ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩

মতামত

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

বাংলাদেশ এখন এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জনম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের প্রথম ২৫ দিনে বেশ কিছু সাহসী ও ‘স্মার্ট মুভ’ গ্রহণ করেছে। এই যাত্রার মূলে রয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উৎপাদনমুখী রাজনীতি এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপোসহীন সংগ্রামের আদর্শিক সেতুবন্ধন। বর্তমান রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান এই উত্তরাধিকারকে ধারণ করে আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তা জনগণের মধ্যে যেমন আশার সঞ্চার করেছে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ ও বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরিচয় ছিল একজন ‘মাঠের মানুষ’ হিসেবে। সাধারণ পোশাকে কৃষকের সঙ্গে খাল কাটা বা অজপাড়া গাঁয়ে হেঁটে বেড়ানো জিয়ার সেই ছবিগুলো আজও গ্রামীণ জনপদে জনপ্রিয়। তারেক রহমান যখন প্রটোকল ভেঙে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশছেন, তখন অবচেতনেই মানুষ তাঁর মধ্যে জিয়ার সেই ছায়া খুঁজে পাচ্ছে। গত দেড় দশকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তারেক রহমানের ব্যাপারে যে নেতিবাচক বয়ান তৈরির চেষ্টা করেছিল, তাঁর বর্তমান আড়ম্বরহীন চলাফেরা সেই প্রচারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে। বিদেশের বিলাসিতা ছেড়ে দেশে ফিরে এসে তৃণমূল মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা শোনা এবং সাধারণ জীবনযাপন তাঁর সম্পর্কে জনমনে একটি ‘নতুন ইতিবাচক উপলব্ধি’ তৈরি করেছে। মানুষ তাকে এখন একজন পরিণত ও সংবেদনশীল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেখছে। সাধারণত বাংলাদেশের রাজনীতিতে শীর্ষ নেতাদের কাছে পৌঁছাতে হলে দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক বা দলীয় স্তরের বাধা পার হতে হয়। তারেক রহমান সরাসরি জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে এই ‘দেয়াল’ ভেঙে দিয়েছেন। এর ফলে তৃণমূলের প্রকৃত সমস্যাগুলো কোনো ফিল্টার ছাড়াই তাঁর কাছে পৌঁছাচ্ছে। দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে জবাবদিহি ভয় তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে, সরকার তাদের কথা শুনছে, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বড় একটি প্রাপ্তি। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ‘প্রটোকল-নির্ভর’ বা ‘রাজকীয়’ নেতৃত্বের চেয়ে ‘অ্যাক্সেসিবল’ বা সহজলভ্য নেতৃত্ব পছন্দ করে। তারেক রহমান যেভাবে সাধারণ পোশাকে, সরাসরি মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন, তা তরুণদের কাছে তাকে একজন আধুনিক ও প্রগতিশীল নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। এটি কেবল আবেগ নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত কৌশলগত নেতৃত্ব (Strategic Leadership)। আড়ম্বরহীন জীবন যাপনের মাধ্যমে তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা দিচ্ছেনÑ ক্ষমতা মানে ভোগবিলাস নয়, বরং ত্যাগ। যখন শীর্ষ নেতা নিজে মিতব্যয়ী হন, তখন নিচের স্তরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার করার প্রবণতা কমে আসে। এটি বর্তমান সরকারের ‘দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন’ গড়ার লক্ষ্যের সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। গণভোটের মাধ্যমে প্রাপ্ত বিশাল জনম্যান্ডেটকে ভিত্তি করে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে সরকার দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই সনদ কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং ছাত্র-জনতার বিপ্লবের রক্তাত আকাক্সক্ষার এক আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা। গত ২৪ দিনের কার্যক্রমে দেখা গেছে, জুলাই সনদের আলোকে প্রশাসনকে আমূল সংস্কার, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং জুলাই হত্যাকা-ের প্রতিটি ঘটনার স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

মতামত বিভাগের সব খবর

চাঁনরাতের মিলনমেলা

চাঁনরাতের মিলনমেলা

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার মতোই উৎসব উদ্যাপনের ধরনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। ঈদ মূলত একটি পারিবারিক ও সামাজিক মিলনের উৎসব। কিন্তু বর্তমান সময়ে সব পরিবারের সদস্যকে একত্র করা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। বাংলাদেশের অনেক পরিবারের সদস্য জীবিকার তাগিদে প্রবাসে বসবাস করেন। তবে ‘আকাশ সংস্কৃতি’ বা আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এই দূরত্ব অনেকটাই কমে এসেছে। এখন ঈদের দিনে ভিডিও কলে আলাপ-আলোচনা, কুশল বিনিময়, এমনকি সালামি আদান-প্রদানও অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। বর্তমানে ঈদের কেনাকাটায় অনলাইন ও অফলাইন উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। তবে অনলাইন শপিং মানুষের এই ব্যস্ততার মধ্যে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। শুধু কেনাকাটাই নয়, প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে ঈদযাত্রাও আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়ে উঠেছে। আগে স্টেশন বা বাস কাউন্টারে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটার যে ভোগান্তি ছিল, এখন অনলাইনের মাধ্যমে তা অনেকটাই কমে গেছে। তবুও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, এই প্রযুক্তি যেন আমাদের বাস্তব অনুভূতি ও আন্তরিক সম্পর্কগুলোকে ম্লান করে না দেয়। একসময় ঈদের আগের রাতে চাঁদ দেখার জন্য সবার মধ্যে এক অন্যরকম উচ্ছ্বাস ও ব্যাকুলতা কাজ করত। ‘চাঁদ রাত’ ছিল আনন্দ ও প্রত্যাশায় ভরা এক বিশেষ মুহূর্ত। কিন্তু এখন আর আগের মতো সেই আমেজ বা শোরগোল তেমন দেখা যায় না। আগে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নতুন জামা পরে ঈদের দিন পাড়ার মেঠো রাস্তায় ঘুরে বেড়াত, হাসি-আনন্দে ভরে উঠত চারপাশ। অথচ বর্তমান সময়ে অনেক শিশুর ঈদের দিন কাটে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা হাজার হাজার ছবি শেয়ার করি ঠিকই, কিন্তু সেই আনন্দের কতটুকু আমরা হৃদয় দিয়ে অনুভব করি সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ঈদ শুধু একটি উৎসব নয়; এটি ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং পারিবারিক বন্ধনের এক পবিত্র উপলক্ষ। তাই এই আন্তরিক সম্পর্কগুলো যেন কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি শেয়ার করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। আমাদের উচিত পরিবারের সবার সঙ্গে সরাসরি আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং একে অপরের সান্নিধ্যে উৎসবের প্রকৃত আনন্দ অনুভব করা। এবারের ঈদ সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল হাসি ও আনন্দ। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গড়ে উঠুক নিবিড় ভালোবাসা ও প্রকৃত আন্তরিকতা। তবেই ফুটে উঠবে ঈদের প্রকৃত সার্থকতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে

বিভেদ ভুলে উৎসব

বিভেদ ভুলে উৎসব

ধনী-গরিবের বৈষম্য এতো বেড়ে গেছে যে, ঈদের দিনের মিলনটা একটা প্রথাগত মিলনে পরিণত হয়েছে। ছোটবেলার ঈদ উদযাপন সবার কাছেই অন্যরকম মজা। যদি বড়দের কাউকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘ঈদের মজা আপনার কাছে এখন কেমন?’—তবে একবাক্যে সবাই ছোটবেলার ঈদ উদযাপনের কথাই বলবেন। দেখতে পেতাম ঈদের জামাত শেষে সহপাঠী বন্ধু প্রতিবেশী দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো, নতুন কাপড়চোপড় পরা, বড়দের কাছ থেকে নগদ টাকা পাওয়া ও বাড়ি-বাড়ি বেড়াতে গিয়ে খাওয়া দাওয়া যার মজাই ছিল আলাদা। এ-মজা আজকাল যেন অনেকটা কমে গেছে। কারণ বর্তমান সময়ে ঈদের জামাত আদায় করার পর কোলাকুলি পর্ব শেষে খাওয়া দাওয়া করে অনেককেই টেলিভিশনের হরেক রকমের অনুষ্ঠান দেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেই দেখা যায়। নানা ব্যস্ততায় এখন আর আত্মীয়স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নেওয়া খুব একটা হয়ে ওঠে না। প্রতিবেশী এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার যে রীতি আগে দেখা যেত এখন তা অনেকটা নিষ্প্রভ। ঈদের দিনে আত্মীয়তার একটি বন্ধন তৈরি হয়। এ আত্মীয়তা হচ্ছে কাছের ও দূরের সকলের সঙ্গে আত্মীয়তা। অসাম্প্রদায়িক আত্মীয়তা। ঈদের দিনে সমাজের নানাবিধ বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও একে অন্যের কাছে আসি। কর্মক্ষেত্রে মিলনের মধ্যে অনেক সময় স্বার্থের সম্পর্ক বড় হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু ঈদের দিনের মিলনে একটি সুন্দর অভিব্যক্তি আছে। এই মিলনে স্বার্থের সম্পর্ক নেই, আছে কেবল ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার তাগিদ। এ দিন উৎসবের দিন, আনন্দ ভাগাভাগি করার দিন। ধনী-গরিব মিলেমিশে উপভোগ করার দিন। ঈদ হলো প্রেমপ্রীতি ভালোবাসার উৎসব। আগেকার সময় ঈদের দিনে সহপাঠী বন্ধু প্রতিবেশী পরিবারের সদস্যরা ঘরেই তৈরি করতেন বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু খাবার। স্মার্টফোন না থাকায় তখন তাদের মধ্যে ছিল না কোনো কনটেন্ট তৈরি করার প্রচেষ্টা, ছিল না খাবারের ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করার ঝোঁক। শপিং করা নিয়ে তাদের মধ্যে ছিল না কোনো প্রকার আগ্রহ। ঘরেই সেলাই করা হতো ছোটদের জন্য নতুন নকশার জামা। দূরে যারা থাকতেন, তাদের ছিল না অনলাইনে অগ্রিম টিকিট কেটে রাখার সুযোগ। ফলে তাদের জন্য পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষায় থাকতেন। আগে একান্নবর্তী পরিবার ছিল বলে মানুষ অনেক দূরবর্তী স্থান থেকেও ছুটে আসত পরিবারের সঙ্গে ঈদ উপভোগ করার জন্য। কিন্তু এখন পরিবারগুলো ছোট ছোট হয়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ায় ঈদের আনন্দ আর আগের মতো ভাগাভাগি করা হয় না।  বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম থেকে

ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য

ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য

অনলাইনে ইদের শুভেচ্ছা ও ইদ সালামি আদান-প্রদান এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাড়ি ফেরার নানা ভিডিও আমাদের আবেগঘন করে তুলে। ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার’ গানে চোখ ভিজে ওঠে অনেকের। উৎসবের এই আবহেও কিছু বাস্তব সমস্যা আমাদের আনন্দকে ভাবমূর্ছা করতে বাধ্য করে। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ঈদ এলেই যেন মূল্যবৃদ্ধির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। সঙ্গে আছে ঈদযাত্রার সেই চিরাচরিত চরম জনদুর্ভোগ। প্রতি বছর অতিরিক্ত ভাড়া, তীব্র যানজট আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনগণের  যাতায়াত উৎসবের আমেজকে মরণফাঁদে পরিণত করে। বর্তমানে ঈদ উদযাপনে সহমর্মিতার চেয়ে বিলাসিতা ও প্রদর্শনেচ্ছা বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। নিজের সামর্থ্যরে বাইরে গিয়েও অন্যের চেয়ে দামি ব্র্যান্ডের পোশাক কেনাকে আভিজাত্যের প্রতীক মনে করা হচ্ছে, যেখানে পাশের অভাবী মানুষের হক ভুলে যাওয়া হয়। কেনাকাটা বা দামি রেস্টুরেন্টে খাওয়ার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করা, যা সুবিধাবঞ্চিতদের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করে। এছাড়া আগে ঈদের দিনে সবাই গোল হয়ে বসে আড্ডা ও খুনসুটিতে মাতত। এখন আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে, সবাই একসঙ্গে বসে থাকলেও প্রত্যেকের চোখ থাকে নিজের ফোনের স্ক্রিনে। সরাসরি কথা বলার চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি আপলোড বা অন্যের পোস্টে সাড়া দেওয়াতেই মানুষ বেশি ব্যস্ত। ঈদযাত্রার ভোগান্তির প্রধান কারণ হলো অপরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দাপট। এরপর রমজানের বাজারে লাগামহীন মূল্যস্ফীতির মূলে রয়েছে অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজি এবং স্থানীয় বাজারে চাহিদার তুলনায় জোগানের অসামঞ্জস্যতা। অর্থনীতিবিদদের মতে, উৎসবের মৌসুমে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়লেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এ বছর পোশাক ও রন্ধন সামগ্রীর দাম গড়ে ১০-১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার দরের সঙ্গে বাজেটের সমতা করতে না পেরে অনেক সময় উৎসবের পরবর্তী দিনগুলো মধ্যবিত্তের জন্য কষ্টকর হয়ে ওঠে। ঈদের আনন্দকে নিরবচ্ছিন্ন রাখতে প্রয়োজন কঠোর বাজার মনিটরিং ও পরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থাপনা। ঈদের দিনের কিছু সময় পরিবার, আপনজনের সঙ্গে কাটানোর অভ্যাস করা চাই। ভুল বোঝাবুঝি ভুলে, একে অপরের সঙ্গে আলিঙ্গন করে, সম্পর্কগুলো নতুন করে শুরু করার সুযোগ করে দেয় ঈদ।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 

বদলে যাওয়া ঈদ

বদলে যাওয়া ঈদ

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই মিলন। বছরের অন্য সময়গুলোতে জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে ছড়িয়ে দেয় নানা জায়গায় কাজ, পড়াশোনা বা জীবিকার টানে অনেকেই পরিবার থেকে দূরে থাকেন। কিন্তু ঈদ এলেই যেন সবাই আবার ফিরে যেতে চান শিকড়ে। পরিবারের সঙ্গে বসে খাওয়া, কোলাকুলি, বড়দের দোয়া আর ছোটদের হাসি এই সবকিছু মিলিয়েই গড়ে ওঠে ঈদের প্রকৃত আনন্দ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঈদ উদ্যাপনের ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। একসময় ঈদের আনন্দের প্রধান কেন্দ্র ছিল পরিবার, পাড়া-প্রতিবেশী এবং আত্মীয়স্বজন। ঈদের নামাজ শেষে সবাই একে অন্যের বাড়িতে যেতেন, খোঁজখবর নিতেন, মিষ্টিমুখ করতেন। পাড়া ভরে উঠত মানুষের আনাগোনায়, শিশুদের নতুন জামার উচ্ছ্বাসে। এখন সেই চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন বাস্তবতা ফেসবুক, ইন্টারনেট এবং তথাকথিত আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব। ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য একসময় চিঠি, ফোন বা সরাসরি দেখা ছিল প্রধান মাধ্যম। এখন তার জায়গা অনেকটাই দখল করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ঈদের দিন ভোর থেকেই ফেসবুকের টাইমলাইন ভরে যায় শুভেচ্ছা বার্তা, ছবি আর ভিডিওতে। অনেকেই পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো শেয়ার করেন, আবার অনেকেই দূরে থেকেও অনলাইনের মাধ্যমে কাছের মানুষদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেন। ইন্টারনেটের এই যুগে ঈদের আনন্দ যেন এক অর্থে আরও বিস্তৃত হয়েছে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে থাকা মানুষ ভিডিও কলের মাধ্যমে মুহূর্তেই পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন। প্রবাসে থাকা সন্তানও ঈদের সকালে মায়ের মুখ দেখতে পারছেন মোবাইলের পর্দায়। দূরত্ব যেন প্রযুক্তির কারণে কিছুটা হলেও কমে এসেছে। তবে এই পরিবর্তনের মাঝেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়, প্রযুক্তির উপস্থিতি কি কখনো কখনো বাস্তব সম্পর্কের উষ্ণতাকে কমিয়ে দিচ্ছে? অনেক সময় দেখা যায়, একই ঘরে বসে থাকা মানুষও নিজেদের মধ্যে কথোপকথনের বদলে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন মোবাইলের পর্দায়। ফলে সরাসরি দেখা হওয়ার যে মানবিক আনন্দ, তা কিছুটা হলেও ম্লান হয়ে যেতে পারে। তাই প্রয়োজন একটি ভারসাম্য। প্রযুক্তি আমাদের যোগাযোগকে সহজ করেছে, দূরের মানুষকে কাছে এনেছে, এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু ঈদের মূল চেতনাটি হলো মানুষে মানুষে সম্পর্কের উষ্ণতা, পারিবারিক বন্ধন এবং আন্তরিকতার প্রকাশ।  মধ্যনগর, সুনামগঞ্জ থেকে

ঈদ আনন্দের সেকাল-একাল

ঈদ আনন্দের সেকাল-একাল

সেকালের ঈদ ছিল এক অনাবিল, সহজ-সরল আনন্দের প্রতিচিত্র। আর একালের ঈদ অনেকটাই ভার্চুয়াল আনন্দের প্রতিফলন। একসময় ঈদ মানেই ছিল এক আবেগঘন প্রতীক্ষার নাম। চাঁদ দেখার সেই মুহূর্তে পুরো পাড়া যেন একসঙ্গে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ত। ঈদের আগের রাত, অর্থাৎ চাঁদ রাত ছিল এক রোমাঞ্চকর অনুভূতির নাম। ঈদের দিন সকালে নতুন পোশাক পরে, আতর মেখে, খেজুর খেয়ে সবাই ঈদগাহের দিকে রওনা দিত। ছোট-বড় সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করত, তারপর কোলাকুলি করে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানাত। আত্মীয়স্বজনের বাসায় দাওয়াত থাকত, একে অপরের বাড়ি যাওয়া, একসঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা এসব ছিল ঈদের অপরিহার্য অংশ। ঈদের দিনে এক প্লেট সেমাই নিয়ে প্রতিবেশীর বাড়িতে যাওয়া ছিল সৌহার্দ্যরে প্রতীক। শহর থেকে মানুষ ছুটে যেত গ্রামে, আপনজনের সান্নিধ্যে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে।তখন গ্রামের প্রতিটি ঘর মেহমানের আগমনে উৎসবমুখর হয়ে উঠত। এই ঈদ ছিল আত্মার ঈদ, ভালোবাসার ঈদ, সবার ঈদ। সময় বদলেছে, সঙ্গে বদলেছে ঈদ উদযাপনের ধরনও। ঈদের চাঁদ দেখার জন্য এখন আর ছোট-বড় কেউ আকাশের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকে না। চাঁদ রাতের সেই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস এখন সোশ্যাল মিডিয়ার স্ট্যাটাসের মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। সম্পর্কগুলোও ধীরে ধীরে ভার্চুয়াল হয়ে যাচ্ছে ঈদ মোবারকের মেসেজগুলো এখন হৃদয়ের উষ্ণতা ছুঁতে পারে না, বরং কপি-পেস্ট করা টেক্সটের মতো নিস্তেজ লাগে। ঈদের পোশাকের ক্ষেত্রেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে দর্জির দোকানে গিয়ে নকশা করিয়ে জামা বানানোর যে আনন্দ ছিল, তা এখন ব্র্যান্ডের দখলে। ইন্টারনেটের এক ক্লিকেই চলে আসে দামি পোশাক, কিন্তু সেই অপেক্ষার রোমাঞ্চ আর খুশির উচ্ছ্বাস এখন আর আগের মতো নেই।  শহুরে জীবনে ঈদের আনন্দ এখন অনেকটাই ডিজিটাল। সকালবেলার ঈদগাহের ভিড় শেষে সেলফি তারপর সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করার হিড়িক পড়ে যায়। কে কার আগে ছবি পোস্ট করবে, কার ছবি কতটুকু সুন্দর হয়েছে, পোস্টে কতগুলো লাইক ও কমেন্ট পড়েছে, এগুলো করতে করতেই তাদের দিন চলে যায়।  নামাজের পর অনেকেই ঘরে বসে টেলিভিশন দেখে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত থাকে। ঈদের পর আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়ার বদলে এখন বেশি গুরুত্ব পায়  ঈদের ছবি পোস্ট করা, রিল তৈরি, কিংবা অভিজাত রেস্টুরেন্টের বুফে পার্টি। ফেসবুক-ইন্টারনেট ঈদের আনন্দকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই সঙ্গে যেন পারিবারিক ঘনিষ্ঠতাও খানিকটা কমিয়ে দিয়েছে।  আগেকার আমলের মানুষ ঈদকে উপভোগ করত, কিন্তু এখনকার যুগে মানুষ উপভোগ করার থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যকে উপভোগ করানোর পেছনে বেশি ছুটছে।  সময়ের সঙ্গে ঈদের রং বদলালেও, তার হৃদস্পন্দন আজও একটাই ‘ভালোবাসা, সংযোগ, আর আনন্দ ভাগাভাগি করা।’ সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদেরও দরকার ঈদের চিরায়ত উষ্ণতাকে ধরে রাখা, প্রযুক্তির মাঝে হারিয়ে না গিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঈদের আসল আনন্দ উপভোগ করা। একালের আধুনিকতার সঙ্গে সেকালের আন্তরিকতা মিশে যাক। ঈদ হোক সত্যিকার অর্থেই সবার জন্য আনন্দময়, মধুর এবং ভালোবাসায় পূর্ণ।  গোপালগঞ্জ থেকে

ঈদে খাওয়াদাওয়া ও স্বাস্থ্য সচেতনতা

ঈদে খাওয়াদাওয়া ও স্বাস্থ্য সচেতনতা

এক মাস রমজানের সিয়াম সাধনার পর আসছে ঈদ, যা বয়ে আনবে সবার জন্য অনাবিল আনন্দ। ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ, খাওয়াদাওয়া, নতুন জামাকাপড় আর ঘোরাঘুরি। ছোট বাচ্চা থেকে বয়স্করা সবাই ঈদের আনন্দকে বরণ করে নেওয়ার জন্য উদ্গ্রীব। রোজার এক মাসে মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে যে পরিবর্তন আসে, সেটাতেই অনেকে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। মাসখানেক সিয়াম সাধনার পর ঈদের দিন সকালেই শুরু হয় ইচ্ছামতো খাওয়াদাওয়া। আর ঈদের দিনে আনন্দের অন্যতম আয়োজনটাই হলো নানা রকমের খাবারদাবার। সকাল বেলা উৎসবের শুরুটাই হয় মিষ্টি, সেমাই, পোলাও, কোর্মাসহ আরও কত রকমের খাবার দিয়ে। অনেকে এই সুযোগে বেশ ভূরিভোজ করে ফেলেন। আসলে ঈদের দিন এভাবে লাগামছাড়া খাওয়াদাওয়া করাটা হতে পারে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। হঠাৎ ঈদের দিনে অতি ভোজনের ফলে পাকস্থলী তথা পেটের ওপর চাপটা পড়ে বেশি। নিজের ঘরে হরেক রকমের খাবারের সঙ্গে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়াতে গেলেই ইচ্ছা-অনিচ্ছায় আরও বেশি খেতে হয়। ফলে অধিক চাপে অনেক সময় পাকস্থলীর এনজাইম ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। এ কারণে পেটে ব্যথা, গ্যাস্ট্রাইটিস, ডায়রিয়া, বমি, পেটফাঁপা ইত্যাদি হরহামেশাই দেখা যায়। সাধারণত ঈদের দিন প্রচুর তৈলাক্ত খাবার যেমন পোলাও, বিরিয়ানি, মুরগি, খাসি বা গরুর গোশত, কাবাব, রেজালা আর এর সঙ্গে মিষ্টিজাতীয় খাবার আমরা সবাই খাই। একসঙ্গে বেশি খাওয়ার ফলে পেটে অস্বস্তিকর অনুভূতি, ভরা ভরা ভাব, বারবার ঢেকুর ওঠা, এমনকি বুকে ব্যথা পর্যন্ত হতে পারে। যাদের পেপটিক আলসার আছে, তাদের রোজা রাখার ফলে দীর্ঘক্ষণ পেট খালি থাকার জন্য নিঃসারিত হাইড্রোক্লোরিক এসিড পাকস্থলী ও ডিওডেনামে ক্ষত করতে পারে। তৈলাক্ত ও ঝাল মসলাযুক্ত খাবার খাওয়ায় পাকস্থলী ও ডিওডেনামের ক্ষতে পুনরায় প্রদাহের সৃষ্টি হয়। ফলে বুক জ্বালা, পেট জ্বালা ইত্যাদি অনেক বেড়ে যায়। আইবিএস বা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম রোগে যারা ভোগেন, তাদের সমস্যাটা আরো বেশি দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারগুলো যেমন পায়েস, সেমাই, হালুয়া ইত্যাদি খাবারে অস্বস্তি, ঘন ঘন মলত্যাগ ও অসম্পূর্ণ মলত্যাগের অনুভূতি হয়। আবার বিভিন্ন খাবার অন্ত্র থেকে অতিরিক্ত পানি শোষণ করে। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। যাদের অ্যানাল ফিশার ও পায়ুপথে জ্বালাপোড়া, ব্যথা ইত্যাদি আগে থেকেই আছে, তাদের এ সমস্যা আরো বেশি প্রকট হয়। যাদের হিমোরয়েড বা পাইলসের সমস্যা আছে, তাদের পায়ুপথে রক্তক্ষরণও হতে পারে। আসলে ছোট বাচ্চাদের ঈদের আনন্দটা সবচেয়ে বেশি। তারা শখ করে দুই-একটা রোজা রাখে, রোজা শেষে ঈদের দিন মজার মজার খাবার খেতে বেশি পছন্দ। তবে অতিভোজনে যে কারো মতো ছোটদেরও সমস্যা হতে পারে। খাবারের  পরিমাণ : যে কোনো কিছু খেলেই সব সময় শরীরে সমস্যা হবে এমন কথা নেই। শুধু পরিমাণটা ঠিক রাখলেই হলো। অতিভোজন না করাই ভালো। ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে অল্প করে সেমাই বা পায়েস খাওয়া ভালো। এগুলোর সঙ্গে কিশমিশ, বাদাম, ফলের জুস, যেমন পেঁপে, আম ইত্যাদি খেতে পারেন। খাওয়ার আধাঘণ্টা পর দেড় থেকে দুই গ্লাস পানি খেয়ে ঈদের নামাজ পড়তে যাবেন। দিনে বিভিন্ন ধরনের খাবার খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে প্রচুর পানি ও অন্যান্য তরল খাবার খাওয়া ভালো। একবারে বেশি করে না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাবেন। যারা ঈদের দিন চটপটিজাতীয় খাবার পছন্দ করেন, তারা তেঁতুলের টক মিশিয়ে খেতে পারেন। পোলাও বা বিরিয়ানির সঙ্গে অবশ্যই সালাদ জাতীয় খাবার এবং দই খেতে পারেন। দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের সতর্কতা : যারা মাঝ বয়সি বা বয়োবৃদ্ধ বা যাদের অন্যান্য শারীরিক সমস্যা আছে, যেমন—ডায়াবেটিস, হাই ব্লাডপ্রেশার বা হৃদরোগ ইত্যাদি, তাদের খাবারের ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। ডায়াবেটিস রোগীকে অবশ্যই মিষ্টিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। সবজি বা টক ফল দিয়ে মজাদার খাবার আগেই বানিয়ে রাখুন। এগুলো আপনাকে অন্য খাবার থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করবে। নেহাত মিষ্টি খেতে চাইলে চিনির বিকল্প দিয়ে তৈরি করে নেবেন। পোলাও-বিরিয়ানি কম খাবেন, ভাত খাওয়াই ভালো। তাই বলে অতিরিক্ত খাবার অবশ্যই পরিহার করবেন। মুরগি বা গরুর মাংস খাওয়া যাবে, যদি অতিরিক্ত তেল বা চর্বি না থাকে। কিডনির সমস্যা থাকলে প্রোটিন জাতীয় খাদ্য যেমন মাছ, মাংস, ডিম, ডাল কম খেতে হবে। এমনকি ফলমূলও বেশি খাওয়া যাবেনা। পানি বা তরল জাতীয় খাবার ডাক্তারের পরামর্শ মত খেতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, এসব খাবার এক বেলাই খাওয়া উচিত, অন্য বেলায় স্বাভাবিক খেতে হবে। রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এদিন একটু বেশি হাঁটাহাঁটি করতে পারেন, প্রয়োজনে ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা একটু বাড়াতে হতে পারে। এ ব্যাপারে ঈদের আগেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। যাদের রক্তে কোলেস্টারল বেশি বা উচ্চরক্তচাপ আছে অথবা হার্টের সমস্যা আছে অথবা যারা মুটিয়ে যাচ্ছেন, তাদের অবশ্যই তেল ও চর্বি এড়িয়ে যেতে হবে। খাসি, কলিজা, মগজ, চিংড়ি ইত্যাদি খাবেন না। তবে চর্বি ছাড়া গরুর মাংস খাওয়া যাবে পরিমাণমতো। ভাজাপোড়া খাবেন না, বিশেষ করে বাইরের। ফল বা ফলের রস, সালাদ ইত্যাদি বেশি করে খাবেন। বিশেষ করে খাবারের শুরুতে সালাদ খেলে অন্য খাবারের জন্য জায়গা কমে যাবে। এছাড়া টক দই খেলে উপকার পাবেন। কিছু টিপস মনে রাখতে হবে : (১) পেট পুরে খাওয়া মানসিক তৃপ্তি দিতে পারে বটে, কিন্তু শরীরের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর। একবারে বেশি না খেয়ে বারেবারে কম পরিমাণে খাওয়া ভালো। সকালের নাশতা একটু বেশি হলেও দুপুরের খাবার হবে হালকা। রাতের খাবার মসলাদার না হওয়াই উচিত। (২) অতিরিক্ত পোলাও, বিরিয়ানি বা চর্বিজাতীয় খাবার পরিহার করবেন। (৩) যারা গ্যাস্ট্রিক, আলসার বা আইবিএস বা অন্যান্য পেটের রোগে ভোগেন, তারা ডমপেরিডন, ওমিপ্রাজল বা প্যান্ট্রোপ্রাজল-জাতীয় ওষুধ খাবেন। অ্যান্টাসিড-জাতীয় ওষুধ এবং বিভিন্ন এনজাইম খেতে পারেন। যাদের আইবিএস আছে, তারা দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার পরিহার করবেন। যাদের কোষ্টকাঠিন্যের সমস্যা, অ্যানাল ফিশার ও পায়ুপথে জ্বালাপোড়া বা ব্যথা ইত্যাদি সমস্যা আছে, তারা ইসবগুলের ভুসি, বেল, পেঁপে ইত্যাদি খেতে পারেন। (৪) রাতে কোনো দাওয়াতে গেলে অল্প পরিমাণে খাবেন। খাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা পর বিছানায় যাবেন। (৫) ঈদের সময় সাধারণত সবাই একত্রে বসে খান এবং অনেক গল্পগুজব করেন। এতে অতিরিক্ত বাতাস পাকস্থলীতে ঢোকে, ফলে বারবার ঢেকুর তোলার সমস্যা হয়। তাই খাবারের সময় যতটা সম্ভব কম গল্পগুজব করা উচিত এবং গোগ্রাসে না খেয়ে খাবার ভালো করে চিবিয়ে খেতে হবে। (৬) খাবারের সময় একটু পরপর পানি না খাওয়া উচিত, এতে হজম রসগুলো পাতলা হয় এবং হজমে অসুবিধা হতে পারে। তাই খাওয়ার অন্তত আধা বা এক ঘণ্টা পর পানি পান করা উচিত। (৭) কোমল পানীয়, চিনিযুক্ত পানীয় পরিহার করবেন। এসবের বদলে চিনি ছাড়া ফলের জুস, বোরহানি, টক দই, পুদিনা লাচ্ছি, ডাবের পানি ইত্যাদি খেতে পারেন। (৮) কোনো সময় বেশি খেয়ে ফেললে বা দাওয়াত থাকলে অন্য সময় রুটি, সালাদ বা স্যুপ খেতে পারেন। ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য ভাত, চিনি, মিষ্টিজাতীয় খাবার কম খেতে হবে। (৯) ব্যায়াম অব্যাহত রাখুন। পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন নিয়ে হাঁটাচলা করতে পারেন। এতে মন প্রফুল্ল থাকবে, শরীরও সুস্থ থাকবে। (১০) এ কথাও মনে রাখতে হবে, খাওয়াদাওয়ার ফলে যদি কোনো শারীরিক সমস্যা হয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। ঈদ অবশ্যই আনন্দের, আর এর সঙ্গে মনে হয় ভূরিভোজ না করলে আনন্দটা পূর্ণতা পায় না। খাওয়াদাওয়ার সঙ্গে মনে রাখতে হবে, খাওয়াটা যেন হয় ভেজালমুক্ত, টাটকা, স্বাস্থ্যসম্মত, সহজপাচ্য এবং উপাদেয়। তা অবশ্যই হতে হবে পরিমিত ও পরিকল্পিত। ঈদের সময় শারীরিকভাবে সুস্থ না থাকলে সব আনন্দই মাটি হয়ে যাবে। এ কথাও মনে রাখতে হবে, অতিভোজন এমনকি স্বাভাবিক খাওয়াদাওয়ার ফলেও যদি শারীরিক সমস্যা হয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক

আত্মশুদ্ধি পূর্তির শাশ্বত উৎসব

আত্মশুদ্ধি পূর্তির শাশ্বত উৎসব

জাতীয় কবি নজরুলের ‘মানুষ’ কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি নিবন্ধের সূচনায় উপস্থাপন করতে চাই। ‘গাহি সাম্যের গান- মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!/নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,/ সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।’ বস্তুতপক্ষে পবিত্র ইসলামের সংযম-আত্মশুদ্ধির মাহে রমজান শেষে ঈদুল ফিতর উদযাপন আনন্দধারার নিরন্তর আবহ। বিরোধ-বিচ্ছেদ-বিভাজন-ব্যবধান সংহার করে মানুষকে মানুষের মর্যাদায় সমাসীন করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে এর প্রণত উদ্দেশ্য। অসাম্প্রদায়িক-মানবিক সমাজের মৌলিক দর্শন বৈষম্যমুক্ত সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠাকল্পে প্রকৃত শিক্ষা ও যথার্থ পরিচর্যা অনুশীলনে এই মাস অতি তাৎপর্যপূর্ণ। এটি সর্বজনবিদিত যে, ‘ঈদ’ শব্দটির উৎপত্তি আরবি ‘আওদ’ থেকে। যার অর্থ ঘুরে আসা-প্রত্যাবর্তন করা। আরবিতে বিশেষ দিবস বা উৎসবের দিনকে ঈদ বলা হয়। ফিতর অর্থ রোজা ভাঙা বা ইফতার করা। ইসলামী পরিভাষায় ঈদুল ফিতর রোজা ভাঙার উৎসব হিসেবে উদযাপিত। প্রতিটি ধার্মিক মুসলমান পবিত্র ইসলামের বিধান মোতাবেক পুরো রমজান মাসে প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় ইফতারের মাধ্যমে রোজা বা উপবাস ভাঙলেও; ঈদের দিনই এক মাসের নিয়মিত উপবাস ভাঙা হয়। যদিও রোজাদারদের জন্য প্রত্যেক দিনের ইফতারের মুহূর্তেই আনন্দের, তথাপি ঈদুল ফিতরের দিন বিশেষ আনন্দ ও উৎসবের।  ঈদুল ফিতরের একটি ওয়াজিব বা আবশ্যিক আমল হলো নামাজ। সাধারণত ঈদ উৎসব শুরু হয় এই সালাতের মাধ্যমে। ঈদের নামাজে ধনী-গরিব-আমির-ফকির নির্বিশেষে সকল ধর্মপ্রাণ মুসলমান এক কাতারে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে আল্লাহর পবিত্রতা ও মহত্ব ঘোষণা করে থাকে। প্রিয় রাসুল (সা.) নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে সবাইকে ঈদগাহের জমায়েতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) এর মহান বাণী ছিল, ‘ঈদের দিন আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের বলেন, তারা আমার ফরজ আদায় করে প্রার্থনার জন্য বের হয়েছে। আমার মর্যাদা, বড়ত্ব ও সম্মানের কসম! আমি অবশ্যই তাদের প্রার্থনা কবুল করব।’ মাহে রমজান মাসে আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের অভিনব পন্থা অবলম্বনে সিয়াম সাধনা পবিত্র ইসলামের বিধিবদ্ধ ইবাদত যা ইমানের অপরিহার্য অঙ্গ। মহান আল্লাহ্ প্রদত্ত দীর্ঘ এক মাস দেহ ও মনের পরিশুদ্ধতার যে পরীক্ষা, তার সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ঈদের নিরন্তর আনন্দ উৎসবে। শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে পালিত হয় এই উৎসব যা ঈদুল ফিতর হিসেবে পরিচিত।  নামাজ, ইফতার, সেহরি, পবিত্র কুরআন পাঠ, জাকাত-ফিতরা প্রদান, নতুন কাপড় কেনা ও পরিধান করা, উপহার বিতরণ-বিনিময় ইত্যাদি সুসম্পন্ন করে মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টিতে নিজেকে বিলীন করার আত্মতৃপ্তিতে সমৃদ্ধ ঈদুল ফিতরের এই উৎসব। কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়, সকলের সঙ্গে বন্ধুত্বের নবতর উপযোজনে সার্থক হয়ে ওঠে এ আনন্দ উৎসব। ধনী, গরিব নির্বিশেষে এই উৎসবের মাত্রিকতা যেমন ভিন্ন; সমাজ পরিবর্তনের আধুনিক পর্যায়ে এসে এই উৎসব এক অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির বাহন হিসেবে বিকশিত। মাহে রমজানের এই অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার মূলে রয়েছে শাশ্বত বন্ধুত্ব-ভ্রাতৃত্ব-সৌহার্দ্যরে যোগসূত্র যা ব্যক্তিকে মানবিকতা-নান্দনিকতার পরিপূর্ণতায় এক সুষম সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উদ্বুদ্ধ করে। আমাদের সকলের জানা যে, পবিত্র রমজান মাসে ধার্মিক মুসলমানগণ মানবসত্তার আত্মিক উৎকর্ষ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিশিষ্ট উপাদান হিসেবে চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ঊনত্রিশ বা ত্রিশ দিন রোজা আদায় করেন।  ইসলামী শরিয়তের পঞ্চ বুনিয়াদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে রোজা। খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০-৫০০০ বছর কালের আদি পিতা হযরত আদম (সা.) থেকে হজরত ঈসা (সা.) পর্যন্ত সকল নবী রাসুলের শরিয়তে ও তাদের উম্মতগণের ওপর রোজা আদায় করা বিধিবদ্ধ ছিল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা মুত্তাকি হতে পার। (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৩) রোজা বিষয়ে অপর বর্ণনায় আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘প্রত্যেক ইবাদতই ইবাদতকারী ব্যক্তির জন্য, পক্ষান্তরে রোজা আমার জন্য। আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব। (সহীহ বুখারী হাদিস-১৯০৪) প্রকৃতপক্ষে নিজের ও অপরের জীবন সমৃদ্ধিতে নিবেদিত সকল কর্মেরই যোগফল হচ্ছে ধর্ম। এই অমিয় সত্যকে ধারণ করে যে কোনো ধর্মে বিশ্বাসী ব্যক্তিবর্গ ধর্মের গোঁড়ামি বা ধর্মান্ধতাকে পরিহার করে প্রকৃত ধার্মিকতার নির্যাসকে প্রাধান্য দিয়ে স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য রোজা আদায় করে থাকেন।  আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের মাধ্যমে স্বীয় দেহ মনকে নিয়ন্ত্রণ এবং এর পরিপূর্ণ উপলব্ধিতে অপরের কল্যাণকে নিশ্চিত করার মধ্যেই রমজানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপিত। রোজা একমাত্র মানবজাতির জন্যই স্বতন্ত্র ইবাদত যা ইমানের অঙ্গ হিসেবে ফরজ বা অবশ্যই পালনীয়। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এই মানবিক বাণীকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে অন্যের পানাহারসহ নানাবিধ কষ্টের উপলব্ধি এক নতুন মাত্রায় মানবজাতিকে সুশোভিত করে যা সমাজের পারস্পরিক আপোস, ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্বের অনুপম সেতুবন্ধন রূপে প্রতিভাত। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পবিত্র রমজান মাসকে তিন ভাগে ভাগ করে প্রথম দশ দিন ‘রহমত’, দ্বিতীয় দশ দিন ‘মাগফিরাত’ ও তৃতীয় দশ দিন ‘নাজাত’ হিসেবে অভিসিক্ত করে স্বমহিমায় এই তিনটি দশককে সমাদৃত করেছেন। রহমত ও মাগফিরাত অর্জন শেষে তৃতীয় দশকে পরকালের শাস্তি থেকে মুক্তির বিষয়ে নিশ্চয়তা প্রাপ্তির লক্ষ্যে ইবাদত বন্দেগি অধিকতর কার্যকর হিসেবে বিবেচিত।  তিনি আরও বলেন, ‘যারা পবিত্র রমজান মাসে নিজ ব্যবহার ও আচার-আচরণকে সুন্দর করবে তারা সেদিন খুব সহজেই পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। যারা এই মাসে ভৃত্য বা অধীনস্তদের কাজ কমিয়ে দেবে মহান আল্লাহ শেষ বিচার দিবসে তার হিসাব সহজ করে দেবেন। যারা রমজান মাসে মানুষকে বিরক্ত করা বা কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকবে বা অন্যদের দোষ ঢেকে রাখবে কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ নিজ ক্রোধ থেকে তাদের রক্ষা করবেন। যারা এতিমকে আদর-যত্ন বা সম্মান করবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদেরকে সম্মান করবেন। যারা এই মাসে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদেরকে রহমতের ধারায় সিক্ত করবেন, আর যারা এই মাসে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে বা তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে আল্লাহ শেষ বিচারের দিবসে তাদেরকে নিজ রহমত থেকে বঞ্চিত করবেন।’ এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে দেহ-মনের সমন্বয়ে যে মানবসত্তার বিকাশ-বিস্তার তার মূলে রয়েছে নফ্স ও রূহের পরস্পর বিরোধী কর্মযজ্ঞ। নফ্স হচ্ছে মানুষের মনস্তাত্তিক কিছু বিরূপসত্তা যেমন কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ এবং অপাঙ্ক্তেয় পানাহার ইত্যাদি। পাপ কর্মের প্রতি আকৃষ্ট, পাপ করে অনুতপ্ত হওয়া এবং পাপের প্রতি অনুরাগী না হয়ে পবিত্র কাজের প্রতি আকর্ষণ- এই তিন ধারায় বিভক্ত নাফ্সের উত্তম পর্যায় হচ্ছে নির্মোহ ও নির্লোভ থেকে পাপাচার মুক্ত বা নাজাত প্রাপ্তি। অন্যদিকে বলা যায় পানাহার ইত্যাদি দ্বারা নফ্স যখন শক্তিশালী হয়, রূহ তখন দুর্বল হয়ে পড়ে। আর রোজা পালনের মধ্যে অর্থাৎ পানাহার ইত্যাদি থেকে নিজেকে বিরত রেখে নফ্সকে শক্তিহীন করে আত্মার পরিশুদ্ধতা উন্নতকল্পে রূহকে শক্তিশালী করার মধ্যেই রোজা পালন হয় মহিমান্বিত। পবিত্র কুরআনে গুরুত্ব সহকারে যে মাসটি বারং বার উচ্চারিত সেটি হচ্ছে রমজান মাস। এই পবিত্র রমজান মাসেই পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে এবং হাজার মাসের শ্রেষ্ঠ রজনীও এ মাসেই অন্তর্ভুক্ত।  উল্লেখ্য, এই মাসে যাকাত ও ঈদের দিন ফিতরা দেওয়ার রেওয়াজ একটি বৈষম্যহীনতার অসাধারণ উদাহরণ। প্রতিটি সামর্থ্যবান ও সচ্ছল মুসলমানদের ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব। ঈদ উদযাপন সর্বজনীন করে ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে সবার মধ্যে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দিতেই সদাকাতুল ফিতরের বিধান চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি এই সদকার মাধ্যমে রোজার ভুল-ত্রুটিও মাফ হয়। পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে ‘তোমরা মানুষকে আল্লাহর হুকুম মতে সম্পদের যে অংশ অন্যদের বণ্টন করে দাও তা তোমাদের সম্পদের বৃদ্ধি ঘটায়’। অর্থাৎ জাকাত ফিতরা আদায় করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী বা সমাজের গরিব দুঃখী মানুষকে খাদ্যদ্রব্য, নতুন কাপড়-চোপড় বা নগদ অর্থ প্রদান করে তার অভাব পূরণে বা স্বাবলম্বী হওয়ার পথে উৎসাহিত করাই জাকাতের মূল লক্ষ্য। ঈদ উৎসবের মহান শিক্ষা হচ্ছে হৃদয়ের সকল কালেমা ও পাপের গ্লানি-লোভ ও লালসাকে নিধন করে অন্ধকার-অসূচি-বিদ্বেষ-বিভেদ-কূপমণ্ডূকতা-সাম্প্রদায়িকতাসহ অশুভ ও অসুন্দর মানসিকতা থেকে পরিত্রাণ। সমৃদ্ধ-সুন্দর-উজ্জ্বল-আদর্শিক মনন ও সৃজনশীল পন্থা অবলম্বনে নিজেকে পরিশুদ্ধ ও দেশ-জাতিকে ভালোবেসে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার প্রতিফলনে এর নির্যাস উন্মোচিত। পরিবার ও সমাজকে আলোকিত করে অন্যকেও আলোকিত করার পথ প্রশস্তকরণে ইহ ও পরকালীন মঙ্গল কামনায় নিজের জীবনকে যথার্থ অর্থে পরিচালনা করার মধ্যেই ঈদ উৎসবের সফলতা ও সার্থকতা। মূলত সাম্যের অমিয় বার্তার নিরন্তর প্রচার-প্রসার এবং জীবন প্রবাহকে পরিশীলিত করে বিশ্বকে আলোকোজ্জ্বল করার শক্তিমানতা ঈদ উৎসবকে পরিপূর্ণতা দান করে। ঈদ উদযাপনের প্রাক্কালে পৃথিবী নামক এই গ্রহের সকল মানব সন্তানকে ঈদের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন ও দেশ-জাতি-বিশ্বের সর্বাঙ্গীণ সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য মহান স্রষ্টার দরবারে বিনীত প্রার্থনা নিবেদন করছি।  লেখক : শিক্ষাবিদ

নদী-খাল খননে সম্ভাবনা

নদী-খাল খননে সম্ভাবনা

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়ায় নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামির আমির ডা. শফিকুর রহমান এমপি। তিনি এক বার্তায় বলেন, বাংলাদেশ একসময় কার্যত নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। নদীগুলো সচল ছিল, নদীপথে যাতায়াত, পণ্য পরিবহন এবং কৃষিক্ষেত্রে নদী ছিল বিশাল নিয়ামক শক্তি। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে একদিকে ফারাক্কা বাঁধের অভিশাপ অন্যদিকে প্রধান নদীগুলোসহ গুরুত্বপূর্ণ সকল নদ-নদী, খাল এবং বিল ভরাট হওয়ার ফলে একসময়ের স্রোতস্বিনী নদীগুলো এখন ভরা মৌসুমে পানি ধারণ করতে পারে না। দেশ বাঁচাতে হলে প্রধান নদীগুলোতে পর্যাপ্ত ড্রেজিং সম্পন্ন করে নাব্য ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উচিত হবে দেশ বাঁচানোর স্বার্থে নদ-নদীগুলোর জীবন ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা। সংসদীয় গণতন্ত্রের নিকট ইতিহাসে আমরা এমনটি খুব কমই দেখেছি প্রধানমন্ত্রীর কোনো পদক্ষেপকে বিরোধীদলীয় প্রধান সাধুবাদ জানিয়েছেন। জাতির জন্য এটি আশা জাগানিয়া সংবাদ।  নদী-খাল খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক, তবে অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন কিছু বিষয় নিয়ে ভাবতে শেখায়। প্রথমত, নদী-খাল খননের আগে সঠিক জরিপ ও সীমানা নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রকৃত প্রস্থ বিবেচনা না করে একই মাপ ধরে খনন করা হয়েছে। ফলে নদী সংকুচিত হয়েছে এবং দখলদারদের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সিএস, এসএসহ বিদ্যমান রেকর্ড যাচাই করে নদীর প্রকৃত সীমা নির্ধারণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে নতুন ডিজিটাল জরিপের মাধ্যমে নদী পুনঃঘোষণা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, খননকৃত মাটির সঠিক ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। বাস্তবে অনেক প্রকল্পে নদীর পাড়েই মাটি ফেলা হয়, যা বর্ষায় পুনরায় নদীতে ভরাট হয়ে যায়। এতে সরকারি অর্থের অপচয় যেমন ঘটে, তেমনি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও ব্যাহত হয়। তাই খনন প্রকল্প গ্রহণের সময় থেকেই মাটি অপসারণ ও ব্যবহারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, নদীকে খাল হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। একটি নদীর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ও পরিচয় অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সংজ্ঞা অনুযায়ী যেসব প্রবাহ নদী হিসেবে স্বীকৃত, সেগুলোকে নদী হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। এতে নিশ্চিত হবে নদীর আইনি সুরক্ষা। চতুর্থত, খনন পদ্ধতিতে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এলোমেলোভাবে খননের ফলে নদীকে বিভক্ত করে একাধিক প্রবাহ তৈরি করা হয়। যা নদীর স্বাভাবিক গতিপথ নষ্ট করে। নদী কখনো সমান প্রস্থে প্রবাহিত হয় না- এ বাস্তবতা মাথায় রেখে খনন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পঞ্চমত, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দূর করতে হবে। উপজেলা থেকে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কমিটি গঠন করে একীভূত পরিকল্পনার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। সরকারের সদিচ্ছা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে নদী-খাল খনন কার্যক্রম সত্যিকার অর্থেই দেশের জন্য মঙ্গলজনক হতে পারে।

পবিত্র ঈদুল ফিতর

পবিত্র ঈদুল ফিতর

পবিত্র রমজানের শেষে ঈদুল ফিতর এসেছে সবার জন্য আনন্দের বার্তা নিয়ে। জাতীয় ঈদগাহসহ দেশের সর্বত্র খোলা ময়দানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে এবার। ঈদুল ফিতর ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার জন্যই বয়ে আনুক সুনির্মল এক আনন্দবার্তা- ঈদ মুবারক! প্রতি বছরের মতো আবারও এসেছে ঈদুল ফিতর, মুসলমানদের সবচেয়ে বড় আনন্দ উৎসব। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর এসেছে খুশির এই উপলক্ষটি। ঘরে ঘরে, জনে জনে আনন্দ ও খুশির বার্তা বয়ে এনেছে ঈদ। দিনটি সৌভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলকে এক কাতারে শামিল করার চেতনায় উজ্জীবিত করে। কল্যাণের পথে ত্যাগ ও তিতিক্ষার মূলমন্ত্রে করে দীক্ষিত। ঈদের আগে রোজার একটি মাস সংযম ও আত্মত্যাগের মাস। রোজার কঠোর অনুশীলন ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধি এবং গরিব-দুঃখী-অনাহারীদের কষ্ট অনুভবের প্রেরণা দেয়। এ সময় গরিব-দুস্থদের ঈদের আনন্দে শরিক করার জন্য রয়েছে ফিতরা ও জাকাতের ব্যবস্থা, যা বিত্তবান প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অবশ্য প্রদেয়।  নামাজের ভেতর দিয়ে ঈদুল ফিতর উদযাপন করা হয়। নতুন পোশাক পরে সকালে ঈদগাহে নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের কর্মসূচি। ধনী-গরিব সবাই এই দিনে মেতে ওঠে আনন্দ উৎসবে। ঈদুল ফিতরের মূল তাৎপর্য বিভেদমুক্ত জীবনের উপলব্ধি। ভুল-ভ্রান্তি, পাপ-পঙ্কিলতা মানুষের জীবনে কমবেশি আসে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়। পরম করুণাময় আল্লাহ্ চান মানুষ পাপ ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে সৎপথে ফিরে আসুক। সম্প্রীতির আনন্দধারায় সিক্ত হয়ে উন্নত জীবন লাভ করুক। ঈদুল ফিতর মানুষকে এই শিক্ষাই দেয়।  দিবসটির উৎসব তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে সমাজের ধনী-গরিবের সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার মধ্য দিয়ে। শ্রেণীবৈষম্য বিসর্জনের মধ্য দিয়েই এ আনন্দ হয়ে ওঠে সার্থক। এবার অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঈদ উদযাপিত হবে বলে আশা করা যায়। দীর্ঘ যাত্রাপথের ভোগান্তি, গরমের ক্লান্তি আর কষ্টের পরও আপনজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার অনুভূতিই আলাদা। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের দুর্ভোগ কমেছে বহুলাংশে। ঈদ বিভেদ-বৈষম্যহীন, ভ্রাতৃচেতনায় ঋদ্ধ এক নির্মল আনন্দ-উৎসব-বিনোদনের উপলক্ষ। এই উৎসবের দিনে সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে হবে আনন্দ। রমজান আমাদের চিত্তশুদ্ধির যে শিক্ষা দিয়েছে, সেই শিক্ষার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শান্তি ও শ্রেয়বোধের চেতনায় সুস্থিত হতে হবে। ঈদুল ফিতর উদযাপনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব সকল প্রকার হিংসা, হানাহানিমুক্ত হোক। দূর হোক যুদ্ধ-বিগ্রহ, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসের বিভীষিকা। সকল শ্রেণীপেশার মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে বন্ধন হোক সুদৃঢ়। সবার ওপর বর্ষিত হোক মহান আল্লাহতায়ালার অশেষ রহমত, শান্তি ও কল্যাণ। আনন্দে ভরে উঠুক জীবনের প্রতিটি দিন- এই প্রত্যাশায় ঈদ মোবারক! সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।

আইন মানলে অধিকার

আইন মানলে অধিকার

দেশের সাধারণ মানুষ প্রায়ই দৈনন্দিন জীবনে ছোটখাটো আইন লঙ্ঘন বা নিয়মের অবজ্ঞা করেন। সচেতন নাগরিকরা জানেন আইন ও সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা শুধু দায়িত্ব পালন নয়, এটি তাদের অধিকার রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। নাগরিক অধিকার ও দায়িত্বের সঙ্গে আইন মেনে চলা অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। আমাদের সংবিধান, বিশেষ করে বাংলাদেশ সংবিধান ১৯৭২, দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত করেছে। সংবিধান নাগরিক ও মানবিক অধিকারের বিস্তৃত কাঠামো প্রদান করে। যার মধ্যে রয়েছে সমতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, শিক্ষা, স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা এবং আইনি সুরক্ষা। নাগরিকদের আইনি প্রক্রিয়ায় সমান সুরক্ষা এবং ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, যা সংবিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত। তবে এই অধিকারগুলো শুধু সংবিধানে লেখা থাকলেই যথেষ্ট নয়; এগুলো কার্যকর করতে হলে নাগরিকদের অবশ্যই প্রচলিত আইন মেনে চলা, সামাজিক নীতি মানা এবং দায়িত্বপরায়ণভাবে জীবন পরিচালনা করা প্রয়োজন। নাগরিক যখন দৈনন্দিন জীবনে আইন মেনে চলে যেমন- ভূমি লেনদেনের দলিল যাচাই করা, বিদ্যালয় বা কলেজে ভর্তি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের নিয়ম মেনে চলা বা ভোটার নিবন্ধনের জন্য নিয়মিত আবেদন করা- তাহলে তারা তাদের স্বাভাবিক অধিকার সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে, নিয়মিত আইন লঙ্ঘন বা অবজ্ঞা করলে নাগরিকদের স্বাভাবিক অধিকার সীমিত হয়ে যায় এবং জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। সংবিধান ও আইনকে মান্যতা এবং অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ করলে নাগরিকরা শুধু নিজেকে সুরক্ষিত রাখে না, বরং সমাজকে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং ন্যায়ের পথে এগোতে সাহায্য করে। এটি আজকের প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা যে, আইন মেনে চলা শুধু একটি দায়িত্ব নয়, বরং এটি একমাত্র পথ যাতে নাগরিকরা তাদের অধিকার নিশ্চিতভাবে ভোগ করতে পারে। দৈনন্দিন জীবনে আইন মেনে চলা কেবল সাজা বা শাস্তি এড়ানোর একটি মাধ্যম নয়। এটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা, সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং স্বাভাবিক জীবন পরিচালনার একটি অপরিহার্য হাতিয়ার। নাগরিক যখন নিয়ম মেনে চলে, তখন সে শুধু নিজেকে সুরক্ষিত রাখে না, বরং সমাজের শান্তি ও ন্যায়ও নিশ্চিত করে। উদাহরণস্বরূপ, ভূমি লেনদেনের সময় যদি নাগরিকরা দলিল যাচাই এবং সরকারি নিয়মাবলি মেনে চলে, তাহলে তাদের সম্পত্তি সুরক্ষিত থাকে এবং কোনো বৈধ বিরোধ বা জটিলতার ঝুঁকি কমে। একইভাবে বিদ্যালয় বা কলেজে ভর্তি প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করলে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক- উভয়েই তাদের অধিকার সুষ্ঠুভাবে ভোগ করতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও আইন ও প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা নিশ্চিত করে যে, নাগরিকরা ন্যায্য সেবা পাবে এবং কোনো ধরনের অন্যায় বা সুবিধা বঞ্চনা হবে না। ভোটার নিবন্ধন ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিয়ম মেনে চলাও নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করে এবং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। প্রতিটি নিয়ম, বিধান বা আইন শুধু বাধ্যবাধকতা নয়; এগুলো নাগরিকদের নিরাপদ জীবন, সংরক্ষিত সম্পদ এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার হাতিয়ার। তাই দৈনন্দিন জীবনে সচেতনভাবে আইন মেনে চলা নাগরিকত্বের একটি মৌলিক দায়িত্ব এবং সচেতন নাগরিক হওয়ার প্রতিফলন। অন্যদিকে, নিয়মিত আইন লঙ্ঘন বা নিয়মের প্রতি অবজ্ঞা নাগরিকদের জন্য শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ নয়, বরং তাদের স্বাভাবিক অধিকার সীমিত করে এবং জীবনকে করে তোলে ঝুঁকিপূর্ণ। যখন কেউ সরকারি নিয়ম বা সামাজিক নীতি মানে না, তখন শুধু তার নিজস্ব সুরক্ষা নয়, তার আশপাশের মানুষের অধিকারও হুমকির মুখে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো নাগরিক যদি সম্পত্তি-সংক্রান্ত আইন অমান্য করে বা দলিল যাচাই না করে জমি লেনদেন করে, তাহলে শুধু তার নয়, সংশ্লিষ্ট পরিবার বা সমাজের অন্যান্য সদস্যরাও দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতা এবং আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। একইভাবে ভোট বা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নিয়ম লঙ্ঘন করলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সমাজের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন হয়। শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, আইন লঙ্ঘনের প্রভাব সমাজের সার্বিক শান্তি, ন্যায় ও স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করে। তাই নাগরিকদের জন্য সচেতনভাবে আইন মেনে চলা, দায়িত্ব পালনে সতর্ক থাকা এবং নৈতিকতা বজায় রাখা কেবল ব্যক্তিগত সুরক্ষা নয়; এটি একটি সমৃদ্ধ, সুশৃঙ্খল ও ন্যায়সংগত সমাজের ভিত্তি তৈরি করে। নাগরিকরা যখন নিয়মিত তাদের দায়িত্ব পালন করে, তখন তারা কেবল নিজের অধিকার রক্ষা করেন না, বরং সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী হয়, ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি প্রসারিত হয় এবং সমগ্র সমাজ হয় স্থিতিশীল ও নিরাপদ। প্রচলিত আইনগুলো নাগরিক জীবনের সুরক্ষা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।  উদাহরণস্বরূপ, দণ্ডবিধি ১৮৬০ দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, অপরাধ ও শাস্তির সুনির্দিষ্ট বিধান স্থাপন করে, যা ব্যক্তিগত এবং সামাজিক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। এটি অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করে এবং নাগরিকদের মধ্যে ন্যায়বিচারের বিশ্বাস জাগিয়ে তোলে। পারিবারিক আইন নাগরিকদের পারিবারিক সম্পর্ক, বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার এবং সন্তানদের সুরক্ষা-সংক্রান্ত অধিকার নিশ্চিত করে, যা পারিবারিক শান্তি ও সামাজিক ন্যায়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে শ্রম আইন কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সমান সুযোগ এবং ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করে, শ্রমজীবী নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করে এবং তাদের কর্মজীবনকে স্থিতিশীল ও সুরক্ষিত করে। ভূমি আইন নাগরিকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষা, দলিল যাচাই এবং জমির লেনদেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার দিকনির্দেশনা প্রদান করে, যাতে কোনো পক্ষের অধিকার লঙ্ঘিত না হয়। শিশু ও মহিলা সুরক্ষা আইন শিশু এবং মহিলাদের প্রতি যে কোনো হিংসা, শোষণ বা বৈষম্য রোধে কার্যকর বিধান নিশ্চিত করে, যা সমাজের নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা করে। এই আইনগুলোর যথাযথ জ্ঞান থাকা এবং সচেতনভাবে প্রয়োগ করা নাগরিকদের জন্য নিরাপদ জীবন, সুরক্ষিত সম্পদ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। তবে শুধু অধিকার ভোগ করাই যথেষ্ট নয়; নাগরিকদের দায়িত্বপরায়ণ হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি নাগরিককে সচেতনভাবে প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা, সুষ্ঠু ভোট প্রদান, কর প্রদান করা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা- এসব দায়িত্ব পালন করতে হবে। এগুলো মানলে নাগরিক কেবল নিজের অধিকার রক্ষা করবে না, বরং সমাজের শান্তি, ন্যায় এবং স্থিতিশীলতাকেও নিশ্চিত করবেন। সংক্ষেপে, প্রতিটি নাগরিকের জীবনে আইন এবং দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে, যা ব্যক্তি এবং সমাজ উভয়ের জন্য নিরাপত্তা, সুষ্ঠু সুযোগ এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। পরিশেষে বলা যেতে পারে যে, নাগরিক অধিকার এবং দায়িত্ব একটি অবিচ্ছেদ্য দ্বৈত তীরের মতো। অধিকার কেবল সেই নাগরিকের সুরক্ষিত থাকে, যিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং দায়িত্বপরায়ণ। তাই সচেতন নাগরিক হওয়া মানে শুধু নিজেকে সুরক্ষিত রাখা নয়, বরং সমাজকে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং ন্যায়ের পথে এগোতে সাহায্য করা। আজকের প্রজন্মের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা- আইন মেনে চলা কেবল কর্তব্য নয়, এটি একমাত্র পথ, যা নিশ্চিতভাবে নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করে।

অপার সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

অপার সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

‘পার্বত্য চট্টগ্রাম’ নামটি শুনলেই বাংলাদেশের জনগণের মানসপটে ভেসে উঠে আকাশছোঁয়া পাহাড়, সবুজ বনরাজি এবং ঝর্ণার সমন্বয়ে গঠিত দুর্গম অঞ্চলের প্রতিচ্ছবি, যেখানে গমনাগমন অত্যন্ত দুরূহ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই অঞ্চল বাংলাদেশের প্রায় এক দশমাংশ আয়তন জুড়ে বিস্তৃত, যা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলা নিয়ে গঠিত। অসম্ভব সুন্দর এই প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটনের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়, গিরিখাত এবং বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ি নদী ও ছড়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত, যা দুর্গমতার প্রধান কারণ। এছাড়াও, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই দুর্গম সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলে বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র সংগঠনের অপতৎপরতার কারণে নিরাপত্তার দিক থেকেও বাংলাদেশের অপরাপর এলাকা থেকে সমস্যাসঙ্কুল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই অঞ্চলে বাস করে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনগণ, যারা এই দুর্গমতা এবং অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পশ্চাতপদ জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে এবং সার্বিক উন্নয়নের অংশীদার হতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের দুর্ভোগ লাঘব, পশ্চাতপদ জনগোষ্ঠেী ও এই অঞ্চলকে সামগ্রিক উন্নয়নের ধারায় আনার জন্য প্রয়োজন উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। দেশজ উন্নয়নের মূলধারার সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নকে একই ধারায় নিয়ে আসার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ‘সীমান্ত সড়ক’ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে এই মেগা প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে তিন পার্বত্য জেলার সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাজুড়ে দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এবং ইতোমধ্যে অনেকাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রকল্পটি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হলে তিন পার্বত্য জেলার অধিকাংশ উপজেলার মধ্যে সংযোগ সড়কের মাধ্যমে উন্নত যোগাযোগ স্থাপিত হবে। যা পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান সড়ক নেটওয়ার্ককে অনেক শক্তিশালী করবে। প্রকল্পটি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হলে একটি দীর্ঘ সড়ক নেটওয়ার্ক স্থাপিত হবে বলে আশা করা যায়। যা বাংলাদেশের সর্ব বৃহৎ সড়ক নেটওয়ার্ক হিসেবে বিবেচিত হবে। কয়েকটি ধাপে এই সড়কের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে। ইতোমধ্যে গত ২০২৫ সালের মধ্যভাগে প্রথম ধাপের সড়কপথ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে এবং দ্বিতীয় ধাপের সড়কের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। সড়কটি বান্দরবানের কেওক্রাডং পাহাড়ের চূঁড়াস্পর্শ করেছে। এটিই হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু সড়ক।     বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড এবং এর অধীনস্ত ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নসমূহের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই সড়ক নির্মাণ প্রকল্প সম্পাদন করা হচ্ছে। প্রকল্পের কাজের গুণগত মান বজায় রেখে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতিসাধন না করে সেনা সদস্যগণ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সুউচ্চ পাহাড়, সুগভীর গিরিখাত, প্রতিকূল পরিবেশ, বৈরি আবহাওয়া, যোগাযোগ সংকট, প্রকল্প এলাকায় নির্মাণ উপকরণ পরিবহন, আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনসমূহের অপতৎপরতা ইত্যাদি কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন দুরূহ হয়ে পড়ে। কিন্তু, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চৌকস সদস্যগণ সকল ধরনের জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে অদ্যাবধি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পরিচালনা করে আসছে। যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয় স্থানীয় জনসাধারণের উপকারের জন্য। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই সীমান্ত সড়কের মূল উপকারভোগী হবে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ও সীমন্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী জনগণ। এর নির্মাণ কাজ শেষ হলে পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে। সীমান্ত সড়কের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে তারা নিজেরাই নিজেদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা তথা জীবনমানের উন্নতি করতে সক্ষম হবে। পূর্বে কোনো স্থানে পৌঁছাতে ২-৩ দিন পায়ে চলা পাহাড়ি পথে হেঁটে পৌঁছাতে হতো। এখন সেখানে মাত্র কয়েক ২০-৩০ মিনিট থেকে ১-২ ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছানো সম্ভব। এর ফলে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্গম এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়বে। অসুস্থ রোগীদের দ্রুত উপজেলা বা জেলা শহরের হাসপাতালে স্থানান্তর সম্ভব হবে। এই অঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিজ পণ্য দেশের অন্যান্য স্থানে সহজে পরিবহনের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়ন হবে। এমনকি কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাবে। এর মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের জীবনমান উন্নয়ন ঘটবে, যা দেশজ উন্নয়নেও এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে। সীমন্ত সড়ক নির্মাণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন। এতে করে পাহাড়ের সঙ্গে সমতলের যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের যাতায়াত বৃদ্ধি পাবে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নাগরিক সেবা পৌঁছানো সহজতর হবে। এই সড়ক পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। যোগাযোগ অবস্থার উন্নয়নের ফলে পাহাড়ে নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। স্থানীয় কাঁচামাল নির্ভর ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প গড়ে উঠবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাগণের ব্যবসা পরিচালন ও সম্প্রসারণের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন হস্তশিল্প ও কৃষিজ পণ্য শহরে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন সহজতর হবে। এতে করে স্থানীয় পণ্যের নতুন বাজার সৃষ্টি হবে। দেশের বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাগণ এই সড়ক ব্যবহার করে পার্বত্য চট্টগ্রামে উৎপাদিত ফসল ও পণ্য সরাসরি সংগ্রহ করতে পারবে। যার ফলে কৃষক ও উৎপাদনকারীগণ পণ্যের ন্যায্য দাম পাবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যবসার প্রসার ঘটবে। এতে করে সার্বিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সমাজের মূল ধারার সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক উপকৃত হবে। পাহাড়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের প্রধান অন্তরায় হল অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থা। দুর্গমতার কারণে পাহাড়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা কঠিন। এছাড়াও যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকগণও সেখানে যেতে অনাগ্রহী হন। যার ফলশ্রুতিতে অস্থায়ী এবং তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ শিক্ষক দ্বারা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। যোগযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে সেখানে যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হবে, তেমনি যোগ্যতা সম্পন্ন দক্ষ শিক্ষকগণও পাঠদানে আগ্রহী হবে। পার্বত্য জনপদের শিক্ষার্থীরাও দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসতে পারবে। এতে করে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাবে এবং এই অঞ্চলের অনগ্রসর জনগণ শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে নিজেদের কর্মসংস্থান নিশ্চিতপূর্বক জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে পারবে। অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এই অঞ্চলে অদ্যবধি মৌলিক চিকিৎসা সেবা অবকাঠামো গড়ে ওঠে নাই। এছাড়াও বিদ্যমান হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহে ডাক্তারের অভাব প্রকট। উন্নত চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, যার ফলে প্রয়শই যথাযথ চিকিৎসার অভাবে রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সীমান্ত সড়ক নির্মাণের ফলে পাহাড়ি অঞ্চলে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং হাসপাতালসমূহে উন্নত চিকিৎসা সামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হবে। বিশেষত জরুরি প্রয়োজনে অসুস্থ রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা বা বিভাগীয় শহরে দ্রুত প্রেরণ সম্ভব হবে। দক্ষ চিকিৎসকগণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে সেবা প্রদানে আগ্রহী হবেন। এর ফলে পার্বত্য অঞ্চলে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং অনেক জীবন রক্ষা পাবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চল এবং এই এলাকার অধিকাংশ মানুষই কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অপর্যাপ্ত যোগাযোগ অবকাঠামোর কারণে এই অঞ্চলের কৃষকদের পক্ষে আধুনিক কৃষি সরঞ্জাম ও উপকরণ ব্যবহার সম্ভব ছিল না। এছাড়াও অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে বাজারজাতকরণ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে এবং উৎপাদিত ফসল হয় নষ্ট হয়ে যায়, অথবা কমদামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। ফলশ্রুতিতে পাহাড়ে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের যথাযথ দাম কৃষক পেত না। সীমন্ত সড়ক নির্মাণের ফলে একদিকে কৃষক যেমন উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা ও ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে পারবে, অপরদিকে উৎপাদিত পণ্য সহজেই সঠিক মূল্যে বাজারজাত করতে সক্ষম হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ সুগম হবে। পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে দেশের অন্যান্য স্থানের ব্যবসায়ীগণ এই সড়ক ব্যবহার করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেতে পারবে এবং পণ্য ক্রয় করে শহরে নিয়ে আসতে পারবে। এছাড়াও, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে কৃষি ভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে উঠবে। শিল্প কারখানা স্থাপনের অন্যতম নিয়ামক হল উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। যাতায়াত সুবিধার কারণে বিনিয়োগকারীগণ এই অঞ্চলে শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে আগ্রহী হবে। এছাড়াও এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী হস্ত ও কারুশিল্প পণ্যের কদর দেশে এবং বিদেশে রয়েছে। ফলশ্রুতিতে এই সকল কারুপণ্য উৎপাদনের জন্য ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প স্থাপনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে, যা দেশে বাজারজাত এবং বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে পাহাড়ি অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি, যা পর্যটন শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বিনোদন হিসেবে বিভিন্ন পর্যটন স্থান ভ্রমণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের এই ভ্রমণ চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান হতে পারে আদর্শ ভ্রমণ গন্তব্য। ইতোমধ্যে সীমান্ত সড়কের কিছু অংশ খুলে দেওয়ার পর ওই সকল এলাকায় ভ্রমণপিপাসু মানুষের সমাগম বৃদ্ধি পেয়েছে। সীমান্ত সড়ক ব্যবহার এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোগের মাধ্যমে এই অঞ্চলে পর্যটন স্পটসমূহ উন্নত করার প্রয়াস নিলে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে। এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী পর্যটন কেন্দ্রিক ব্যবসায় নিয়োজিত হবার মাধ্যমে জীবনমান উন্নত করতে পারবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গমতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী দীর্ঘকাল থেকে এই অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়েছিল। অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও ওই সকল দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনা করতে বেগ পেতে হয়। ফলে সন্ত্রাসীরা ওই সকল এলাকায় বসবাসরত সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে চাঁদাবাজি, নির্যাতন, গুম, অপহরণ, চোরাচালান, মাদক ব্যবসা, রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত করে আসছে। এছাড়াও সন্ত্রাসীরা অপরাধ সংঘটনের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পার্শ¦বর্তী দেশে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে, যার ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে অনেক ক্ষেত্রেই অসুবিধার সম্মুখীন হয়। সীমান্ত সড়ক নির্মাণের ফলে দুর্গম অঞ্চলসমূহে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত টহল ও যাতায়াত বৃদ্ধি পাবে। যে কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও অপতৎপরতা রোধে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। এতে করে স্থানীয় জনসাধারণের সাহস ও জীবনের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে এবং বিভিন্নি ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম হ্রাস পাবে। এছাড়াও পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর টহল কার্যক্রমের মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অবাধ চলাচল ব্যাহত হবে। এছাড়াও, পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গমতার সুযোগে ও সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতায় পাহাড়ে গাঁজা ও পপির মতো মাদকের চাষ হয়ে থাকে। পর্যাপ্ত সড়ক যোগাযোগের অভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই সকল খেতের সন্ধানে বেগ পেতে হয় এবং অভিযান পরিচালনা করাও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এই সড়ক চালু হলে, এ ধরনের মাদকের চাষাবাদ বন্ধ করা সম্ভব হবে। এতে করে আন্তঃসীমান্ত মাদক চোরাচালান রোধ করাও সম্ভব হবে। এই সীমন্ত সড়ক শুধুমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে তাই নয়, বরং ভবিষ্যতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় চলাচলের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্তে অবস্থিত স্থল বন্দরের মাধ্যমে স্থলপথে যোগাযোগ উন্নয়নের পথ সুগম হবে। এতে করে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির একটি গুরত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুসারে আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে সীমান্ত সড়ক প্রকল্পের কাজ শেষ হলে এটি বাংলাদেশের দীর্ঘতম সড়ক নেটওয়ার্ক হবে। যা পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন ও আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এর পাশাপাশি এই দুর্গম এলাকায় নিরাপত্তা অবস্থার উন্নতি, সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী দমন এবং মাদক চাষ ও চোরাচালান রোধে রাষ্ট্রের জন্য সহায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। এই প্রকল্প কেবল বর্তমানে বিদ্যমান সমস্যাসমূহই সমাধান করছে না, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়ে তোলার ভিত্তি স্থাপন করছে। এই সড়ক শুধুমাত্র একটি অবকাঠামো নয়, এটি পার্বত্য জনপদের শান্তির পথে উজ্জল আলো হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পাহাড়ে শান্তির সুবাতাসের জন্য এই প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

যুদ্ধের ছায়ায় বন্দি শহর

যুদ্ধের ছায়ায় বন্দি শহর

War does not determine who is right, only who is left- বার্ট্রান্ড রাসেল এর বিখ্যাত উক্তিটি যুদ্ধ সম্পর্কে মানুষের নির্মম বাস্তবতার যে উপলব্ধি তা যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরের নিরব আর্তনাদের প্রতিধ্বনি। যুদ্ধ কখনো সত্যিকারের বিজয় নির্ধারণ করে না। বরং নির্ধারণ করে কে বেঁচে থাকে আর কে হারিয়ে যায়। যুদ্ধের ছায়ায় হারিয়ে যায় একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। বন্দি হয়ে পড়ে শহর আর মানুষের মন জুড়ে জন্ম নেয় এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা যেখানে শুধুই শান্তির জন্য অপেক্ষা। এই সত্যটি আমরা ইতিহাসের প্রতিটি সংঘাতে বারবার দেখেছি। ভূখণ্ডের মানচিত্র বদলেছে, সামরিক শক্তির পাল্লা বেড়েছে কিন্তু মানুষের চোখের জল এবং স্বপ্নভঙ্গের গল্প একই রয়ে গেছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই, যুদ্ধের গল্প মূলত মানুষের গল্প, ভাঙা ঘরের গল্প। ১৯৩৯ সালে যখন শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ তখন ইউরোপের বহু শহর রাতারাতি এক অদৃশ্য কারাগারে পরিণত হয়েছিল। লন্ডনের আকাশে জার্মান বোমারু বিমানের গর্জন, পোল্যান্ডের রাস্তায় উদ্বাস্তু মানুষের মিছিল আর হিরোশিমার আকাশে বিস্ফোরিত পারমাণবিক আগুন- সবই যেন এক বিশাল মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক। বিশেষ করে হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা হামলা মানবসভ্যতাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, প্রযুক্তির অগ্রগতি যদি মানবিক বোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য না হয় তবে তা সভ্যতার অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। যুদ্ধ কেবল সৈন্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত শহরকে বন্দি করে ফেলে। যুদ্ধের ছায়ায় স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে নিভে যেতে থাকে। রাস্তা হয়ে যায় ট্যাংকের পথ, হাসপাতাল হয়ে ওঠে আহত মানুষের কান্নার জায়গা, স্কুলের শ্রেণিকক্ষ পরিণত হয় আশ্রয় কেন্দ্রে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ- সব ক্ষেত্রেই একই দৃশ্য। ভিয়েতনাম যুদ্ধ দেখিয়েছিল কিভাবে একটি দীর্ঘ সংঘাত পুরো একটি সমাজকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে। সেই যুদ্ধে শুধু সৈন্য নয়, হাজার হাজার সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল, অসংখ্য গ্রাম ধ্বংস হয়েছিল এবং একটি প্রজন্মের মনোজগতে তৈরি হয়েছিল গভীর ক্ষত। যুদ্ধের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো বন্দি শহরের বাস্তবতা। যখন একটি শহর অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে তখন সেখানে বসবাসকারী মানুষের জীবন হয়ে ওঠে এক অদৃশ্য কারাগার। খাবারের সংকট, বিদ্যুতের ঘাটতি, চিকিৎসার অভাব সব মিলিয়ে শহরটি ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লেনিনগ্রাদ অবরোধে প্রায় ৯০০ দিন ধরে চলেছিল, যেখানে লাখ লাখ মানুষ ক্ষুধা ও ঠান্ডায় মারা গিয়েছিল। সেই শহরের মানুষ প্রতিদিন অপেক্ষা করত, কবে যুদ্ধ শেষ হয়ে মানুষ স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে। একইভাবে ১৯৯০- এর দশকে সারাজেভো অবরোধে ইউরোপের আধুনিক ইতিহাসে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের উদাহরণ যেখানে একটি শহর বছরের পর বছর অবরুদ্ধ ছিল। যুদ্ধ মানুষের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের আশাকে শেষ করে দেয়। ইতিহাসে অনেক লেখক যুদ্ধের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে মানুষের অন্তরের ক্ষয়কে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখিয়েছেন। রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তয় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ War and Peace- এ লিখেছিলেন, The strongest of all warriors are these two- Time and Patience। এই কথার গভীরে লুকিয়ে আছে একটি বড় সত্য। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত মানুষের ধৈর্যই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ শুরু হলে সেই ধৈর্যকে বহন করে সাধারণ মানুষ, যারা অস্ত্র ধরেন না কিন্তু যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। আজকের বিশ্বে যখন মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান ও ইসরাইলের সংঘাত তখন সেই সংঘাতের অদৃশ্য কেন্দ্রস্থলে রয়েছে অসংখ্য বন্দি শহর। যেখানে মানুষের জীবন প্রতিদিন নতুন করে ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে পরিচিত হয়। এই শহরগুলোকে মানচিত্রে চিহ্নিত করা যায় কিন্তু মানুষের ভাঙা মনকে কোন মানচিত্রে ধারণ করা যায় না। আমি সেই বন্দি শহরের গল্প বলি যেখানে প্রতিটি দেয়াল কেবল কংক্রিট নয়। সেখানে জমে আছে মানুষের আস্থা, ভেঙে যাওয়া আশা আর নিঃশব্দ আর্তনাদ। শহরটি হয়তো তেহরানের উপকণ্ঠে, হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের কোন শহরে কিংবা এমন কোনো সীমান্তবর্তী নগরীতে যেখানে আকাশের দিকে তাকালে যুদ্ধবিমানের ছায়া দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নিহতদের প্রায় ৮০ শতাংশই বেসামরিক মানুষ। এই পরিসংখ্যানে লুকিয়ে আছে অসংখ্য শিশুর গল্প। তারা স্কুলে যেতে পারে না, খেলতে পারে না, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়। এগুলো কোন রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তৃতায় নেই, কোনো কূটনৈতিক বৈঠকের কাগজেও নেই। পৃথিবীর গণতান্ত্রিক মানচিত্রে যত দেশ আছে, তাদের প্রত্যেকের নীতিনির্ধারকরা নিরাপত্তা, কৌশল, প্রতিরক্ষা- এই শব্দগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। ইরান-ইসরাইল ও আমেরকিার সংঘাতকে অনেক বিশ্লেষক একটি মাল্টিভেক্টর যুদ্ধ হিসেবে দেখেন। যেখানে কেবল তিন রাষ্ট্র নয় বরং আঞ্চলিক শক্তি, আন্তর্জাতিক জোট, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা একসঙ্গে জড়িত। এ সংঘাতের পেছনে রয়েছে পারমাণবিক কর্মসূচি, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে উত্তেজনা। এ জটিল বিশ্লেষণের ভেতরে সাধারণ মানুষের গল্পগুলো হারিয়ে যায়। সৈন্যদের মনোবল, সামরিক কৌশল, ক্ষেপণাস্ত্র, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা- এসব নিয়ে প্রতিদিন খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু ইরানের স্কুলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত শিশুদের জন্য দীর্ঘশ্বাস এবং আহত শিশুদের নিঃশব্দ আর্তনাদ সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না। অথচ যুদ্ধে প্রকৃত মূল্য সেই মানুষগুলোর জীবনেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি শিশু যখন স্কুলে যেতে পারে না, একজন মানুষ যখন প্রিয়জনকে হারায়, একজন রোগী যখন হাসপাতালে দাঁড়িয়ে আতঙ্কে কাঁদে, তখন বুঝা যায় যুদ্ধ আসলে কাকে আঘাত করে। যুদ্ধের পটভূমিতে রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি এবং কূটনৈতিক ব্যর্থতার মিশ্রণ যেন বিষাক্ত কুসুম। একদিকে আছে দেশের নিরাপত্তা, অস্তিত্বের প্রশ্ন আর অন্যদিকে সেই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় ঘটে যাওয়া মানবিক অপচয়। যেখানে প্রতিটি বেসামরিক প্রাণ যেন প্রশ্নবোধক চিহ্নে পরিণত হয়েছে। ইরান-ইসরাইল ও আমেরকিার সংঘাতে অবরুদ্ধ শহরগুলো যখন ধ্বংসের মুখোমুখি, তখন প্রতিটি শহরে যেন ধ্বনিত হতে থাকে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের আর্তনাদ, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা স্বপ্ন আর আহতদের দীর্ঘশ্বাস। ভাঙা দেয়াল, ধুলোমাখা রাস্তা আর অন্ধকারে ডুবে থাকা জানালাগুলো যেন সাক্ষী হয়ে থাকে মানুষের অদম্য বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা। যেখানে প্রতি নিঃশ্বাসে থাকে বেদনা, তবু আশার আলো নিভে যেতে চায় না। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি স্মৃতি, প্রতিটি অদেখা অশ্রু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধের প্রকৃত পরাজিত মানুষ। আর যদি কখনো পৃথিবী এই সত্যটিকে সত্যিই উপলব্ধি করতে পারে, তবে হয়তো একদিন যুদ্ধ মানুষের অন্তর থেকেই হারিয়ে যাবে। তাই বলি, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও এখনো মানবতার আলো রয়ে গেছে।

দারিদ্র্য বিমোচনের বিকল্প মডেল

দারিদ্র্য বিমোচনের বিকল্প মডেল

পবিত্র ঈদুল ফিতর আমাদের দ্বারে যখন কড়া নাড়ে, তখন মুমিনের হৃদয়ে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সামাজিক সাম্যের এক সুগভীর বার্তা অনুরণিত হয়। এই উৎসব কেবল ব্যক্তিগত ভোগের নয়, বরং ত্যাগের মাধ্যমে সামষ্টিক কল্যাণের এক মহান সোপান। ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম জাকাত ব্যবস্থাকে যদি নিছক ব্যক্তিগত পর্যায়ের দান-খয়রাত হিসেবে বিবেচনা না করে একটি শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখা হতো, তবে আমাদের দারিদ্র্য বিমোচনের পথচিত্রটি হয়তো অন্যরকম হতে পারত। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার করে এসে আমরা যখন প্রবৃদ্ধির বড় বড় মাইলফলক স্পর্শ করছি, তখন কেন এখনও কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে এবং কেন সম্পদের পাহাড় কেবল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে জমা হচ্ছে, সেই নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ করা আজ সময়ের দাবি। বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে জাকাত ব্যবস্থার যে বিপুল সম্ভাবনা সুপ্ত রয়েছে, তার সঠিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান করা গেলে তা কেবল রাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি মেটাতেই সাহায্য করত না, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতে পারত। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে আয়ের চরম বৈষম্য এবং মুদ্রাস্ফীতির কশাঘাতে প্রান্তিক মানুষের জীবন আজ ওষ্ঠাগত, সেখানে জাকাতভিত্তিক একটি বিকল্প উন্নয়ন মডেল আমাদের মুক্তিদাতা হয়ে উঠতে পারে। তাত্ত্বিক অর্থনীতি এবং গাণিতিক পরিসংখ্যানের নিরিখে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে জাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণ বিশাল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে ব্যক্তিগত আমানতের পরিমাণ এবং পুঁজিবাজারের মূলধন মিলিয়ে যে বিপুল তারল্য প্রবাহ বিদ্যমান, তার একটি ক্ষুদ্র অংশও যদি জাকাতের আওতায় সুসংগঠিতভাবে সংগ্রহ করা যেত, তবে তার পরিমাণ দাঁড়াত বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বার্ষিক জাকাত সংগ্রহের সম্ভাবনা প্রায় ৩০-৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তুলনা করলে দেখা যায়, সরকারের প্রতি বছর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতে যে বিশাল বরাদ্দ থাকে, জাকাতের এই সম্ভাব্য অর্থ তার একটি বড় অংশকে অনায়াসেই প্রতিস্থাপন করতে পারে। বর্তমানের বাজেট ব্যবস্থাপনায় আমরা দেখি যে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর একটি বড় অংশ ব্যয় হয় সরকারি কর্মকর্তাদের পেনশন এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে, যার ফলে প্রকৃত গরিব ও দুস্থ মানুষের কাছে পৌঁছানো অর্থের পরিমাণ থাকে অত্যন্ত নগণ্য। যদি একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ জাতীয় জাকাত বোর্ড বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ ও বণ্টন করা হতো, তবে প্রশাসনিক ব্যয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে রেখে সরাসরি প্রান্তিক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব ছিল। এই বাড়তি অর্থ যখন সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছায়, তখন তা বাজারে পণ্যের চাহিদা তৈরি করে এবং পরোক্ষভাবে শিল্প উৎপাদন ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া বা অন্যান্য মুসলিম প্রধান দেশগুলোর জাকাত ব্যবস্থাপনার দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা একে একটি অত্যন্ত আধুনিক ও ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় নিয়ে এসেছে। সেখানে জাকাত কেবল অভাবীদের এক বেলা খাওয়ানোর মাধ্যম নয়, বরং এটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি এবং দারিদ্র্যের স্থায়ী অবসানের একটি পদ্ধতি। বাংলাদেশে জাকাত ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর বিক্ষিপ্ত ও অসংগঠিত চরিত্র। আমরা প্রতি বছর দেখি বিত্তবানরা নিজ উদ্যোগে শাড়ি বা লুঙ্গি বিতরণ করছেন, যা অনেক সময় পদদলিত হয়ে প্রাণহানির মতো করুণ ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। এই সনাতনী পদ্ধতি দারিদ্র্য বিমোচন করে না, বরং দারিদ্র্যকে লালন করে এবং মানুষের আত্মমর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। অথচ জাকাতের অর্থ দিয়ে যদি এলাকাভিত্তিক কর্মসংস্থান কেন্দ্র গড়ে তোলা হতো, গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তির ব্যবস্থা করা হতো কিংবা বিনা সুদে ক্ষুদ্র ঋণের বিকল্প হিসেবে বিনিয়োগ করা হতো, তবে সেই মানুষগুলো একসময় নিজেরাই জাকাতদাতার কাতারে শামিল হতে পারতেন। সম্পদের এই যে বৃত্তাকার প্রবাহ, এটিই হলো জাকাত অর্থনীতির আসল মাহাত্ম্য। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় যেখানে সুদ সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঘটায়, জাকাত সেখানে সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করে বাজারকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে। বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট। মুদ্রাস্ফীতির ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ, যাদের প্রকৃত আয় কমছে এবং ভোগের পরিমাণ সংকুচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জাকাত ভিত্তিক একটি শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। যখন রাষ্ট্র তার সীমিত সম্পদ দিয়ে বিশাল জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন জাকাত হতে পারে একটি বেসরকারি এবং ধর্মীয় দায়বদ্ধতা থেকে আসা বিকল্প অর্থায়ন। ২০২৬ সালের দিকে আমরা যখন এলডিসি থেকে চূড়ান্তভাবে উত্তরণ লাভ করব, তখন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর অনুদান বা সহজ শর্তের ঋণ অনেক কমে যাবে। সেই কঠিন সময়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের জন্য জাকাত ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ছাড়া আমাদের হাতে খুব বেশি বিকল্প থাকবে না। যদি আমরা এখনই একটি সঠিক আইনি কাঠামো এবং মানুষের আস্থার জায়গা তৈরি করতে না পারি, তবে সম্পদের এই বিশাল সম্ভাবনাটি চিরকালই অব্যবহৃত থেকে যাবে। সাধারণ মানুষের মনে একটি বড় সংশয় থাকে যে, জাকাতের টাকা সঠিক খাতে ব্যয় হচ্ছে কিনা বা এর মধ্যে কোনো দুর্নীতি প্রবেশ করছে কিনা। এই আস্থাহীনতা দূর করার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্লকচেইন ভিত্তিক ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে, যাতে দাতা দেখতে পারেন তার দেওয়া অর্থ ঠিক কার কাছে পৌঁছাচ্ছে। জাতীয় বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরকার প্রতি বছর দেশি ও বিদেশি ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করে, যার সুদের বোঝা বইতে হয় সাধারণ জনগণকে। যদি একটি প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অর্থায়ন করা যেত, তবে রাষ্ট্রের ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা অনেক কমে আসত। জাকাত কেবল একটি ধর্মীয় বিধান নয়, এটি একটি সামাজিক কর ব্যবস্থা যা সরাসরি সম্পদশালীদের কাছ থেকে নিয়ে বিত্তহীনদের দেওয়া হয়। বর্তমান কর ব্যবস্থায় আমরা দেখি যে, সাধারণ মানুষের ওপর ভ্যাট বা পরোক্ষ করের বোঝা বেশি থাকে, যা প্রকারান্তরে বৈষম্য বাড়ায়। জাকাত ব্যবস্থা এ অসামঞ্জস্যতা দূর করার জন্য একটি আদর্শ মডেল। এটি সম্পদকে অলস ফেলে রাখতে নিরুৎসাহিত করে এবং অর্থনীতিতে অর্থের গতিশীলতা বজায় রাখে। সামষ্টিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে অর্থের বেগ বা ‘ভেলোসিটি অফ মানি’ যত বেশি হয়, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তত বেশি সম্প্রসারিত হয়। জাকাত যেহেতু সম্পদের আড়াই শতাংশ প্রতি বছর বাধ্যতামূলকভাবে খরচ করার নির্দেশ দেয়, সেহেতু এটি পুঁজিবাদীদের বাধ্য করে তাদের সম্পদকে বিনিয়োগে খাটাতে। এর ফলে নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে এবং বেকার সমস্যার সমাধান হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাকাত ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চিন্তার সমন্বয়হীনতা। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ সরকারের জাকাত তহবিলের চেয়ে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত কোনো প্রতিষ্ঠানে অর্থ দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এই প্রবণতা পরিবর্তনের জন্য সরকারকে উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে থাকা জাকাত বোর্ডকে আরও স্বায়ত্তশাসিত ও শক্তিশালী করতে হবে যেখানে অর্থনীতিবিদ, আলেম এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকবে। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে একটি আঞ্চলিক মডেলও চিন্তা করা যেতে পারে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে যেখানে এখনো দারিদ্র্যের হার শহরের তুলনায় অনেক বেশি, সেখানে জাকাত ভিত্তিক সমবায় ব্যবস্থা চালু করা গেলে কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা যারা মহাজনী ঋণের জালে পিষ্ট হন, জাকাতের অর্থ দিয়ে তাদের কৃষি উপকরণ সরবরাহ করলে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। পবিত্র রমজান এবং ঈদুল ফিতরের এই সময়ে আমরা যদি হৃদয়ের প্রসারতা দিয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্যের দিকে তাকাই, তবে দেখব যে জাকাত ব্যবস্থা কেবল পরকালীন মুক্তির উপায় নয়, বরং এটি ইহকালীন মুক্তিরও এক অনন্য চাবিকাঠি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। যে প্রবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের পেটে ক্ষুধা রেখে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখে, সেই প্রবৃদ্ধি টেকসই হতে পারে না। জাকাত ভিত্তিক একটি শক্তিশালী সামাজিক কাঠামো তৈরি করা গেলে তা হবে দারিদ্র্য বিমোচনের সবচেয়ে কার্যকর ও সস্তা মডেল। এটি কোনো দয়া নয়, বরং বিত্তহীনদের প্রাপ্য অধিকার। এই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রকে যেমন নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ নিতে হবে, তেমনি সম্পদশালীদের মাঝেও চেতনার উন্মেষ ঘটতে হবে।  আমরা যদি একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর জাকাত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে অভাবের গ্লানি চিরতরে মুছে যাবে। সাম্যের সেই সুদিন দেখার প্রত্যাশায় আমাদের অর্থনৈতিক নীতিমালায় জাকাতকে একটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার নয়, বরং নৈতিক অপরিহার্যতায় পরিণত হয়েছে। আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কতটা সাহসের সাথে এ ধরনের মৌলিক সংস্কার গ্রহণ করতে পারছি তার ওপর। জাকাত হোক আমাদের দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের অন্যতম কারিগর।

পোল্ট্রি খাতে অস্থিরতা

পোল্ট্রি খাতে অস্থিরতা

টানা চার মাস ধরে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন দেশের প্রান্তিক পোলট্রি খামারিরা। দেশের সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দৈনিক পণ্যমূল্যের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সম্প্রতি রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি হালি ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ৩৬-৪০ টাকা। আর মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা হলো, প্রতিটি ডিম উৎপাদনে যেখানে খরচ পড়ছে প্রায় সাড়ে ৯ টাকা, সেখানে খামারিদের বিক্রি করতে হচ্ছে সাড়ে ছয় টাকার মতো দামে। ফলে প্রতিটি ডিমেই প্রায় তিন টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। অথচ সেই ডিম আড়ত হয়ে খুচরা বাজারে সাধারণ ভোক্তাকে ১১ টাকায় কিনে খেতে হচ্ছে। এছাড়া প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে ১৮০-১৯০ এবং এক মাস আগে ১৭০-১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।  পোল্ট্রি খাতে দিনের পর দিন এই লোকসান টেনে নেওয়া, ঋণের চাপ, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া, কর্মচারীর বেতন– সব মিলিয়ে প্রান্তিক খামারিদের জীবন এখন অনিশ্চয়তার দোলাচলে। অনেকে খামার গুটিয়ে ফেলেছেন, কেউ অন্য পেশায় চলে গেছেন। আবার কেউ ঋণের চাপে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে থাকছেন।  ছোট খামারিদের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তারা দ্রুত লোকসানে পড়েন। বড় বাণিজ্যিক খামার সহজে ঋণ ও সরকারি সুবিধা পায়। কিন্তু প্রান্তিক খামারিরা তা পান না। ফলে তারা একবার ক্ষতির মুখে পড়লে আবার উৎপাদনে ফিরতে পারেন না। বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য রোধ করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারগুলো টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্যে একদিকে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে বাড়তি মূল্যে ডিম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রেতা। যদি ছোট খামারগুলো বন্ধ হয়ে যায় তাহলে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ডিম ও মুরগির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। এতে ভবিষ্যতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে সরাসরি ভোক্তার ওপর।  পোলট্রি খাত গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। দুই দশকের বেশি সময় প্রান্তিক খামারিদের পরিশ্রমের কারণেই দেশের মানুষ তুলনামূলক কম দামে ডিম ও মুরগি খেতে পেরেছেন। অথচ আজ তারাই সবচেয়ে বেশি সংকটে। বাজারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য নির্ধারণ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো না গেলে ছোট খামারিরা দ্রুত ঝরে পড়বে এমনটাই স্বাভাবিক। খামারিদের অভিযোগ, পোলট্রি খাত নিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর নীতিমালা নেই। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রেও জানা যায়, আগের তুলনায় দেশে পোলট্রি খামারের সংখ্যা কমেছে।  খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে খাতটি সুরক্ষা পাবে। তাছাড়া প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিমের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ, স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমানো, পোলট্রি খামারিদের জন্য কৃষক কার্ড ও ভর্তুকি এবং ছোট খামারিদের জন্য আলাদা নীতিগত সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।

গ্যাস সংকটে আশার আলো

গ্যাস সংকটে আশার আলো

কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্রের ৫ নম্বর কূপ থেকে পরীক্ষামূলক গ্যাস উত্তোলনের মধ্য দিয়ে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে আরো ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। উল্লেখ্য, শনিবার এই কূপ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় গ্রিডে শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্রের পাঁচটি কূপ থেকে প্রতিদিন ১৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে, যা এ সময়ে অর্থাৎ ভয়াবহ গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে দেখা দিয়েছে আশার আলো হয়ে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল কর্তৃক যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা তথা যুদ্ধাবস্থায় সারাবিশ্বে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি, এলপিজিসহ সবরকম জ্বালানির দাম বর্তমানে ঊর্ধ্বমুখী। এর পাশাপাশি ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে জ্বালানি বিশ্বে।  বাংলাদেশও এই সংকটের বাইরে নয়। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে জ্বালানি তেল ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে দেখা যায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রতীক্ষা। অনেক স্টেশনে তেল ও পাওয়া যায় না। এ নিয়ে হাতাহাতি, মারামারিসহ একাধিক হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। গ্যাসের অভাবে কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাসাবাড়িতে চলছে গ্যাস সংকট। দেখা দিয়েছে লোডশেডিং। গ্যাসের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিল্প-কারখানার উৎপাদন। চড়ামূল্য এবং পরিবহন সংকটে আন্তর্জাতিক বাজার থেকেও জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানিতে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। এমতাবস্থায় ভোলাসহ দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করে চাহিদা মেটানোর বিকল্প নেই। এর পাশাপাশি সবিশেষ মনোযোগ দিতে হবে নতুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানসহ নতুন কূপ খননের দিকে।  গ্যাস সংকটের কথা স্বীকার করেছেন সাবেক বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীও। তবে কোনো আশ্বাসের বাণী শোনাতে পারেননি কেবল দুঃখ প্রকাশ ব্যতিরেকে। মার্চ মাস নাগাদ গ্যাস সংকটের সমাধান হতে পারে বলে জানিয়েছেন গণমাধ্যমে। এর পাশাপাশি বলেছেন, ২০২৬ সাল নাগাদ নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে, পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায় গত ১ নভেম্বর থেকে চট্টগ্রামের ভাসমান আমদানীকৃত দুটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ রয়েছে। এলএনজি প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তরিত করে পাইপলাইনে সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের স্থলে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলেও দেখা দিয়েছে গ্যাস সংকট। উল্লেখ্য, এ সংকট দীর্ঘদিন থেকে চলমান। এর জন্য তিতাসের সিস্টেম লসসহ অনিয়ম-দুর্নীতি এবং অবৈধ গ্যাস সংযোগ কম দায়ী নয় কোনো অংশে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে অনেক স্থানে গ্যাসের চাপ এবং সরবরাহ প্রায় সময়ই স্বাভাবিক থাকে না। দিনরাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা বন্ধ থাকে গ্যাস সরবরাহ। অথচ গ্রাহকদের বর্ধিত হারে গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হয় প্রতি মাসে। সিলিন্ডার গ্যাসের দামও চড়া- প্রায় লাগামহীন। বাড়তি উপদ্রব হিসেবে রয়েছে যখন-তখন তিতাসের পাইপলাইন রক্ষণাবেক্ষণের নামে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা। দৈনিক প্রায় ৪০০ ঘনফুট গ্যাসের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ২৭০ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে এসব স্থানে। ফলে গ্যাস সংকট খুব সহসাই কাটবে বলে মনে হয় না।

সোনালি আঁশে স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ

সোনালি আঁশে স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ

পাট বাংলাদেশের সোনালি আঁশ। বর্তমানে দেশে পাটচাষির সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় চার কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সংস্থান হচ্ছে পাট চাষে। পাট শিল্পে ও পাটপণ্য রপ্তানির কাজে জড়িত আছেন প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার শ্রমিক। জিডিপিতে পাটের অবদান প্রায় শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ। কৃষি জিডিপিতে পাটের শরিকানা প্রায় ১ শতাংশ। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ২ শতাংশ উপার্জন হয় পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি থেকে। তৈরি পোশাক শিল্পের পর এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। পাট থেকে আহরিত মোট বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে কাঁচা পাট রপ্তানি থেকে। এক সময় পাট ও পাটজাত পণ্যই ছিল বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত। পাট থেকে আহরিত মোট বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে কাঁচা পাট রপ্তানি থেকে। এক সময় পাট ও পাটজাত পণ্যই ছিল বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ সালে মোট বৈদেশিক আয়ে পাটের অংশ ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ১ দশমিক ৮৮ শতাংশে। ১৯৫৮ সালে এ দেশে সাদা পাটের আওতাধীন জমির পরিমাণ ছিল শতকরা ৭৫ দশমিক ৪৮ ভাগ এবং তোষা ২৪ দশমিক ৫২ ভাগ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তোষা পাট শতকরা প্রায় ৮৯ ভাগ, সাদা পাট প্রায় ৪ ভাগ এবং মেস্তা ও কেনাফ প্রায় ৭ ভাগ জমিতে চাষ করা হয়। তোষা পাটের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ১৩ দশমিক ৬৪ বেল, সাদা পাটের উৎপাদন ৯ দশমিক ৭৩ বেল এবং মেস্তা ও কেনাফের গড় উৎপাদন ১০ দশমিক শূন্য ৬ বেল। সারা দেশে হেক্টরপ্রতি পাটের গড় উৎপাদন ১৩ দশমিক ২৪ বেল। নব্বইয়ের দশকে এ দেশে পাটের চাষ হতো প্রায় ১২ লাখ হেক্টর জমিতে। ক্রমেই তা নেমে আসে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ হেক্টরে। স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ এক সংবাদ সম্মেলনে সম্প্রতি পাটপ্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম ছয় মাসে বিগত সময়ের চেয়ে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। এ সময়ে রপ্তানি হয়েছে ৪১৮ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।’ তিনি বলেন, ‘পাটশিল্পের উন্নয়ন মানেই রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতির সমৃদ্ধি। দেশে যখন পাট ও পাটজাত পণ্য নিয়ে এ ধরনের স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, ঠিক তখন শুক্রবার (৬ মার্চ) ‘পাটশিল্প গড়ে তুলুন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করুন’ প্রতিপাদ্যে পালিত হয়েছে জাতীয় পাট দিবস। দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বহুমুখী পাট মেলা ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। উৎপাদন ও রপ্তানির চালচিত্র ২০১৬ সালে ১৭ দশমিক ৮৫ একর জমির আবাদ থেকে উৎপাদিত হয়েছিল ১৫ দশমিক ৪৯ লাখ মেট্রিক টন পাট। ২০২১ সালে জমির পরিমাণ বেড়ে ২৩ দশমিক ৭৯ লাখে একরে উন্নীত হয়। কিন্তু সেবার জমির পরিমাণ বাড়লেও পাটের উৎপাদন নেমে এসেছিল ১৪ দশমিক ০৯ লাখ মেট্রিক টনে। ২০২৫ সালে পাটের আবাদ হয় ১৬ দশমিক ৮২ একর। উৎপাদন ছিল ১৫ দশমিক ১৫ লাখ মেট্রিক টন। তবে উৎপাদন কমলেও এই এক দশকে পাটের গড় বাজারমূল্য বেড়েছে। ২০১৬ সালে প্রতি কেজি পাটের গড় বাজারমূল্য ছিল ৪০ দশমিক ৫৮ টাকা। ২০২৫ সালে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৭৮ দশমিক ৪৮ টাকায়। অর্থাৎ, দাম দ্বিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাঁচা পাট, পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে থাকে। বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন ও পাট অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত ২০২৪- ২০২৫ অর্থবছরে ১২টি দেশে কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে। ১২টি দেশের মধ্যে রয়েছে- ভারত, পাকিস্তান, চীন, নেপাল, ব্রাজিল, যুক্তরাজ্য, ভিয়েতনাম, তিউনিশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, আইভরি কোস্ট, যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড। তবে অনেক দেশেই বর্তমানে পাট রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। পাট অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অক্টোবরে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, চীন, ব্রাজিল, ইউকে, তিউনিশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ৮০ হাজার ৭৪০ বেল কাঁচাপাট রপ্তানি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাঁচা পাট রপ্তানি হয় ২ দশমিক ২৯ টন, আয় হয় ১৭৮১.৭৬ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয় ৬.৪৩ লাখ টন ও আয় হয় ৮০৯৫.২০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) চেয়ারম্যান খন্দকার আলমগীর কবির বলেন, ‘বিগত অন্তর্বর্তী সরকার কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। অল্প কিছু দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এতে পাটের বাজারে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। আমরা চাই কাঁচাপাট রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হোক।’ পাট খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘দেশে বর্তমানে ৪০টির মতো পাটকল চালু আছে। যদিও সরকারি হিসাবে সেটি দুই শতাধিক বলা হয়। তবে আমরা চাই অন্য পাটকলগুলোও চালু করা হোক। কেননা বিশ্বে পাটের চাহিদা রয়েছে; কিন্তু সেই তুলনায় আমরা রপ্তানি করতে পারছি না।’ তিনি বর্তমান সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘বর্তমানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে। বিএনপি কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যের রপ্তানির বিষয়ে নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমরা চাই পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির ওপর যেসব বিধিনিষেধ বিগত সরকার দিয়ে গেছে তা তুলে নেওয়া হোক।’ তিনি বলেন, ‘পাটকলসহ অন্য কলকারখানাগুলো চালু করতে পারলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পাটের বাজারদরও বাড়বে। বর্তমানে এক মণ পাট উৎপাদনে কৃষকের খরচ ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা। এই পাট তারা ৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করতে পারে। এ দাম আরও বাড়ালে কৃষকের পাট চাষে আগ্রহ বাড়বে।’ মাঠ গবেষনার ফলাফল মাঠ গবেষণায় দেখা যায় কসময় রংপুর অঞ্চলের অর্থনীতির মূল প্রাণ ছিল পাট। কিন্তু এখন সেই ঐতিহ্য হারাচ্ছে। গত ২০ বছরে পাট চাষ কমেছে প্রায় ৭০%। ফলে হাজার হাজার কৃষক বেকার হয়েছেন। এর প্রধান কারণ বন্যা, ভালো বীজের অভাব এবং বাজারের অনিশ্চয়তা। তবে এবার নতুন পাট বাজারে ওঠায় এবং ভালো দাম পাওয়ায় কৃষক খুশি। রংপুর কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর (খরিফ-১ মৌসুমে) রংপুর বিভাগের আট জেলার (রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী) মোট ৫৪ হাজার ৬৬৯ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। প্রত্যাশা, ৭ লাখ ৯ হাজার ৭৯৯ বেল পাট উৎপাদন হবে। উল্লেখ্য, গত তিন বছরে এই অঞ্চলে প্রতি বছর গড়ে দুই শ’ থেকে চার শ’ হেক্টর জমিতে পাট চাষ কমেছে। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী জেলায় মোট ৫১ হাজার ৬২৭ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছিল। এ উৎপাদনে প্রায় ৭০ হাজার কৃষক যুক্ত ছিলেন। ২০২২ সালে, ৫৬ হাজার ৪১২ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়। প্রায় ৭৫ হাজার কৃষক এতে জড়িত ছিলেন। গত ১০ বছরে এই অঞ্চলে পাট চাষের পরিমাণ প্রায় ৪০% কমেছে। আর গত ২০ বছরের হিসাবে এই হ্রাসের পরিমাণ ৭০%। পাট চাষ কৃষি শ্রমিকদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করে। কৃষকরা পাট কাটার পর আমন ধানের চারা রোপণ করেন। এরপর প্রায় এক থেকে দেড় মাস তাদের হাতে কোনো কাজ থাকে না। এই সময়ে পাট জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ করে কৃষি শ্রমিকরা কর্মসংস্থান পান। তবে পাট চাষ কমে যাওয়ায় কাজের সুযোগও কমে গেছে। কৃষি শ্রমিকের বাজারও ছোট হয়ে আসছে। তবে আশার কথা, এই বছর নতুন পাট বাজারে উঠতে শুরু করেছে। প্রতি মণ পাট মানভেদে ৩,০০০ থেকে ৩,২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে কৃষকরা কিছুটা লাভবান হচ্ছেন। এছাড়াও, প্রতি মণ পাটকাঠি ৭০০ থেকে ১,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাটকাঠি এখন আর শুধু জ্বালানি নয়, এটি শিল্পের কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। পাটকাঠি দিয়ে হার্ডবোর্ড তৈরি হয়। এছাড়াও, বিশেষ প্রক্রিয়ায় পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করা হয়, যা গুঁড়ো করে কার্বন ও ডিজিটাল প্রিন্টারের কালি বানানো হয়। পাট চাষ এখন কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক ফসল। রংপুর পাট গবেষণা ও উন্নয়ন বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বন্যা, বীজের অভাব, পর্যাপ্ত পানির সংকট এবং বাজারের অনিশ্চয়তার কারণেই রংপুর বিভাগে পাট চাষের জমি ও উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে। আশার কথা হলো, চলতি খরিফ মৌসুমে উঁচু জমিতে পাট চাষের পর্যাপ্ত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনাবৃষ্টির কারণে পাট জাগ দেওয়া (পচানো) নিয়ে একসময় কৃষকের মনে ভয় ছিল। কিন্তু আষাঢ় মাসের শেষের দিকে বৃষ্টি হওয়ায় খাল-বিলে পানি জমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত পাট পচন নিয়ে বড় ধরনের কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। পাট গবেষণার ক্ষেত্রে এ নাগাদ সাদা পাটের ১২টি উচ্চফলনশীল জাত পাওয়া গেছে। তোষা পাটের আটটি, কেনাফের চারটি ও মেস্তার তিনটি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন ও অবমুক্ত করা হয়েছে। এগুলোর সম্প্রসারণ চলছে মাঠ পর্যায়ে। পাটের বহুমাত্রিক অবদান বিশ্বে আমাদের দেশের পাট সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। তবে কাঁচাপাট রপ্তানি বিগত সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল। কেননা, কয়েকটি দেশ আমাদের কাঁচা পাট নিয়ে পণ্য তৈরি করে বেশি দামে বিক্রি করে। তবে দেশীয় শিল্প ও পাটকল এবং অন্যান্য কলকারখানায় পাটের চাহিদা বেড়ে যাওয়াও রপ্তানি বন্ধ থাকার একটি কারণ। ‘বন্ধ থাকা সরকারি পাটকলগুলো বেসরকারিভাবে লিজভিত্তিক চালু করা হচ্ছে। ২৫টির মধ্যে ২০টি লিজের জন্য ধার্য করা হয়েছে, ৫টি লিজ দেওয়া হয়েছে। আর বেসরকারি পর্যায়ে ২৬৬টি পাটকল রয়েছে। সেখানে ৯৩টি বন্ধ আছে। তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পাটশিল্প বড় অবদান রাখবে, এমন প্রত্যাশা। দেশের ৪ ভাগের এক ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাটশিল্পের সঙ্গে জড়িত। পাট দিয়ে বহুমুখী পণ্য তৈরি করা যায়। বর্তমানে আমরা দেশে ২৮২ ধরনের পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করছে। আমাদের কৃষকরা যদি ভালো দাম পায় তাহলে তারা পাট চাষে মনোযোগ দেবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা পাটের স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনতে পাট খাতের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পাট খাতকে উজ্জীবিত করতে স্বল্প ও মধ্য-মেয়াদি কার্যক্রম পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। স্বল্প মেয়াদি কর্মপরিকল্পনায় পাট অধিদপ্তরের ১৫ প্রকার লাইসেন্স অনলাইন সেবাদান, পাট আইন সংশোধন, পাট খাতে বিশেষ প্রণোদনা, জুট পোর্টাল তৈরির মতো কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনায় ইন্ডাস্ট্রিজ-একাডেমি কলাবরেশন বৃদ্ধি, পৃথক টাস্কফোর্স গঠন, জুট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাস্টার-পাট খাতের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা, গোল্ডেন ফাইবার অব বাংলাদেশ নামে ব্র্যান্ডিংয়ের মতো বিভিন্ন কার্যপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার।’ বর্তমানে পাটের গড় ফলনে পৃথিবীর পাট উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই বেশি। এর পেছনে কৃষি বিজ্ঞানী এবং বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের অবদান অনস্বীকার্য। সম্প্রতি পাটের বংশগতিবিন্যাস (জেনোম সিকুয়েন্স) উদ্ভাবন হয়েছে। তাতে রোগ ও পোকা প্রতিরোধক আরও উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে। এখন আমাদের এমন পাটের জাত উদ্ভাবন করতে হবে যা খরা, লবণাক্ততা ও শীতসহিষ্ণু। সারা বছর উৎপাদন উপযোগী পাটজাত উদ্ভাবন এখন সময়ের দাবি। এরই মধ্যে বছরে দুবার অর্থাৎ, ফেব্রুয়ারি ও মে মাসে পাট বোনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাতে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। তবে গবেষণার মাঠে নতুন উদ্ভাবিত পাট জাতের ফলন যত বেশি, কৃষকের মাঠে তত বেশি নয়। গবেষণা ও কৃষকের মাঠে প্রাপ্ত উৎপাদনে প্রায় ৪০ শতাংশ ফারাক বিদ্যমান। এটি কমাতে হবে। এর জন্য গবেষণা ও সম্প্রসারণের মধ্যে জোরালো সমন্বয় প্রয়োজন। পাট গবেষণা ও সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সচেষ্ট হতে হবে। পাট সংশ্লিষ্ট শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে। লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ ও  গবেষক