ভোর চারটা বাজতেই কুন্দল গ্রামের জামে মসজিদের মাইকে ভেসে আসে শান্ত, মৃদু সুরধ্বনি। সেই সুরে রোজাদারদের আহ্বান—“সেহরী খাওয়ার সময় হয়েছে, উঠুন।” নিঃশব্দ ভোরের ওই সুর যেন চারপাশে আলো ছড়িয়ে দেয়। পুরো গ্রাম ঘুম ভাঙে, শহরও যেন ভোরের আলোয় জীবন্ত হয়ে ওঠে।
সবার প্রশ্ন, “এমন কে ডাকছে?” উত্তর আসে নিরবে—এ হচ্ছেন আল-ফারুক একাডেমির শিক্ষক মোঃ শফিকুল ইসলাম। তার সুরে মিশে আছে চার দশকের অধ্যবসায়, শিক্ষা, ধর্মচর্চা ও মানবিকতার গল্প। মোঃ শফিকুল ইসলাম—বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর সৈয়দপুর উপজেলা শাখার নায়েবে আমির। তবে ১১ নং ওয়াডের কুন্দল পূর্বপাড়ার মানুষ তাঁকে জানে শফিকুল নামে এক ধর্মভীরু মানুষ হিসেবে, যিনি নিভৃতভাবে আলোর পথ দেখান।
পিতার আদর্শ ও মসজিদের নিঃশব্দ পথ
ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন পিতার প্রতি নিষ্ঠা। আট ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় এই শিশুটি পঞ্চম শ্রেণিতে পৌঁছতেই মসজিদের দিকে হাঁটতে শুরু করে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কোরআনের তেলাওয়াত, রাতের ইবাদত—সবই ধীরে ধীরে তাঁর জীবনের নিয়ম হয়ে ওঠে। শৈশব থেকেই মানুষের প্রতি দায়বোধ, সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধ তার চরিত্রে গড়ে ওঠে।
একবার এলাকার এক যুবক প্রশ্ন করেছিল, “ভাই, এত সকালে কেন ওঠো?” তিনি হাসি দিয়ে বলেছিলেন, “ভোরের নীরবতা অন্য সব শব্দকে হারিয়ে দেয়। তখন শুধু আলোর সঙ্গে থাকি।” এই ভোরের আলোর সঙ্গে থাকা আজও তার জীবনের নিয়ম।
স্কুল পেরিয়ে কলেজে পড়াকালীন তিনি ছিলেন তুখোড় অ্যাথলেট। ১০০ মিটার, ৮০০ মিটার ও ৩০০০ মিটার দৌড়ে তিনি টানা চার বছর চ্যাম্পিয়ন। ক্রীড়ার মাঠে শেখা ধৈর্য, সাহস ও একাগ্রতা পরবর্তী জীবনের শিক্ষার ভিত্তি গড়ে তোলে। সহপাঠীরা আজও মনে রাখে, “শফিকুল ভাই আমাদের দেখিয়েছেন, পরিশ্রম ছাড়া কিছু সম্ভব নয়।”
রমজানের ভোর: নিভৃত সাধনা ও মানবিক দৃষ্টি
চলমান রমজান। কুন্দল গ্রামের জামে মসজিদে বারবার ঘোষণা আসে—“রোজাদারগণ উঠুন, সেহরী খান। মাত্র কিছু সময় বাকি।” আধা ঘণ্টা বারবার ডাকের পর মোঃ শফিকুল ইসলাম শুরু করেন গজল। তার মৃদু সুর ভেসে আসে প্রতিটি বাড়িতে। কেউ জাগে, কেউ ঘুম ভাঙে, কেউ চুপচাপ শুনে। এই ভোরের মুহূর্তে গ্রামের মানুষ দেখেন, একজন শিক্ষক, নেতা ও সমাজসেবক নিজে আলোকিত হয়ে অন্যদের জীবন আলোকিত করছেন।
একজন প্রতিবেশী বলেন, “শফিকুল ভাই না থাকলে আমরা অনেক কিছুই ঠিকমতো করতে পারতাম না। তার জন্য ভোরের এই সময়ও বিশেষ।” কেউ অসুস্থ হলে বা প্রয়াত হলে তিনি প্রথমে ছুটে যান। রোগীর পাশে দাঁড়ান, প্রয়াতের দাফন ও সব ব্যবস্থা দেখেন। রোজার সময়ে তিনি ঘর ঘর গিয়ে মানুষকে সেহরী খেতে বলেন। ছোট শিশুদের কোরআনের আয়াত শেখান। বৃদ্ধদের পাশে থাকেন। গ্রামের মানুষের কাছে তিনি শুধু নেতা নয়; তিনি এক ‘নিজের মানুষ’—যার জন্য ভোরের নিভৃত সাধনা এবং দিনের কাজ সবই অর্থপূর্ণ।
শিক্ষা তার কাছে দায়িত্ব। সৈয়দপুর সরকারি কলেজ থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএড করেছেন। ১৯৮৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আল-ফারুক একাডেমি। বিদ্যালয়টি কেবল জ্ঞান শেখায়নি; শিক্ষার্থীরা চরিত্রও শিখেছে। বিতর্ক, বিজ্ঞানচর্চা, ইসলামী সংস্কৃতি ও খেলাধুলার আয়োজন সব মিলিয়ে এটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
তার হাতে গড়া শিক্ষার্থীরা আজ দেশসেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়ছে—বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (CUET), রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (RUET), ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে। অনেকে উচ্চ শিক্ষা শেষে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত, কেউবা বিদেশে পড়াশোনা ও চাকরিতে রয়েছেন।
এক শিক্ষার্থী সোহেল বলেন, “শফিকুল স্যার শুধু শিক্ষক নন। তিনি আমাদের জীবনের পথপ্রদর্শক। তার শেখানো নিয়ম ও ধৈর্য আমাদের প্রতিদিন পথ দেখায়।”
তিনি সংসারে একজন সহধর্মিণী, তিন পুত্র ও এক কন্যার পিতা। পরিবার তার শক্তির উৎস। প্রতিদিনের কাজের মধ্যে পরিবারের দায়িত্বও পালন করেন। সমাজে সক্রিয়; প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া, শিক্ষার্থীর পাশে থাকা, বাড়ি বাড়ি দাওয়াত দেওয়া—সবই তার দৈনন্দিন কাজ। চার দশক ধরে এই দায়িত্ব পালন তাকে এলাকার জনপ্রিয় ও সম্মানিত মানুষে পরিণত করেছে।
দর্শন: নিভৃত সাধনা থেকে আলোকিত জীবন
মোঃ শফিকুল ইসলাম নীরবভাবে কাজ করে আলোকিত। শান্ত, কিন্তু প্রভাবশালী। কুন্দল গ্রামের সেই নিভৃত ঘর থেকে তিনি প্রমাণ করেছেন—নেতৃত্ব মানে উচ্চকণ্ঠ নয়; আদর্শে দৃঢ় থাকা, সমাজে সাহায্য করা।
তিনি চান, দেশে ন্যায়, নীতি ও ইনসাফ কায়েম হোক। মানুষ মরণশীলতা উপলব্ধি করে জীবন পরিচালনা করুক। সৃষ্টিশীল কিছু রেখে যাক, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পাথেয় হবে। তার জীবনগাঁথা শুধু ব্যক্তিগত গল্প নয়; এটি চার দশকের ধর্ম, শিক্ষা, ক্রীড়া, সমাজসেবা ও মানবিকতার ইতিহাস, যা প্রজন্মকে পথ দেখায়।
শেষ কথা
গ্রামের মানুষ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সহপাঠী—সবার মনে তিনি এক মানুষ, যার জন্য নিভৃত সাধনা, ধৈর্য, নিষ্ঠা এবং সৃষ্টিশীলতা সবসময় উদাহরণ হয়ে থাকবে। মোঃ শফিকুল ইসলামের জীবন এক দীপশিখা, যা নিভে না; বরং চার দশকের পথচলা অন্যদের আলোর পথ দেখায়।
নোভা








