বৃহত্তর যশোরে অনেক নদী একসময় প্রমত্তা স্রোতধারার সাক্ষী ছিল। আজ এই নদীগুলো আগের মতো প্রবাহিত হয় না, কিছু নদী শুকিয়ে গেছে, কিছু বর্ষার সময়ে পানি ধরে রাখে, বাকি সময় শুকিয়ে যায়। নদীর এই পরিবর্তন জীববৈচিত্র্যে নতুন প্রতিকূলতা নিয়ে এসেছে। তবুও এই নদীগুলোই গড়ে তুলেছিল জনপদ, গ্রাম, হাটবাজার। যদিও সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের সঙ্গে নৌপথের গুরুত্ব কমেছে, নদীর ইতিহাস ও প্রভাব এখনো স্পষ্ট।
স্রোতস্বিনী ভৈরব : অতীতের আয়নায় বর্তমান ॥ ‘ওগো ভৈরব, ওগো ভয়াল রূপধারী,/ তোমার বুকে জাগে কত অজানা ইতিহাস’ এই পঙ্ক্তির মতোই ভৈরব একসময় ছিল ভয়ঙ্কর, প্রাণময়, প্রবল। নামের মধ্যেই তার শক্তির পরিচয়। ‘সিন্ধু-ভৈরব-শোন’ এই একত্র উচ্চারণে তাকে নদপর্যায়ে মহিমান্বিত করা হয়েছে। ভারতবর্ষে বহু নদীর নামে অন্য নদীর নাম থাকলেও ভৈরবের নামে আর কোনো নদ নেই, এ এক অনন্য স্বাতন্ত্র্য। সে শুধু নদী নয়, এক তীর্থনদ; ইতিহাস, জনপদ ও সভ্যতার ধারক।
মালদহের দিক থেকে পদ্মায় মিলিত হওয়া মহানদের অপর পারে যেন ভৈরব নাম ধারণ করে তার যাত্রা শুরু। পদ্মার দক্ষিণবাহিনী শাখা জলঙ্গীর সঙ্গে মিলন, পুনরায় মুক্ত হয়ে মেহেরপুরের পাশ দিয়ে জয়রামপুর রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিমে মাথাভাঙ্গার সঙ্গে সংযোগ এইভাবে সে বহুসংযোগে সমৃদ্ধ। দর্শনা স্টেশনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে প্রকাণ্ড বৃত্তাকার বাঁক ঘুরে আবার যশোরে প্রবেশ, কোটচাঁদপুর পর্যন্ত পূর্বমুখী গতি, পরে দক্ষিণমুখী প্রবাহ ভৈরব যেন নিজের ইচ্ছায় পথ এঁকে চলেছে। তাহিরপুরে এসে কপোতাক্ষ শাখা ত্যাগ করে সে নিজে পূর্বদিকে গিয়েছে, আর কপোতাক্ষ দক্ষিণে। এই বিভাজনও এক ইতিহাসের সূচনা।
যশোর-খুলনার আর্যসভ্যতা এই নদীপথেই প্রবাহিত হয়েছে। বারবাজার, মুড়লী কসবা (বর্তমান যশোর), বসুন্দিয়া, সেখহাটি, আলিনগর (নওয়াপাড়া), ফুলতলা, দৌলতপুর, বাগেরহাট কত জনপদ তার কূলে কূলে গড়ে উঠেছে। নদীর বুকে ভেসে এসেছে বাণিজ্য, কৃষি, সংস্কৃতি, জ্ঞানালোক। নৌকার পাল ফুলে উঠত তার স্রোতে; ঘাটে ঘাটে বাজত জীবনের সুর।
কিন্তু ভৈরবের ইতিহাসে আছে মানুষের হস্তক্ষেপের করুণ অধ্যায়। তাহিরপুরে কপোতাক্ষের স্রোত রোধ করতে বাঁধ দেওয়া হলো; প্রবল স্রোত সেই বাধা মানল না। পরে দর্শনার কাছে নদীয়ার কালেক্টর সেক্সপীয়র সাহেবের খনন করা ক্ষুদ্র খাল মাথাভাঙ্গার পথ সোজা করে দিল। ফল হলো ভয়াবহ, মাথাভাঙ্গায় জল চলে গেল, ভৈরব ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ল। পদ্মার জল আর তেমন এ পথে এলো না; যা এলো, কপোতাক্ষ টেনে নিল। বসুন্দিয়ার নিচে নৌচলাচল বন্ধ হয়ে গেল। একসময়ের ভয়াল, সুদীর্ঘ নদ ক্রমে সঙ্কুচিত, নিস্তেজ।
তবু ভৈরব পুরোপুরি মরে যায়নি। মুজদখালি, আতাই, আঠারবাঁকী প্রভৃতি শাখা থেকে পার্বত্য স্রোত এসে তাকে কিছুটা পুষ্টি দিয়েছে। আলাইপুর থেকে যাত্রাপুর পর্যন্ত সে আবারও জলোচ্ছ্বাসে বিক্রম দেখিয়েছে। ইতিহাসের ধারায় সে আজ ক্ষীণ হলেও তার কূলে কূলে ছড়িয়ে আছে জনপদের স্মৃতি, সংস্কৃতির রেখাচিত্র।
কপোতাক্ষ : জনপদের জীবনরেখা ॥ ‘সতত হে নদ, তুমি পড় মোর মনে’ মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই অমর উচ্চারণে যে নদীর কথা, সে কপোতাক্ষ। বাংলা সাহিত্যের স্মৃতিবিজড়িত এই নদী কেবল জলধারা নয়, এক আবেগের উৎস, প্রবাসী কবির হৃদয়ের অনির্বচনীয় টান।
তাহিরপুরে ভৈরব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কপোতাক্ষ দক্ষিণমুখী হয়েছে। চৌগাছা, কাবিলপুর, গঙ্গানন্দপুর, মাগুরা, ঝিখরগাছা, বাঁকড়া, ত্রিমোহানী, সাগরদাড়ি, এই সাগরদাঁড়িই মাইকেলের জন্মভূমি। কপোতাক্ষের তীরে দাঁড়িয়েই তিনি শৈশবের আকাশ, কাশফুল, নৌকার ভাটিয়ালি দেখেছেন। পরে দূর বিদেশে বসে সেই নদীকেই স্মরণ করেছেন অশ্রুসজল কণ্ঠে। তার কাব্যে কপোতাক্ষ তাই রূপ পেয়েছে মাতৃভূমির প্রতীক হিসেবে।
কপিলমুনি, রাডুলি, বড়দল, চাঁদখালি পেরিয়ে সুন্দরবনের অন্তরে খোলপেটুয়ার সঙ্গে মিলন অবশেষে আড়পাঙ্গাসিয়া নামে বঙ্গোপসাগরে পতন। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে কপোতাক্ষ বহু জনপদের জন্ম দিয়েছে, বাণিজ্য ও কৃষির বিস্তার ঘটিয়েছে। তার স্রোতে ভেসে এসেছে লবণাক্ত হাওয়া, নোনা জলের গন্ধ, আবার লোকগানের সুর।