আল কুদস-দিবস উপলক্ষে শুক্রবার ইরানজুড়ে বিশাল জনসমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়
ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নেওয়া একটি মার্কিন সামরিক রিফুয়েলিং বিমান ইরাকে বিধ্বস্ত হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং বিমানে ছয়জন ক্রু ছিলেন। তারা সবাই নিহত হয়েছেন। এই ঘটনার তদন্ত চলছে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের জনগণের প্রতি মার্কিন সেনাদের অবস্থান জানাতে আহ্বান জানিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) গোয়েন্দা শাখা। আইআরজিসির গোয়েন্দা শাখার এক বিবৃতিতে বলা হয়, হাজার হাজার মার্কিন সেনা হোটেল ও ব্যক্তিগত আবাসনে বা বাসাবাড়িতে অবস্থান করছে। ওয়াশিংটন ইরানের আরব ভাইদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করা হয় বিবৃতিতে। আইআরজিসি শুক্রবার দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক বিবৃতিতে জানায়, সরকারবিরোধী নতুন কোনো বিক্ষোভ দমনে গত জানুয়ারির চেয়েও আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে ইরানে হওয়া বিক্ষোভে ৭ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলী লারিজানি বলেছেন, ইরানের বিদ্যুৎ সরবরাহ নেটওয়ার্কে যদি যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায় তাহলে পুরো অঞ্চল অন্ধকারে ডুবে যাবে।
শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানে আগামী সপ্তাহের মধ্যে কঠোর আঘাত হানা হবে। অন্যদিকে ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে জার্মানি কোনো যুদ্ধে জড়াতে চায় না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মেয়ার্জ। খবর বিবিসি, আলজাজিরা ও তাসনিম নিউজের।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে, শত্রু পক্ষের গুলির কোনো ঘটনা ঘটেনি। ঘটনায় দুটি বিমান জড়িত ছিল। এর মধ্যে একটি নিরাপদে অবতরণ করে এবং অন্যটি পশ্চিম ইরাকে বিধ্বস্ত হয়। তবে সেন্টকমের এই বার্তার কিছু সময় পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে বিমানটি ভূপাতিত করার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেয় ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট দ্য ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক। টেলিগ্রাম পোস্টে দ্য ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স দাবি করে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) ব্যবহারের মাধ্যমে জোটের যোদ্ধারা বিমানটিকে ভূপাতিত করেছে। তবে ওয়াশিংটন এই দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ঘটনায় জড়িত অন্য বিমানটিও একটি কেসি-১৩৫ ট্যাঙ্কার ছিল। সেন্টকম জানায়, পরিস্থিতি অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও তথ্য প্রকাশ করা হবে। আমরা অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ এবং সেনা সদস্যদের পরিবারের জন্য স্পষ্টতা দিতে কিছুটা ধৈর্য ধরার অনুরোধ করছি। আইআরজিসির এক বার্তায় বলা হয়েছে, আমরা বাধ্য হচ্ছি আমেরিকানদের শনাক্ত করতে এবং লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের হোটেলগুলোতে তাদের আশ্রয় না দেওয়াই ভালো এবং তাদের অবস্থান থেকে অন্যদের দূরে থাকা উচিত। এতে আরও বলা হয়, মার্কিন সেনাদের লুকিয়ে থাকার জায়গাগুলো সঠিকভাবে জানানো আপনার (মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ জনগণ) ইসলামী দায়িত্ব।
সেই তথ্য আমাদের কাছে টেলিগ্রামে পাঠিয়ে দিন। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আমরা এক ঘণ্টার মধ্যে ইরানের বিদ্যুৎ সক্ষমতা ধ্বংস করে দিতে পারি, কিন্তু এখনো তা করিনি। এর জবাবে লারিজানি বলেন, তারা যদি এমনটি করে তবে আধা ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে পুরো অঞ্চল অন্ধকার হয়ে যাবে। আর সেই অন্ধকার নিরাপত্তার জন্য পালিয়ে বেড়ানো মার্কিন সেনাদের খুঁজে বের করার মোক্ষম সুযোগ করে দেবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগে জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো থেকে বিরত রয়েছে। ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি পার হতে বিভিন্ন দেশের জাহাজগুলোকে রক্ষা করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ ভালোভাবে এগিয়ে যাবে। ট্রাম্প ইরান প্রসঙ্গে দোলাচলে আছেন, যদিও তিনি ইরানের সামরিক ক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রশংসা করেছেন। তবে তিনি দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে পারছেন না। এর আগে গত বুধবার কেন্টাকির হেবরনে ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, আমরা জিতেছি। কিন্তু কাজ শেষ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে এ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। এদিকে ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলে আঘাত হেনেছে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এ ঘটনায় অন্তত ৫৮ জন আহত ও বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, শুক্রবার স্থানীয় সময় ভোরে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।
ইসরাইলের জরুরি সেবা সংস্থা মাগেন ডেভিড অ্যাডম (এমডিএ) জানিয়েছে, আহত সবাইকে নিকটবর্তী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে। ইসরাইলের ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ বিভাগ বলেছে, উত্তরাঞ্চলীয় শহর জারজিরের একটি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হানলে সেখানে উদ্ধারকাজে অংশ নেয় তারা। এতে বেশ কিছু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও অগ্নিকাণ্ড ঘটে। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। ইসরাইলের জরুরি সেবা সংস্থা এমডিএ জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে ৩৪ বছর বয়নি একজন নারী রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই জাতিসংঘের বৈঠকে পরমাণু ইস্যুতে ইরানের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ঠেকাতে পারেনি চীন ও রাশিয়া। শুক্রবার বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হয় মস্কো-বেজিংয়ের। যদিও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় তারা। নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য দেশের মধ্যে ১০টি দেশ বৈঠকের পক্ষে ভোট দেয়। ভোটদানে বিরত থাকে পাকিস্তান ও সোমালিয়া। এদিকে লেবাননের সরকারকে আবারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ। তিনি বলেছেন, লেবানন সরকার হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র না করলে ইসরাইল দেশটির বিরুদ্ধে হামলা আরও জোরদার করবে। শুক্রবার লেবাননের লিতানি নদীর ওপর একটি সেতু ইসরাইলি সামরিক হামলায় ধ্বংস হওয়ার পর কাটজ বলেন, এটা শুধু শুরু মাত্র।
ইসরাইলের ওয়াইনেট নিউজে প্রকাশিত মন্তব্যে তিনি বলেন, লেবাননের সরকার হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ব্যর্থ এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে। হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হলে দেশটির জাতীয় অবকাঠামোর ক্ষতির মাধ্যমে চড়া মূল দিতে হবে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, তার দেশ আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। কারণ এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং দুই সপ্তাহের হামলায় প্রচণ্ড আঘাতের মুখোমুখি হয়েছে। শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, ইসরাইলি হামলায় ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী নিহত হয়েছেন এবং ইসলামিক রেভ্যুলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং বাসিজ বাহিনীর মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। ইরান আর আগের ইরান নেই। নেতানিয়াহু বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলা ইরানকে তার পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক প্রকল্পগুলোকে ভূগর্ভস্থ স্থানান্তরে বাধা দিয়েছে। ইরানের নবনির্বাচিত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এবং হিজবুল্লাহর নেতা নাইম কাসেম সম্পর্কে জানতে চাইলে নেতানিয়াহু বলেন, তিনি উভয় ব্যক্তির জন্যই কোনো লাইফ ইন্স্যুরেন্স নেবেন না। ইরানের দক্ষিণের হরমজগান প্রদেশের মিনাব শহরের একটি প্রাইমারি স্কুলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নির্বিচার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ২ লাখ ডলার অনুদানের ঘোষণা দিয়েছে চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জরুরি মানবিক সহায়তা হিসেবে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিকে ২ লাখ ডলার দেবে চীনের রেড ক্রস সোসাইটি।
এই অর্থ নিহত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের প্রতি সমবেদনা ও ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ সামরিক আগ্রাসন শুরু করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। ওইদিন ইরানের মিনাবে ওই স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭৫ জন নিহত হয়। যাদের বেশিরভাগই শিশু শিক্ষার্থী। এদিকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানানোর বার্ষিক আন্তর্জাতিক কর্মসূচি আল কুদস দিবস উপলক্ষে ইরানের রাজধানী তেহরানে লাখ লাখ মানুষের মিছিলের মধ্যে একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের ১৪তম দিন শুক্রবার আল-কুদস দিবস উপলক্ষে ইরানজুড়ে বিশাল জনসমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। দেশটির ছোট-বড় বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ এ কর্মসূচিতে অংশ নেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে- রাজধানী তেহরান ছাড়াও খোররামাবাদ, ইস্ফাহান, গোলেস্তান, ইয়াজদ, মাশহাদ এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জাহেদান শহরে বিপুল মানুষ পতাকা হাতে মিছিলে অংশ নেন। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের হাতে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এবং তার নিহত বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি দেখা যায়। এর মধ্যেই বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে রাজধানী তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১২ দিনে ইরানে ২৪ হাজার ৫৩১টি বেসামরিক স্থাপনা সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থা রেড ক্রিসেন্টের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ইরানের সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ইরনা। ক্ষতিগ্রস্ত এসব বেসামরিক স্থাপনার অধিকাংশই বাড়িঘর। ইরনার প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুসারে, ধ্বংস হওয়া এই ২৪ হাজার ৫৩১টি বেসামরিক স্থাপনার মধ্যে বাড়িঘর ও অ্যাপার্টমেন্ট ভবন আছে ১৯ হাজার ৭৭৫টি। দোকানপাট, বাণিজ্য-অর্থনৈতিক কেন্দ্র আছে ৪ হাজার ৫১১টি। স্কুল ৬৯টি, রেড ক্রিসেন্ট কেন্দ্র ১৬টি, উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত যানবাহন ২১টি এবং ১৯টি অ্যাম্বুলেন্স আছে। এ ছাড়া গত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ২ শতাধিক মানুষ, আহত হয়েছেন আরও কয়েক হাজার।
প্যানেল / জোবায়ের








