বাংলাদেশ একটি চিরসবুজ ব-দ্বীপ, যার প্রাণভোমরা হলো কৃষি। জাতীয় জিডিপিতে কৃষির অবদান প্রায় ১২ শতাংশ এবং দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমশক্তি সরাসরি এই মাটির সঙ্গে মিশে আছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষির সংজ্ঞা পাল্টাচ্ছে। এক সময় কৃষি ছিল কেবলই ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যম, কিন্তু আজ তা ব্যবসা, প্রযুক্তি এবং পর্যটনের এক অনন্য সংমিশ্রণে পরিণত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে এখন ‘এগ্রি-ট্যুরিজম’ বা কৃষি পর্যটনের জয়জয়কার। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে প্রতি বছর ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে এবং শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, সেখানে কৃষি পর্যটন কেবল একটি বিনোদন মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি টেকসই অর্থনৈতিক বিপ্লবের নাম। এটি এমন এক নতুন দিগন্ত, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি তরুণদের ‘চাকরিপ্রার্থী’ থেকে ‘চাকরিদাতা’ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
কৃষি পর্যটন হলো এমন একটি অভিজ্ঞতা যেখানে একজন পর্যটক যান্ত্রিক শহর ছেড়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কোনো সচল খামারে সময় কাটান। এখানে পর্যটক কেবল দর্শক নন, বরং অংশীজন। তিনি নিজ হাতে গাছ থেকে আম পাড়েন, খেত থেকে সবজি তোলেন, কিংবা নাঙল চালানোর অভিজ্ঞতা নেন। এই অংশগ্রহণমূলক পর্যটন পর্যটকের মনে প্রশান্তি দেয় এবং কৃষকের পকেটে বাড়তি অর্থ যোগায়।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এই মডেল ব্যবহার করে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। ইতালিতে ‘এগ্রিটুরিজমো’ (Agritourism) আইনের মাধ্যমে গ্রামীণ খামারগুলোকে পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে, যা তাদের মৃতপ্রায় গ্রামগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। জাপানের ‘এডু-ট্যুরিজম’ মডেলে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের খামারে গিয়ে হাতে-কলমে চাষাবাদ শেখা প্রায় বাধ্যতামূলক, যা শিশুদের মাটির সঙ্গে শৈশবেই পরিচয় করিয়ে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও বা আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির মতো ল্যান্ড-গ্র্যান্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিশাল খামারকে একাধারে গবেষণাগার এবং পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে ধানখেত বা সবজি বাগানকে যেভাবে শৈল্পিক রূপ দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণ করা হয়, তা আমাদের জন্য বড় একটি শিক্ষার জায়গা হতে পারে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য কৃষি পর্যটনের জন্য স্বর্গরাজ্য। উত্তরের জেলা রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম ও লিচু বাগানগুলো কেবল ফলের জোগানদার নয়, এগুলো হতে পারে বিশাল পর্যটন স্পট। আম পাকার মৌসুমে সেখানে ‘ম্যাংগো ফেস্টিভ্যাল’ আয়োজন করে পর্যটকদের বাগানবাড়িতে থাকার ব্যবস্থা (Farm-stay) করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে।
অন্যদিকে, সিলেটের দিগন্তজোড়া চা বাগানগুলো ঐতিহাসিকভাবেই পর্যটনসমৃদ্ধ। তবে সেখানে ‘টি-ট্যুরিজম’ বা চা পর্যটনকে আরও গভীরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। পর্যটকরা চা শ্রমিকদের সঙ্গে চা পাতা তোলার অভিজ্ঞতা নেওয়া থেকে শুরু করে কারখানায় চা তৈরির প্রক্রিয়া সরাসরি দেখার সুযোগ পেলে তা উচ্চমূল্যের পর্যটন হিসেবে গণ্য হবে। ঝিনাইদহ ও যশোরে গড়ে ওঠা আধুনিক ড্রাগন ফলের খামারগুলো
আমাদের কৃষি বিপ্লবের নতুন মুখ। বিশেষ করে রাতে যখন ড্রাগন বাগানে কৃত্রিম আলো জ্বলে ওঠে, তখন সেই দৃশ্য পর্যটকদের কাছে জাদুর মতো মনে হয়। এটি হতে পারে ‘এগ্রি-টেক’ ট্যুরিজমের অনন্য উদাহরণ। বরিশাল ও ঝালকাঠির ভাসমান পেয়ারা বাজার বা ভিমরুলির খালগুলো ইতোমধ্যে পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তবে একে আরও পরিকল্পিত রূপ দিয়ে ‘অ্যাকুয়াটিক এগ্রি-ট্যুরিজম’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা সময়ের দাবি।
বাংলাদেশে কৃষি শিক্ষার প্রসার ঘটলেও পর্যটনের সঙ্গে এর সংযোগ এখনো কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ। আমাদের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে (যেমন- বাকৃবি, শেকৃবি বা গ্রাকৃবি) ‘কৃষি পর্যটন’ বিষয়টিকে একটি স্বতন্ত্র ক্রেডিট কোর্স হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এখন অপরিহার্য। বিশেষ করে কৃষি সম্প্রসারণ (Agricultural Extension) বিভাগের অধীনে একটি বিশেষায়িত কোর্স হিসেবে এটি পড়ানো যেতে পারে। এখানে শিক্ষার্থীরা কেবল ফসল ফলানো শিখবে না, বরং শিখবে কীভাবে একটি খামারকে পর্যটনবান্ধব করতে হয়, কীভাবে আতিথেয়তা (Hospitality) প্রদান করতে হয় এবং কীভাবে আধুনিক বিপণন কৌশলে শহর ও গ্রামের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে হয়।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) বা ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (BRRI) বিশাল এলাকাগুলোতে নিয়ন্ত্রিত ‘এডুকেশনাল ট্যুর’ চালু করা যেতে পারে। আমাদের গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীরা সেখানে ‘গাইড-কাম-ইন্সট্রাক্টর’ হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেতে পারে। এতে তাদের যেমন কর্মসংস্থান হবে, তেমনি সাধারণ মানুষও কৃষি গবেষণার আধুনিক দিকগুলো সম্পর্কে জানতে পারবে। এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের কৃষি পাঠ্যক্রমে ‘খামার ভ্রমণ’কে ব্যবহারিক অংশ হিসেবে বাধ্যতামূলক করা উচিত। যখন একজন শিক্ষার্থী সরাসরি একটি আধুনিক ডেইরি ফার্ম বা হাইড্রোপনিক খামার ঘুরে দেখবে, তখন তার মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দানা বাঁধবে।
কৃষি পর্যটন খাতটি একটি ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ বা বহুমাত্রিক প্রভাব তৈরি করে। একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে যখন একটি কৃষি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠে, তখন কেবল সেই খামারের মালিক লাভবান হন না। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় আরও অনেকগুলো খাত :
পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য স্থানীয় অটো-রিক্সা, নৌকা বা মাইক্রোবাস চালকদের কাজের সুযোগ বাড়ে।
স্থানীয়ভাবে হোম-স্টে বা ছোট ছোট রেস্তরাঁ গড়ে ওঠে, যেখানে গ্রামের মা-বোনেরা দেশি খাবারের স্বাদ পর্যটকদের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। পর্যটকরা সাধারণত ফেরার পথে স্থানীয় হস্তশিল্প বা খাঁটি কৃষি পণ্য (যেমন- মধু, ঘি, চাল) কিনে নিয়ে যান, যা স্থানীয় কারিগরদের শিক্ষিত তরুণরা যারা ইন্টারনেটে দক্ষ, তারা এই খামারগুলোর ব্র্যান্ডিং, সোশ্যাল মিডিয়া প্রমোশন এবং অনলাইন বুকিং ব্যবস্থা পরিচালনা করে ঘরে বসেই স্মার্ট ক্যারিয়ার গড়তে পারেন।
এতসব সম্ভাবনা সত্ত্বেও বাংলাদেশে কৃষি পর্যটন এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এর প্রধান কারণ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব। প্রত্যন্ত অঞ্চলের খামারগুলোতে যাওয়ার রাস্তাঘাট এখনো অনেক ক্ষেত্রে পর্যটন উপযোগী নয়। এছাড়া নিরাপত্তার অভাব এবং পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাবে অনেক উদ্যোগ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে।
এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে একটি শক্তিশালী ‘জাতীয় কৃষি পর্যটন নীতিমালা’ প্রণয়ন করা জরুরি। কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পর্যটন করপোরেশনকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে এই খাতে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে ‘গ্রিন লোন’ বা ‘এগ্রি-এন্টারপ্রেনার লোন’ প্রদান করতে হবে। এছাড়া জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেম (NARS) ও BARC এর কৃষি তথ্য কেন্দ্র (AIC)-এর মাধ্যমে একটি ডিজিটাল ‘এগ্রি-ট্যুরিজম ম্যাপ’ তৈরি করা যেতে পারে। যেখানে পর্যটকরা সহজেই জানতে পারবেন বছরের কোন সময়ে কোন এলাকায় যেতে হবে (যেমন- শীতের সরিষা খেত, বসন্তের মৌয়ালদের মধু সংগ্রহ বা বর্ষার ভাসমান বাজার)।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে কৃষিকে কেবল মাটি আর ঘামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আমাদের প্রযুক্তি ও পর্যটনকে যুক্ত করে কৃষিকে করতে হবে গ্ল্যামারাস এবং লাভজনক। শিক্ষিত তরুণরা যখন দেখবে যে টাই-কোট পরে ল্যাপটপ হাতে নিয়েও সফলভাবে খামার পরিচালনা করা সম্ভব, তখনই তারা মাটির দিকে ফিরে আসবে।
কৃষি পর্যটন কেবল বেকারত্ব নিরসনের উপায় নয়, এটি আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার একটি জানালা। এর মাধ্যমেই সম্ভব হবে দারিদ্র্যমুক্ত, কর্মসংস্থান সমৃদ্ধ একটি ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ে তোলা। লাঙল-জোয়ালের সেই চিরায়ত ঐতিহ্যকে লালন করে যখন আমরা আধুনিক পর্যটনের দিকে এগোবো, তখনই বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম হয়ে উঠবে এক একটি ছোট অর্থনৈতিক জোন। আর সেই দিনটি খুব বেশি দূরে নয়, যখন কৃষি হবে আমাদের গর্ব আর পর্যটন হবে অর্থনীতির মূল শক্তি।
লেখক : পরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, ফার্মগেট
[email protected]
প্যানেল/মো.








