ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

ফিচার বিভাগের সব খবর

বৃহত্তর যশোরের নদ-নদীর ইতিহাস এখনও স্পষ্ট

বৃহত্তর যশোরের নদ-নদীর ইতিহাস এখনও স্পষ্ট

বৃহত্তর যশোরে অনেক নদী একসময় প্রমত্তা স্রোতধারার সাক্ষী ছিল। আজ এই নদীগুলো আগের মতো প্রবাহিত হয় না, কিছু নদী শুকিয়ে গেছে, কিছু বর্ষার সময়ে পানি ধরে রাখে, বাকি সময় শুকিয়ে যায়। নদীর এই পরিবর্তন জীববৈচিত্র্যে নতুন প্রতিকূলতা নিয়ে এসেছে। তবুও এই নদীগুলোই গড়ে তুলেছিল জনপদ, গ্রাম, হাটবাজার। যদিও সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের সঙ্গে নৌপথের গুরুত্ব কমেছে, নদীর ইতিহাস ও প্রভাব এখনো স্পষ্ট। স্রোতস্বিনী ভৈরব : অতীতের আয়নায় বর্তমান ॥ ‘ওগো ভৈরব, ওগো ভয়াল রূপধারী,/ তোমার বুকে জাগে কত অজানা ইতিহাস’ এই পঙ্ক্তির মতোই ভৈরব একসময় ছিল ভয়ঙ্কর, প্রাণময়, প্রবল। নামের মধ্যেই তার শক্তির পরিচয়। ‘সিন্ধু-ভৈরব-শোন’ এই একত্র উচ্চারণে তাকে নদপর্যায়ে মহিমান্বিত করা হয়েছে। ভারতবর্ষে বহু নদীর নামে অন্য নদীর নাম থাকলেও ভৈরবের নামে আর কোনো নদ নেই, এ এক অনন্য স্বাতন্ত্র্য। সে শুধু নদী নয়, এক তীর্থনদ; ইতিহাস, জনপদ ও সভ্যতার ধারক। মালদহের দিক থেকে পদ্মায় মিলিত হওয়া মহানদের অপর পারে যেন ভৈরব নাম ধারণ করে তার যাত্রা শুরু। পদ্মার দক্ষিণবাহিনী শাখা জলঙ্গীর সঙ্গে মিলন, পুনরায় মুক্ত হয়ে মেহেরপুরের পাশ দিয়ে জয়রামপুর রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিমে মাথাভাঙ্গার সঙ্গে সংযোগ এইভাবে সে বহুসংযোগে সমৃদ্ধ। দর্শনা স্টেশনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে প্রকাণ্ড বৃত্তাকার বাঁক ঘুরে আবার যশোরে প্রবেশ, কোটচাঁদপুর পর্যন্ত পূর্বমুখী গতি, পরে দক্ষিণমুখী প্রবাহ ভৈরব যেন নিজের ইচ্ছায় পথ এঁকে চলেছে। তাহিরপুরে এসে কপোতাক্ষ শাখা ত্যাগ করে সে নিজে পূর্বদিকে গিয়েছে, আর কপোতাক্ষ দক্ষিণে। এই বিভাজনও এক ইতিহাসের সূচনা। যশোর-খুলনার আর্যসভ্যতা এই নদীপথেই প্রবাহিত হয়েছে। বারবাজার, মুড়লী কসবা (বর্তমান যশোর), বসুন্দিয়া, সেখহাটি, আলিনগর (নওয়াপাড়া), ফুলতলা, দৌলতপুর, বাগেরহাট কত জনপদ তার কূলে কূলে গড়ে উঠেছে। নদীর বুকে ভেসে এসেছে বাণিজ্য, কৃষি, সংস্কৃতি, জ্ঞানালোক। নৌকার পাল ফুলে উঠত তার স্রোতে; ঘাটে ঘাটে বাজত জীবনের সুর। কিন্তু ভৈরবের ইতিহাসে আছে মানুষের হস্তক্ষেপের করুণ অধ্যায়। তাহিরপুরে কপোতাক্ষের স্রোত রোধ করতে বাঁধ দেওয়া হলো; প্রবল স্রোত সেই বাধা মানল না। পরে দর্শনার কাছে নদীয়ার কালেক্টর সেক্সপীয়র সাহেবের খনন করা ক্ষুদ্র খাল মাথাভাঙ্গার পথ সোজা করে দিল। ফল হলো ভয়াবহ, মাথাভাঙ্গায় জল চলে গেল, ভৈরব ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ল। পদ্মার জল আর তেমন এ পথে এলো না; যা এলো, কপোতাক্ষ টেনে নিল। বসুন্দিয়ার নিচে নৌচলাচল বন্ধ হয়ে গেল। একসময়ের ভয়াল, সুদীর্ঘ নদ ক্রমে সঙ্কুচিত, নিস্তেজ। তবু ভৈরব পুরোপুরি মরে যায়নি। মুজদখালি, আতাই, আঠারবাঁকী প্রভৃতি শাখা থেকে পার্বত্য স্রোত এসে তাকে কিছুটা পুষ্টি দিয়েছে। আলাইপুর থেকে যাত্রাপুর পর্যন্ত সে আবারও জলোচ্ছ্বাসে বিক্রম দেখিয়েছে। ইতিহাসের ধারায় সে আজ ক্ষীণ হলেও তার কূলে কূলে ছড়িয়ে আছে জনপদের স্মৃতি, সংস্কৃতির রেখাচিত্র।  কপোতাক্ষ : জনপদের জীবনরেখা ॥ ‘সতত হে নদ, তুমি পড় মোর মনে’ মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই অমর উচ্চারণে যে নদীর কথা, সে কপোতাক্ষ। বাংলা সাহিত্যের স্মৃতিবিজড়িত এই নদী কেবল জলধারা নয়, এক আবেগের উৎস, প্রবাসী কবির হৃদয়ের অনির্বচনীয় টান। তাহিরপুরে ভৈরব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কপোতাক্ষ দক্ষিণমুখী হয়েছে। চৌগাছা, কাবিলপুর, গঙ্গানন্দপুর, মাগুরা, ঝিখরগাছা, বাঁকড়া, ত্রিমোহানী, সাগরদাড়ি, এই সাগরদাঁড়িই মাইকেলের জন্মভূমি। কপোতাক্ষের তীরে দাঁড়িয়েই তিনি  শৈশবের আকাশ, কাশফুল, নৌকার ভাটিয়ালি দেখেছেন। পরে দূর বিদেশে বসে সেই নদীকেই স্মরণ করেছেন অশ্রুসজল কণ্ঠে। তার কাব্যে কপোতাক্ষ তাই রূপ পেয়েছে মাতৃভূমির প্রতীক হিসেবে। কপিলমুনি, রাডুলি, বড়দল, চাঁদখালি পেরিয়ে সুন্দরবনের অন্তরে খোলপেটুয়ার সঙ্গে মিলন অবশেষে আড়পাঙ্গাসিয়া নামে বঙ্গোপসাগরে পতন। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে কপোতাক্ষ বহু জনপদের জন্ম দিয়েছে, বাণিজ্য ও কৃষির বিস্তার ঘটিয়েছে। তার স্রোতে ভেসে এসেছে লবণাক্ত হাওয়া, নোনা জলের গন্ধ, আবার লোকগানের সুর।

আবাসন ও আশ্রয়ণে হতদরিদ্রদের মানবেতর জীবনযাপন

আবাসন ও আশ্রয়ণে হতদরিদ্রদের মানবেতর জীবনযাপন

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি হারানো আশ্রয়হারা হতদরিদ্র মানুষের পুনর্বাসনে সরকারি এবং বেসরকারিভাবে নির্মিত সহস্রাধিক ঘর এখন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। জীর্ণদশার কারণে এসব ঘরে আশ্রিত শত শত পরিবার পুনর্বাসনের ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। অনেকে আবার বেড়িবাঁধের স্লোপে কিংবা এক চিলতে খাস জমিতে ঝুপড়ি তুলে চরম দুর্যোগঝুঁকিতে থাকছেন। পুনর্বাসনের কয়েক শ’ ঘর খালি পড়ে আছে। এমনকি এসব ঘরের টিন-চাল- বেড়া ঝড়োহাওয়ায় উড়ে গেছে। খুঁটিগুলো ক্ষয়ে গেছে। অনেক ঘরের টিন-বেড়া খুলে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। যথাযথ তদারকির অভাব এবং শ্রমজীবী মানুষের জন্য নির্মিত ঘর বর্তমানে বসবাস উপযোগী না থাকায় ছিন্নমূল মানুষের আশ্রয় দেওয়ার উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে। এসব দরিদ্র মানুষগুলোর এখন চরম দুরবস্থা চলছে। করছেন মানবেতর জীবনযাপন। কেউ আবার টাকার বিনিময় অন্যকে ঘর হস্তান্তর করে দিয়েছে।  এদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সরকারের উদ্যোগে ২০১৩ সালে ৬৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ক্ষুদ্রঋণ সরকারি উদ্যোগে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মাত্র তিনটি আবাসন প্রকল্পের বাসিন্দাদের জন্য প্রায় ২২ লাখ টাকার ঋণ দেওয়া হয়েছে। বাকি প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যাংকে অলস পড়ে ছিল। অথচ এসব পরিবারের সদস্যরা কোনো উপায় না পেয়ে বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়াসুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। করছেন ধারকর্জ। শুধু যথাযথ তদারকির অভাব এবং দরিদ্র মানুষের অসচেতনতায় স্বাবলম্বী করার সরকারের এই যুগান্তকারী উদ্যোগ এখন ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সবশেষ মুজিবর্ষের নামে বিগত সরকারের দেওয়া দুই শতক জমিসহ ঘরগুলোতে কিছু পরিবার থাকলেও ঘরগুলোর অর্ধেক খালি পড়ে আছে। দরিদ্র নয় এমন মানুষকে বরাদ্দ দেওয়ায় এমন অবস্থা হয়েছে। যেন দরিদ্রদের গৃহপুনর্বাসন প্রক্রিয়াটির কোন মনিটরিং ব্যবস্থাই নেই। অসহায় হতদরিদ্র মানুষগুলো এখন যারা আবাসনে থাকছেন তাদের অন্যত্র কোনো যাওয়ার উপায় না থাকায় বাধ্য হয়ে রোদবৃষ্টি উপেক্ষা করে খেয়ে না খেয়ে থাকছেন। কাটাচ্ছেন উপোস কিংবা অর্ধাহারে একেকটা দিন। সরকারের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা থেকেও এসব মানুষগুলো সবসময় উপেক্ষিত থাকছেন। এদের জীর্ণদশার ঘরগুলো দ্রুত মেরামত করা না হলে এরা আবার ঠিকানাহারা হয়ে পড়বেন। মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। প্রকৃতির বুলডোজারখ্যাত ঘূর্ণিঝড় সিডর বিধ্বস্তে মধ্যউপকূলীয় জনপদ কলাপাড়া উপজেলায় ১২ হাজার নয় শ’ পরিবার গৃহহারা হয়ে পড়েন। এসব পরিবারকে আশ্রয়ের জন্য সর্বপ্রথম বিভিন্ন ধরনের আবাসন পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঠিকানাহারা এসব মানুষকে পুনর্বাসনে সরকারিভাবে আবাসন, বিশেষ আবাসন, জাপানি ব্যরাক হাউস, আশ্রায়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন ইউনিয়নে দেড় শতাধিক ব্যরাক হাউস করা হয়। যেখানে প্রায় দুই হাজার পরিবারের আশ্রয়স্থল করা হয়। এছাড়া বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে আরও পাঁচ হাজার পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের সিডর পরবর্তী সময় থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত পুনর্বাসনের কাজ চলতে থাকে। কিন্তু তিন বছর না যেতেই এসব ঘরের ব্যবহার উপযোগিতা নষ্ট হতে থাকে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ের ঘূর্ণিঝড়ে ঘরের টিনের চাল বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। কোথাও আবার স্থানীয় লোকজন খুলে নিয়ে গেছে আবাসন ব্যারাক হাউসের বেড়া কিংবা চাল। প্রভাবশালীসহ যারা আবার ওইসব আবাসনে বসবাস করছে তারা একেকজনে একাধিক ব্যরাক দখল করে গবাদিপশু পালন করছেন। জীর্নদশার আবাসনের ঘরগুলো মেরামত না করায় বাস উপযোগিতা নেই। যার সঙ্গতি আছে সে পলিথিন ছাপড়া ও বেড়া টিন দিয়ে মেরামত করে কোনোমতে থাকছেন। আবার দরিদ্র কর্মজীবী মানুষের কর্মস্থলের অনেক দূরে কিংবা বিরোধীয় খাস জমিতেও দু’একটি আবাসন প্রকল্প করা হয়েছে। মোটকথা কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সরকার ছিন্নমূল শ্রমজীবী মানুষকে আশ্রয়স্থল করে দিলেও সংশ্লিষ্টদের যথাযথ তদারকির অভাবে সকল উদ্দেশ্য চরমভাবে ব্যাহত হয়ে পড়েছে। এসব মানুষকে একটু ঠিকানার জন্য সরকার এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন করেছিল। শুধু আশ্রয়স্থল নয়, আয় বর্ধনমূলক কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ হিসাবে গড়ে তুলে ক্ষুদ্রঋন দেওয়ার প্রক্রিয়াও চালু করা হয়। কিন্তু সবই যেন ভেস্তে  গেছে। অনেককে আজ পর্যন্ত ঘরের দলিলসহ কাগজপত্র দেওয়া হয়নি। সবশেষ মুজিববর্ষের নামে পুনর্বাসনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাতেও হতদরিদ্র মানুষের পরিবর্তে আশ্রয় মিলেছে বহু বিত্তবান মানুষের। ৮৩৯টি ঘরের মধ্যে শতাধিক ঘর এখন খালি পড়ে আছে। 

রামরাই দীঘি অতিথি পাখির অভয়াশ্রম

রামরাই দীঘি অতিথি পাখির অভয়াশ্রম

শীত নামলেই যেন রাণীশংকৈলের আকাশে ডানা মেলে নতুন জীবন। ঝাঁকে ঝাঁকে রঙিন অতিথি পাখির আগমনে মুখর হয়ে ওঠে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী রামরাই দীঘি। ভোর থেকে সন্ধ্যা-দিনভর দীঘির আকাশ আর জলরাশির ওপর উড়াউড়ি করে তারা। আর সন্ধ্যা নামলেই দীঘিপাড় ঘেঁষে থাকা লিচু বাগানে আশ্রয় নেয় এই দূরদেশি অতিথিরা। তাদের কিচিরমিচির কলতানে চারপাশ যেন মুহূর্তেই হয়ে ওঠে এক অনন্য প্রকৃতির মেলবন্ধন। এই দীঘি কেবল একটি জলাশয় নয়; এটি ইতিহাস, লোককথা, পরিবেশ এবং সম্ভাবনাময় পর্যটনের এক বহুমাত্রিক কেন্দ্র। প্রতিটি ঋতুতে দীঘির সৌন্দর্য ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়, শীতের কুয়াশা ও বর্ষার জলরাশির মিলন দর্শনার্থীকে মুগ্ধ করে। স্থানীয়রা মনে করেন, এ দীঘি কেবল জলাশয় নয়, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। পর্যটন, শিক্ষা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য এটি এক অনন্য শিক্ষণীয় ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করতে পারে, যা কেবল স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে না, বরং দেশের ইকো-ট্যুরিজমকে নতুন মাত্রা যোগ করবে। শীতের কুয়াশা ভোরে পাখিদের ডানা মেলা ও জলরাশিতে প্রতিফলিত সূর্যের আলো এক অনন্য দৃশ্যের সৃষ্টি করে, যা শুধু পাখিপ্রেমী নয়, সকল ভ্রমণপিপাসুদের আকৃষ্ট করে। প্রাকৃতিক আলো-ছায়ার খেলায় দীঘির জলরাশি কখনো নীলাভ, কখনো সোনালি আভা ধারণ করে; যেন প্রকৃতি নিজেই রঙের তুলিতে এঁকে চলেছে এক জীবন্ত চিত্রপট।

টাঙ্গাইলের যত জমিদার বাড়ি

টাঙ্গাইলের যত জমিদার বাড়ি

টাঙ্গাইল জেলা ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বেশ জনপ্রিয় এক স্থান। এখানে আছে ছোট-বড় অনেক জমিদার বাড়ি। ছুটির দিনগুলোতে বিভিন্ন সময়ে পর্যটকরা আসেন টাঙ্গাইল জেলায় অবস্থিত জমিদার বাড়ি দেখতে। বিখ্যাত সব জমিদার বাড়ি দর্শনের পাশাপাশি টাঙ্গাইলের বিখ্যাত চমচমের স্বাদ নিয়ে একদিনেই ঘুরে বেড়াতে পারেন পর্যটকরা। লর্ড কর্ণওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নামে একটি জমিদারি প্রথা চালু করেন। এই প্রথার মাধ্যমে পুরো বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে জমিদারি প্রথা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পুরো ভারতবর্ষের হিসাব-নিকাশ ব্রিটিশদের জন্য সহজ হয়। পৃথিবী বদলে গেছে। বদলে গেছে জমিদারি প্রথাও।  সেই জমিদার এখন নেই! নেই জমিদারি শাসন ব্যবস্থাও। কিন্তু তাদের বাড়িগুলো আজও রয়ে গেছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। জমিদার বাড়ির শতবর্ষী পুরানো দেয়ালগুলো আমাদের ইতিহাস আর কালের সাক্ষী। ক্ষয়ে পড়া চুন-সুরকির আস্তরণগুলোয় লুকিয়ে আছে ঐশ্বর্যমন্ডিত ঐতিহ্য। জমিদারের বিলাসী প্রাসাদের কারুকার্যখচিত ভবনের সমারোহ। ভবনের দেয়ালের প্রতিটি পরতে পরতে সৌন্দর্যের ছোঁয়া। দেয়ালগুলো শুধুই দেয়াল নয়, যেন অক্লান্ত ইতিহাস রচয়িতার অলঙ্কার খচিত জীবন্ত ইতিহাসের বইয়ের পাতা, যেখান থেকে আমাদের নবীন চোখ পড়ে নিতে পারে হাজার বছরের ইতিহাস। রাজ প্রাসাদের সামনের সুবিস্তৃত বাগানও শুধুই বাগান নয়, শত বছরে হয় তো শত হাজারবার ঝরে গেছে গোলাপের পাপড়ি, কামিনীর পাতা, তবুও আজ পাতায় পাতায় লেখা রয়ে গেছে রাজা-রাণীর রোমান্টিকতার কড়চা, পাঁপড়িগুলোয় রাজকুমারীর হাতের স্পর্শ। তাই ভ্রমণ পিয়াসী ও ইতিহাস প্রেমীরা ঐতিহ্যের খোঁজে বারবারই ছুটে চলে জমিদার বাড়িতে। এরই রেশ ধরে জমিদাররা নিজেদের বসবাসের জন্য বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলেন সুন্দর সব অট্টালিকা, যা পরবর্তী সময়ে রাজবাড়ি নামে খ্যাতি পায়। একেক জমিদারের শৌখিনতা ফুটে উঠতো তাদের কারুকার্যপূর্ণ রাজবাড়িগুলোতে। প্রতিটি জমিদার বাড়িই তখনকার শিল্পীদের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় পূর্ণতা পেত। বহু বছর কেটে গেলেও এসব জমিদার বাড়ি আজও মাথা উঁচু করে সগৌরবে দণ্ডায়মান রয়েছে। বাড়িগুলো কালের সাক্ষী হয়ে আজও সবার কৌতূহল বাড়াচ্ছে। এক টাঙ্গাইল জেলাতেই দেখা যায় অনেকগুলো জমিদার বাড়ি। তার মধ্যে কতগুলো আজও সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া বেশিরভাগই সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে।  মহেড়া জমিদার বাড়ি : টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত মহেড়া জমিদার বাড়ি। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের নাটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই জমিদার বাড়ি। টাঙ্গাইলে অবস্থিত বিভিন্ন জমিদার বাড়ির মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হলো মির্জাপুর উপজেলার মহেরা ইউনিয়নে অবস্থিত মহেড়া জমিদার বাড়ি। আজও চকচক করছে বাড়ির দেওয়াল। বাড়ির দিকে তাকালেই আপনি বুঝতে পারবেন, তখনকার কারিগরদের হাতের ছোঁয়া কি অপূর্ব ছিল। ১৮৯০ সালেরও আগে নির্মিত হয় এই জমিদার বাড়ি। স্পেনের করডোভা নগরের আদলে নির্মিত করা হয় এই জমিদার বাড়ি। কালীচরণ সাহা ও আনন্দ সাহা নামে দুই ভাই ১ হাজার ১৭৪ শতাংশ জমির ওপর এই বাড়ি নির্মাণ করেন। এই জমিদার বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়বে বিশাখা পুকুর। ভেতরে ঢুকলে চৌধুরী লজের দেখা পাবেন। এর পাশেই আছে আকর্ষণীয় এক ভবন। যার নাম আনন্দ লজ। তার পাশে আছে মহারাজ লজ। এই জমিদার বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও সুন্দর ভবনের নাম কালীচরণ লজ। ইংরেজি ইউ অক্ষরের আদলে করা ভবনটি রানিদের জন্য নির্মাণ করা হয়। তাই একে রানি ভবনও বলা হতো। জমিদার বাড়ির ভেতরে বাগান, শিশুপার্ক, বিভিন্ন আর্টিফিশিয়াল স্থাপনা আছে। এছাড়া পাখ-পাখালি, বাগান, পুকুর, বিল্ডিং সব মিলিয়ে স্বপ্নপুরীর মতো মনে হয় মহেরা জমিদার বাড়ি। মূলত জমিদার বাড়ি হলেও ১৯৭২ সালে পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পুলিশ ট্রেনিং স্কুল করা হলে দিন দিন জমিদার বাড়িটির সৌন্দর্য বর্ধনে নেওয়া হয় নানা উদ্যোগ। বর্তমানে জমিদার বাড়িটি পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে। ব্রিটিশ সরকার জমিদার প্রথা চালু করলে কালিচরণ সাহা ও আনন্দ সাহার পুত্ররা করটিয়ার ২৪ পরগনার জমিদারদের কাছ থেকে একটি অংশ বিপুল অর্থের বিনিময়ে কিনে নেন আর তখন থেকে শুরু হয় জমিদারি শাসন ও শোষণ। তৎকালীন জমিদারগণ হলেন, বুদাই সাহা, বুদ্ধু সাহা, হরেন্দ্র সাহা এবং কালীচরণ সাহা। আর তাদের হাত ধরে গড়ে ওঠে এই জমিদার বাড়িটি। বাড়ির মূল ফটক দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে চোখ পড়বে চারটি লজ। আরও আছে কাচারি, নায়েব সাহেবের ঘর, গোমস্তাদের ঘর। জমিদার বাড়ির সামনেই আছে বিশাল এক দীঘি যার নাম বিশাখা সাগর। লজগুলোর পেছনে আছে পাসরা পুকুর এবং রানী পুকুর নামে দুটা পুকুর। এছাড়া পুলিশ মিউজিয়াম, মিনি চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক এবং পিকনিক স্পটও আছে।  জমিদার বাড়ির চারটি লজ। এরমধ্যে অন্যতম চৌধুরী লজ। প্রথমেই দেখা মিলবে এই ভবনের। এর ছাদের দেওয়ালটি অপূর্ব কারুকার্যে সজ্জিত। লজটি রোমান ধাঁচে নির্মাণ করা হয়। সামনে রয়েছে বিশাল সবুজ মাঠ যেখানে নানা দেশি-বিদেশি ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। সাদা ও নীলের সমন্বয়ে স্থাপনা মহারাজ লজ। এতে ১২টি কক্ষ আছে। আছে ঝুলন্ত বারান্দা, যা শূটিং স্পট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।  আনন্দ লজ নামের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভবনের সামনে রয়েছে বিশাল বাগান আর সিংহদ্বার। বাগানে বাঘ, হরিণ আর বিভিন্ন পশু-পাখির মূর্তি রয়েছে। আরও আছে কালীচরণ লজ ও রানী মহল। দৃষ্টিনন্দন এই জমিদার বাড়ির মাঝেও লুকিয়ে আছে এক বেদনাদায়ক স্মৃতি। ১৯৭১ সালের ১৪ মে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে স্থানীয় রাজাকার আল-বদরদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী মহেড়া জমিদার বাড়িতে হামলা করে এবং জমিদার বাড়ির কূলবধূ যোগমায়া রায় চৌধুরীসহ পাঁচজন গ্রামবাসীকে চৌধুরী লজের মন্দিরের পেছনে একত্রে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক পণ্ডিত বিমল কুমার সরকার, মণীন্দ্র কুমার চক্রবর্তী, অতুল চন্দ্র সাহা এবং নোয়াই বণিককেও হত্যা করা হয়। পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি : টাঙ্গাইল সদর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে নাগরপুর উপজেলার লৌহজং নদীর তীরে ১৫ একর জায়গা জুড়ে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি। জমিদার বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ে পুরানো মন্দির। লোকমুখে শোনা যায় শরৎ দিনে দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত থাকতেন ভারতবর্ষের নামকরা প্রতিমা কারিগরেরা। কালের বিবর্তনে জায়গাটা এখন নির্জন, নেই আগের সেই গৌরব আভিজাত্যের ছাপ, নেই প্রতিমা তৈরির কোনো ব্যস্ততা। মন্দির ঘুরে দেখা গেল, এর কোথাও কোথাও ইট খসে পড়েছে, সেই পুরানো দিনের নকশা হারাচ্ছে তার সৌন্দর্য। মন্দিরের পেছনে বিশাল তিনটি মহল, যা সেকালে তিন তরফ নামে পরিচিত ছিল। মহলগুলোর আলাদা কোনো নাম পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে বড় মহলে বর্তমান পাকুটিয়া বিসিআরজি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ পরিচালিত হচ্ছে। দ্বিতল বিশিষ্ট ভবনের নির্মাণ শৈলী মুগ্ধ করবে সবাইকে। তবে সংস্কারের অভাবে ভবনটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে। তারপাশেই অপূর্ব লতাপাতার কারুকার্য খচিত বিশাল আরেকটি  ভবন, যার মাথায় মূয়রের মূর্তি রয়েছে, এছাড়া কিছু নারী মুর্তিরও দেখা মিলে। লতাপতায় আছন্ন ভবনটির একাংশ বর্তমানে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং আরেক অংশে একটি বেসরকারি দাতব্য সেবা সংস্থা পরিচালিত হচ্ছে। এই ভবনের পিলারের মাথায় এবং দেওয়ালেও অসাধারণ নকশা দেখা যায়। সবশেষে দ্বিতলবিশিষ্ট আরেকটি মহল যার সামনে বিশাল শান বাঁধানো সিঁড়ি। অন্যসব ভবনের সঙ্গে এই ভবনের নকশার যথেষ্ট মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তবে ভবনটির বারান্দা প্রশংসার দাবি রাখে। আর পুরানো সেই কাঠের দরজা তার সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে কয়েক গুণ। ভবনটির মাথায় মূয়রের সঙ্গে দুই পাশে দুই নারী মূর্তির দেখা মিলে। সিঁড়ি বেয়ে ছাদে গেলে, গাছ গাছালির সুবজে ঘেরা পুরো জমিদার বাড়ির সৌন্দর্য বিমোহিত করবে সবাইকে। ভবনের ভিন্ন অংশ খসে পড়েছে, হারাচ্ছে রূপ লাবণ্য। বর্তমানে ভবনটির বিভিন্ন অংশ কলেজ কৃর্তপক্ষ ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। জমিদার বাড়ির পেছনে একটি দীঘি রয়েছে আর আছে দুইটি পরিত্যক্ত কুপ। একটি প্রাচীর ঘেরা ভাঙা বড় কূপের দেখা মিলে, যেখানে সেকালের জমিদার গিন্নিরা গোসল করতেন। এছাড়া জমিদার বাড়ির বিশাল মাঠের এক কোণে নাট মন্দির রয়েছে। এক সময় নাচে, গানে মুখর থাকত এই নাট মন্দির।

টাঙ্গাইলের যত জমিদার বাড়ি

টাঙ্গাইলের যত জমিদার বাড়ি

টাঙ্গাইল জেলা ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বেশ জনপ্রিয় এক স্থান। এখানে আছে ছোট-বড় অনেক জমিদার বাড়ি। ছুটির দিনগুলোতে বিভিন্ন সময়ে পর্যটকরা আসেন টাঙ্গাইল জেলায় অবস্থিত জমিদার বাড়ি দেখতে। বিখ্যাত সব জমিদার বাড়ি দর্শনের পাশাপাশি টাঙ্গাইলের বিখ্যাত চমচমের স্বাদ নিয়ে একদিনেই ঘুরে বেড়াতে পারেন পর্যটকরা। লর্ড কর্ণওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নামে একটি জমিদারি প্রথা চালু করেন। এই প্রথার মাধ্যমে পুরো বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে জমিদারি প্রথা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পুরো ভারতবর্ষের হিসাব-নিকাশ ব্রিটিশদের জন্য সহজ হয়। পৃথিবী বদলে গেছে। বদলে গেছে জমিদারি প্রথাও।  সেই জমিদার এখন নেই! নেই জমিদারি শাসন ব্যবস্থাও। কিন্তু তাদের বাড়িগুলো আজও রয়ে গেছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। জমিদার বাড়ির শতবর্ষী পুরানো দেয়ালগুলো আমাদের ইতিহাস আর কালের সাক্ষী। ক্ষয়ে পড়া চুন-সুরকির আস্তরণগুলোয় লুকিয়ে আছে ঐশ্বর্যমন্ডিত ঐতিহ্য। জমিদারের বিলাসী প্রাসাদের কারুকার্যখচিত ভবনের সমারোহ। ভবনের দেয়ালের প্রতিটি পরতে পরতে সৌন্দর্যের ছোঁয়া। দেয়ালগুলো শুধুই দেয়াল নয়, যেন অক্লান্ত ইতিহাস রচয়িতার অলঙ্কার খচিত জীবন্ত ইতিহাসের বইয়ের পাতা, যেখান থেকে আমাদের নবীন চোখ পড়ে নিতে পারে হাজার বছরের ইতিহাস। রাজ প্রাসাদের সামনের সুবিস্তৃত বাগানও শুধুই বাগান নয়, শত বছরে হয় তো শত হাজারবার ঝরে গেছে গোলাপের পাপড়ি, কামিনীর পাতা, তবুও আজ পাতায় পাতায় লেখা রয়ে গেছে রাজা-রাণীর রোমান্টিকতার কড়চা, পাঁপড়িগুলোয় রাজকুমারীর হাতের স্পর্শ। তাই ভ্রমণ পিয়াসী ও ইতিহাস প্রেমীরা ঐতিহ্যের খোঁজে বারবারই ছুটে চলে জমিদার বাড়িতে। এরই রেশ ধরে জমিদাররা নিজেদের বসবাসের জন্য বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলেন সুন্দর সব অট্টালিকা, যা পরবর্তী সময়ে রাজবাড়ি নামে খ্যাতি পায়। একেক জমিদারের শৌখিনতা ফুটে উঠতো তাদের কারুকার্যপূর্ণ রাজবাড়িগুলোতে। প্রতিটি জমিদার বাড়িই তখনকার শিল্পীদের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় পূর্ণতা পেত। বহু বছর কেটে গেলেও এসব জমিদার বাড়ি আজও মাথা উঁচু করে সগৌরবে দণ্ডায়মান রয়েছে। বাড়িগুলো কালের সাক্ষী হয়ে আজও সবার কৌতূহল বাড়াচ্ছে। এক টাঙ্গাইল জেলাতেই দেখা যায় অনেকগুলো জমিদার বাড়ি। তার মধ্যে কতগুলো আজও সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া বেশিরভাগই সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে।  মহেড়া জমিদার বাড়ি : টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত মহেড়া জমিদার বাড়ি। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের নাটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই জমিদার বাড়ি। টাঙ্গাইলে অবস্থিত বিভিন্ন জমিদার বাড়ির মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হলো মির্জাপুর উপজেলার মহেরা ইউনিয়নে অবস্থিত মহেড়া জমিদার বাড়ি। আজও চকচক করছে বাড়ির দেওয়াল। বাড়ির দিকে তাকালেই আপনি বুঝতে পারবেন, তখনকার কারিগরদের হাতের ছোঁয়া কি অপূর্ব ছিল। ১৮৯০ সালেরও আগে নির্মিত হয় এই জমিদার বাড়ি। স্পেনের করডোভা নগরের আদলে নির্মিত করা হয় এই জমিদার বাড়ি। কালীচরণ সাহা ও আনন্দ সাহা নামে দুই ভাই ১ হাজার ১৭৪ শতাংশ জমির ওপর এই বাড়ি নির্মাণ করেন। এই জমিদার বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়বে বিশাখা পুকুর। ভেতরে ঢুকলে চৌধুরী লজের দেখা পাবেন। এর পাশেই আছে আকর্ষণীয় এক ভবন। যার নাম আনন্দ লজ। তার পাশে আছে মহারাজ লজ। এই জমিদার বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও সুন্দর ভবনের নাম কালীচরণ লজ। ইংরেজি ইউ অক্ষরের আদলে করা ভবনটি রানিদের জন্য নির্মাণ করা হয়। তাই একে রানি ভবনও বলা হতো। জমিদার বাড়ির ভেতরে বাগান, শিশুপার্ক, বিভিন্ন আর্টিফিশিয়াল স্থাপনা আছে। এছাড়া পাখ-পাখালি, বাগান, পুকুর, বিল্ডিং সব মিলিয়ে স্বপ্নপুরীর মতো মনে হয় মহেরা জমিদার বাড়ি। মূলত জমিদার বাড়ি হলেও ১৯৭২ সালে পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পুলিশ ট্রেনিং স্কুল করা হলে দিন দিন জমিদার বাড়িটির সৌন্দর্য বর্ধনে নেওয়া হয় নানা উদ্যোগ। বর্তমানে জমিদার বাড়িটি পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে। ব্রিটিশ সরকার জমিদার প্রথা চালু করলে কালিচরণ সাহা ও আনন্দ সাহার পুত্ররা করটিয়ার ২৪ পরগনার জমিদারদের কাছ থেকে একটি অংশ বিপুল অর্থের বিনিময়ে কিনে নেন আর তখন থেকে শুরু হয় জমিদারি শাসন ও শোষণ। তৎকালীন জমিদারগণ হলেন, বুদাই সাহা, বুদ্ধু সাহা, হরেন্দ্র সাহা এবং কালীচরণ সাহা। আর তাদের হাত ধরে গড়ে ওঠে এই জমিদার বাড়িটি। বাড়ির মূল ফটক দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে চোখ পড়বে চারটি লজ। আরও আছে কাচারি, নায়েব সাহেবের ঘর, গোমস্তাদের ঘর। জমিদার বাড়ির সামনেই আছে বিশাল এক দীঘি যার নাম বিশাখা সাগর। লজগুলোর পেছনে আছে পাসরা পুকুর এবং রানী পুকুর নামে দুটা পুকুর। এছাড়া পুলিশ মিউজিয়াম, মিনি চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক এবং পিকনিক স্পটও আছে।  জমিদার বাড়ির চারটি লজ। এরমধ্যে অন্যতম চৌধুরী লজ। প্রথমেই দেখা মিলবে এই ভবনের। এর ছাদের দেওয়ালটি অপূর্ব কারুকার্যে সজ্জিত। লজটি রোমান ধাঁচে নির্মাণ করা হয়। সামনে রয়েছে বিশাল সবুজ মাঠ যেখানে নানা দেশি-বিদেশি ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। সাদা ও নীলের সমন্বয়ে স্থাপনা মহারাজ লজ। এতে ১২টি কক্ষ আছে। আছে ঝুলন্ত বারান্দা, যা শূটিং স্পট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।  আনন্দ লজ নামের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভবনের সামনে রয়েছে বিশাল বাগান আর সিংহদ্বার। বাগানে বাঘ, হরিণ আর বিভিন্ন পশু-পাখির মূর্তি রয়েছে। আরও আছে কালীচরণ লজ ও রানী মহল। দৃষ্টিনন্দন এই জমিদার বাড়ির মাঝেও লুকিয়ে আছে এক বেদনাদায়ক স্মৃতি। ১৯৭১ সালের ১৪ মে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে স্থানীয় রাজাকার আল-বদরদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী মহেড়া জমিদার বাড়িতে হামলা করে এবং জমিদার বাড়ির কূলবধূ যোগমায়া রায় চৌধুরীসহ পাঁচজন গ্রামবাসীকে চৌধুরী লজের মন্দিরের পেছনে একত্রে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক পণ্ডিত বিমল কুমার সরকার, মণীন্দ্র কুমার চক্রবর্তী, অতুল চন্দ্র সাহা এবং নোয়াই বণিককেও হত্যা করা হয়। পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি : টাঙ্গাইল সদর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে নাগরপুর উপজেলার লৌহজং নদীর তীরে ১৫ একর জায়গা জুড়ে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি। জমিদার বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ে পুরানো মন্দির। লোকমুখে শোনা যায় শরৎ দিনে দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত থাকতেন ভারতবর্ষের নামকরা প্রতিমা কারিগরেরা। কালের বিবর্তনে জায়গাটা এখন নির্জন, নেই আগের সেই গৌরব আভিজাত্যের ছাপ, নেই প্রতিমা তৈরির কোনো ব্যস্ততা। মন্দির ঘুরে দেখা গেল, এর কোথাও কোথাও ইট খসে পড়েছে, সেই পুরানো দিনের নকশা হারাচ্ছে তার সৌন্দর্য। মন্দিরের পেছনে বিশাল তিনটি মহল, যা সেকালে তিন তরফ নামে পরিচিত ছিল। মহলগুলোর আলাদা কোনো নাম পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে বড় মহলে বর্তমান পাকুটিয়া বিসিআরজি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ পরিচালিত হচ্ছে। দ্বিতল বিশিষ্ট ভবনের নির্মাণ শৈলী মুগ্ধ করবে সবাইকে। তবে সংস্কারের অভাবে ভবনটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে। তারপাশেই অপূর্ব লতাপাতার কারুকার্য খচিত বিশাল আরেকটি  ভবন, যার মাথায় মূয়রের মূর্তি রয়েছে, এছাড়া কিছু নারী মুর্তিরও দেখা মিলে। লতাপতায় আছন্ন ভবনটির একাংশ বর্তমানে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং আরেক অংশে একটি বেসরকারি দাতব্য সেবা সংস্থা পরিচালিত হচ্ছে। এই ভবনের পিলারের মাথায় এবং দেওয়ালেও অসাধারণ নকশা দেখা যায়।

মধু কবির সাগরদাঁড়ি : কবিদের তীর্থভূমি

মধু কবির সাগরদাঁড়ি : কবিদের তীর্থভূমি

বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির মানচিত্রে যশোরের সাগরদাঁড়ি শুধুই মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবহ একটি প্রান্তর নয়; এটি এমন এক প্রাণময় পরিসর, যেখানে বহু যুগ প্রতিভার পদচিহ্ন আজও ইতিহাসের পাতায় দীপ্ত হয়ে আছে। একসময় এখানে সমবেত হয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের দুই অগ্রগণ্য কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। এসেছিলে ছিলেন ভারতের বিশিষ্ট সাংবাদিক, যুগান্তর-এর সম্পাদক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় এবং অমৃতবাজার পত্রিকা-এর প্রভাবশালী সম্পাদক তুষারকান্তি ঘোষ-বাংলা গণমাধ্যমের দুজন অবিস্মরণীয় পথপ্রদর্শক। এই ঐতিহাসিক সমাবেশ আরও মহিমান্বিত হয়েছিল মধুসূদনের বন্ধু ভুদেব মুখোপাধ্যায়ের নাতনি, প্রতিভাবান সাহিত্যিক অনুরুপা দেবী ও নীল দর্পণখ্যাত দীনবন্ধু মিত্রের পুত্র, সাহিত্যিক ললিতচন্দ্র মিত্র। ব্যক্তিত্ব ও সৃষ্টিশীলতার এমন অপূর্ব সমাবেশ সাগরদাঁড়িকে এক অনন্য সাংস্কৃতিক অধ্যায়ে উন্নীত করেছিল। ব্রিটিশ আমলে মধু কবির মৃত্যুবার্ষিকী পালন হতো যশোর শহরে। বিভিন্ন সংগঠন ২৯ জুন দিন পালন করতো। তবে ‘যশোহর সাহিত্য সংঘ’ প্রতিষ্ঠিত হলে তার উদ্যোগে মধু কবির মৃত্যুবার্ষিকী পালন শুরু হয়। পরে জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানও শুরু হয় সাগরদাঁড়িতে। উপরের ব্যক্তিরা ছাড়াও সাগরদাঁড়ি এসেছেন ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কবি গোলাম মোস্তফা, জসীম উদদীন, মনোজ বসু, ধীরাজ ভট্টাচার্যসহ আরও অনেক বিখ্যাত, লেখক, কবি, সাহিত্যিকগণ।  আমরা ফিরে দেখবো সেই দিনগুলোর আবহ, যেখানে সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব মিলেমিশে রচনা করেছিল স্মরণীয় এক সাংস্কৃতিক পর্ব। বাংলা ১৩২২ সনের ১৪ কার্তিক মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি ঘুরতে এসেছিলেন নীল দর্পণের লেখক দীনবন্ধু মিত্রের পুত্র ললিতচন্দ্র মিত্র। তিনি ছিলেন সাহিত্যানুরাগী। ‘পূর্ণিমা মিলন’ নামে এক সাহিত্য সভা পরিচালনা করতেন। সাগরদাঁড়ি থেকে কলকাতা ফিরে গিয়ে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায়  লেখেন ‘সাহিত্যিক তীর্থযাত্রা’ নামের একটি লেখা। লতিতচন্দ্র মিত্র লেখেন, ‘ছাব্বিশ বছরের কিছু বেশি হল, মধুসূদনের বন্ধু মনোমোহন ঘোষের সভাপতিত্বে মাইকেল মধুসূদন দত্তের সমাধিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেইদিন সেই স্তম্ভে  লেখা কবিতায় যশোরের সাগরদাঁড়ি কপোতাক্ষ তীরে পড়ে ‘সাগরদাঁড়ি’ নামটি চিরকালের জন্য হৃদয়ে জাগ্রত আছে। গ্রামটি দেখার ইচ্ছা বহুদিনের। সে ইচ্ছা এখন পূরণ হচ্ছে। এর জন্য ‘বঙ্গীয় স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি’র ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডাক্তার ফণীভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (বাড়ি সাতক্ষীরা) কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। এটা একটি স্বদেশী প্রতিষ্ঠান। সাত বছর ধরে এই লঞ্চ চলছে। প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির বহু রকমের বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে এখনো চলছে এই প্রতিষ্ঠান। বাংলা ১৩২২ সনের ১৩ কার্তিক রাত সাড়ে ১০টার সময়  রেলগাড়িতে চড়ে কলকাতা থেকে রওনা দিলাম ঝিকরগাছার উদ্দেশ্যে। দেড় ঘণ্টা পর আমরা ঝিকরগাছা ঘাট স্টেশনে  পৌঁছেছিলাম। কপোতাক্ষ বেয়ে চলাচল করে তাই এর নাম ‘কপোতাক্ষী’। রাত আড়াইটার সময় কপোতাক্ষ নদ দিয়ে স্টীমার চলতে লাগল। অনেক সুন্দর লাগল এই ভ্রমণ। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আমরা সাগরদাঁড়ি পৌঁছলাম। আমরা দুই পাতা ইংরেজি পড়ে, কলকাতার জলের কল, গ্যাসের আলো দেখে গ্রামের কথা ভুলে যাই। কিন্তু যিনি বিদেশি সাহিত্যে অসীম পণ্ডিত্য লাভ করেছেন, যিনি ইউরোপের অমরাবর্তীসহ বহু শহর দর্শন করেছিলেন তিনি অকৃত্রিম স্বদেশ প্রেমে অনুপ্রাণিত হয়ে লিখেছিলেন, ‘এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে’ লইছে যে তব নাম বঙ্গের সংগীতে’। ধন্য মাইকেল। তোমার বাইরের আবরণ বিদেশি হলেও তোমার হৃদয়ের অন্তস্থল স্বদেশীপ্রেমে পূর্ণ। তাই তুমি দেশবাসীকে শিখাইছো যে, দেশের নদী যথার্থই ‘দুগ্ধস্রোত রুপী তুমি জন্মভূমি স্তনে।’ নদের তীরে উপস্থিত হয়ে প্রথমেই ঘাটের পাশে বহৎ বটবৃক্ষ পথিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই বটবৃক্ষের উদ্দেশে বোধ হয় কবি চতুর্দশপদী কবিতাবলীর ‘বটবৃক্ষ’ সনেট রচনা করেছিলেন। আশৈশব যার ছায়া তিনি ভোগ করেছিলেন, তাকে তিনি মধুর ভাষায় বর্ণনা করেছেন তা উদ্ধৃত করার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না-‘দেব-অবতার ভাবি বন্দে যে তোমারে,/ নাহি চাহে মনঃমোর তাহে নিন্দা করি,/ তরুরাজ ! প্রত্যক্ষতঃ ভারত-সংসারে,/ বিধির করুণা তুমি তরু-রূপ ধরি!/ পাঠক এখানে লক্ষ্য করবেন, তিনি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করলেও মাইকেল বৃক্ষে দেবত্ব আরোপ করে পরম স্নেহের চোখে দেখেছেন। সেই শতপত্রময় মঞ্চ অতিক্রম করে, আমরা তাঁর বাড়ির সামনে উপস্থিত হলাম। এখানে একটি বড় বাদাম গাছ আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছিল নদ তীরে। এই বাদামবৃক্ষ তলে তিনি বিশ্রাম নিয়েছেন। স্থানটি যে কবি চিত্ত আকর্ষণের উপযুক্ত তা বলা নিষ্প্রয়োজন। বাস ভবনের ভগ্ন দশা দেখে মনে কষ্ট হলো। মাইকেল যে গৃহে ভূমিষ্ঠ হন, তার একটি দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। আমরা তাঁর জন্মস্থল আনন্দ ও বিষাদপূর্ণ হৃদয়ে নিরীক্ষণ করতে লাগলাম। আমাদের সঙ্গে ফটোগ্রাফার বাবু প্রাণতোষ বসু গিয়েছিলেন। তিনি এই স্থানটির একটি ছবি তুললেন। বাড়ির বাইরে সরকার কর্তৃক একটি ছোট স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে, সেটা দেখলাম। মনে হলো, যার অমরকীর্তি স্তম্ভ বঙ্গ সাহিত্য ক্ষেত্রে অনন্তকালের জন্য দেদীপ্যমান থাকবে, এ ক্ষুদ্র স্তম্ভ তাঁর স্মৃতিরক্ষার জন্য যথেষ্ট না। তবুও সরকার এই যা করেছে সেটার জন্য ধন্যবাদ দেওয়া যায়।

মাইসাহেবা মসজিদ

মাইসাহেবা মসজিদ

অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক সীমান্তবর্তী পর্যটন জেলা শেরপুর। কৃষি ও খাদ্যে সমৃদ্ধ এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ নদী ও পাহাড়ের পাশাপাশি রয়েছে বেশকিছু প্রাচীন ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। এর মধ্যে ঐতিহাসিক বারোদুয়ারি মসজিদ, মাইসাহেবা মসজিদ ও মোগল আমলের ঘাগড়া লস্কর জামে মসজিদ উল্লেখযোগ্য। মসজিদগুলো একদিকে যেমন কালের সাক্ষী, অন্যদিকে দৃষ্টি কাড়ছে পর্যটকদের। মাইসাহেবা জামে মসজিদ : শেরপুরের এক প্রাচীন ও দৃষ্টিনন্দন নিদর্শন ‘মাইসাহেবা মসজিদ’। জেলা শহরের তিনআনী বাজার (রাজাবাড়ী) এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ওই মসজিদটি একদিকে যেমন শহরের প্রথম নির্মিত, অন্যদিকে এটি ধর্মীয় অনুভূতি, প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিক স্থাপত্যশৈলীমণ্ডিত জেলার অন্যতম প্রধান মসজিদ। শহরে প্রবেশের সময় মসজিদটির সুউচ্চ দুটি মিনার অনেক দূর থেকে দৃষ্টি কাড়ে উৎসুক মানুষের। প্রায় ৭৩ শতক জমির ওপর নির্মিত ওই মসজিদে প্রতিদিন নামাজ আদায় করেন হাজার হাজার মুসল্লি। ফলে কালের পরিক্রমায় মসজিদটি এক অনন্য ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে খ্যাতি পাওয়ায় প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছুটে আসেন তা একনজর দেখতে। এই সুবাদে মসজিদের মুসল্লি আর দর্শনার্থীদের কাছ থেকে অনেক অর্থও জমা পড়ে মসজিদ ও তার দানবাক্সে।  ঐতিহাসিক তথ্যমতে, তৎকালীন সুসঙ্গ মহারাজার কাছ থেকে এ মসজিদের জমিটুকু দান হিসেবে পেয়েছিলেন মুসলিম সাধক মীর আব্দুল বাকি। মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ’র নিয়োগপ্রাপ্ত সুবেদার ছিলেন মীর আব্দুল বাকি। গড়জরিপা কেল্লার দায়িত্ব নিয়ে তিনি আল্লাহর নৈকট্য লাভের কামনায় এতই ব্যাকুল হন যে, দিল্লির সম্রাটের কাছে তার পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে স্ত্রী সালেমুন নেছাসহ বেরিয়ে পড়েন সুফি সাধকদের সাহচর্যের আশায় শেরপুর অঞ্চলে এসে নিজেকে সমর্পিত করেন আল্লাহর ধ্যানে। এদিকে তৎকালীন শক্তিধর সুসঙ্গ মহারাজাকে শেরপুর পরিদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানান শেরপুরের নয়আনী জমিদার হরচন্দ্র চৌধুরী, তিনআনী জমিদার রাধাবল্লভ চৌধুরীসহ অন্যান্য জমিদারগণ। মহারাজা তাদের জানিয়ে দেন, অন্যের জমিতে তিনি আহার ও রাত্রিযাপন করেন না। ওইসময় শেরপুরের জমিদারগণ তিনআনী বাড়ির পশ্চিমাংশের ২৭ একর লাখোরাজ সম্পত্তি মহারাজার নামে লিখে দিলে তিনি শেরপুরে আসেন। শেরপুর ছাড়ার সময় মহারাজা ওই সম্পত্তি তাম্র দলিলের মাধ্যমে মুসলিম সাধক মীর আব্দুল বাকিকে দান করেন। পরে দানকৃত এ জমিটি তিনআনি জমিদার রাধাবল্লভ চৌধুরী মসজিদ স্থানের ৮ শতাংশ জমি ছাড়া সমুদয় নিজ নামে সিএস রেকর্ডভুক্ত করে নিজ দখলে নেন। এরপর তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেলে তার পাওয়ার অব এটর্নিমূলে ৬৫ শতাংশ জমির দায়িত্বপ্রাপ্ত হন মরহুম ফরিদ উদ্দিন। তিনি পরে মসজিদের কাছে ওই জমিটি বিক্রির মাধ্যমে হস্তান্তর করেন।  অন্যদিকে স্বামী মীর আব্দুল বাকির ইন্তেকালের পর ১৮৬১ সালে সালেমুন নেছা তার ভাগনে শহরের শেরীপাড়া মিঞাবাড়ির বাসিন্দা সৈয়দ আব্দুল আলীসহ স্থানীয় মুসলমানদের সহযোগিতায় দানের ওই জমিতে ৩ গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। ২ কাতার বিশিষ্ট এ মসজিদে ৩৬ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন। মসজিদ প্রতিষ্ঠার পর এ পূণ্যময়ী নারীর কৃতিত্বের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ এ মসজিদে নামাজ আদায় করতে আগ্রহী হয়ে উঠেন। দিন দিন মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকায় মসজিদটি সম্প্রসারণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ১৯০৩ সালে আরও ৩ কাতারের স্থান সংকুলান উপযোগী করে মসজিদ ভবনটি সম্প্রসারণ করা হয়। তার জীবদ্দশায় এ মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের সার্বিক দায়িত্ব তিনি নিজেই পালন করেন। এ বংশের নারীদের মাইসাহেবা এবং পুরুষদের মিঞা সাহেব বলে ডাকা হতো। সে হিসেবে সালেমুন নেছা বিবিকেও মাইসাহেবা বলা হতো। তিনিই মসজিদটি নির্মাণ করেন। তাঁরই নাম অনুসারে এই মসজিদকে মাইসাহেবা মসজিদ বলা হয়। প্রায় আটাশ হাজার বর্গফুট জায়গার পশ্চিম দক্ষিণ বরাবর আদি মসজিদ ভবনটির অবস্থান ছিল। আদি কাঠামোটি মূলত ৪০ ইঞ্চি পুরুত্বের ইট, সুরকি ও চুনের মিশ্রণে গাঁথুনির দেওয়াল ছিল। মসজিদটির প্রস্থ ২০ ফুট এবং দৈর্ঘ্য ৩০ ফুট। যার ছাদ তিনটি পাশাপাশি গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। এ আদি রূপের মসজিদটির ৫টি প্রবেশ পথ ছিল। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ প্রয়াত পণ্ডিত ফছিহুর রহমানের লেখা ‘শেরপুর জেলার অতীত ও বর্তমান’ বই থেকেও পাওয়া যায় একই তথ্য। 

মাগুরার রাজবাড়ি : পুরাকীর্তি সংরক্ষণযোগ্য

মাগুরার রাজবাড়ি : পুরাকীর্তি সংরক্ষণযোগ্য

দক্ষিণ পঞ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার খ্যাত ছোট জেলা মাগুরা। আয়তনে মাগুরা ছোট জেলা হলেও মাগুরার অতীত ইতিহাস রয়েছে গৌরবময়। মাগুরার মহম্মদপুর এক কালের বিশাল প্রমত্তা মধুমতির তীরে আবস্থিত। মহম্মদপুরে আনুমানিক ১৬৮৭-১৬৮৮ সালে স্বাধীনচেতা রাজা সীতারাম রায়ের হাত প্রজাপত্তন শুরু হয়। মহম্মদপুর ছিল তার রাজ্যের রাজধানী। রাজা সীতারাম রায় বর্তমানে না থাকলেও তার স্মৃতিকে ধারণ করে রয়েছে মহম্মদপুরের মাটি। একদিন যে এক রাজ্যের রাজধানী ছিল কালের পরিক্রমায় আজ তা কেবলই স্মৃতি। এক কালের জাঁকজমকপূর্র্ণ পরগনা এখন কেবলই স্মৃতি আর চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। ইটের ভাঙা অবকাঠামোর চিহ্ন। কিছু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে আর কিছু অতীতকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, যা জানান দিচ্ছে কয়েশ বছর পূর্বে এখানে এক স্বাধীনচেতা রাজার রাজধানী ছিল। মাগুরা জেলার রয়েছে অনেক প্রাচীন স্থাপনা এর মধ্যে স্বাধীনচেতা রাজা সীতারামের রাজবাড়ী ও রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ ও রামসাগর, দুধ সাগর, সুখসাগরসহ বড় বড় দীঘিগুলো অতীতের স্মৃতিকে বহন করে আজও কালের সাক্ষী হয়ে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, যা বর্তমান প্রজন্মকে তাদের গৌবরময় অতীতের কত স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। প্রাচীর রাজবাড়ী কাছারির বাড়ির ভগ্নদশা অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এক কালে যে রাজবাড়ী শত শত মানুষের পদচারণায় মুখরিত হতো। কালের পরিক্রমায় আজ তা মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। হারিয়ে গেছে সব জৌলুস। শুধু কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভাঙা বাড়ির আবকাঠামোগুলো। প্রতিদিন বহু দর্শনার্থী এই ভগ্নদশা রাজবাড়ী ও নতুন সংস্কার করা কাছারি বাড়ি দেখতে আসেন। স্বাধীনচেতা রাজার স্মৃতিচিহ্ন দেখে স্মৃতিমন্থনের চেষ্টা করেন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কাছারি বাড়িটি সংস্কার করলেও রাজবাড়ীটি ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। ফলে কাছারীবাড়ি কালে সাক্ষী কিছু স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়েছে।

সন্ধ্যা নদীর সৌন্দর্য্য

সন্ধ্যা নদীর সৌন্দর্য্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জীবনানন্দ দাশের পর বাংলা কবিতার তরী যারা বেয়ে নিয়েছেন আগামীর গন্তব্যের পথে। তাদের অগ্রপথিক ছিলেন বরিশালের সন্তান পশ্চিমবঙ্গের পদ্মভূষণ পদকে সম্মানিত কবি শঙ্খ ঘোষ। এ নিয়ে পুরো প্রতিবেদনটি সাজিয়েছেন আমাদের বরিশালের স্টাফ রিপোর্টার খোকন আহম্মেদ হীরা। ধান-নদী-খাল এই তিনে বরিশাল। বরিশালের প্রতিটি এলাকায় জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য নদী। তেমনই একটি নদী সন্ধ্যা। আড়িয়াল খাঁ থেকে সন্ধ্যা নদীর উৎপত্তি হয়ে উজিরপুর ও বানারীপাড়া উপজেলা হয়ে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার কঁচা নদীতে পতিত হয়েছে। সন্ধ্যা নদীটি বরিশাল জেলার একটি প্রধান নদী। এটি বানারীপাড়া ও স্বরূপকাঠি উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি অংশজুড়ে প্রবাহিত। নদীটি বানারীপাড়া উপজেলাকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে এবং এই অঞ্চলকে যোগাযোগ ও জীবিকার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে সাহায্য করে। এই নদীটি স্থানীয় অর্থনীতি, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং মৎস্য আহরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।