মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উন্মুক্ত আঙিনায় অনুষ্ঠিত বসন্ত উৎসবের বর্ণিল পরিবেশনা। ছবি: জনকণ্ঠ।
প্রকৃতিতে আজ নবপ্রাণের স্পন্দন। বসন্তের রঙিন ছোঁয়ায় চারদিক যেন নতুন করে জেগে উঠেছে। কচি পাতার কোমল সবুজ, আগুনরাঙা শিমুল ও পলাশের শোভা আর দখিনা হাওয়ার মৃদু হিল্লোলে প্রকৃতি আজ জীবনের জয়গান গাইছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়—“আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো, আজি ভুলিয়ো আপন পর ভুলিয়ো, এই সংগীতমুখরিত গগনে তব গন্ধ তরঙ্গিয়া তুলিয়ো।”
আজ পয়লা ফাল্গুন, বাঙালির প্রাণের ঋতু বসন্তের প্রথম দিন। মাঘের শেষ বিকেলের যে হিমেল পরশটুকু অবশিষ্ট ছিল, ভোরের সূর্যের সোনালি স্পর্শে তা নিমেষেই মিলিয়ে গেছে। মহানগরের ইট-পাথরের ধূসরতা ছাপিয়ে রাজপথ আজ বাসন্তী রঙে মুখর। তরুণীদের পরনে হলুদ ও কমলা শাড়ি, মাথায় গাঁদা ফুলের মুকুট; আর তরুণদের রঙিন পাঞ্জাবি বা ফতুয়া—এই পোশাকি বৈচিত্র্য যান্ত্রিক ঢাকাকে মুহূর্তেই এক উৎসবের নগরীতে বদলে দিয়েছে।
এ বছর পয়লা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবস একই দিনে পড়ায় উৎসবের আমেজে যুক্ত হয়েছে বাড়তি উচ্ছ্বাস। চিরাচরিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের পরিবর্তে এবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে সীমিত পরিসরে আয়োজন করা হয়েছে বসন্ত উৎসব। স্থান বদলালেও বাঙালির প্রাণের এই উদযাপনে আনন্দের কোনো ঘাটতি নেই।
বসন্ত মানেই জড়তা ঝেড়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। রুক্ষ মাটির বুক চিরে যেমন নবতৃণ মাথা তোলে, তেমনি মানুষের মন থেকেও ক্লান্তি আর বিষাদ সরে যায়। গ্রামবাংলায় এ ঋতুর রূপ আরও নিবিড়—আম্রকুঞ্জে মুকুলের ঘ্রাণ আর রক্তকাঞ্চনের গাঢ় রঙে প্রকৃতি যেন এক মায়াবী উৎসবে মেতে ওঠে। রাজধানীর ‘ফুসফুস’খ্যাত রমনা পার্কে গেলে এখনো চোখে পড়ে গামারি ও উদালের উচ্ছ্বাস। কোকিলের কুহুতান আর বাতাসের মৃদু উষ্ণতা জানিয়ে দেয়—শীতের রিক্ততা ফুরিয়েছে।
ফাল্গুনের এই উদ্দামতা যখন ধীরে ধীরে চৈত্রে গড়ায়, তখন প্রকৃতির রূপ কিছুটা শান্ত ও ধীর হয়ে আসে। রোদ বাড়ে, মাঠের মাটি তৃষ্ণার্ত হয়, ঝরাপাতার মচমচ শব্দে মিশে থাকে এক ধরণের উদাসীন সৌন্দর্য। তবে এই শুষ্কতাও আসলে নতুনেরই প্রস্তুতি; চৈত্রসংক্রান্তির মাধ্যমে পুরোনো বছরের গ্লানি ধুয়ে মুছে নতুনকে বরণ করে নেওয়ার এক মহালগ্ন।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে আজ ঋতুচক্র কিছুটা বিপর্যস্ত, নগরায়নের ভিড়ে শিমুল-পলাশও হয়তো কমে আসছে; তবু ঋতুরাজ প্রতিবছর ফিরে আসে আমাদের পুনর্জন্মের বার্তা দিতে। পয়লা ফাল্গুন তাই কেবল ফুলের উৎসব নয়—এটি আশা, প্রেম ও নবজাগরণের দিন। হৃদয় খুলে এই অফুরান প্রাণশক্তিকে গ্রহণ করারই মাহেন্দ্রক্ষণ আজ।🌼
এম.কে








