ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

ভেস্তে যাচ্ছে সরকারের গৃহপুনর্বাসন প্রকল্প

আবাসন ও আশ্রয়ণে হতদরিদ্রদের মানবেতর জীবনযাপন

মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া, পটুয়াখালী

প্রকাশিত: ১৯:৩৮, ৬ মার্চ ২০২৬

আবাসন ও আশ্রয়ণে হতদরিদ্রদের মানবেতর জীবনযাপন

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি হারানো আশ্রয়হারা হতদরিদ্র মানুষের পুনর্বাসনে সরকারি এবং বেসরকারিভাবে নির্মিত সহস্রাধিক ঘর এখন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। জীর্ণদশার কারণে এসব ঘরে আশ্রিত শত শত পরিবার পুনর্বাসনের ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। অনেকে আবার বেড়িবাঁধের স্লোপে কিংবা এক চিলতে খাস জমিতে ঝুপড়ি তুলে চরম দুর্যোগঝুঁকিতে থাকছেন। পুনর্বাসনের কয়েক শ’ ঘর খালি পড়ে আছে। এমনকি এসব ঘরের টিন-চাল- বেড়া ঝড়োহাওয়ায় উড়ে গেছে। খুঁটিগুলো ক্ষয়ে গেছে। অনেক ঘরের টিন-বেড়া খুলে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। যথাযথ তদারকির অভাব এবং শ্রমজীবী মানুষের জন্য নির্মিত ঘর বর্তমানে বসবাস উপযোগী না থাকায় ছিন্নমূল মানুষের আশ্রয় দেওয়ার উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে। এসব দরিদ্র মানুষগুলোর এখন চরম দুরবস্থা চলছে। করছেন মানবেতর জীবনযাপন। কেউ আবার টাকার বিনিময় অন্যকে ঘর হস্তান্তর করে দিয়েছে। 
এদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সরকারের উদ্যোগে ২০১৩ সালে ৬৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ক্ষুদ্রঋণ সরকারি উদ্যোগে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মাত্র তিনটি আবাসন প্রকল্পের বাসিন্দাদের জন্য প্রায় ২২ লাখ টাকার ঋণ দেওয়া হয়েছে। বাকি প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যাংকে অলস পড়ে ছিল। অথচ এসব পরিবারের সদস্যরা কোনো উপায় না পেয়ে বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়াসুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। করছেন ধারকর্জ। শুধু যথাযথ তদারকির অভাব এবং দরিদ্র মানুষের অসচেতনতায় স্বাবলম্বী করার সরকারের এই যুগান্তকারী উদ্যোগ এখন ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সবশেষ মুজিবর্ষের নামে বিগত সরকারের দেওয়া দুই শতক জমিসহ ঘরগুলোতে কিছু পরিবার থাকলেও ঘরগুলোর অর্ধেক খালি পড়ে আছে। দরিদ্র নয় এমন মানুষকে বরাদ্দ দেওয়ায় এমন অবস্থা হয়েছে। যেন দরিদ্রদের গৃহপুনর্বাসন প্রক্রিয়াটির কোন মনিটরিং ব্যবস্থাই নেই। অসহায় হতদরিদ্র মানুষগুলো এখন যারা আবাসনে থাকছেন তাদের অন্যত্র কোনো যাওয়ার উপায় না থাকায় বাধ্য হয়ে রোদবৃষ্টি উপেক্ষা করে খেয়ে না খেয়ে থাকছেন। কাটাচ্ছেন উপোস কিংবা অর্ধাহারে একেকটা দিন। সরকারের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা থেকেও এসব মানুষগুলো সবসময় উপেক্ষিত থাকছেন। এদের জীর্ণদশার ঘরগুলো দ্রুত মেরামত করা না হলে এরা আবার ঠিকানাহারা হয়ে পড়বেন। মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
প্রকৃতির বুলডোজারখ্যাত ঘূর্ণিঝড় সিডর বিধ্বস্তে মধ্যউপকূলীয় জনপদ কলাপাড়া উপজেলায় ১২ হাজার নয় শ’ পরিবার গৃহহারা হয়ে পড়েন। এসব পরিবারকে আশ্রয়ের জন্য সর্বপ্রথম বিভিন্ন ধরনের আবাসন পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঠিকানাহারা এসব মানুষকে পুনর্বাসনে সরকারিভাবে আবাসন, বিশেষ আবাসন, জাপানি ব্যরাক হাউস, আশ্রায়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন ইউনিয়নে দেড় শতাধিক ব্যরাক হাউস করা হয়। যেখানে প্রায় দুই হাজার পরিবারের আশ্রয়স্থল করা হয়। এছাড়া বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে আরও পাঁচ হাজার পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের সিডর পরবর্তী সময় থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত পুনর্বাসনের কাজ চলতে থাকে। কিন্তু তিন বছর না যেতেই এসব ঘরের ব্যবহার উপযোগিতা নষ্ট হতে থাকে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ের ঘূর্ণিঝড়ে ঘরের টিনের চাল বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। কোথাও আবার স্থানীয় লোকজন খুলে নিয়ে গেছে আবাসন ব্যারাক হাউসের বেড়া কিংবা চাল। প্রভাবশালীসহ যারা আবার ওইসব আবাসনে বসবাস করছে তারা একেকজনে একাধিক ব্যরাক দখল করে গবাদিপশু পালন করছেন। জীর্নদশার আবাসনের ঘরগুলো মেরামত না করায় বাস উপযোগিতা নেই। যার সঙ্গতি আছে সে পলিথিন ছাপড়া ও বেড়া টিন দিয়ে মেরামত করে কোনোমতে থাকছেন। আবার দরিদ্র কর্মজীবী মানুষের কর্মস্থলের অনেক দূরে কিংবা বিরোধীয় খাস জমিতেও দু’একটি আবাসন প্রকল্প করা হয়েছে। মোটকথা কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সরকার ছিন্নমূল শ্রমজীবী মানুষকে আশ্রয়স্থল করে দিলেও সংশ্লিষ্টদের যথাযথ তদারকির অভাবে সকল উদ্দেশ্য চরমভাবে ব্যাহত হয়ে পড়েছে। এসব মানুষকে একটু ঠিকানার জন্য সরকার এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন করেছিল। শুধু আশ্রয়স্থল নয়, আয় বর্ধনমূলক কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ হিসাবে গড়ে তুলে ক্ষুদ্রঋন দেওয়ার প্রক্রিয়াও চালু করা হয়। কিন্তু সবই যেন ভেস্তে  গেছে। অনেককে আজ পর্যন্ত ঘরের দলিলসহ কাগজপত্র দেওয়া হয়নি। সবশেষ মুজিববর্ষের নামে পুনর্বাসনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাতেও হতদরিদ্র মানুষের পরিবর্তে আশ্রয় মিলেছে বহু বিত্তবান মানুষের। ৮৩৯টি ঘরের মধ্যে শতাধিক ঘর এখন খালি পড়ে আছে। 

কলাপাড়ায় গামুরিবুনিয়া আবাসন প্রকল্পের ঘরগুলো বেহাল দশা    -জনকণ্ঠ
অনেকেই থাকছেন না। রয়েছে তালাবদ্ধ। কেউবা অন্যকে ভাড়া দিচ্ছেন। ফলে আশ্রয়হারা মানুষগুলো আবার আশ্রয়হীন হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এসব পুনর্বাসনের বেহালদশার ভয়াবহতার চিত্র। চাকামইয়া ইউনিয়নের গামুরি বুনিয়ায় ২০০৮ সালে এক শ’ পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য ১০টি টিনশেড ব্যারাক করে দেওয়া হয়। মনোরম পরিবেশ। ইউ টাইপে তিনদিকে ব্যারাক হাউস করা হয়। মাঝখানে একটি বিশাল পুকুর রয়েছে। দক্ষিণ দিকে একটি কমিউনিটি সেন্টার ছিল। যেখানে আবাসনে বসবাসকারীদের শিশুরা লেখাপড়া করার সুযোগ সুষ্টি করা হয়েছিল। করা হয়েছিল কমিউনিটি সেন্টার ভবন। পুকুরটিতে সমবায় সমিতির মাধ্যমে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার কথা। কিন্তু এখন সব বেহালদশায়। যেন সব ব্যারাকগুলো জীর্ণদশার বস্তিতে পরিণত হয়েছে। কিছু কিছু স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে। অর্ধেক ঘর কঙ্কালের মতো আয়রণ স্ট্রাকচার পড়ে আছে। তিন নম্বর ব্যারাকের ছয় নম্বর ঘরের বাসিন্দা চার সন্তানের জননী পিয়ারা বেগম জানালেন, ঘরের চাল নাই। পলিথিন টানাইয়া থাকি। সিমেন্টের খুঁটি খুইল্যা পড়ে। বৃষ্টিতে বাইরের আগে ঘরে পানি পড়ে। দরজা-বেড়া ভাঙ্গা। লেট্রিন নাই। খাবার পানি বাইরে থেকে আনতে হয়। স্বামী ভাড়াটে অটোচালক রাসেলের একার উপার্জনে খেয়ে না খেয়ে দিন চলছে তাদের। অধিকাংশ সকালে পান্তাভাত আর পোড়া মরিচ দিয়ে সন্তানদের নিয়ে খেতে হয় বলে জানালেন। গত কোরবানিতে এক টুকরা মাংস পর্যন্ত জোটেনি। জীবনের দূরবস্থায় এখন কাহিল পিয়ারা। জানালেন, সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া নাজমুন নাহার সুমাইয়া সাত কিলোমিটার দূরে কলাপাড়া শহরের গার্লস স্কুলে হেঁটে যায়। বাপের সুযোগ থাকলে কখনো অটোতে যাইতে পারে। নইলে ভোগান্তির শেষ নাই। একটা স্কুল ব্যাগ, একটা গাইড বই একজনে কিনে দিয়েছিল। একই দশা ফাইভে পড়া ফারিয়ার। যেন দুঃখ কষ্টের জীবনে সুখের দেখা মেলে না পিয়ারার। ১৫টি বছরের দশটি বছরই এভাবে কাটছে তার। ঘরটি মেরামত করার জন্য একটু আকুতি পিয়ারার। থাকার কোন জায়গা না থাকায় উপায় না পেয়ে অসহনীয় কষ্টে কাটাচ্ছেন পিয়ারা বেগম।
১০ নম্বর ব্যারাকের সাত নম্বর ঘরের বিধবা শেফালী রাণী জানালেন, ৬০ হাজার টাকার এনজিও লোনের সঙ্গে ২০ হাজার টাকা কর্জ করে গেলবার (আগের বছর) ঘরের চাল কিছুটা ঠিক করেছেন। কোনো উপায় নাই তাই এখনো এখানে থাকছেন। আট নম্বর ব্যারাকের ১০ কক্ষের মর্জিনা বেগমও জানালেন, একই কষ্টের কথা। যেন দুঃখের সাতকাহন এসব হতদরিদ্রদের। দুই নম্বর ব্যারাকের নয় নম্বর কক্ষের ৯৮ বছর বয়সী কাছেম হাওলাদার এখন শয্যাশায়ী। জানালেন দরাজ কণ্ঠে- চালে পলিথিন দিয়াও থাকতে পারি না। বাবা একটা কিছু করেন। একমাত্র কিশোর বয়সী ছেলে নাঈমের উপার্জনের ওপর নির্ভর থাকা বয়োবৃদ্ধ এ মানুষটি জানালেন, তাদের ঘরটি মেরামত কেউ করতে পারেব না? একই আবেদন ৯০ বছর বয়সী আশের্^দ হাওলাদারের। চার নম্বর ব্যারাকের আট নম্বর কক্ষের এই মানুষটিও এখন শয্যাশায়ী। তিন বেলা খাবার তো দূরের কথা চিকিৎসাও চলে না। মানুষটির দুর্দশার যেন শেষ নেই। বয়স্ক ভাতাও জোটেনি তার। গোটা ব্যারাক হাউসগুলোর বাসিন্দাদের কষ্টের ধরন এক। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ কেউ তাঁদের খোঁজ-খবর নেয় না বলে ক্ষুব্ধ মনোভাব পোষণ করলেন সবাই।
সাত নম্বর ব্যরাকের নয় নম্বর কক্ষে থাকছেন রাবেয়া আলফাজ দম্পতি। ৬ নম্বর ব্যারাকের আটটি কক্ষ খালি পড়ে আছে। এসব কক্ষের বেড়ার টিন উধাও হয়ে গেছে। এই ব্যারাকের তিনটি কক্ষ বিধ্বস্ত দশায় রয়েছে। ময়লা আবর্জনায় একাকার হয়ে আছে। আগে গরু থাকত। এভাবে ৬ নম্বর ব্যারাকের ৪টি। ৭ নম্বর ব্যারাকের ৪টি। ৮ নম্বর ব্যারাকের ৩টি। ৯ নম্বর ব্যারাকের ২টি। ১০ নম্বর ব্যারাকের ২টি। ৫ নম্বর ব্যারাকের ৬টি। তিন নম্বর ব্যারাকের ৫টি। দুই নম্বর ব্যারাকের ৬টি। এক নম্বর ব্যারাকের ২টি কক্ষ খালি রয়েছে। এছাড়া অন্তত আরও ১৬টি কক্ষের চাল বেড়া নেই। উপরের আয়রণ স্ট্রাকচার কঙ্কালের মতো পড়ে আছে। এভাবে ১০টি ব্যরাকের অন্তত অর্ধেক কক্ষ এখন আর আবাসনটিতে ব্যবহৃত হয় না। এর মধ্যে আবার অনেকে খালি পজিশন দখলে রেখেছে। এক নম্বর ব্যারাকের সেরাজ হাওলাদার ঘর পাওয়ার দুই বছর পরই অন্যত্র (পূর্ব চাকামইয়া) চলে গেছেন। কিন্তু এখনো খালি স্ট্রাকচার তার দাবি করে অন্য কাউকে থাকতে দিচ্ছেন না। এসব মানুষের সকলের দাবি জীর্ণদশার ঘরগুলো মেরামত করে তাঁদের একটু থাকার উপযোগী করে দেওয়া হোক।
গামুরিবুনিয়া আবাসন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি জামাল হোসেন জানান, বর্তমানে অর্ধেক ঘর খালি আছে। আর সবগুলো মেরামত করা দরকার। এসব ঘরে এখন আর থাকা যায় না। তাদের প্রত্যেককে চালের টিন দেওয়া হলে অন্তত বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে পারতেন। তিনি জানালেন, গামুরিবুনিয়া মৌজায় মনোরম পরিবেশে ছয় একর খাস জমিতে এই আবাসনটি করা হয়। যেখানে ১০টি ব্যারাক করা হয়। প্রত্যেকটি ব্যারাকে দশটি করে কক্ষ রয়েছে। প্রত্যেককে তিন শতক জমিসহ ঘরের মালিকানার দলিল দেওয়ার কথা থাকলেও অনেকের দলিল এখন পর্যন্ত হাতে পৌঁছেনি। তিনদিকে ব্যারাক করা এই আবাসনের মাঝখানে একটি বিরাট দিঘির সাইজের পুকুর রয়েছে। এখন সেখানে মাছের চাষও করতে পারেন না। ঘাটলা দুটি ধসে গেছে। ব্যবহার করতে পারেন না। ঘরের সামনে পুকুর পাড়ের রাস্তাটি কাদামাটির। পাঁচটি টিউবওয়েলের সব কয়টি নষ্ট। পানি ওঠে না। টয়লেটগুলো সব অকেজো। কমিউনিটি সেন্টারটি বিধ্বস্ত দশায় রয়েছে। সামনে অব্যবহৃত জমিতে সবজির আবাদও করতে পারেন না। কবরস্থানের চারদিকে বেড়া দেওয়ার সঙ্গতি নেই। পারেনি মসজিদটি পূর্ণাঙ্গভাবে গড়ে তুলতে। সামনের যোগাযোগের সড়কের কালভার্টটি করা হলেও রাস্তাটি পাকা না করায় বর্ষায় ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে না। নিজেদের চলাচলেও ভোগান্তির শেষ নেই। এসব মানুষগুলো এখন জীবন-জীবিকার চাকা সচল করবেন, না ঘর মেরামত করবেন। কোনটাই পারছেন না। নেই তাদের কোনো আর্থিক সঙ্গতি। একই অবস্থা চর ধুলাসারের দুটি ব্যারাকের ২০টি কক্ষের, মাত্র ৭টিতে লোকজন থাকছে। বাকিসব খালি রয়েছে। চরচাপলীর তিনটি ব্যারাকের ৩০টি কক্ষের ২৪টি খালি পড়ে আছে। একটি ব্যারাকের চাল-বেড়া খুলে নেওয়া হয়েছে। আইয়মপাড়া গ্রামের আবাসনের ব্যরাকটিতে বসবাসকারীদের আনুষ্ঠানিকভাবে ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। অথচ এরই মধ্যে ব্যারাকের টিন চাল জীর্ণদশায় বিধ্বস্ত হয়ে আছে। লোহার এ্যাঙ্গেলগুলো ভেঙ্গে গেছে। বৃষ্টি হলেই পানি পড়ছে। সামনের টয়লেট ব্যবহার করা যায় না। মেলাপাড়া গ্রামের আবাসনটি করা হয়েছে নয় বছর আগে। অথচ অধিকাংশ ঘরের বেড়া কিংবা চালের টিন নষ্ট হয়ে গেছে। নদীরপাড়ে হওয়ায় জোয়ারের পানিতে ডুবে যায়। সাফাখালীর ১০ কক্ষের ব্যারাকটি কঙ্কালের মতো পড়ে আছে। সেখানেই কোনো উপায় না থাকায় মাত্র একটি পরিবার পলিথিন দিয়ে থাকছেন। হাজীপুরের ব্যারাকটির অস্তিত্ব নেই বলা যায়।
সবচেয়ে বড় আবাসন প্রকল্প রয়েছে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের নীলগঞ্জ গ্রামের নদীর পাড়ে। এখানে ২৮টি ব্যারাকে ২৮০টি পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। কলাপাড়া শহরের উল্টোদিকে হওয়ায় এখানে সবচেয়ে বেশি শ্রমজীবী মানুষ বাস করছেন। এসব পরিবারের সদস্যদের সমবায়ের উদ্যোগে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দেওয়া হয়েছে ক্ষুদ্রঋণ। কিন্তু কোনটাই সফলতায় পৌঁছেনি। ঘরগুলো জীর্ণ হয়ে গেছে। বেড়া, চাল সব জীর্ণদশায়। যে যার মতো কোনমতে মেরামত করে থাকছেন। যাদেরকে ঘর দেওয়া হয়েছে তাদের অনেকে আবার এই ঘর টাকার বিনিময়ে অন্যত্র বিক্রি করে দিয়েছে। টয়লেট নেই। টিউবওয়েল নেই। চলাচলের রাস্তাটি পর্যন্ত মেরামত করা হয় না। আবার অতিরিক্ত জলোচ্ছ্বাসে জোয়ারের পানিতে কখনো ডুবে যায়। আবার আবাসন এলাকার পুকুর, কিছু জমি দখল হয়ে গেছে। এখন এই আবাসনে বসবাসের উপযোগী নেই অধিকাংশ ঘরগুলো। মানুষের দুর্ভোগ চরমে। কর্মজীবী মানুষগুলো নিতান্ত দায় ঠেকে এখানে বসবাস করছেন। জানালেন বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক, নির্বাচন আসলে সবাই বলে সব ঠিক করে দেবেন। কিন্তু কেউ কিছু করে না। আবার সরকারিভাবে এসব ঘরগুলো মেরামত করার কোন ব্যবস্থাও করা হয় না।
সবচেয়ে বেশি বেহাল দশা চালিতা বুনিয়া আবাসনের। এখানে ১০টি ব্যারাকের এক শ’ কক্ষের মধ্যে মাত্র নয়টিতে লোক বসবাস করছেন। বাকিসব খালি পড়ে আছে। খালি ঘরগুলো এখন গোয়ালঘরে পরিণত হয়েছে। বেড়া টিন উধাও হয়ে গেছে। চর ধুলাসার আবাসনের বাসিন্দা স্বামী পরিত্যাক্তা রাণী বেগম জানালেন, তাদের কোন ধরনের সহায়তা দেওয়া হয় না। ব্যরাক হাউসটির আশপাশে তাদের কাউকে নামতে দেয়া হয় না। হাঁস-মুরগি পালন করতে পারেন না। গবাদি পশু পালনের সুযোগ নেই। আশপাশের জমির মালিকরা তাঁদেরকে মানুষ বলে মনে করেন না। সংযোগ সড়ক নেই। লেট্রিনগুলো ভেঙ্গে গেছে। একটি টিউবওয়েল নষ্ট হয়ে গেছে। কর্মসংস্থানও নেই। দুটি ব্যারাকের নয়টি ঘর খালি পড়ে আছে। একইদশা চাকামইয়া নিশান বাড়িয়া, খাজুরা, ফাঁসিপাড়া, পাখিমারা গুচ্ছ গ্রামের, আনিপাড়া, লেমুপাড়া, লোন্দা, ছোট বালিয়াতলী, তেগাছিয়া, ফতেহপুর আশ্রয়ণ কিংবা আদর্শ গ্রামের। মোটকথা আবাসন, আশ্রয়ণ কিংবা আদর্শ গ্রাম সবগুলোর এখন চরম বেহালদশা। বসবাস উপযোগিতা নেই। এসব প্রকল্প সরকারি অর্থায়নে করা হয়েছে। এসব আবাসনের বাসিন্দাদের দাবি তাদের ঘরগুলো দ্রুত মেরামত করে দেওয়া হোক। যারা ঘর ব্যবহার করছে না তাদের নাম বরাদ্দ বাতিল করে প্রকৃত ভূমিহীনকে বরাদ্দ দেওয়া হোক। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হোক।
এছাড়াও সিডর পরবর্তী সময়ে সৌদি সরকারের সহায়তা ১৫৪০টি পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ব্রিটিশ রেডক্রিস্টে ৭৫২টি, স্পিড ট্রাস্ট এক হাজার, ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল ৬০০, সোস্যাল এসিসট্যান্স ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ৪৫টি, উরমাতা বাংলাদেশ ৯৪টি, ব্র্যাক ৩০টি, লায়ন্স ক্লাব ৩০টি, গ্রুপ থিয়েটার বাংলাদেশ ২০টি, অরকা রাজশাহী ৮০টি, ফ্রেন্ডশীপ ৪৯টি, কারিতাস ৬০০টি, স্পিড ট্রাস্ট (একশন এইড) ৮৪টি, প্রথম আলো একটি পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেয়। কিন্তু এসব ঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে গেছে। শতকরা ৯০টির কোন অস্তিত্ব নেই। কুয়াকাটার মাঝিবাড়ি এলাকার অর্কা পল্লীর বাসীন্দারা জানান, সিডর পরবর্তী তাদেরকে পুনর্বাসনের পর থেকে আজ পর্যন্ত কেউ কোন ধরনের সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। ঘরগুলো চরম জীর্ণ দশায় রয়েছে। খাজুরা আবাসনটির অর্ধেক নদীতে চলে গেছে। বাকিটাও ভাঙনের শঙ্কায় রয়েছে।
আবার গৃহহারাদের তালিকায় অনিয়মের কারণে প্রভাবশালী লোকজন এসব ঘর বরাদ্দ নিয়ে অন্যত্র বিক্রি করে দিয়েছে। বহু ঘরের শুধু খুঁটি পড়ে আছে। বিভিন্ন সময় মহাসেনসহ অন্যসব দুর্যোগে এসব ঘর বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। নীলগঞ্জের হাজিপুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। বেড়িবাঁধের আবাসনের ব্যারাকটি চেনার উপায় নেই।

কলাপাড়ায় গামুরিবুনিয়া আবাসন প্রকল্পের ঘরগুলো বসবাসের অযোগ্য    -জনকণ্ঠ
সরকারি হিসাবে কলাপাড়ায় অন্তত ১৭০টি ব্যারাক হাউস করা হয়েছে। এছাড়া গুচ্ছ গ্রাম ও আদর্শ গ্রাম করা হয়েছে আরও দশটি। যেখানে কমপক্ষে দুই হাজার পরিবারের আবাসস্থল করা হয়েছে। এরমধ্যে প্রায় দেড় হাজার পরিবার বসবাস করছেন। কিন্তু কাগজপত্রে রেজিস্ট্রির মাধ্যমে প্রায় ৫০০ পরিবারকে ঘর হস্তান্তর করা হয়েছে।  এগুলো ছাড়াও রাখাইনদের জন্য তিনটি বিশেষ আবাসন করা হয়েছে। যেখানে ৫৭টি পরিবার বসবাস করছেন। বর্তমানে এসব আবাসনের বাস্তব চিত্র কী তা খোদ সরকারি প্রশাসন সঠিকভাবে জানাতে পারেনি। তবে আশ্রিতদের অর্ধেক পরিবার বসবাস করতে পারছেন না। এক কথায় চরম বেহালদশা আবাসন প্রকল্পের। যারা কোন উপায় না পেয়ে এখনও বসবাস করছেন তারা সকল সুবিধার বাইরে রয়েছেন। এসব হতদরিদ্র পরিবারের মাঁথা গোজার ঠাই মিললেও বর্তমানে তা আবার হারানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আশ্রিত পরিবারের সন্তানের জন্য লেখা পড়ার সহজ সুযোগ নেই। এছাড়া কর্মসংস্থান সহায়ক কোন কিছুই নেই। বাসিন্দাদের অভিযোগ, আবাসন প্রকল্পের যথাযথ তদারকি এবং সরকারের দায়িত্ব প্রাপ্তদের পৃষ্ঠপোষকতা নেই। উপজেলা সমবায় অফিসের দেয়া তথ্যানুসারে কয়েকটি আবাসন প্রকল্পের দরিদ্র মানুষের জন্য ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালু রয়েছে। তাদের দাবি বাকিসব আশ্রয়ণের বাসিন্দাদেরকে নির্মাণ করা ঘর ভূমি অফিস থেকে মালিকানার দলিলের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। তাই ওইসব মানুষকে ঋণ প্রোগ্রামের আওতায় আনা যাচ্ছে না। সবশেষ মুজিববর্ষের নামে গৃহহীন-ভূমিহীন প্রত্যেক পরিবারকে একক গৃহনির্মাণের মাধ্যমে পুনর্বাসন প্রকল্পের মাধ্যমে চার পর্যায়ে দুই শতক জমিসহ আলাদাভাবে ৮৩৯ টি পরিবারকে সেমিপাকা ঘর দেওয়া হয়েছে। এখানে ঘর বরাদ্দের তালিকা তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বেড়িবাঁধের বাইরে ঘর দেওয়ায় অনেকে জলোচ্ছ্বাসকালে সমস্যায় পড়ছেন। বালিয়াতলী সেতুর ডান দিকের পুনর্বাসন পল্লীতে গিয়ে দেখা গেছে এক তৃতীয়াংশ ঘরে তালাবদ্ধ রয়েছে। প্রকৃত ভূমিহীন, গৃহহীনদের ঘর না দেওয়ায় এমনটা হয়েছে। আবার তালিকা তৈরিতে ইউনিয়ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে উপকার ভোগীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারপরও এই ঘরগুলোতে প্রকৃত ভূমিহীন যারা রয়েছেন। তারা স্বস্তিতে রয়েছেন বলে জানান আশ্রীতরা। উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ জানান, যদি বরাদ্দ পাওয়া যায় কিংবা সুযোগ থাকে তবে আবাসনের জীর্নদশার স্থাপনাগুলো মেরামত করা হবে। তবে এই মুহূর্তে তেমন সুযোগ নেই। এছাড়া মুজিবর্ষের নামে যে ঘর দেওয়া হয়েছে এটা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে চারটির বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সবগুলো যাচাইবাছাই কওে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানালেন তিনি।

 

প্যানেল/মো.

×