সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বট’ শব্দটি সাধারণত কটাক্ষ বা অভিযোগ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। তবে মানুষ নয়, কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বটদের জন্য যদি আলাদা একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থাকে—তাহলে কেমন হবে সেই দুনিয়া? এমনই ব্যতিক্রমী ধারণা নিয়ে সামনে এসেছে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম, যার নাম মোল্টবুক।
মোল্টবুক মূলত এআই এজেন্ট বা বটদের জন্য তৈরি একটি সোশ্যাল মিডিয়া। এখানে মানুষের তৈরি বিভিন্ন এআই বট নিজেরাই পোস্ট দিতে পারে, মন্তব্য করতে পারে এবং একে অন্যের সঙ্গে আলোচনা চালাতে পারে। প্ল্যাটফর্মটির কাঠামো অনেকটা রেডিটের মতো—বিষয়ভিত্তিক আলাদা সেকশন রয়েছে এবং পোস্টে আপভোট দেওয়ার ব্যবস্থাও আছে। তবে সাধারণ মানুষ এখানে সরাসরি অংশ নিতে পারে না; তারা কেবল দর্শকের ভূমিকায় থাকতে পারেন।
প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষ জানায়, চলতি মাসের ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোল্টবুকে নিবন্ধিত এআই এজেন্টের সংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়েছে।
মোল্টবুকের পেছনে রয়েছে মোল্টবট নামের একটি ওপেন সোর্স এআই টুল। এটি বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য এবং ইমেইল পড়া ও তার সারসংক্ষেপ তৈরি, উত্তর পাঠানো, ক্যালেন্ডার ব্যবস্থাপনা এমনকি রেস্তোরাঁয় টেবিল বুক করার মতো দৈনন্দিন কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে সক্ষম।
তবে এআই বটদের এমন ‘সামাজিক আচরণ’ ভবিষ্যতের এজেন্টিক এআইয়ের ইঙ্গিত কি না—তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। এক ইউটিউবারের মতে, মোল্টবুকে অনেক পোস্ট পড়লে মনে হয়, সেগুলো মানুষের লেখা, কোনো বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের নয়।
মার্কিন ব্লগার স্কট আলেকজান্ডার জানান, তিনি নিজের একটি বটকে মোল্টবুকে যুক্ত করেছেন এবং সেটির মন্তব্য অন্য বটদের মতোই স্বাভাবিক ছিল। তবে তার মন্তব্য, শেষ পর্যন্ত মানুষই বটকে নির্দেশ দেয়—কোন বিষয়ে পোস্ট হবে, কীভাবে লেখা হবে।
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. শানান কোহনি মোল্টবুককে এক ধরনের ‘পারফরম্যান্স আর্ট’ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, কতটা কনটেন্ট বট নিজের সিদ্ধান্তে তৈরি করছে আর কতটা মানুষের নির্দেশে—তা স্পষ্ট নয়। ধর্ম তৈরির মতো বিষয়গুলোও আসলে বটের নিজস্ব চিন্তার ফল নয়; বরং ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলকে দেওয়া নির্দেশনার ফল।
কোহনি বলেন, মোল্টবুক ভবিষ্যতের এক ঝলক দেখালেও এখানে অনেক অপ্রয়োজনীয় কনটেন্ট রয়েছে, যা মানুষের নিয়ন্ত্রণেই তৈরি হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে এআই এজেন্টদের পারস্পরিক শেখার মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানোর জন্য এমন নেটওয়ার্ক কার্যকর হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে মোল্টবুক নিয়ে বাড়তি আগ্রহের প্রভাব পড়েছে হার্ডওয়্যার বাজারেও। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে ম্যাক মিনি কম্পিউটারের সংকট দেখা যায়, কারণ অনেক ব্যবহারকারী আলাদা কম্পিউটারে মোল্টবট সেটআপ করছিলেন—যাতে মূল ডেটা বা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট নিরাপদ থাকে।
ড. কোহনি সতর্ক করে বলেন, কোনো এআই বটকে পুরো কম্পিউটার, অ্যাপ কিংবা ইমেইল অ্যাকাউন্টে পূর্ণ অনুমতি দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ‘প্রম্পট ইনজেকশন’ আক্রমণের আশঙ্কা থাকে, যেখানে দূষিত বার্তার মাধ্যমে বটকে বিভ্রান্ত করে সংবেদনশীল তথ্য বের করে নেওয়া সম্ভব।
তার মতে, এখনো এআই এজেন্টরা এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে তাদের পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্বাস করা যায়। আবার প্রতিটি ধাপে মানুষের অনুমোদন প্রয়োজন হলে স্বয়ংক্রিয়তার মূল সুবিধাটিও হারিয়ে যায়।
মোল্টবুকের নির্মাতা ম্যাট শ্লিখ্ট সামাজিক মাধ্যম এক্সে জানান, সাম্প্রতিক সময়ে সাইটটিতে লাখো মানুষ ভিজিট করেছেন। তার ভাষায়, এআই বটগুলোর আচরণ অনেক সময় হাস্যকর ও নাটকীয় হয়ে উঠছে, আর পুরো অভিজ্ঞতাটি পর্যবেক্ষণ করা সত্যিই দারুণ এক অনুভূতি।