ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

তৃণমূলের ক্ষমতায়ন ও আগামীর নেতৃত্ব: একটি প্রস্তাবিত রোডম্যাপ 

মাহাদী-উল-মোর্শেদ

প্রকাশিত: ২২:১৩, ১৩ মার্চ ২০২৬

তৃণমূলের ক্ষমতায়ন ও আগামীর নেতৃত্ব: একটি প্রস্তাবিত রোডম্যাপ 

ছবি: সংগৃহীত

একটি আদর্শ রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠনের প্রাণশক্তি লুকিয়ে থাকে তার তৃণমূলের কর্মীদের মাঝে। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা প্রায়ই দেখি, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আবেগ বা প্রত্যাশার প্রতিফলন খুব একটা ঘটে না। অনেক সময় যোগ্য নেতারা কেবল সঠিক প্রক্রিয়ার অভাবে আড়ালে পড়ে যান। এই অচলায়তন ভাঙতে এবং নেতৃত্বকে সরাসরি তৃণমূলের দায়বদ্ধতার জায়গায় নিয়ে আসতে আসন্ন সম্মেলনকে কেন্দ্র করে একটি নতুন ও স্বচ্ছ নির্বাচনী মডেলের কথা বলার চেষ্টা করছি। এই মডেলের মূল লক্ষ্য হলো নেতৃত্ব আর ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত হবে না, বরং তা হবে নিচ থেকে উঠে আসা একটি জনদাবি।

প্রস্তাবিত এই মডেলটি মূলত দুই স্তরের একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। প্রথম স্তরে প্রতিযোগীতা হবে প্রতিটি বিভাগের নিজস্ব আঙিনায়। দেশের ৮টি বিভাগে আলাদা আলাদা বিভাগীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে জেলা, মহানগর কিংবা বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর যেসব লড়াকু প্রাণ নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী, তারা প্রার্থী হিসেবে নিজেদের নাম ঘোষণা করবেন। ভোট দেবেন ওই বিভাগেরই তৃণমূল প্রতিনিধিরা। গোপন ব্যালটে স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিটি বিভাগ থেকে শীর্ষ ৫ জন নেতাকে 'ফাইনালিস্ট' হিসেবে বেছে নেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়ায় ৮টি বিভাগ থেকে উঠে আসা ৪০ জন নেতাকে নিয়ে হবে আমাদের কেন্দ্রীয় প্যানেল। এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো কেন্দ্রীয় প্যানেলে যাওয়ার আগে প্রত্যেক নেতাকে তার নিজ অঞ্চলের কর্মীদের আস্থার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এতে লবিং নির্ভর নেতৃত্বের বদলে মাঠের নেতারা সামনে আসার সুযোগ পাবেন।

দ্বিতীয় স্তরটি হবে রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত কেন্দ্রীয় মহাসম্মেলন। এই সম্মেলনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন সারা দেশের ইউনিটের প্রধান চালিকাশক্তি বা 'সুপার ফাইভ' নেতারা। একটি ইউনিটের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে সাংগঠনিক, দপ্তর ও প্রচার সম্পাদক যারা দিনরাত সংগঠনের ঝাণ্ডা ধরে রাখেন, তারাই হবেন চূড়ান্ত ভোটার। ঢাকার মঞ্চে উপস্থিত কয়েক হাজার তৃণমূল নেতার সরাসরি ভোটে এই ৪০ জন ফাইনালিস্টের মধ্য থেকে কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন। বাকি প্রার্থীরা তাদের মেধা ও প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন সম্পাদকীয় পদে আসীন হবেন। 

এর ফলে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের একক আধিপত্য থাকবে না; বরং উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম সারা বাংলার এক সুষম প্রতিফলন ঘটবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে।

পুরো প্রক্রিয়াটিকে জালিয়াতিমুক্ত রাখতে ডিজিটাল ডাটাবেজ ব্যবহার করা হবে, যেখানে প্রত্যেক 'সুপার ফাইভ' ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া ভোটারদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তার জন্য ফাইনালিস্টদের বিগত দিনের লড়াই ও ত্যাগের ইতিহাস উন্মুক্ত রাখা হবে। আমরা বিশ্বাস করি, ৫ সপ্তাহের একটি সুশৃঙ্খল কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমেই সংগঠনের চেহারা বদলে দেওয়া সম্ভব। যখন একজন মাঠের কর্মী জানবেন যে তার ভোটেই কেন্দ্রীয় অভিভাবক নির্বাচিত হচ্ছেন, তখন সংগঠনের প্রতি তার মালিকানা আর মমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে। এভাবেই আমরা একটি বৈষম্যহীন, শক্তিশালী এবং সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সংগঠন গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখি, যেখানে প্রতিটি ভোট হবে এক একটি পরিবর্তনের কারিগর।

লেখক: মাহাদী-উল-মোর্শেদ
পলিসি এনালিস্ট ও গবেষক

এফএ

×