ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৭ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২

ভিন্নখবর

এবারের অভিজ্ঞতা প্রকাশকের আগামীর পাথেয়

এবারের অভিজ্ঞতা প্রকাশকের আগামীর পাথেয়

হবে কী হবে না- চলছিল এমন দ্বিধাদ্বন্দ্ব। চার দফার তারিখ পরিবর্তনের পর বইনির্ভর আনন্দযজ্ঞের সূচনাটা হয়েছিল ২৬ ফেব্রুয়ারি। এক মাসের পরিবর্তে এবার অমর একুশে বইমেলার ব্যাপ্তি নির্ধারিত হয় ১৮ দিনে। রবিবার ছিল দেশের সবচেয়ে বড় সেই সাংস্কৃতিক উৎসবের শেষ দিন। সেই বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে, কেমন হলো এবারের বইমেলা? উত্তরে বলতে হয় রোজার মাসে মেলা হওয়ায় কাক্সিক্ষত পাঠকের সাড়া মেলেনি। তাই বইয়ের বিকিকিনিও কম হয়েছে। শুরু থেকেই এমনটাই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন মেলায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রকাশক। গড় হিসাবে এবার ৫৭০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বই বিক্রির পরিমাণ আনুমানিক ১৭ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে মেলার আয়োজক বাংলা একাডেমি। যদিও একাডেমির দেওয়া বই বিক্রির এই হিসাবকে অসত্য তথ্য উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছে সৃজনশীল প্রকাশকদের মোর্চা প্রকাশক ঐক্য। অন্যদিকে মেলার সময় সংক্ষিপ্ত হওয়ায় এবার কমেছে নতুন বই প্রকাশের সংখ্যা। সব মিলিয়ে ২০০৭টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগ। তাই বলে কী বলা যায় এবারের মেলা মলিন হয়েছে? তেমনটাও বলা যায় না। কারণ, দুই হাজার নতুন বইয়ের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে বেশ কিছু মানসম্পন্ন উপন্যাস, গল্প, কবিতা, রাজনীতি ও গবেষণাধর্মী সৃজনশীল ও মননশীল বই। সমঝদার পাঠকেরা মেলা প্রাঙ্গণ চষে বেড়িয়ে সংগ্রহ করেছেন সাহিত্যের গুণমানসম্পন্ন গ্রন্থসমূহ। অন্যদিকে পাঠক খরার মাঝেও বেঙ্গল বুকস, মাওলা ব্রাদার্স, ঐতিহ্য, পাঠক সমাবেশ, প্রথমা, বাতিঘরসহ হাতেগোনা কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বই বিক্রির পরিমাণ প্রত্যাশিত হলেও সন্তোষজনক বলে উল্লেখ করেছে। এমন বাস্তবতায় প্রকাশকরা বলছেন, আগামী কয়েক বছর ফেব্রুয়ারি মাসে রোজা শুরু হবে। এবারের অভিজ্ঞতা হবে তাদের আগামীর পাথেয়। এই অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে সাজাবেন আগামীর বইমেলার পরিকল্পনা। এ প্রসঙ্গে প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশের প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা আশঙ্কা করেছিলাম এবারের বইমেলায় লোকসান হবে। তেমনটাই হয়েছে। নিশ্চিত ক্ষতি জেনেও নির্বাচিত একটি সরকারের প্রতি আস্থা জানাতেই অধিকাংশ প্রকাশনী অংশ নিয়েছে এবারের মেলায়। তাই আগামী বছর প্রকাশকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিলে রোজার আগেই মেলা শুরু করতে হবে। সেক্ষেত্রে জানুয়ারির ৭ তারিখ থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখে মেলা শেষ হতে পারে। তাহলে একই সঙ্গে ভাষার মাসকেও ছুঁয়ে যাবে বইমেলা। এছাড়া জানুয়ারিতে শীতের আমেজ এবং স্কুল-কলেজসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার চাপ না থাকায় উৎসমুখর একটা আবহ থাকবে। অন্যথায় ফেব্রুয়ারিতে রোজার মধ্যে মেলা চালু রাখলে পুনরায় প্রকাশকদের লোকসান গুনতে হবে। আবার ঈদের পর অর্থাৎ মার্চ মাসে গরমের মধ্যে মেলা জমবে না। এজন্য আমরা সৃজনশীল প্রকাশকরা আগামী বছরের মেলার পরিকল্পনা সাজাতে কিছুদিনের মধ্যেই বৈঠকে বসব। সবাই মিলে মেলার জন্য একটি উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করব। আদর্শ প্রকাশনীর মাহবুবুর রহমান বলেন, লোকসানের বোঝা নিয়েই এবারের মেলা শেষ হয়েছে। স্টল ভাড়া পুরো মওকুফ করা হলেও স্টল নির্মাণের কাঠামোসহ বিক্রয় কর্মীদের ভাতা মিলিয়ে মুনাফা তো দূরের কথা বিপুল সংখ্যক প্রকাশনীর খরচ ওঠেনি। তাই এখন থেকেই আমাদের ভাবতে হবে আগামী বছরের মেলা কিভাবে আরও কার্যকরভাবে আয়োজন করা যায়। প্রকাশকদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, ভবিষ্যতের বইমেলার ধরন ও সময় নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা থাকবে তাদেরই। প্রকৃত অর্থে আমরা কেবল আয়োজক। মেলার মূল অংশীদার হচ্ছেন প্রকাশকরা। তাই আগামী মেলা কেমন হবে এবং কবে হবে সেই সিদ্ধান্ত তাদেরকেই নিতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্য সরকারের সদিচ্ছাও গুরুত্ববহ ভূমিকা রাখবে। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) প্রকাশক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এবার বই বিক্রি প্রায় ৭০ শতাংশ কম হয়েছে। অংশগ্রহণকারী প্রায় ৯০ শতাংশ প্রকাশক স্টল নির্মাণের প্রাথমিক খরচটুকুও তুলতে পারেননি। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ প্রকাশকের স্টলে পাঁচ হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়নি। আবার বই বিক্রি কম এবং লোকসান হয়েছে এমন দাবির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণকারী প্রকাশনীও রয়েছে। তেমন কথাই বললেন বেঙ্গল বুকসের প্রকল্প পরিচালক আজহার ফরহাদ। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, মূলত মেলা হওয়া না হওয়ার দোদুল্যমানতায় অধিকাংশ প্রকাশনী পরিকল্পনামাফিক মানসম্পন্ন নতুন বই প্রকাশ করতে পারেনি। ফলশ্রুতিতে এসব প্রকাশনীতে মানসম্পন্ন নতুন বই না থাকায় তাদের বিক্রি ভালো হয়নি। সেই প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রকাশনী মেলার খরচ তুলে বরং লাভের মুখ দেখেছে। এবার সমাপনী দিনের মেলার কথা। এদিনও পাঠকের পদচারণা কম থাকায় বিক্রির গতি ছিল মন্থর। দুপুর বেলায় স্টলগুলোতে ক্রেতার উপস্থিতি ছিল সামান্য। তারপরও কিছু মানুষ বিকেল থেকে মেলায় এসেছেন। বই সংগ্রহের পাশাপাশি মেলা প্রাঙ্গণে বসেই ইফতার করেছেন। এরপর রাত অবধি আড্ডা-গল্পে সুন্দরতম সময় কাটিয়েছেন। তেমন এক পাঠক ফারহানা আফরিন বলেন, বই আমার বিনোদনের প্রধানতম অনুষঙ্গ। তাই আগে দু’দিন এলেও শেষদিনও চলে এসেছি। স্টল ঘুরে ঘুরে গল্প, কবিতা, উপন্যাসের পাশাপাশি রাজনীতি, গবেষণাসহ বিবিধ বিষয়ের বই সংগ্রহ করেছি। শেষদিনে মেলার প্রান্তর ঘুরে জানা যায়, এ বছর বিক্রির শীর্ষে ছিল মননশীল সাহিত্য। উপন্যাস পড়ুয়া পাঠক এবার চিন্তাশীল প্রবন্ধ ও বিষয়ভিত্তিক রচনাবলীর দিকে ঝুঁকেছে। এ প্রসঙ্গে কথাপ্রকাশের ব্যবস্থাপক মো. ইউনুস বলেন, তরুণ পাঠকরা তাদের পাঠ্যসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বই কিনেছেন। নতুন বিষয়ে জানতে আগ্রহী তরুণরা বিষয়ভিত্তিক বই খুঁজেছেন। এছাড়া তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও আঞ্চলিক ইতিহাস পড়ার প্রবণতা বেড়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সমসাময়িক প্রযুক্তি নিয়ে লেখা বইগুলোর কাটতি ছিল ভালো। বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী অনুবাদের বইগুলোও কাছে টেনেছে অনেক পাঠককে। বই বিক্রির হিসাব : সমাপনী দিনে বাংলা একাডেমির দেওয়া প্রতিবেদনে জানানো হয়, মেলায় অংশ নেওয়া ২৬৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী ১৭ দিনে তাদের বিক্রি হয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকা। মেলায় মোট অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৫৮৪টি। এর মধ্যে ১৪টি ছিল মিডিয়া ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছিল ৫৭০টি। এই তথ্যের ভিত্তিতে মেলা পরিচালনা কমিটি ধারণা করছে গড়ে সব মিলিয়ে ৫৭০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মোট বিক্রির পরিমাণ ১৭ কোটি টাকার মতো হতে পারে। মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব সেলিম রেজা তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, অনেক ক্ষেত্রে কম ইউনিট বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি বেশি হয়েছে, তুলনামূলকভাবে বেশি ইউনিট পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায়। সমাপনী অনুষ্ঠান : বিকেলে মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বইমেলার সদস্য সচিব ড. মো. সেলিম রেজা। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি সচিব মো. মফিদুর রহমান। প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত ‘গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হয়। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, যে বই পাঠককে মনের ভেতর থেকে জাগিয়ে তোলে, ন্যায়-অন্যায় বোধ জাগ্রত করে এবং রাষ্ট্র গঠনে ও উন্নত চিন্তা-চেতনা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে সেটিই মানসম্পন্ন বই। একটি জাতির কল্যাণ ও ভবিষ্যৎ পাঠাভ্যাস দ্বারা নির্ণিত হয়। কাজেই পাঠকদের হাতে ভালো ও মানসম্পন্ন বই তুলে দেওয়ার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। প্রধান অতিথির বক্তব্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে নতুন প্রজন্মকে পুনরায় বইয়ের জগতে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, কেবল জ্ঞানই পারে একটি সমাজকে সঠিকভাবে শাসন করতে এবং বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য বজায় রাখতে। দেশের প্রতিটি উপজেলায় পাঠাগার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করে মন্ত্রী বলেন, আমরা লাইব্রেরিগুলোকে প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যাব এবং সেখানে সরকারিভাবে বই সরবরাহের ব্যবস্থা করব। প্রকাশকদের প্রতি আমার আহ্বান, আপনারা মানসম্মত বই প্রকাশ করুন, যাতে আমাদের সন্তানরা আবার বইয়ের প্রতি আগ্রহী হয়।

ভিন্নখবর বিভাগের সব খবর

পাঠকের আনাগোনায় মুখর প্রাণের উৎসব

পাঠকের আনাগোনায় মুখর প্রাণের উৎসব

বই নিয়ে আবেগ ও ভালোবাসার গল্পময় যাত্রাটা শুরুটা হয়েছিল গত ২৬ ফেব্রুয়ারি। তবে বৃহস্পতিবার অবধি আট দিন পেরুলেও মলিনতার ছাপ ছিল অমর একুশে বইমেলার শরীরে। রমজান মাসের কারণে পাঠকখরার সমান্তরালে দর্শনার্থীদের আনাগোনাও ছিল অল্পস্বল্প। ফলে বাঙালির মননের প্রতীকী প্রাণের উৎসবে যেন চলছিল বিরহকাল। চোখে পড়ছিল বই নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব। ক্রেতা না থাকায় বিরস বদনে আলসে সময় পার করছিলেন বই বিতানের বিক্রয়কর্মীরা। লোকসানের বোঝা বহনের চিন্তায় প্রকাশকদের কপালে লেপটেছিল চিন্তার ভাঁজ। বইপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের অনুপস্থিতিতে অধিকাংশ সময় মেলা প্রান্তরে বিরাজ করেছে সুনসান নীরবতা। অবশেষে শুক্রবার ছুটির দিনে ভাঙল সেই নীরবতা। গ্রন্থানুরাগীদের পদচারণায় সরব হলো মেলার দুই ক্যানভাস- সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি আঙিন। বিশেষ করে সৃজন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসমূহের অবস্থান উদ্যান অংশে  এদিন প্রাণবন্ত দৃশ্যের দেখা মিলেছে। হাতে হাতে ঘুরেছে বই। বইয়ের ব্যাগ হাতে নিয়ে ঘোড়াফেরা করা মানুষের সংখ্যাটাও নেহাত কম ছিল না।  সেই সুবাদে  অধিকাংশ প্রকাশনীতে ভিড় জমেছিল বই পোকাদের।           ফাগুনের সকাল থেকে খুলে যায় বইমেলার দুয়ার। শিশুপ্রহরের হাতছানিতে অভিভাবকদের সঙ্গী করে বইয়ের উৎসবে শামিল হয়েছিলেন সোনামণিরা। তাদের পদচারণায় মুখরিত হয়েছে শিশু কর্নারের স্টলগুলো। এরপর মুখরতা ছাপিয়ে বইয়ের রাজ্যে ডুবে যায় ছোট ছোট বইপ্রেমীরা। বাবা-মা কিংবা মামা-চাচার হাতের বাঁধনটি আলগা করে খুঁজতে থাকে নিজের পছন্দ ও মননের উপযোগী বইটি। সেই তালিকায় উঠে আসে  রূপকথার গল্প থেকে শুরু করে,  সুন্দরবনের প্রাণীরাজ্যের গল্প, ছড়ায় ছবিতে বাংলার ষড়ঋতুর গল্প, মহাকাশের রহস্যময় জগতের তথ্য মেলে ধরা বই,  কল্পবিজ্ঞান, অ্যাডভেঞ্চার, ভূতের গল্প, ম্যাজিক বুক, টোনাটুনি কিংবা ঈশপের গল্পসহ বিচিত্র বিষয়ের বই। ছোটদের উপযোগী মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বইয়ের প্রতিও  ছিল অনেকের প্রবল ঝোঁক। আর বই সংগ্রহের আনন্দকে সঙ্গী করে কাকতাড়ুয়া থিয়েটারের উপস্থাপিত বায়োস্কোপ কিংবা পুতুল নাচ দেখে কেটেছে তাদের সুন্দরতম সময়। সকাল গড়ানো দুপুর এবং বিকেলে মেলায়  ভিড় জমিয়েছিলেন জ্যেষ্ঠ পাঠকরা। অনেকে ইফতার শেষে সন্ধ্যার পর এসেছিলেন। সব মিলিয়ে ছুটির দিনে পাঠক ও দর্শনার্থীর পদচারণায় সরগরম হয় প্রাণের মেলা। যেহেতু এসেছিল কাক্সিক্ষত পাঠক তাই বইয়ের বিক্রিও অন্যান্য দিনের তুলনায় ভালো  হয়েছে। আর বই বিকিকিনির হিড়িকে হাসি ফুটেছে প্রকাশের মুখে। কাক্সিক্ষত বেচাকেনায় ছোট-বড় সব প্রকাশক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। বসন্ত বিকেলে কথা হয় ঐতিহ্যের ব্যবস্থাপক আমজাদ হোসেন কাজলের সঙ্গে। আলাপচারিতায় বলেন, আজ যারা মেলায় এসেছেন তাদের অধিকাংশই বই কিনেছেন। বইকে ঘিরে আসা মানুষের এই পদচারণা আমাদের স্বস্তি দিয়েছে। সেই বাস্তবতায় মেলা শুরুর পর থেকে আজ (শুক্রবার) নবম দিনে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে।  বই বিকিকিনির এই স্বতঃস্ফূর্ত  ধারাটা মেলার আগামী দিনগুলোতেও   অব্যাহত থাকুক। নতুন বইয়ের তথ্য

মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে  আলিয়ঁসে বিশেষ  প্রদর্শনী

মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আলিয়ঁসে বিশেষ প্রদর্শনী

শনিবার ছিল ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির শেষদিন। আর মাসজুড়ে নানা অনুষ্ঠানসহ ফেব্রুয়ারির সমাপনী দিনেও অনুষ্ঠিত হয়েছে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠান।  এ উপলক্ষে ফরাসি সাংস্কৃতিক আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা তাদের নুভেল ভগ মিলনায়তনে বিশেষ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এই প্রদর্শনীতে স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতা এবিএম নজমুল হুদার নির্মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়, যা মাতৃভাষার গুরুত্ব ও ভাষাগত বৈচিত্র্যের তাৎপর্য তুলে ধরে। এই প্রদর্শনীতে দেখানো হয় প্রামাণ্যচিত্র ‘ম্রো রূপকথা’। ছবিটিতে ম্রো ভাষায় রচিত প্রথম সাহিত্যগ্রন্থ প্রকাশের ইতিহাস ও তার নেপথ্যের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। সাংস্কৃতিক গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে চলচ্চিত্রটি জাতীয় চলচ্চিত্র অনুদান পেয়েছে।  এছাড়াও বিশেষ এ আয়োজনে প্রদর্শিত হয় ‘দ্য কনসিকোয়েন্স’ নামের স্বল্পদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র; যা ম্রোদের ঐতিহ্যবাহী এক  লোকগাথার অবলম্বনে নির্মিত। এটি ম্রো ভাষায় নির্মিত প্রথম অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র। সেই সুবাদে ধারণা করা হয়, বাংলা  ভাষার বাইরে এটিই বাংলাদেশে নির্মিত অন্য ভাষার প্রথম অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র। প্রদর্শনী শেষে নির্মাতা এবি এম নাজমুল হুদা বলেন, আমাদের ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। এই মাসে আমাদের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ভাষা আন্দোলনের প্রেরণা। বাংলাদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৪১টির বেশি ভাষা প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে কিছু ভাষা বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এসব ভাষার নিজস্ব লিখিত বর্ণমালা নেই অথবা এসব ভাষায় খুব অল্প সংখ্যক মানুষ কথা বলে। ভাষা মানব সভ্যতার অন্যতম শক্তিশালী ও অর্থবহ অর্জন।  নির্মাতা আশা প্রকাশ করেন যে, এ ধরনের চলচ্চিত্র মাতৃভাষা চর্চা ও সংরক্ষণের বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং মানুষকে এ বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হতে উৎসাহিত করবে। আমার বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সম্মান ও সুস্থভাবে লালন করা গেলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রসঙ্গত, এবি এম নাজমুল হুদা বাংলাদেশের একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা। সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর গল্প বলার ভিন্ন এক ভাষা খুঁজে নেন তিনি। প্রাতিষ্ঠানিক চলচ্চিত্র শিক্ষার পরিবর্তে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করেছেন এই নির্মাতা। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে অন্তর্যাত্রা, মনপুরা, গেরিলা এবং বাড়ির নাম শাহানা।  তিনি একাধিক টেলিভিশন নাটক ও অনুষ্ঠান রচনা ও পরিচালনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে উত্তরাধিকার বাংলাদেশের প্রথম টেলিভিশন রিয়েলিটি শো।

আবেগের টানে অনেকেই আসেন প্রাণের উৎসবে

আবেগের টানে অনেকেই আসেন প্রাণের উৎসবে

অমর একুশে বইমেলা মানে শুধু বইয়ের বিকিকিনি নয়।  জাতির মননের উৎকর্ষের প্রতীকী  মেলার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে  চেতনার বহ্নিশিখা।   সেই  চেতনায় মিশে আছে ভাষা আন্দোলনের খরস্রোতা সংগ্রামী অধ্যায়।  শুধু কি তাই!  এই  মেলার সঙ্গে মিশে আছে মুক্তচিন্তার সমাজ গড়ার গল্প। যে গল্পে মিশে আছে মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন। সম্প্রীতির সমাজ বিনির্মাণের ভাবনাটাকেও বহন করে এই গল্প। তাই তো একুশে বইমেলায় অনেকেই আসেন আবেগের টানে।  তারা নতুন বই সংগ্রহের আনন্দকে ছাপিয়ে অন্য কিছুরও সন্ধান করেন প্রাণের এই উৎসবে। হৃদয়ের অকৃত্রিম অনুরাগে শামিল হন  ভাষাশহীদদের স্মৃতিতে নিবেদিত  আযোজনটিতে। ঘুরে বেড়ান মেলার দুই ক্যানভাস  সোহরাওয়ার্দী  উদ্যান ও বাংলা একাডেমি আঙ্গিনায়। ভালোলাগার অনুভবে নতুন বই নিয়ে নাড়াচাড়ার পাশাপাশি স্টল বিন্যাসের সৌন্দর্য অবলোকনে মুগ্ধতার সন্ধান খোঁজেন। উপভোগ করেন গান-কবিতার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে শিল্পী-সাহিত্যিক ও মনীষীদের স্মরণে অনুষ্ঠিত কথামালায় ।  কেউ বা লেখকদের লেখক হওয়ার ভেতরের গল্পটি শুনতে উপস্থিত হন লেখক বলছি মঞ্চের অনুষ্ঠানে। সব  দেশের সবচেয়ে বড় এই সাংস্কৃতিক উৎসবটাকে তারা ভিন্নভাবে উপলব্ধি করেন। একরাশ ভালোলাগার অনুভব নিয়ের তারা প্রবেশ করেন প্রাণের মেলায়। উদ্যাপনের অপার আনন্দের শামিল হওয়া  তেমনই এক কবি ও আবৃৃত্তিশিল্পী  এবং উপস্থাপিকা তাসনুভা মোহনা। শনিবার বসন্ত বিকেলে উৎফুল্ল মনে এই নারী চষে বেড়াচ্ছিলেন সোহরাওয়াদী উদ্যানের মেলা প্রান্তর। এই অংশের বাংলা একাডেমির প্যাভিলিয়নে দৃশ্যমান বাংলা বর্ণমালায় সজ্জিত রঙিন নকশা বোর্ডের সঙ্গে ফ্রেমবন্দি করছিলেন নিজেকে। এরপর ধীরে পায়ে চলে গেলেন প্রকাশনা সংস্থা বাতিঘরের  স্টলে। হাতে তুলে নেন সদ্য প্রকাশিত মোস্তাক শরীফ রচিত ‘মির্জা গালিব’ শিরোনামের বইটি।  এ সময় কথা হয় তাসনুভা মোহনার সঙ্গে। আলাপচারিতায় এই পাঠক ও দর্শনার্থী বইমেলাকে দেশজ সংস্কৃতির অনন্য উদ্যাপন উল্লেখ করে বলেন, বইমেলা মানে কেবল বই কেনা এবং বেচার বিষয় নয়। কেবলই ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম নয়। শুধুমাত্র বই কেনার জন্য  এখানে আসি না।  এই মেলার সঙ্গে মিশে আছে  আবেগের সম্পর্ক। যুক্ত রয়েছে ভাষা আন্দোলনের অবিনাশী চেতনা। মিশে  আছে ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের সুন্দরতম অনুভূতি। অন্যদিকে এই মেলা যেন এক বিশালতম  সংস্কৃতির সুন্দরতম প্রকাশ। এখানে একটা মঞ্চে দাঁড়িয়ে লেখকরা তাদের লেখক হওয়ার গল্পগুলোকে মেলে ধরেন পাঠকের সামনে। এতে লেখক-পাঠকের মাঝে গড়ে ওঠে নিবিড়তম সম্পর্ক। আবার গ্রন্থ মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে যখন লেখক তার সদ্য প্রকাশিত বইটির নিয়ে কথা বলেন তার অন্তর্গত আনন্দের রেশটা ছুঁয়ে যায় সেথায় উপস্থিত শ্রোতাদের মনে। এর বাইরে মেলামঞ্চের  সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটিও আমার কাছে দারুণ উপভোগ্য। কখনো বা মনীষী কিংবা কবি-সাহিত্যিকদের নিবেদিত আলোচনা শুনেও ঋদ্ধ হই। তাছাড়া মেলা মানেই হচ্ছে উৎসব। সব ধরনের মানুষের সমাগম ঘটে এ উৎসবে। সবাই মিলে আয়োজনটাকে উদ্যাপন করে। এ কারণে  মেলা এখনো জমে না উঠলেও সুযোগ পেলেই এখানে ঢুঁ দেই। শনিবার নিয়ে দ্বিতীয় দিন নিলাম। এখনো তেমনভাবে  নতুন বই না আসায় খুব একটা বই  কেনা হয়নি।  তবে মেলাটা পুরোদমে উপভোগ করছি। এর বাইরে বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দেওয়াসহ আনন্দের নানা অনুষঙ্গ আমাকে টেনে নিয়ে আসে এই মেলায়। আমার মতো অনেকেই অভিন্ন অনুভূতি নিয়ে প্রবেশ করেন ভাষা আন্দোলনের স্মৃতির স্মারক এই তীর্থস্থানে।

৭ প্রতিষ্ঠানে চাকরি হারাচ্ছে মানুষ

৭ প্রতিষ্ঠানে চাকরি হারাচ্ছে মানুষ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই একদিন মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে- এই আশঙ্কা বেশ কয়েক বছর ধরে তীব্র হয়েছে। বাস্তবতা হলো, সেই ভবিষ্যৎ যেন ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের প্রায় ১১ দশমিক ৭ শতাংশ কাজ প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম। গবেষকেরা ‘আইসবর্গ ইনডেক্স’ নামে একটি বিশেষ টুল ব্যবহার করে ১৫ কোটি মার্কিন কর্মীর তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন এবং দেখেছেন কোন কোন পেশায় মানুষের জায়গা এআই নিতে পারে। এআই যেমন মানুষের কাজ দখল করছে, তেমনি নতুন কাজের সুযোগও তৈরি হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জরিপে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কর্মীর সংখ্যা কমাতে পারে। তবে বড় ডেটা, ফিনটেক ও এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তি খাতে চাকরির সংখ্যা ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।নিচে কিছু প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করা হলো, যারা ইতিমধ্যে এআই দিয়ে মানুষের কাজ প্রতিস্থাপন করেছে বা সেই পথে হাঁটছে। এইচপি : এআই-ভিত্তিক উদ্যোগের কারণে করপোরেট পর্যায়ে কর্মীর সংখ্যা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে আমেরিকান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এইচপি। ২০২৮ সালের মধ্যে ৪ থেকে ৬ হাজার কর্মী ছাঁটাই করার কথা ভাবছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এআই গ্রহণ ও প্রয়োগের মাধ্যমে গ্রাহক সন্তুষ্টি, উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো হবে। আইবিএম : যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইবিএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অরবিন্দ কৃষ্ণা দ্য ওয়াল স্ট্রেট জার্নালকে জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগে শতাধিক কর্মীর কাজ ইতিমধ্যে এআই দিয়ে করানো হচ্ছে। ২০২৬ সালের শেষ দিকে আরও কয়েক হাজার কর্মী ছাঁটাই হতে পারে। তবে নতুন প্রযুক্তি ও কোয়ান্টাম ক্ষেত্রের জন্য নিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে পাঁচ বছরে মানবসম্পদের মতো বিভাগে প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ এআই দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে পারে। আমাজন : যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানটিতে এআই-নির্ভর দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আগামী কয়েক বছরে কর্মীর সংখ্যা কিছুটা কমতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ছাঁটাই মূলত সাংগঠনিক সংস্কৃতি পুনর্গঠনের অংশ বলে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে। আমাজন এআইকে উদ্ভাবন বাড়ানোর সহায়ক হিসেবে দেখছে। সেলসফোর্স : বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্লাউড-ভিত্তিক সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান সেলসফোর্স। এর গ্রাহক সহায়তা বিভাগে এআই এজেন্ট ব্যবহার করছে। এর ফলে কর্মীর সংখ্যা ৯ হাজার থেকে কমে প্রায় ৫ হাজারে চলে এসেছে। তবে নতুন কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন পড়েনি এবং শত শত কর্মীকে অন্যান্য বিভাগে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। ক্লারনার : প্রতিষ্ঠানটিতে গত চার বছরে ক্লারনারের কর্মীর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং আগামী বছরগুলোতেও কমতে পারে। বর্তমানে ক্লারনায় প্রায় ৩ হাজার কর্মী আছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ২ হাজারের নিচে নামতে পারে। ২০২২ সালে কর্মীর সংখ্যা ছিল ৭ হাজার। যেখানে ‘মানবিক সংযোগ’ গুরুত্বপূর্ণ, সেই কাজগুলোতে মানুষ অপরিবর্তিত থাকবে। এআই সহকারী বর্তমানে ৮৫৩ জন কাজ করতে সক্ষম। এতে বছরে প্রায় ৫৮ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হচ্ছে। ফাইভার : এটি ফ্রিলেন্সারদের জন্য গঠিত একটি অনলাইন মার্কেট প্লেস। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি মোট কর্মীর প্রায় ৩০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করেছে। এই পদক্ষেপ ফাইভারকে আরও এআই নির্ভর কোম্পানিতে রূপান্তরিত করবে। কফম্যান বিজনেস ইনসাইডারকে জানান, ফাইভার ভবিষ্যতে শুধু সেই লোকদের নিয়োগ দেবে যাঁরা এআই ব্যবহার করতে জানেন। ওয়াইজটেক : লজিস্টিক সফটওয়্যার নির্মাতা ওয়াইজটেক ২ হাজার জন বা ৩০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করছে। সিডনি-ভিত্তিক এই কোম্পানিতে অক্টোবরের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৭ হাজার কর্মী কাজ করত।এআই এখন কোড লেখা থেকে গ্রাহকসেবা পর্যন্ত মানুষের কাজের জায়গা দখল করছে। ভবিষ্যতে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীর অর্ধেককে ছাটাই করতে বাধ্য হতে পারে। আইটি ডেস্ক

কণ্ঠস্বরই যখন গোপনীয়তার বড় হুমকি

কণ্ঠস্বরই যখন গোপনীয়তার বড় হুমকি

আপনার কণ্ঠস্বর এখন আর শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়। একজন কণ্ঠ বিশেষজ্ঞ আপনার কথা বলার ধরন শুনেই অনেক কিছু বলে দিতে পারেন। আপনার শিক্ষা, মানসিক অবস্থা, এমনকি পেশা বা আর্থিক অবস্থাও তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। বিষয়টি শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও বিজ্ঞানীরা এখন এক বড় আশঙ্কার কথা জানাচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আপনার গলার স্বর বিশ্লেষণ করে আপনার অজান্তেই একটি নিখুঁত ব্যক্তিগত প্রোফাইল তৈরি করে ফেলতে পারে। এর ফলে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অন্যের কাছ থেকে অন্যায্য সুবিধা নেওয়া বা আপনাকে হয়রানি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। মানুষ কথা বলার সময় অন্যের ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা বা আনন্দ বেশ সহজেই বুঝতে পারে। কিন্তু কম্পিউটার বা এআই এই কাজটি করতে পারে আরও দ্রুত এবং মানুষের চেয়েও অনেক বেশি নিখুঁতভাবে। নতুন এক গবেষণা বলছে, আপনার কথা বলার ধরন থেকে অনেক কিছুই জানা সম্ভব। এমনকি আপনার ব্যবহৃত শব্দগুলো থেকে আপনার মনের খবরও পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে আপনার রাজনৈতিক পছন্দ যেমন বোঝা যায়, তেমনি শরীরের জটিল কোনো রোগ বা স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কেও আগাম ধারণা পাওয়া সম্ভব। গত ১৯ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিডিংস অব দ্য আইইইই জার্নালে এ সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। গবেষকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, প্রযুক্তির এই ক্ষমতা যদি ভুল পথে ব্যবহৃত হয়, তবে তা আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। নতুন এক গবেষণা বলছে, আপনার কথা বলার ধরন থেকে অনেক কিছুই জানা সম্ভব। এমনকি আপনার ব্যবহৃত শব্দগুলো থেকে আপনার মনের খবরও পাওয়া যায়। কণ্ঠস্বর শনাক্তকরণ প্রযুক্তি আমাদের জন্য অনেক সুযোগ তৈরি করলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে বড় এক ঝুঁকি। ফিনল্যান্ডের আল্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও এই গবেষণার প্রধান লেখক টম বাকস্ট্রোম একটি গুরুতর আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।  তাঁর মতে, কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যদি আপনার কণ্ঠস্বর বিশ্লেষণ করে আপনার আর্থিক অবস্থা বা প্রয়োজনের কথা বুঝে ফেলে, তবে তারা সেটিকে আপনার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করতে পারে। ধরুন, আপনার গলার স্বর শুনে কোনো এআই বুঝে ফেলল আপনি আর্থিকভাবে বেশ সচ্ছল। অথবা আপনার কথা শুনে মনে হলো, এই মুহূর্তে আপনার কোনো সেবা খুব জরুরি। এমন পরিস্থিতিতে বিমা কোম্পানিগুলো আপনার জন্য সেবার দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। আপনার কণ্ঠস্বরের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া এই অন্যায্য সুযোগকেই বলা হয় ডিজিটাল বৈষম্য। ঝুঁকি এখানেই শেষ নয়। আমাদের কণ্ঠস্বর আমাদের মানসিক দুর্বলতা, লিঙ্গপরিচয় ও আরও অনেক ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করে দিতে পারে। সাইবার অপরাধীরা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এই তথ্য ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে পারে। ফলে ব্যক্তিগত জীবনে হয়রানি বা ব্ল্যাকমেইলের মতো ঘটনা ঘটার আশঙ্কা বেড়ে যায়। আমরা যখন কথা বলি, তখন অবচেতনভাবেই এই তথ্যগুলো অন্যের কাছে পৌঁছে দিই এবং আমাদের মস্তিষ্কও অন্যের কণ্ঠের প্রতি অবচেতনভাবেই সাড়া দেয়।  সূত্র: লাইভ সায়েন্স

এক সময়ের নিঃস্ব হাসান এখন স্ট্রবেরি চাষ করে কোটিপতি

এক সময়ের নিঃস্ব হাসান এখন স্ট্রবেরি চাষ করে কোটিপতি

এক সময়ে বিদেশে বন্দি স্বপ্ন এখন দেশের মাটিতে ডানা  মেলেছে তার। সোনার হরিণের পেছনে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার জালে জড়িয়ে ফেলেছিলেন তারুণ্যের স্বপ্ন। অচেনা বিদেশ বিভুঁইয়ের কারাগার প্রকোষ্ঠে চাপা আর্তনাদ কেউ শুনত না তার। বিদেশের রঙিন জীবনের নেশা আর ভালো উপার্জনের স্বপ্ন  কারাগারের নিকষ আঁধারে হারিয়ে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল সে সময়। তবে বিদেশে গিয়ে ভালো উপার্জনের স্বপ্নের ডানা এখন দেশের মাটিতেই খুলেছে বগুড়ার তরুণ কৃষি উদ্যেক্তা এম এ হাসানের। বিদেশে সব হারানো এই তরুণের গল্প এখন সাফল্যে ভরা। বিদেশের কারাগার তার স্বপ্ন যেমন কেড়ে নিতে পারেনি তেমনি বিদেশি ফল স্ট্রবেরিও তাকে হতাশ করেনি। স্ট্রবেরি চাষ করেই এক সময়ের নিঃস্ব তরুণ হাসান এখন কোটিপতি। নিজের দেশের সোনার মাটি তাকে নতুন উদ্যমে পথচলার পুঁজি ও নতুন দিনের সাফল্যের ছবি আঁকার পথ দেখিয়েছে। বিদেশের মাটিতে ভালো থাকার ঠিকানা খোঁজা হাসান এখন দেশেই পেয়েছেন স্বস্তির ঠিকানা। তাই তার চোখ ভরে এখন এই ফাগুনের আলোর দ্যুতির স্বপ্নরা ঝাঁপি খুলে বসে তার লাল-সবুজের ছোপ দেওয়া খেতে। সবুজের সঙ্গে লাল বর্র্ণের ফুটে ওঠা নিজের খেত শুধু চিত্তাকর্ষক বা মনোমগ্ধকর এক খামারই নয়, স্বপ্ন ভাঙা এক তরুণের নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সফলতার প্রতিচ্ছবি। নিজগ্রামে বিশাল স্ট্রবেরি খামারের সাফল্যে তাকে এ অঞ্চলে অন্যতম কৃষি উদ্যোক্তার পরিচয় এনে দিয়েছে। এটি উত্তরের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ স্ট্রবেরি খামার। বগুড়া সদরের শেষ সীমানা ঘেঁষে বগুড়ার শিবগঞ্জ ও গাবতলি উপজেলার সীমানার কাছেই সবুজে ছাওয়া হাসানের গ্রাম সদরের রায়মাঝিড়া। এখানকার উর্বর জমিই তাকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখিয়েছে। বোরো জমিতে সেচ দেওয়ার স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানির এঁকে বেঁকে জমির আইল ধরে চলে যাওয়ার পথে নীরবতা ছন্দপতন, শ্যালো মেশিন থেকে পানি ওঠানোর শব্দে ভাঙে এই নীরবতা। তবে এসব শব্দ যেন থেমে যায় হাসানের মনোলভা স্ট্রবেরি খামারের প্রান্তে। পরিচ্ছন্ন খামারে গুল্মজাতীয় স্ট্রবেরি গাছের ফাঁক দিয়ে লাল বর্ণের মোহনীয় উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে উঁকি দিচ্ছে ফল। সকাল থেকে কর্মীদের ব্যস্ততা আর বিশাল খামারের চোখ জুড়ানো সবুজ আর লালের হাতছানি। একেবারে গ্রামীণ এলাকায় এ ধরনের বিশাল যজ্ঞের স্ট্রবেরি খামার অনেককে হতচকিত করে বিহ্বলতা এনে দেবে। তবে মোহনীয় এই স্ট্রবেরির খামার একই সঙ্গে মুগ্ধতাও এনে দেবে। এক যুগ আগের কথা। হাসান তখন কেবল কলেজের গন্ডি পেরিয়ে বিশ^বিদ্যালয়ে পা দিতে ঢাকায়। তবে তার মনোজগত জুড়ে ছিল বিদেশের চাকচিক্যে চোখ ধাঁধানো জীবনের হাতছানি। গ্রাম থেকে ঢাকায় গিয়ে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও বিদেশে গিয়ে অনেক টাকা আয় আর উন্নত জীবনের টান তাকে অষ্ট্রেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। শেষমেশ পাড়ি জমান অচেনা দেশের উদ্দেশে। তবে বিধি বাম। ভ্রমণের নথি নিয়ে জটিলতায় ইউরোপোর দেশ জর্জিয়ায় কারাগারে গিয়ে স্থান হয়। তখন তার চোখে ঘোর অন্ধকার। ৬ মাস কারাগারে থাকার পর ফিরেন দেশে। তবে বিদেশে যাওয়া তার কাছে জেদে পরিণত হয়েছিল। ৩ বারের চেষ্টায় অবশেষে মালয়েশিয়ায় গিয়ে কিছু দিন থিতু হতেই অবার বিপদ। সেখান থেকে কোনোমতে রক্ষা পেয়ে ফিরেন দেশে। তবে ততদিন ঋণের ভার তার পুরো পরিবারকে গিলে খেতে বসেছে। বাড়ি ফিরে কি করবেন তা চিন্তা করতেই আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। কিছু যে করবেন তার মূলধন কই। এলাকার সমিতি থেকে ৪৬ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে যাত্রা শুরু করেন কৃষি খামার গড়ার সংগ্রাম। প্রথমে পেঁপে চাষ। এর পরেই স্ট্রবেরি চাষ নিয়ে খোঁজ খবর নিতে শুরু করলেন। দেখলেন কম সময়ের ফল চাষে তুলনামূলক কয়েগুণ বেশি লাভ। শুরু করলেন স্ট্রবেরি চাষ। তবে প্রথম কয়েক বছর এ জন্য করতে হয়েছে প্রচুর পরিশ্রম। একপর্যায়ে হালছাড়ার কথাও ভেবেছিলেন। তবে  লেগে থাকার কারণে আর পেছনে ফিরতে হয়নি। এখন মোট ৭ বিঘা জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করছেন। এর সঙ্গে রয়েছে ১ বিঘা জমির ওপর চারা তৈরি পলিনেট হাউস (কৃষি বিভাগ থেকে তৈরি করে দেওয়া)। তবে স্ট্রবেরিতেই থেমে নেই তিনি। আরও ৭ বিঘা জমিতে মাল্টা, ড্রাগন, উন্নত জাতের কলা ও পেয়ারা বাগান করেছেন। জানালেন স্ট্রবেরি চাষ ও ফলন ৫ মাসের। এর মধ্যে মধ্যে ফলন হয় ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ এপ্রিল পর্যন্ত। ডিসেম্বর থেকে চারা লাগালে এই সময় পর্যন্ত ফলন হয়। এর আগেও চারা লাগানো যায়। হাসানের স্ট্রবেরি খামারে আমেরিকান ফেস্টিভ্যাল, উইন্টার ডন, থাই-ইতালি জাত ও ফ্রিডম ২৪ জাতের স্ট্রবেরির প্রায় ৩৫ হাজার গাছ থেকে ফল হয়। গড়ে প্রায় ১ কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়া যায় প্রতি গাছ থেকে মৌসুমে।  সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে সাড়ে ৪শ’ টাকায় প্রতি কেজি স্ট্রবেরি বিক্রি হয়। অনলাইন মার্কেট থেকে শুরু করে পাইকারদের অর্ডার অনুযায়ী ফল তোলা হয় বাগান বা ফার্ম থেকে। হাসানের শালিন অ্যাগ্রো ফার্ম নামে এই স্ট্রবেরি খামার থেকে প্রতিদিন ২ থেকে আড়াইশ’ কেজি স্ট্রবেরি স্থানীয় বাজার ছাড়াও রংপুর, নীলফামারী, যশোর, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, কুষ্টিয়া ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় স্ট্রবেরি যায়। যার দাম লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। শুধু ফল নয় এখান থেকে চারা উৎপাদনও তার খামারের মূল আর্থিক উৎস হয়ে উঠেছে। বছরে প্রায় ২ লাখ চারা বিক্রি করেন ১৫ থেকে বিভিন্ন টাকা দরে। কৃষি বিভাগের স্থানীয় উপ-সহাকরী কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল কিবরিয়া জানান, চারা উৎপাদন ও স্ট্রবেরি চাষে সবধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি পলিনেট হাউস করে দেওয়া হয়েছে চারা উৎপাদনের জন্য। এ ছাড়া ট্রাইকোকম্পোস্ট সারের জন্য একটি ইউনিট করে দেওয়া ছাড়াও তরুণ উদ্যোক্তা হাসানকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। হাসান তার ফার্মে মালচিং পদ্ধতিতে স্ট্রবেরি উৎপাদন করছেন। হাসান জানালেন, স্ট্রবেরি চাষের সঙ্গে একই জমিতে তিনি সাথী ফসল হিসাবে তরমুজ চাষ শুরু করেছেন। স্ট্রবেরি ফলন শেষ হলে পুরোদমে তরমুুজ লাগাবেন। সাথী ফসল হিসাবে তরমুজ থেকেও ভালো লাভ করা যায়। এক সময়ে বিদেশের কারাগারে স্বপ্ন খুইয়ে নিঃস্ব হওয়ার পথ থেকে সফল উদ্যেক্তা হওয়া হাসানের স্ট্রবেরি চাষের খামার এখন উত্তরের মধ্যে সবচেয়ে বড় হওয়ার সঙ্গে দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়। তার স্ট্রবেরি খামারে প্রায় ১৮ জন শ্রমিক কাজ করেন। এরমধ্যে ১০ জন নিয়মিত। খামারের কাজে শ্রমকিদের আসা যাওয়ার জন্য ২টি মোটরসাইকেল কিনেছেন। নিজে চালান প্রাইভেটকার। বিদেশে যাওয়ার জন্য যে ঋণ পরিবার করেছিল তা আর নেই। পরিবারের মুখে হাসি এনে দেওয়ার সঙ্গে তার এগিয়ে যাওয়ার পথকে আরও বিস্তৃত করেছেন। তার লক্ষ্য স্ট্রবেরি ফার্মকে সামনে আরও বড় করা। লিজ নেওয়া জমিতে তিনি চাষ করেন। আগামীতে ৭ বিঘার খামার ১৬ বিঘাতে পরিণত করে একটি আধুনিক খামার প্রতিষ্ঠা তার বড় স্বপ্ন। জানান অন্য যে সব ফল করছেন আগামীতে সেসব ফল না করে পুরো জমিতেই স্ট্রবেরি চাষের খামার গড়ে তোলার লক্ষ্য। এভাবেই এক অত্যাধুুনিক কৃষি ফার্ম গড়ে তোলার পথে এগিয়ে যেতে চান। স্ট্রবেরির উদ্ভিদীয় নাম ফ্রাগারিয়া। প্রাচীন রোমান সাহিত্যে স্ট্রবেরির কথা রয়েছে। শুধু ফল হিসাবে নয়, নানা স্বাদের খাদ্য, পানীয় তৈরিতে এর প্রাসঙ্গিকতার জুড়ি মেলা ভার। এক সময় এটি  ছিল রাজকীয় খাবারের অংশ। সুদূর ফ্রান্সে এর চাষ ১৮ শতকের মাঝের সময়ে এর বাণিজ্যিক চাষ শুরু হলেও এর চাষ ও গুণাবলির কথা ইতিহাসে মিলে অনেক আগে থেকে। ১৫ থেকে ১৬শ’ শতকে এর চাষ ও এর নানা বর্ণনা বর্ণিত হতে দেখা যায়। তবে ফ্রান্সের সঙ্গে এটি উত্তর আমেরিকার ও ইউরোপের অন্য অঞ্চলেও পুষ্টি, স্বাদ আকর্ষণীয়তায় এটির চাষ বাড়ে। প্রধানত শীত প্রধান দেশের ফল হলেও উষ্ণ শীত এলাকাতেও এর চাষ হয় বলে এটির চাষ দেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেক কৃষি কর্মকর্তা জানিয়েছেন উত্তরের জেলাগুলোতে এর সম্ভবনা বেশি। এ বিষয় বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক  সোহেল মো. সামসুদ্দিন ফিরোজ জানান,বগুড়া সদর ছাড়াও শাজাহানপুর, শেরপুর, নন্দীগ্রাম শিবগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্ট্রবেরি চাষ হচ্ছে। কৃষিবিভাগের হিসাবে মতে বগুড়ায় ১৬ বিঘা জমিতে স্ট্রবেরি চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে সদরের শালিন অ্যাগ্রো সবচেয়ে বড় ও কমার্শিয়াল খামার। জেলায় স্ট্রবেরির সম্ভবনা থাকলেও এটি সংরক্ষণের সমস্যা দূর হলে এটি চাষে আগামীতে কৃষকরা আগ্রহী হয়ে উঠবে। বাজারও হবে বড়। বগুড়া থেকে উৎপাদিত স্ট্রবেরি খুলনা,পটুয়াখালী, শেরপুর, যশোর, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। এর সঙ্গে চারাও এখান থেকে বাইরে যাচ্ছে।

যশোরের গ্রামে শিমুলের অভূতপূর্ব জাগরণ

যশোরের গ্রামে শিমুলের অভূতপূর্ব জাগরণ

মাঘের শেষ বিকেল। শীতের রুক্ষতা তখনো পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। মাঠের ঘাসে ধুলা, খাল-বিলের পানি কমে এসেছে, গাছের ডালে ক্লান্তির ছাপ। এমন সময়ই হঠাৎ চোখে পড়ে আগুনরঙা এক বিস্ময় শিমুল ফুল। যেন দীর্ঘ নিদ্রা ভেঙে ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম আহ্বানে জেগে ওঠে সে। সারা বছর নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকা শিমুলগাছ ফাগুনের শুরুতেই লাল শিখায় জ্বলে উঠে জানিয়ে দেয় বসন্ত এসেছে। যশোরের গ্রামে গ্রামে এখন সেই রঙের উচ্ছ্বাস। শার্শা উপজেলার কাশিপুর থেকে চৌগাছা উপজেলার কাবিলপুর, ধুলিয়ানি পেরিয়ে ফতেপুর হয়ে বেড়গোবিন্দপুর বাঁওড়ের পূর্ব পাশের সড়কে গেলে দেখা মেলে সারি সারি শিমুলগাছ। দু’পাশ লাল হয়ে আছে। দূর থেকে মনে হয়, কেউ যেন রাস্তার ধার জুড়ে আগুনের মালা টাঙিয়ে দিয়েছে। ঝলমলে রৌদ্রের আলোয় সেই লাল আরও দীপ্ত, আরও গভীর। শিমুলের এই রং এক আবেগ। কবি-সাহিত্যিকদের কলমে বহুবার ফিরে এসেছে এই রক্তিম ফুল। কোকিলের ডাক, আম-লিচুর মুকুল, বাতাসে মৃদু উষ্ণতার স্পর্শ সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নতুন করে প্রেমের ডাক শোনায়। শিমুলের লাল পাপড়ি নীল আকাশের পটভূমিতে এমনভাবে ফুটে ওঠে, মনে হয় প্রকৃতি নিজেই রাঙা আলপনা এঁকেছে। শিমুলগাছের একটি আলাদা স্বভাব আছে। অন্য গাছ যখন নতুন পাতা মেলে, শিমুল তখন প্রায় নিরাবরণ। পাতা ঝরিয়ে খালি ডালে ফুল ফোটায় সে। এই নগ্ন ডালের ওপর রক্তলাল ফুলের বিস্ফোরণ দৃশ্যটি একই সঙ্গে সাহসী ও সৌন্দর্যময়। কিছুদিন পর সেই লাল রঙ ম্লান হয়ে আসে, ফুল শুকিয়ে সাদা-ধূসর তুলায় রূপ নেয়। বাতাসে ভেসে যায় শিমুলের তুলা গ্রামের আকাশে ভেসে বেড়ায় ছোট ছোট মেঘের মতো। একসময় এই তুলা ছিল গ্রামের অর্থনীতির অংশ। শিশুরা কুড়িয়ে আনত, বড়রা বিক্রি করত। অনেক পরিবার নিজের গাছের তুলা দিয়ে বানাত লেপ, তাষক, বালিশ। শীতের রাতে সেই লেপের উষ্ণতায় থাকত শিমুলেরই স্পর্শ। শিমুল শুধু বসন্তের রূপসী নয়, সে ছিল উপকারি, ঔষধি গুণসম্পন্ন ও অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান একটি গাছ। কিন্তু কালের বিবর্তনে এই চিরচেনা দৃশ্য ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। এখন আর খুব একটা শিমুলগাছ রোপণ করতে দেখা যায় না। নতুন প্রজন্মের কাছে এটি যেন কেবল স্মৃতির গাছ। জমির চাহিদা, দ্রুত ফলনশীল গাছের প্রতি আগ্রহ, নগরায়ণের চাপ সব মিলিয়ে শিমুল ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে গ্রামবাংলার বুক থেকে। যে গাছ এক সময় ফাগুনের আগমনী বার্তা দিত, আজ সে নিজেই বিলুপ্তির পথে। তবু যেখানে আছে, সেখানে সে আজও সমান উজ্জ্বল। বসন্তের সকালে রক্তলাল শিমুলের দিকে তাকালে মনে হয় প্রকৃতি এখনো বেঁচে আছে, এখনো জেগে ওঠার শক্তি রাখে। এই ফুল দীর্ঘ নীরবতার পরেও জ্বলে ওঠা যায়, শূন্য ডালেও রং ছড়ানো যায়। যশোরের মেঠোপথ, বাওড়ের ধারে কিংবা গ্রামের নির্জন প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সময়ের সাক্ষী, স্মৃতির বাহক, গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতীক। ফাগুনের আগুনরঙা এই দূত আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে তার সঙ্গে সম্পর্কও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। না হলে একদিন হয়তো বসন্ত আসবে, কিন্তু শিমুলের লাল আগুন আর দেখা যাবে না।

গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া এক রাজকীয় ঐতিহ্য

গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া এক রাজকীয় ঐতিহ্য

একসময় গ্রামবাংলার পথঘাট মানেই ছিল মানুষের কোলাহল, ঢোলের শব্দ আর বেহারাদের ছন্দময় হাঁক, ‘হুনহুনা হুনহুনা’এই ডাকের সঙ্গে সঙ্গে দুলে দুলে এগিয়ে যেত পালকি। পালকির ভেতরে বসে লাজুক নববধূ, আর চারপাশে কৌতূহলী মানুষের ভিড় ছিল বাঙালির সামাজিক জীবনের এক অনন্য চিত্র। আজ সেই পালকি আর নেই বললেই চলে। সময়ের স্রোতে, প্রযুক্তির দাপটে, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে বাঙালি ঐতিহ্যের এই রাজকীয় বাহন। গ্রামবাংলায় একসময় বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা দূরযাত্রা। সবখানেই পালকি ছিল অপরিহার্য। পালকি শুধু যাতায়াতের বাহন ছিল না; এটি ছিল মর্যাদা, সম্মান ও সামাজিক অবস্থানের প্রতীক। বিশেষ করে নারীদের জীবনে পালকির গুরুত্ব ছিল আলাদা। বিয়ের দিনে পালকিতে চড়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া ছিল প্রতিটি বধূর কল্পনার অংশ। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তার ‘পালকির গান’ এ এই ঐতিহ্যকে অমর করে রেখেছেন। কবিতার ছন্দে, শব্দের ঝংকারে আজও ভেসে ওঠে সেই হারানো সময়। পালকি সাধারণত তিন ধরনের হতো। যেমন, সাধারণ পালকি, আয়না পালকি ও ময়ূরপঙ্খী পালকি। কাঠের তৈরি এই বাহনগুলোতে থাকত বাহারি কারুকাজ। পাখি, লতাপাতা, ফুল আর নানা নকশায় সাজানো পালকি ছিল যেন চলমান শিল্পকর্ম। ময়ূরপঙ্খী পালকির ভেতরে থাকত পালঙ্কের মতো আরামদায়ক আসন। আয়না পালকিতে বসানো থাকত চকচকে আয়না। এসব পালকি বহন করত চার থেকে ছয়জন শক্তপোক্ত বেয়ারা। তাদের কাঁধে ভর করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ চলত পালকি। মানুষের শক্তিই ছিল এর একমাত্র চালিকাশক্তি। পালকি কেবল বাহন নয়, গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। বেয়ারাদের হাঁক শুনে বাড়ির উঠানে জড়ো হতো নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সবাই। হাসি, গল্প, কৌতুক আর কৌতূহলে মুখর হয়ে উঠত পুরো এলাকা। মুসলিম সমাজে পালকি ছিল নারীদের পর্দা রক্ষার নিরাপদ বাহন। হিন্দু সমাজেও বউ-মেয়েদের যাতায়াতে পালকির প্রচলন ছিল ব্যাপক। বিত্তবান পরিবারগুলোর নিজস্ব পালকি ও বেয়ারা থাকলেও সাধারণ মানুষ ভাড়ায় পালকি ব্যবহার করত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোঘল ও পাঠান আমলে রাজা-বাদশা, বেগম ও শাহজাদীদের প্রধান বাহন ছিল পালকি। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণকালে পালকি ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন বলে জানা যায়। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্টিমার ও রেলগাড়ির প্রচলন এবং পরবর্তীতে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের ফলে পালকির গুরুত্ব কমতে থাকে। ১৯৩০-এর দশকে রিকশার আগমনে শহরাঞ্চলে পালকি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। আজ রাজা নেই, বাদশা নেই, নেই সেই বেয়ারাদের হাঁক। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় পালকি এখন শুধুই স্মৃতি। যদিও কেউ কেউ বিয়েতে নতুনত্ব আনতে বা নাটক-সিনেমার প্রয়োজনে পালকির ব্যবহার করছেন, তবু সেই প্রাণ, সেই আবহ আর ফিরে আসে না। সমাজসেবীরা মনে করেন, পালকি সংরক্ষণ করা না গেলে একদিন এটি শুধু জাদুঘরের প্রদর্শনী বা বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে। তখন নতুন প্রজন্মকে গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্য দেখতে যেতে হবে লোকজ শিল্প জাদুঘরে। কৃত্রিম আলোয় সাজানো এক নিস্তব্ধ পালকির সামনে দাঁড়িয়ে। পালকি হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি বাহনের বিলুপ্তি নয়; হারিয়ে যাওয়া মানে একটি সময়, একটি সংস্কৃতি, একটি জীবনধারা। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে গিয়েও যদি আমরা আমাদের শিকড় ভুলে যাই, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। পালকি তাই শুধু অতীত নয়, এটি বাঙালির পরিচয়ের নীরব সাক্ষী।

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো...

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো...

মা আমার/তুমি কি জান না/গানের পথে তোমার ছেলে/কোনো বন্ধন মানে না/সেদিন দুপুরে/ তুফান উঠেছিল সুরের নদীতে ...। সেই সুরটি  ছিল বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের। মাতৃভাষার জন্য সেদিন স্বেচ্ছাচারী সশস্ত্রদের বিরুদ্ধে দ্রোহের অনলে জ্বলে উঠেছিল বাংলা মায়ের নিরস্ত্র সন্তানরা।  ফাগুনের তপ্ত দুপুরে লড়াই করে অর্জিত হয়েছিল মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার। শেষ পর্যন্ত শোষকের প্রাণঘাতী মারণাস্ত্রও পরাজিত হয়েছিল নৈতিকতার প্রশ্নে জেগে ওঠা শোষিতের  হুঙ্কারে। জয়ী হয়েছিল পূর্বপুরুষের মুখের ভাষায় কথা বলতে চাওয়া  সাহসী সন্তানেরা।    বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাসে বাঁক ফিরানো সেই দিনটি ছিল বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি।  সেদিন দুপুর প্রায় দুটা পর্যন্ত রাজপথে চলতে থাকে মিছিল। গ্রেপ্তার হতে থাকে রাজপথ কাঁপানো মিছিলে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে ছাত্ররা জমাট বাঁধতে থাকে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল, মেডিক্যাল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ গেটে। বাংলা বর্ণমালা থেকে প্রাপ্ত সম্মিলিত  শক্তির সেই স্লোগানে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় ১৪৪ ধারা নামের নিষেধাজ্ঞা। বিক্ষোভ মিছিলটি এগুতে থাকে প্রাদেশিক পরিষদ ভবনের দিকে। ফলশ্রুতিতে শুরু হয় পুলিশের ঝাঁঝাল কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ। সঙ্গে বেপরোয়া লাঠিচার্জ এবং   নির্বিচারে গ্রেপ্তার। ছাত্রদের সেই সংহতি ও সংগ্রামকে জোরাল করতে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় মেডিক্যাল কলেজের ওয়ার্ডবয়, বেয়ারা, সড়কের পাশের রেস্তোরাঁর কর্মচারী, পথচারী থেকে রিকশাওয়ালা। এ সময় এমএলএ ও মন্ত্রীরা মেডিক্যাল কলেজের সামনে দিয়ে পরিষদে আসতে থাকেন। উল্টোদিকে মিছিলের শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে পুলিশি  নির্যাতন।  একপর্যায়ে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের ভেতর পুলিশি আক্রমণের জবাবে পাল্টা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ছাত্ররা।  প্রতিবাদের সেই ঝড়ো হাওয়ায়  দিগি¦দিক শূন্য হয়ে ছাত্রদের ওপর গুলি চালায় পুলিশ। সেদিন আবুল বরকতের গুলি খাওয়া সম্পর্কে শামসুল বারী (মিঞা মোহন) বলেছেন, ‘সিগারেট ধরিয়ে ২০ নং ব্যারাকের মাঝামাঝি কামরার বারান্দায় দাঁড়িয়ে জিরোচ্ছিলাম। আমার দিকে এগিয়ে এলেন বরকত, ডাকনাম আবাই। আমাকে দেখে এগিয়ে এলেন তিনি কিন্তু পড়ে গেলেন সঙ্গে সঙ্গে আমার হাতখানেক দূরে। পুলিশ ঢুকে পূর্বদিক থেকে সোজা গুলি ছুঁড়ছে। সফিকুর রহমান ১৭ নম্বরে থাকতেন, দৌড়ে এসে পানি ঢেলে দিলেন, ভেবেছিলেন টিয়ার গ্যাসের প্রতিক্রিয়া। আমি গুলির কথা বললাম, ততক্ষণে পানির সঙ্গে রক্ত দেখা দিয়েছে বারান্দার মেঝেতে। তলপেটে লেগেছে গুলি। গায়ে ছিল তার নীল রঙের ফ্লাইং হাফ শার্ট, পরনে খাকি প্যান্ট, পায়ে কাবুলী স্যান্ডেল। তখন তার দুই ঠ্যাং সফিকুর রহমান কাঁধে তুলে নিলেন আর মাথা নিলাম আমার কাঁধে।  আমার কাছে পানি চাইল কিন্তু কোথায় পানি, সময় নাই, পুলিশ দেখলে কেড়ে নিতে পারে, তাই পড়িমরি করে ছুটছি। ভেজা রুমালটা দিলাম চুষতে। ... সে বলল, খুব কষ্ট হচ্ছে, বাঁচব না, বিষ্ণুপ্রিয়া ভবন, পুরানা পল্টনে সংবাদ পৌঁছে দেন। তাকে নিয়ে ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে নামলাম। কেউ কেউ কেঁদে ফেলল। একজন নার্স ‘কাপুরুষ’ বলে গালাগালি দিয়ে প্রতিশোধ নেবার জন্য গেটে যেতে বল্লেন। আমি দরজার দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই স্ট্রেচারে করে একজনকে মৃতদেহ আনতে দেখলাম। মাথার খুলি উড়ে গেছে। নিচের দিকে খানিকটা ঘিলু ঝুলছে। শুধু দাঁতগুলো দিয়ে হাসছে যেন আমাদের দিকে তাকিয়ে।’ সেদিনের ঘটনার ভাষ্যে এম আর আখতার মুকুল বলেছেন, ‘বেলা তিনটা দশ মিনিটের সময় আকস্মিকভাবে একদল সশস্ত্র পুলিশ মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের মধ্যে প্রবেশ করে এবং গুলিবর্ষণ করে। ঘটনাস্থলে জব্বার ও রফিকউদ্দীন নিহত হন। প্রকাশ্য রাস্তার ওপর পড়ে থাকা গোটাদুয়েক লাশ পুলিশ নিজেদের ট্রাকে নিয়ে যায়।’ মোহাম্মদ সুলতান বলেছেন, ‘কত রাউন্ড গুলি চলেছিল জানা যায়নি। ... শহীদ হলেন একজন রিকশাচালক। শহীদ হলেন বরকত, জব্বার, সালাউদ্দিন প্রমুখ। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে বা রাস্তায় যারা শহীদ হলেন পুলিশ বাহিনী সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিয়ে গাড়িতে তুললেন। ... ১৪৪ ধারা আর রইল না। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রাবাস মহান তীর্থস্থানে পরিণত হলো। এ ঘটনায় ঢাকার সমস্ত অফিস-আদালত, কল-কারখানা, রেডিও, রেলগাড়ির চাকা বন্ধ হয়ে গেল। রিকশা চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। হাজার হাজার লোক মেডিক্যাল কলেজে এসে জমা হতে থাকলেন। কান্নার রোল পড়ে গেছে চতুর্দিকে। পুলিশবাহিনী সরে পড়েছে। ঢাকার রাস্তায় কোথাও একটি পুলিশ নেই।’ একুশে ফেব্রুয়ারি ঠিক কতজন শহীদ হয়েছিলেন তা জানার আজ আর উপায় নেই। ভাষা সংগ্রামীদের তথ্যমতে, অনেক লাশ সরিয়ে ফেলেছিল পুলিশ। তবে জানা-অজানা সেই বীর শহীদদের রক্তঋণে সারাদশে ছড়িয়েছিল  দ্রোহের আগুন।  

যশোর সদরের নিশ্চিন্তপুর গড়ের প্রাচীন স্মৃতি

যশোর সদরের নিশ্চিন্তপুর গড়ের প্রাচীন স্মৃতি

যশোর জেলার সদর উপজেলার ১ নং হৈবতপুর ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর গ্রামে আছে ইতিহাসের এক বিস্মৃত সাক্ষী ‘নিশ্চিন্তপুর গড়’। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি বহুদিন ধরেই একটি ঐতিহাসিক গড় হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সময়ের স্রোত, অবহেলা আর দখল-দূষণের চাপে আজ সেই গড় প্রায় বিলুপ্তির পথে। যশোর শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে এবং উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত এই প্রত্নস্থানটি সদর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রায় ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে। ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় এটি একসময় গুরুত্বপূর্ণ জনপদ বা প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা ছিল এমন ধারণাই করেন স্থানীয়রা। নিশ্চিন্তপুর গড় মূলত আদি ঐতিহাসিক যুগের মৃত্তিকা নির্মিত একটি দুর্গ বা প্রতিরক্ষা কাঠামো বলে ধারণা করা হয়। বহু আগে নির্মিত এই গড় মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। যদিও এর নির্মাণকাল বা ঐতিহাসিক পটভূমি নিয়ে এখনো কোনো সুস্পষ্ট গবেষণা বা সরকারি সংরক্ষণ উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়, তবু স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে এটি ইতিহাসের অংশ হয়ে বেঁচে আছে। একসময় উঁচু মাটির প্রাচীর ও প্রশস্ত পরিখায় বেষ্টিত ছিল গড়টি। বর্তমানে গড়ের উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম পাশের মৃত্তিকা নির্মিত দেওয়ালের কিছু অংশ টিকে থাকলেও সেগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত। গড়সংলগ্ন তিন পাশে প্রায় ৫০ ফুট প্রশস্ত পরিখার অস্তিত্ব ছিল, যা এখন ভরাট হয়ে চাষাবাদের জমিতে পরিণত হয়েছে। দূর থেকে দেখলে বোঝাই কঠিন যে এখানে কোনোদিন একটি সুগঠিত প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা ছিল। গড়ের অভ্যন্তরভাগ এখন প্রায় সমতল ভূমি। সেখানে তেমন কোনো সাংস্কৃতিক জঞ্জাল বা প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনের দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই। উঁচু ভূমির অংশে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, খনন করা হয়েছে পুকুর। উত্তর পাশের জমি নিয়মিত চাষাবাদের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রায় ১০৪ বিঘা আয়তনের এই প্রতœস্থলের জমির বর্তমান মালিক আফসার আলী। সময় আর মানবিক হস্তক্ষেপ মিলিয়ে গড়টির অবস্থা আজ বিপন্ন। চারপাশের পরিখা ভরাট হয়ে গেছে, উঁচু মাটির প্রাচীর কেটে সমান করে ফেলা হয়েছে চাষের সুবিধার্থে। কোথাও তৈরি হয়েছে রাস্তা, কোথাও ঘরবাড়ি। ফলে গড়ের প্রাচীন কাঠামো আজ প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। নিশ্চিন্তপুর গড় আমাদের অতীতের দলিল। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও সংরক্ষণের অভাবে এমন বহু নিদর্শন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। যথাযথ জরিপ, গবেষণা ও সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ না করলে অচিরেই নিশ্চিন্তপুর গড় কেবল স্মৃতির অংশ হয়ে থাকবে ভূমির বুকে তার অস্তিত্বের কোনো চিহ্নই হয়তো আর থাকবে না। ইতিহাসকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সচেতনতা, উদ্যোগ এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ। নিশ্চিন্তপুর গড় যেন সেই দায়বদ্ধতার পরীক্ষায় আরেকটি ব্যর্থতার গল্প হয়ে না ওঠে এটাই স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা।