ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া

পুঁথি, পটগান ও লোকগান

প্রবীর বিশ্বাস, খুলনা

প্রকাশিত: ১৯:২০, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬; আপডেট: ২৩:৪৮, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

পুঁথি, পটগান ও লোকগান

প্রাককথা: মো. ইলিয়াস ফকির, শৈশবাবস্থায় জমিতে কিষাণ দিতে দিতে আইলের (খেত/জমির সীমানা) পাশে শুয়ে শুনেন মাটির তলার গান। বীজ ফেলা হচ্ছে। বীজ সবে অঙ্কুরিত। একটি একটি করে পাতা ফুটছে; তারপর একটি পরিণত গাছে ফল। আর তৈরি হচ্ছে প্রকৃতির গান। সেই গান তাঁকে দোলা দিয়েছিল, রেখেছে বেঁধে। কেননা এটিই তাঁর জীবনের গান; যে গান কখনও কেউ লেখেননি। এই স্বপ্ন বাস্তবতায় বেড়ে ওঠা ‘সুরিয়ালিস্টিক’ (পরাবাস্তব/ চিত্রকল্প দ্বারা গঠিত) একজন মানুষ ইলিয়াস ফকির। এরপর মধুমতির তীর ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে ভাবসাগরে তরী ভাসে। ওই যে শুরু, থামা হয়নি আর। বুকের মধ্যে যে গান, যে সুর, যে ছন্দ বাসা বেঁধেছিল তা বেরিয়ে পড়ার অপেক্ষার তর যেন আর সইলো না। কেমন ছিলো উত্তরকালের লোকায়ত বাউল কবি ইলিয়াস ফকিরের কৈশোরের। শোনা যাক পরিণত ইলিয়াস ফকিরের মুখে।
ইলিয়াস ফকির একাধারে শক্তিমান লেখক, সুরস্রষ্টা, সুরসঙ্গতকারী ও শিল্পী। সমাজের কুসংষ্কার, অন্যায়, অবিচার, অন্যায্যতা, অসমতা ও জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে তিনি মত প্রকাশ করেছেন। লিখেছেন সমাজের অসংগতিসহ উন্নয়নের নানা দিক নিয়ে। নারীর প্রতি সামাজিক নির্যাতন ও তার সংস্কারবন্দি জীবনের রূপায়ণে তিনি বিপ্লবী লেখক। গানের জগতে তিনি সব্যসাচী ও গবেষক। নিজের লেখা গানে আঞ্চলিক সুর থেকে শুরু করে বিভিন্ন সুর নিয়ে নাড়াচাড়া করে তার সঙ্গে নিজের ভালোবাসা মিশিয়ে সুরের আবহ তৈরি করেছেন। তাঁর কবিতা ও গানে প্রেম, বিরহ, কটাক্ষ, রাগ, অনুরাগ, বিরাগ, দেশপ্রেম, শিশুর সারল্য, বৃদ্ধের অসায়ত্ত্ব¡ সামাজিক নাটকীয়তা ও বিদ্রোহ চাওয়া মাত্রই পাওয়া যায়। গান-কবিতার বাইরেও তিনি প্রবন্ধ, ছোটগল্প ও নাটক লিখেছেন। আধুনিক পটগানের স্রষ্টা তিনি। এছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে লোকগান যেমন কীর্ত্তণ, অস্টক, হালুই, গম্ভীরা, প্যাঁচালি, জবগান ও জারিগানও লিখেছেন। শুধু তাই নয় অসাধারণ কন্ঠ আর গায়কী ঢং। কবিয়ালদের ভাবের খেলা ঠিক যেন তাঁর প্রতিটি শিরা ও ধমনীতে। এক সময় তিনি নৃত্যের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের সামনে গান পরিবেশন করতে পারতেন ভীষণ প্রাঞ্জল ভাবে। 
জন্ম-পরিচয়: ইলিয়াস ফকির ১৯৬৪ সালে ২ অক্টোবর তৎকালীন ফরিদপুর ও বর্তমান গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার করপাড়া ইউনিয়নের বনগ্রাম নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মোঃ রজ্জব আলী ফকির; পেশায় মসজিদের ইমাম ও বিবাহ রেজিষ্ট্রার ছিলেন। পাশাপাশি কৃষি কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছিলেন একজন বিশিষ্ট সুফী সাধক। এল্মে শরীয়তের পাশাপাশি এল্মে মারেফত বিষয়েও অনেক মানুষকে নসিহত (কল্যাণকমিতা/সদুপদেশ) করতেন। বয়ানের মাঝে মাঝে তিনি মারফতী ও মুর্শিদী গানও করতেন। আর দাদা হযরত আব্দুল বারেক ফকির ছিলেন আল-কাদরিয়া তরিকাপন্থি খেলাফতপ্রাপ্ত পীর। তিনি বেশ কিছু মুরীদান (শিষ্য/অনুসারী) রেখে গেছেন। যাঁর বদৌলতে পিতাও দাদা কর্তৃক খেলাফতপ্রাপ্ত হনে অনেক মুরীদান রেখে গেছেন। আর মা মোসাম্মৎ আমেনা বেগম; অত্যন্ত ধৈর্যশীলা, মায়াময়ী, স্নেহময়ী, করুণাময়ী ও মমতাময়ী একজন গৃহিনী ছিলেন। 
শিক্ষা ও ব্যক্তিগত জীবন: ১৯৬৪ সাল হতে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বনগ্রামে বেড়ে ওঠা। গ্রামের মধ্যপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু হয় এবং চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত সেখানে পড়া-লেখা। ৭১ সালে বংশের দুইজন যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে ছিল বলে তাঁদের পরিবারের উপর স্থানীয় রাজাকাররা অত্যাচার করে। অত্যাচারের মাত্রা এতোটাই বেশী ছিলো যে সম্মান বাঁচাতে দাদা সমস্ত সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে গোলাবাড়িয়া গ্রামে চলে যান। যে গ্রামটি গোপালগঞ্জ শহরের সন্নিকটে। সেখানে দাদা মাত্র ১৬ কাঠা বসতবাড়ি ক্রয় করেন। আর বাকি অর্থ তাদের নিকট এক আত্মীয় আত্মসাৎ করেন। ফলে আর্থাভাবে অসহায় হয়ে পড়ে পরিবারটি। তখন লুকিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া এক চাচাতো ভাই এম এল বেল্লাল মোল্লা তাঁকে রাজশাহীতে নিয়ে যান পড়ালেখার জন্য। সেখানে থেকে পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণি পড়া হলে চাচাতো ভাই চট্টগ্রাম বদলি হয়ে গেলে ইলিয়াস ফকির বাড়ি চলে আসেন। এসময় সংসারে ভীষণ অভাবের কারণে আর পড়া হয়নি। সে সময় নয় সদস্যের পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব ছিল বাবার উপর। তাই বাবাকে সাহায্য করতে অন্যের জমিতে তিনি কিষাণ দেওয়া শুরু করেন। এর মধ্যে বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে নিরুপায় হয়ে ঘরসহ বসতবাড়িটা বিক্রি করে ১৯৭৯ সালে মামা বাড়ি করপাড়াতে চলে আসেন। বর্তমানে সেটাই স্থায়ী ঠিকানা। বসতভিটার সঙ্গে কিছু জমিও ক্রয় করার সমর্থ হয়েছেন। ছয় ভাই-বোন মধ্যে তিনি দ্বিতীয় ও ভাইদের মধ্যে প্রথম। সকলের বড় একমাত্র বোন রেখাতুন্নেসা রেখা। মেজ ভাই মেরাজ হোসেন ফকির, সেজ জন লোকমান হোসেন ফকির, নোয়া ফরমান হোসেন ফকির আর ছোট ভাই সোবহান হোসেন ফকির। ১৯৮৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি একই গ্রামের জরিনা বেগমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। দুই সন্তানের জনক-জননী এই দম্পতি। কন্যা রোজিনা আক্তার রোজি ও পুত্র মোঃ রাজিব হাসান।
কর্মজীবন: ১১ বছর বয়স থেকেই গোলাবাড়িয়া থাকাকালীন কৃষি কাজের মাধ্যমে কর্মজীবনে পদার্পন করেন তিনি। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত কাজ করে পেতেন সাড়ে সাত টাকা। আর শুধুু সকালে কাজ করলে পাঁচ টাকা ও বিকালে আড়াই টাকা করে। এরপর ১৯৭৭ থেকে ৮০ সাল পর্যন্ত চার বছর তৎকালীন স্বনামধন্য ‘দীপালি অপেরা’ যাত্রা দলে একাঙ্গ (শিশুশিল্পী) বালকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মাসিক ৩০০ টাকা চুক্তিতে। ১৯৭৮ সালে বেতন বেড়ে দাড়িয়েছিলো ৪৫০ টাকায়। ৮১ থেকে ৮৭ সাল পর্যন্ত পালাগান অর্থাৎ কড়চা গানের দল গঠন করে অর্থেও বিনিময়ে ঘুরে ঘুরে পালাগান করেছেন। ৮৮ সালে আবার ‘স্বর্ণকলী’ যাত্রা ইউনিটে যোগদান করে বিবেকের (সাধক/বাউল গায়ক/অন্তরাত্মার কণ্ঠস্বর) ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। সেখানে ছয়শ’ টাকা মাসিক বেতন পেতেন। আর সপ্তাহে হাত খরচ পেতেন ২০-৩০ টাকা করে। এরপর সারা দেশে ‘স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক’ আন্দোলনে যাত্রা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে আবার বাড়িতে এসে পালাগান শুরু করেন। এর পাশাপাশি ৯০ সাল থেকে উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস-এর আওতাধীন ভূমিহীন সমিতি গড়ে তোলেন। সমিতির সভাপতি পদে নিযুক্ত হন। ৩৭টি ভূমিহীন সমিতির সমন্বয়ে ইউনিয়ন কমিটির সভাপতিরও দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও কারিতাসের বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় শিক্ষাসেবক পদে ৯৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে কারিতাসের স্বপক্ষে ও বিপক্ষে একটি পালাগান তৈরী করে বোলতলী বাজারে বার্ষিককর্মী সম্মেলনে উপস্থাপন করেন। যেটি বোলতলী কারিতাস অফিসের মাঠ কর্মকর্তা ফ্রান্সিস গোমেজ ক্যাসেট করে বাংলাদেশের সমস্ত কারিতাস অফিসে প্রেরণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় কারিতাস খুলনা আঞ্চলিক অফিসের এক কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম খোকনের সন্ধানী দৃষ্টি তাঁর উপর পড়ে। যিনি দেশের উন্নয়ন ব্যক্তিত্ব ও উন্নয়ন সংস্থা রূপান্তরের নির্বাহী পরিচালক।

ইলিয়াস ফকিরের গাজিরগান পরিবেশনা        -জনকণ্ঠ
পুঁথি কবিতা দিয়ে শুরু: রফিকুল ইসলাম খোকন তাঁকে পুঁথি কবিতা লেখার জন্য কিছু তথ্য দেন। সেই তথ্য মোতাবেক ১৯৯৫ সালে প্রথমে দিনাজপুরে পুলিশ কর্তৃক ইয়াসমিনকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা নিয়ে “ইয়াসমিন হত্যার কবিতা’’ শিরোনামে ১৬ পৃষ্ঠার একটি পুঁথি কবিতা তিনটি সুরের সমন্বয়ে সম্পন্ন করেন। এসময় তিনি গোপালগঞ্জ থেকে খুলনা এসে রফিকুল ইসলাম খোকনের বাসায় থেকে তথ্য নিতেন ও কবিতা লিখে জমা দিয়ে চলে যেতেন। কখনওবা তথ্য নিয়ে বাড়ি যেয়ে কিছুদিন পর কথা ও সুর নিয়ে খুলনায় ফিরতেন। ইন্টারনেটতো দূরের কথা ভ্রাম্যমানের ফোনের প্রচলন না হওয়ায় যাতায়াতের মধ্য দিয়েই লেখালেখির আদান প্রদান করতে হতো। পরবর্তীতে তাঁর আরও ১৮টি পুঁথিকবিতা প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলো হল বাঙালির আন্দোলনের কবিতা, নির্বাচনের কবিতা (৭ম সংসদ), নির্বাচনের কবিতা (ইউপি), নির্বাচনের কবিতা (নারী প্রার্থী), নসিরণের আত্মহত্যার কবিতা, জৈগুনের দুঃখের কবিতা, নির্বাচনের কবিতা (৮ম সংসদ), দুর্যোগের কবিতা (টর্ণেডো), কল্পনা চাকমার কবিতা, ভণ্ড দরবেশের কবিতা, ভেজালের কবিতা, ঘুর্ণিঝড়ের কবিতা (সিডর), পানি ও মানুষের কবিতা, নারী অধিকারের কবিতা, বাংলাদেশের ইতিহাসের কবিতা, নারী ও শিশু পাচারের কবিতা, দুর্যোগের কবিতা (আইলা) ও জাতীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থী শিরোনামের কবিতা। যে কবিতাগুলো সামাজিক রূপান্তর গোষ্ঠী (রূপান্তরের পূর্বের নাম) পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে জনসচেনতায় মানুষের মধ্যে বিলি করতো। এরপর রূপান্তরের প্রধান নির্বাহী স্বপন কুমার গুহ ও পরিচালক রফিকুল ইসলাম খোকন ১৯৯৬ সালের জুলাইয়ে রূপান্তর থিয়েটার সেন্টারে (রূপান্তরের সাংস্কৃতিক বিভাগ) নাট্যকর্মী হিসেবে ইলিয়াস ফকিরকে নিয়োগ দেন। যাঁরা বর্তমানে দু’জনই নির্বাহী পরিচালক। যেখানে তিনি গণসচেতনতার জন্য গান গাইতেন ও লোকপ্রিয় নাটকে অভিনয় করতেন।
এই সময় তার সঙ্গে কাজ করতেন মিজানুর রহমান পান্না (বর্তমানে যিনি পরিচালক), খাদিজা খাতুন, কার্তিক রায়, কাজী মফিজুর রহমান, প্রবীর কুমার বিশ্বাস, এস এম ফেরদৌস, সাব্বির হোসেন, নাজমুল আলম মুন্না, হুমায়ুন কবির মুন্না, বিকাশ কুমার কুন্ডু, সুপ্রিয়া মন্ডল, চন্দনা মন্ডল, ভবানন্দ হালদার, প্রদীপ ভাদুড়ী, শামীম আহমেদ, নার্গিস সুলতানা, নিহার রঞ্জন হাওলাদারসহ অনেকে। সেই থেকে খুলনার বিভিন্ন ভাড়াটিয়া বাসায় বসবাস। প্রথমে এসেই তিনি রূপান্তরের খুলনা নগরীর ফারাজিপাড়া ফুলমার্কেট অফিসের একটি কক্ষে থাকতেন। সেখানে তার সঙ্গী হন সহকর্মী প্রবীর কুমার বিশ্বাস (বর্তমানে যিনি সাংবাদিকতা ও লেখালেখির সঙ্গে জড়িত)। দু’জন মিলে তখন রান্নাবান্না করে খেতেন। রূপান্তর থিয়েটারে কাজ করতে করতে ২০০০ সালে নাট্য প্রশিক্ষক, ২০০৪ সালে কর্মসূচী কর্মকর্তা, ২০০৬ থেকে কর্মসূচী সমন্বয়কারী এবং ২০১০ সাল থেকে অদ্যাবধি রূপান্তর থিয়েটারের লোকসঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন।
লেখালেখি: লেখালেখি শুরু শিশুকাল থেকেই। স্কুলে পড়ার সময়ই কবিতা, ছড়া, ছড়াগানসহ বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করতেন। আর এই লেখায় বিশেষ ভাবে উৎসাহ যুগিয়েছেন তাঁর বাবা-মা ও স্কুলের শিক্ষকগণ। স্কুলে শিক্ষার্থীদের পড়া-লেখা, শিক্ষকদের আচার আচরণসহ সার্বিক অবস্থা সম্বলিত লেখা ছড়া ও গান নিয়ে তিনি বিদ্যালয়ের বাৎসরিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। ফলে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটিও উৎসাহিত করতেন। লেখা কবিতার সংখ্যা এ পর্যন্ত ১০৪টি, গানের সংখ্যা এক হাজার দুইশ’, প্রবন্ধ ৮২টি, ছোট গল্প ১২টি, বিশেষ চিঠি ১০টি ও নাটক পাঁচটি। এছাড়া ৮৮টি আধ্যাত্মিক গান (সাধনতত্ত্ব ও দেহতত্ত্ব) রয়েছে তাঁর ঝুড়িতে। ইলিয়াস ফকিরের লেখা নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে দুইটি; দেব-দেবীর বিচার ও পুঁথি-নাট্য প্রচার হয়েছে একুশে টেলিভিশনে। ‘রূপান্তরের কর্মী আমরা মানুষকে ভালোবেসেছি, মোরা মানব প্রেমে অবগাহিয়া প্রভাতের পথে চলেছি’ এই গানটি রূপান্তর সঙ্গীত হিসেবে খ্যাত। গানটি তাঁরই রচিত। লিখেছিলেন ১৯৯৭ সালে। 
পটগান: এবার আসি পটগানের কথায়। খ্রীষ্টীয় ১২/১৩ শতক থেকে ১৯৫০ সাল নাগাদ এতদাঞ্চলের পটুয়ারা খুবই সক্রিয় ছিলেন। তবে ১৯৬০ সালের পরবর্তী সময়ে এই পটগান ক্রমশই কমতে থাকে। অবশ্য স্বাধীনতা উত্তর দু’এক জায়গায় যে এটা দেখা যায়নি তা নয়। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ১৯৯৬ সালে এটি আবার দেখা যায় বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার চিলা ইউনিয়নের হলদিবুনিয়া গ্রামে। এই পটগান দেখেন ইলিয়াস ফকির। এরপর শুরু পটগান লেখা। রূপান্তর প্রথম পটগানটি উপস্থাপিত হয় ১৯৯৭ সালের ৫ই জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলা মিলনায়তনে। পটগানটিও তৈরী হয়েছিলো সুন্দরবন ও পরিবেশকে ঘিরে। পটগানের আদি সুরে লেখা গানে নিজেই কন্ঠ দিয়েছিলেন। গানটির প্রথম কথা ছিলো, ‘ওকি, হায়রে সাধের সুন্দরবন, মানুষেই ধ্বংস করছে অমূল্য রতন’। দ্বিতীয় পটগানটি ছিল নারীর অবস্থা ও অবস্থান -এর উপর। পটগানে আদি সুরেই কথাগুলো ছিল, ‘ওকি, হায়রে নারী দুর্গতী, সমাজে নির্যাতন হতে কি পাবে না মুক্তি’। যেখানে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন নারী নির্যাতনে ধরণ, কারণ, কুফল, প্রতিকার ও নারী উন্নয়নের ভাবনা। আর তৃতীয় পটগানটি ছিল পরিবেশ সুরক্ষার। যার মুখবন্ধ, ‘ভাইরে, পরিবেশ দিবস আসিলে বক্তৃতা দেয় কত নেতা; মুখে মুখে বলে সবাই কাজের বেলা করে না তা, সত্য কথা; বলি অতি সত্য কথা। তবে গণমানুষদের পটগানে প্রতি বেশী বেশী আকর্ষণ করার জন্য তিনি এখান থেকে সুরের বৈচিত্র্য ঘটনা। এ পটগানটি পুঁথি কবিতার সুর ছন্দে করা হয়েছিল। পটগান যদিও পৌরাণিক কিংবা অলৌকিক কাহিনী নিয়ে তৈরী হতো, তৈরী করা হতো ধর্ম প্রচারের জন্য, কিন্তু রূপান্তরের পটগানগুলো উন্নয়নের ইস্যুভিত্তিক (গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে)। গণসচেতনতায় এটিকে আসলে উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে রূপান্তর ব্যবহার করছে। যারমধ্যে গণতন্ত্র, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন, মানবাধিকার, আর্সেনিক, শিশু অধিকার, জেন্ডার, সার্বিক সাক্ষরতা আন্দোলন, স্বাস্থ্য তথ্য, পলিথিন প্রতিরোধ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সমবায়, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ঔষধি গাছ, নদী ও পানি, জলবায়ু পরিবর্তন, মনিষীদের জীবন ও কর্মের পটগান প্রভৃতি উল্লেযোগ্য। যার বেশীর ভাগ তারই সুরারোপিত। বর্তমানে তাঁর লেখা পটগানের সংখ্যা ২২৪টি। এগুলো নয়টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- প্রকৃতি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য-২১টি, গণতন্ত্র ও সুশাসন- ৩৩, লিঙ্গবৈষম্য ও নারী অধিকার- ১৬, দুর্যোগ ঝুঁকি ও প্রশমন- ১৫, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা- ২৫, মানবাধিকার ও পাচার- ৪০, শিশু অধিকার ও শিশু শিক্ষা- ২০, সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতা- নয়, জীবন-জীবিকা ও উন্নয়ন- ২১ এবং সংস্কৃতি ও ব্যক্তির জীবন আদর্শ- ৩৩টি। পটগানের অন্যতম বিষয় পটচিত্র; অর্থাৎ চিত্র দেখিয়ে গানের কথা সাজানো থাকে। এই চিত্রের ধারণা তিনি দিয়েছেন ১৮০টি পটে। নিজে ১০টি পটগানে কণ্ঠ দিয়েছেন। যার প্রদর্শনীর সংখ্যা কয়েক হাজার। প্রথম পট অঙ্কণ করেছিলেন প্রয়াত চিত্রশিল্পী এস এম আব্দুর রহমান। পরবর্তীতে দীর্ঘদিন ধরে পটের চিত্র এঁকেছেন চিত্রশিল্পী শ্রীবাস মন্ডল; এরপর অলোক সরকার, দেবাশীষ সরদার, কালি কিংকর সরদার ও চিত্রশিল্পী প্রসেন অধিকারীসহ অনেকে। প্রথম দিকে ইলিয়াস ফকিরের পটগানসহ বিভিন্ন গানে কণ্ঠ দিয়েছেন খাদিজা খাতুন, শলীল বাড়ৈ, মিঠু বিশ্বাস, নমিতা মল্লিক, আশফাকুর রহমান আশা, দীপ্তি মন্ডল, রমা মন্ডল, স্বপন রায়, দীপক মন্ডল, আখতারুন্নেসা নিশা, শীলা হালদার, হিরন্ময় মালাকার, শ্যামল মণ্ডল, অপর্ণা সাহাসহ অনেকে। আর গানে সুরারোপ করেছেন ছোট ভাই মিরাজ ফকির, সুশান্ত বৈরাগী, বিপুল শীলসহ অনেকে। পটগানের সঙ্গে অন্যতম অনুসঙ্গ নেচে নেচে কাঠি ঢোল বাজানো। যেটি শুরু করেছিলেন প্রবীর কুমার বিশ্বাস। এরপর স্বর্গীয় (প্রয়াত) বিকাশ কুমার কুন্ডু, সমীরণ বিশ্বাস, স্বপ্না মৌলিক, প্রদীপ বিশ্বাস, লালন কবিরাজ, বিপুল রায় ও চপল রায়। এরা প্রত্যেকে স্বগৌরবে ঢোল বাজিয়েছেন দীর্ঘ দিন ধরে। বর্তমানে দেশের অনেক উন্নয়ন সংস্থা পটগানের দল তৈরী করলেও পরিবেশনের ধরন একেবারেই রূপান্তরের অনুকরণীয়। তাই এটাই সত্য যে আধুনিক পটগান সৃষ্টি হয়েছে রূপান্তরের হাত ধরে আর ইলিয়াস ফকিরের মাথা থেকেই। অনেক সংস্থার দলগুলোকে তিনি প্রশিক্ষণও দিয়েছেন।
প্রকাশনা: গীতিসুধা-১ নামে একটি গ্রন্থ ছাপা হয়েছে। এতে স্থান পেয়েছে উন্নয়নমূলক ১০১টি গান। এছাড়া ২৫২টি গানের সমন্বয়ে গীতিসুধা-২ শিরোনামে আরো একটি গ্রন্থ ছাপার অপেক্ষায় রয়েছে। ভিন্ন চারটি দর্শন যথা- মানব দর্শন, প্রকৃতি দর্শন, ধর্ম দর্শন ও গোস্বামী বা সুফীকথন গ্রন্থটি লেখা সমাপ্ত হয়েছে। আরো একটি বই লেখা প্রায় শেষ পর্যায়ে; যার নাম রহস্যজ্ঞানে কোরানুম্ মাজিদ। অবশ্য গ্রন্থের এই নামগুলো বিষয়ভিত্তিক। পাঁচটি গ্রন্থেরই সিরিয়ালগত নাম ‘আলোর আরশি’। লিখেছেন অনেকগুলো প্রবন্ধও। অধিকাংশ প্রবন্ধ ২০১৬ সালের পূর্বে জাতীয় দৈনিক জনকণ্ঠ ও ভোরের কাগজে ছাপা হয়েছে। কিছু কবিতা ও প্রবন্ধ ঢাকার একটি ম্যাগাজিন প্রকীর্তিতে ছাপা হয়েছে। দুর্গাপুজা উপলক্ষে খুলনার সাহেবের করবখানা পূজা কমিটির প্রকাশিত স্মরণিকা ‘বোধন’-এ কয়েক বছর কবিতা ও প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। দুই বাংলার কবি সাহিত্যিকদের সংগঠন ‘সাহিত্য নিকেতন’র ত্রৈমাসিক মুখপত্র ‘হৃদয়ে বাংলা’য় তাঁর কবিতা ছাপা হয় নিয়মিত। এছাড়া দৈনিক জন্মভূমি ও দৈনিক পূর্বাঞ্চল পত্রিকার সাহিত্য পাতাসহ বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকীতে লেখা ছাপা হয়েছে।
গায়ক: গায়ক হিসেবে অনবদ্য ও অনিন্দ্য সুন্দর এক নাম ইলিয়াস ফকির। হারমোনিয়াম বাজাতে পারেন দারুন। অন্যের সঙ্গে যে কোন গানে সঙ্গত আর নিজের গানেতো বটেই। মন্দিরা, করতাল, প্রেমজুড়ি কিংবা জিপসিতেও পাকা। মাঝে মধ্যে সারিন্দাও বাজিয়েছেন। আর তবলা কিংবা ঢোলেও ঠেকা দেন তালেতালেই। নিজের লেখা অনেক গানে নিজেই সুর করেন। বিভিন্ন ধরণের গান গাইতে পরলেও বিজয়গীতি, লালনগীতি, ভাটিয়ালী, মুর্শিদী, মারফতিসহ নানা ধরনের লোকগীতি ও বাাউল গানের উপর তাঁর একটা বিশেষ টান রয়েছে। জারিগান লিখে সুর দিয়ে গেয়েছেন। অত্যন্ত রসিক প্রকৃতির লোক ইলিয়াস ফকির। জারি গানের মাঝে উপমা দিয়ে অনেক গল্প বলে দর্শক হাসাতেও পারদর্শী। মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেছেন ২০টির মতো। যার প্রদর্শনী শহস্রাধিক। ‘এসব নাটকের বিষয়বস্তু কি’ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সব নাটকই উন্নয়নের ইস্যু নিয়ে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার, পরিবেশ, শিশু অধিকার, সুশাসন, মানবাধিকার অন্যতম।
বিশেষ পরিবেশনা: ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর লেখা প্রথম পটগান ‘সুন্দরবন বাঁচাও’ শিরোনামের এবং হালুই গান সম্প্রচার হয়। সঙ্গে চণ্ডিদাস ও রজকিনীর প্রেমকাহিনী নিয়ে অষ্টকগানও সম্প্রচার হয়েছিলো। এই তিনটিতেই তিনি অভিনয় করেছিলেন। এরপর ১৯৯৮ সালে পাঁচ পর্বের একটি ধারাবাহিক টিভি নাটক ‘বনবিবি’ তে তিনি অভিনয় করেছেন। নাটকটি বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও পরবর্তীতে চ্যানেল আইতে সম্প্রচারিত হয়েছে। টেলিফিল্ম হিসেবেও সম্প্রচার হয়েছে একবার। ১৫ এপ্রিল ২০১৫ হতে ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ের মোট ২৮টি পটগান ধারণ ও সম্প্রচার করে বিটিভি। যা পরবর্তীতে সম্প্রচারিত হয়। এ ভিন্ন যে সব চ্যনেলে পটগান সম্প্রচার হয়েছে সেগুলি হল- এটিএন বাংলা, একুশে টিভি, একাত্তর টিভি, চ্যানেল আই, ইটিভি ও মাছরাঙ্গা টিভি। আর যমুনা টিভিতে পটগান ও তাঁকে নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন সম্প্রচার হয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সদ্য প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সামনেও গান পরিবেশন করেছেন। পরিবেশন করেছেন অসংখ্য মন্ত্রী, এমপি ও বিশেষ ব্যক্তিবর্গের সামনে। বাংলাদেশ বেতারে গীতিকার হিসেবে ২০১৪ সালে মনোনিত হয়েছিলেন। বর্তমান কর্মক্ষেত্র রূপান্তর আর বসবাস খুলনা মহানগরীর পশ্চিম বানিয়াখামারে ভাড়া বাসায়। স্ত্রী, কন্যা ও ১৫ বছর বয়সের নাতনীকে নিয়ে থাকেন তিনি। জামাতা প্রবাসী আর পুত্র বৈবাহিক জীবন গ্রহণ করে সস্ত্রীক অন্যত্র থাকেন। 
প্রিয় ব্যক্তিত্ব: ইলিয়াস ফকিরের প্রিয় ব্যক্তিত্ব মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান। আর প্রিয় লেখক হুমায়ুন আজাদ; যিনি বাংলাদেশের বহুমাত্রিক লেখক। যিনি ধর্ম, মৌলবাদ, সংস্কারবিরোধিতা, নারীবাদ ও রাজনীতি বিষয়ে প্রথাবিরোধী লেখালেখি করে ১৯৮০-র দশক থেকে ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর প্রিয় সাহিত্যিক কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলাদেশের জাতীয় কবি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও দার্শনিক; যিনি বাংলা কাব্যে অগ্রগামী ভূমিকা রাখার পাশাপাশি প্রগতিশীল প্রণোদনার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। চিরসুখী জন ভ্রমে কি কখন ব্যথিত বেদন বুঝিতে পারে? কী যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে কভূ অশীবিষে দংশেনি যারে অথবা যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি, আশু গৃহে তার দেখিবে না আর নিশিতে প্রদীপ ভাতি। এমন অমর বাণী যার তিনি হলেন বাংলার নীতিকবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার (খুলনার সেনহাটিতে জন্ম); ইলিয়াস ফকিরের প্রিয় কবি। এই কবির জীবন আদর্শের উপর ‘সদ্ভাবশতক’ শিরোনামে পটগান লিখেছেন তিনি। আর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তিনি সারাক্ষণ মাথায় ও হৃদয়ে ধারণ করেন।
পুরস্কার: রাষ্ট্রীয় বড় কোন পুরস্কার না পেলেও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন ইলিয়াস ফকির। রূপান্তর বার্ষিককর্মী সম্মেলনে পরপর দুই বছর পোস্টার প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পেয়েছেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার কেউটিয়ায় বিজয় মেলা হতে বিজয় গীতিতে সম্মাননা ও ছেউড়িয়ায় লালন ও বিজয় মেলা হতে বিজয় গীতিতে সম্মাননা ও মানপত্র পেয়েছেন। নদীয়া জেলার শান্তিপুরে রঙ্গপীঠ নাট্যগোষ্ঠী হতে সম্মাননা পেয়েছেন। আর নড়াইলে বিজয় মেলা হতে ২০১৭ সালে বিশেষ সম্মাননা পদক পেয়েছেন তিনি। ২০০৪ সালে খুলনা শিল্পকলা একাডেমি হতে কৃতিজন সম্মাননা পেয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠনও তাঁকে পুরস্কৃত করেছেন।

লেখককে স্বাক্ষাৎকার দিচ্ছেন    -জনকণ্ঠ
সখ ও ভালোলাগা: বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হাডুডুর প্রতি সখ ছিল ছোট বেলা থেকেই, বড়শি কিংবা জাল দিয়ে মাছ শিকার যেন নিত্যদিনের কাজ ছিল। সঙ্গে ঘুড়ি ওড়াতে ভীষণ পছন্দ করতেন। অনেকের মতো দুষ্টুমি তাঁরও ছিল; সুযোগ পেলেই ফাঁদ পেতে বক ধরতেন। তবে বুঝতে শিখে এটাকে গর্হিত কাজ বলে মনে করেছেন তিনি। আপনার স্বপ্ন কি? এমন প্রশ্ন ছিলো ইলিয়াস ফকিরের কাছে। বলেন, স্বপ্ন শুধু একটাই; সেটা হল সম্প্রীতি। মনে রাখতে হবে বিশ্ব মানব জাতি, ধর্ম, গোত্র, বর্ণ হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে সবার আগে আমরা মানুষ, মানবতাই হবে আমাদের মহান ধর্ম। আর অতৃপ্ততার কথা বলতে যেয়ে বলেন, আমি মানুষের, সমাজের ও দেশের কল্যাণের জন্য কিছুই করতে পারিনি, এটাই আমার অতৃপ্ততা। মনে হয় যা কিছু করছি স্বার্থপরের মত নিজের জন্যেই। আনন্দের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, একটি বড় রকম আনন্দের মূহুর্ত আমার মনে পড়ে। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ফাইনাল ম্যাচে কেনিয়াকে হারিয়ে আইসিসি ট্রফি জিতে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলার যোগ্যতা অর্জন করে (১৯৯৯ সালে বিশ্বকাপ খেলা হয়); সে দিন গ্রাম পর্যায়ে ছাত্র যুবক রাস্তায় নেমে আনন্দ উল্লাস ও রং ছড়াছড়ি করেছিল, যে রংয়ে আমিও রঙিন হয়ে ছিলাম। সেটাই ছিল বোধ হয় আমার সবচেয়ে আনন্দঘন মুহূর্ত। এরপর প্রথম সন্তানের জনক পরবর্তীতে পুত্র সন্তানের জনক হওয়ার পরিতৃপ্তি এখনও আমাকে পুলকিত করে।
বেদনা: দুঃখের স্মৃতি বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে সম্ভবত জুলাইয়ের শেষ দিকে বরিশালের গৌরনদী, আগৈলঝাড়া ও গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া এলাকার ২৫-৩০টি হিন্দু পরিবার প্রাণ ও সম্ভ্রম রক্ষার্থে ভিটে মাটি ছেড়ে ভারতে যাওয়ার জন্য নৌকাযোগে আমাদের বাড়ি সংলগ্ন একটি খাল ধরে বহর বেঁধে যাচ্ছিল। এর মধ্যে রাজাকাররা সংবাদ পেয়ে দল বেঁধে এসে তাদের নৌকাগুলি ডুবিয়ে দিয়ে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, এমন কি শুকনা খাবার পর্যন্ত লুটে নেয়। তারা শিশু-বৃদ্ধ সকলেই খালের মধ্যে নাকানি চুবানি খেয়ে কোন মতে তীরে উঠতে সক্ষম হয়। দুগ্ধপোষ্য শিশুদের বুকে ধরে, ছোট্ট ছেলে-মেয়ে ও বুড়ো-বুড়িদের হাত ধরে, ভয়ে জড়সড় হয়ে মহাশঙ্কিত দৃষ্টিতে কি অবস্থায় সেই মানুষগুলির ছুটোছুটি, তা নিজের চোখে দেখেছিলাম। সে স্মৃতি কোন দিনও ভুলবার নয়। তাই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি বলেন, তৎকালীন পাকিস্তানী স্বৈরশাসকের নির্যাতন, নিপীড়ন ও জুলুমের কবল হতে একটি জাতিকে মুক্তি দিতে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, প্রাণ হারিয়েছিলেন, রক্ত দিয়েছিলেন, মা-বোনেরা সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন; জাতি হিসেবে আমরা তাঁদের নিকট চিরঋণী। 
শেষকথা: বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল তাঁদের প্রথম পুত্র সন্তান বড় হয়ে লেখাপড়া শিখে সরকারি চাকরি করে ছোট ভাইদের মানুষ করবে। কিন্তু কবিতা, গান আর গান করেই জীবন পার। ব্যক্তিগত জীবনে মানুষটা নিজের জন্য কিছুই করেন নাই। গভীর মনন ও নিরলস গবেষণার ফসল তাঁর সৃষ্টি। তিনি মার্জিত এবং বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাধারার অনুসারীও। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যতদিন বেঁচে থাকি ততদিন সকল মানুষকে যেন সমান ভাবে ভালোবাসতে পারি। কেউ যেন আমার থেকে কোন প্রকার কষ্ট না পায়। অর্থে, বাক্যে ও ভালোবাসায় যেন কারো কাছে ঋণী না থাকি। সবশেষে সকলের নিকট দোয়া এবং সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করি, আমি যেন বিছানায় ভুগে ভুগে মৃত্যুবরণ না করি। প্রিয়জনের মনে ভালোবাসার পরিবর্তে ঘৃণার পাত্র হতে চাইনা। ২০১৭ সালে পুরাতন ঢাকার আজগর আলী হাসপাতালে ওপেন হার্ট সার্জারি করে কৃত্রিম প্রযুক্তির মাধ্যমে বেশ ভালো আছি। তবে এখন নানা রোগে রোগান্বিত। আগের মতো আর গানগাইতে পারি না। ইলিয়াস ফকিরের কাছে শেষ প্রশ্ন ছিল, কতদিন লেখালেখি করবেন? বলেন, যত দিন কলম হাতে নিয়ে লিখতে পারবো ঠিক ততদিনই।

প্যানেল/মো.

×