দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে থার্ড টার্মিনাল চালুর জট খুলেছে। যে ইস্যুতে বিগত দুবছরের আলোচনায় কোনো ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, শুক্রবার তাতে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। এ বিষয়ে ঢাকা ও টোকিও আন্তরিক মনোভাব প্রকাশ করে বড় ধরনের অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছে। যার শানে নুজুল হচ্ছে- রাজস্ব বণ্টনের সব মতপার্থক্য নিরসন করেই থার্ড টার্মিনাল অপারেট করার দায়িত্ব পাচ্ছে জাপানই। এতে কোনো সন্দেহ বা বিতর্কের অবকাশ নেই। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে- মূলত থার্ড টার্মিনাল অপারেট করার জন্য জাপানের সঙ্গে রাজস্ব বন্টনের ইস্যুটাই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। এটা নিয়ে বিগত দু বছরেরও আলোচনাতেও কোনো সুরাহা হয়নি। এই চালুর শর্তে- প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে জাপান অপারেটর হিসেবে ১২ ডলার চার্জ আদায়ের প্রস্তাব দেয়। ঢাকা তাতে কিছুতেই রাজি হয়নি। কেন না বর্তমানে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৫ শ’ টাকা এম্বারকেশন চার্জ আদায় করা হয়। এটা থার্ড টার্মিনালে ১২ ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় সেটা দেড় হাজার
টাকার ওপরে নিতে চাচ্ছে জাপাান। কিন্তু জাপানের এই প্রস্তাবে ঢাকার তীব্র আপত্তির মুখে শুক্রবারের বৈঠকে নতুন করে প্রস্তাব চাওয়া হয়। এটা যেন কিছুতেই ৮ ডলারের বেশি না হয় সেটার পক্ষে যৌক্তিক কারণ ব্যাখা করা হয়। জাপান তাতে অনেকটাই নমনীয়।
বৈঠকের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, থার্ড টার্র্মিনালের অনেকগুলো ইস্যু নিয়েই আলোচনা হয়েছে। তার মধ্যে প্রধান ইস্যু ছিল এম্বারকেশন ফি কত হবে সেটা আগে ঠিক করা। তারপর রাজস্ব বণ্টনের বিষয়টি ফয়সালা হবে। জাপানের আস্কিং রেট হচ্ছে- যাত্রী প্রতি ১২ ডলাল। কিন্তু বেবিচকের প্রস্তাব হচ্ছে এটা খুবই বেশি। এতে যাত্রীরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই চার্জ কিছুইে ৮ ডলারের বেশি হওয়া উচিত নয়। এতদিন জাপান তাতে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার মনোভাব প্রদর্শন করলেও আজকের বৈঠকে সংশোধিত প্রস্তাবে সাড়া দিতে রাজি হয়েছে। বৈঠকে বেবিচকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে জাপানের কাছ থেকে নতুন প্রস্তাব যখনই পাওয়া যাবে তখনই পরবর্তী ধাপের বা চূড়ান্ত সিদ্বান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। যদি আগামী ৭ দিনের মধ্যে জাপান প্রস্তাব দিতে পারে তাহলে তার পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে সেটা আরেক ধাপ এগিয়ে নিতে পারবে বেবিচক। এবং চলতি মাসেই এ বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে।
জানা গেছে, জাপান এখন যত দ্রুত নতুন প্রস্তাব পাঠাবে -ততই এটা দ্রুততার সঙ্গে স্বাক্ষরিত হবে। বেবিচক আশা করছে- আগামী মাসেই থার্ড টার্মিনাল চালুর কার্যাদেশ দেয়ার প্রস্তুতি চলছ। কার্যাদেশ দেওয়ার ৬ মাসের মধ্যেই থার্ড টার্মিনাল চালু করা সম্ভব হতে পারে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। অর্থাৎ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই চালুর উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বর্তমান পরিস্থিতিতে।
এদিন সকালে ঢাকার পররাষ্ট্রৃ মন্ত্রণালয়ে দুদেশের উচচ পর্যায়ের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন- বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা), পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, পররাষ্ট্রসচিব, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসরীন জাহান, বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক, সদস্য অপারেশন এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মাহবুব খান এবং জাপানের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস মিনিস্টার নাকায়ামা রিইকো, জাপান দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স তাকাহাশি নাওকি। বৈঠক শেষে উভয় পক্ষের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা সফল এবং দ্রত সমাধানের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
জানা গেছে, বৈঠকে জাপানের পক্ষ থেকে তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে উপস্থাপিত প্রস্তাব এবং বিমানবন্দরের এমবারকেশন ফি, রেভিনিউ শেয়ার এবং আপফ্রন্ট ফির বিষয়ে আলোচনা করা হয়। এ সময় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত জাপানের পক্ষ থেকে দ্রুত একটি রিভাইজড বা সংশোধিত প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানালে জাপান তাতে সম্মত হয়।
বৈঠক শেষে হুমায়ুন কবির বলেন, সরকার বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই বিষয়টি দেখছে। দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে এবং শীঘ্রই ভালো কোনো অগ্রগতি হবে বলে আশা করছি। সরকার যে স্লোগান ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনগণের ভোট পেয়েছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-সেই চেতনা থেকেই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। দেশের স্বার্থকে সামনে রেখে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করার চেষ্টা চলছে।
একই বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা সংক্রান্ত চুক্তিতে কয়েকটি চার্জ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে কিছু জটিলতা ছিল। এসব বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, সিভিল এভিয়েশন সংক্রান্ত চুক্তিতে সাধারণত তিন ধরনের চার্জ থাকে। এসব চার্জের কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল। বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশ পক্ষ তাদের প্রস্তাব দিয়েছে এবং জাপানও তাদের প্রস্তাব তুলে ধরেছে।
আলোচনায় উভয় পক্ষই এমন একটি সমাধানের দিকে যেতে চায়, যা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে। আগের কিছু চুক্তিতে যে ধরনের ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা ছিল, সেগুলো সংশোধন করে একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করতে সরকার কাজ করছে। জাপানের পক্ষ বাংলাদেশের দেওয়া প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করে দ্রুত সংশোধিত প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছে। সেই প্রস্তাব পাওয়ার পর আবারও আলোচনা করে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।
২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর এই টার্মিনালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের কাজ ৯৯ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হবার পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে সফট উদ্বোধন করা হয়। তারপর দু বছেেররও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও শুধু জাপানের সঙ্গে আলোচনায় ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ায় এটা চালু করা যায়নি। মূলত টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, পরিচালন নিয়ন্ত্রণ এবং আয়ের অংশীদারিত্ব নিয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার।
অভিযোগ রয়েছে-বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের একগুয়েমি মনোভাবের দরুন জাপান ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে আলোচনা থেকে সরে দাড়ায়। এমন জটিল পরিস্থিতিতে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই থার্ড টার্মিনাল চালুর বিষয়ে জোর গুরুত্ব দিয়ে জাপানের সঙ্গে বসার নির্দেশন প্রদান করেন। তারই ফলশ্রুতিতে শুক্রবার ঢাকায় এই উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে আশার আলো জ্বলে ওঠে।
বহুল আলোচিত এই থার্ড টার্মিনালের আয়তন দুই লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার। বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরের প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল দিয়ে বছরে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রী বহনের ধারণক্ষমতা রয়েছে। পাঁচ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটারের তৃতীয় টার্মিনালটি যুক্ত হলে বছরে ২ কোটি পর্যন্ত যাত্রীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। টার্মিনালটিতে একসঙ্গে ৩৭টি উড়োজাহাজ পার্কিং করা যাবে। ১৬টি ব্যাগেজ বেল্টসহ অত্যাধুনিক সব সুবিধা রয়েছে নতুন এ টার্মিনালে। এ ভবনের ভেতরে থাকবে পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য ও অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তির ছোঁয়া। এতে থাকবে বেশ কয়েকটি স্ট্রেইট এক্সকেলেটর। যারা বিমানবন্দরের দীর্ঘপথ হাঁটতে পারবেন না, তাদের জন্য এ ব্যবস্থা। সিঙ্গাপুর, ব্যাঙ্ককসহ বিশ্বের অত্যাধুনিক ও বেশি যাত্রী প্রবাহের বিমানবন্দরগুলোতে এ ধরনের এক্সকেলেটর ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এটি যাত্রীদের শান্ত ও মসৃণ যাত্রার অভিজ্ঞতা দেয়। নতুন এ টার্মিনালে যাত্রীদের ব্যাগের জন্য সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি ও ব্যাঙ্ককের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরের মতো অত্যাধুনিক তিনটি আলাদা স্টোরেজ এরিয়া করা হয়েছে। এগুলো হলো- রেগুলার ব্যাগেজ স্টোরেজ, লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড এবং ওড সাইজ (অতিরিক্ত ওজনের) ব্যাগেজ স্টোরেজ। যাত্রীদের স্বাভাবিক ওজনের ব্যাগেজের ১৬টি রেগুলার ব্যাগেজ বেল্ট থাকবে টার্মিনালটিতে। অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগেজের জন্য স্থাপন করা হয়েছে আরও চারটি পৃথক বেল্ট। টার্মিনালের প্রতিটি ওয়াশরুমের সামনে থাকবে একটি করে দৃষ্টিনন্দন বেবি কেয়ার লাউঞ্জ। এ লাউঞ্জের ভেতর মায়েদের জন্য ব্রেস্ট ফিডিং বুথ, ডায়াপার পরিবর্তনের জায়গা এবং একটি বড় পরিসরে ফ্যামিলি বাথরুম করা হয়েছে। এ ছাড়া বাচ্চাদের স্লিপার-দোলনাসহ একটি চিলড্রেন প্লে এরিয়াও রাখা হয়েছে এখানে। ইতোমধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে হেলথ ইন্সপেকশন রুম, প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ফার্স্ট-এইড রুম, করোনাসহ নানা রোগের টেস্টিং সেন্টার ও আইসোলেশন এরিয়া। অত্যাধুনিক এ টার্মিনাল ভবনে থাকবে ১০টি সেলফ চেক-ইন কিওস্ক (মেশিন)। এগুলোতে পাসপোর্ট ও টিকিটের তথ্য প্রবেশ করালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসবে বোর্ডিং পাস ও সিট নম্বর। এরপর নির্ধারিত জায়গায় যাত্রী তার লাগেজ রাখবেন। স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাগেজগুলো উড়োজাহাজের নির্ধারিত স্থানে চলে যাবে। তবে নির্ধারিত ৩০ কেজির বেশি ওজনের ব্যাগেজ নিয়ে এখানে চেক-ইন করা যাবে না। যাত্রীদের জন্য আরও ১০০টি চেক-ইন কাউন্টার থাকবে এ টার্মিনালে। অবসরে যাত্রীদের সময় কাটানোর জন্য নতুন এ টার্মিনালে শীঘ্রই করা হচ্ছে মুভি লাউঞ্জ, এয়ারলাইন্স লাউঞ্জ। এ দুই লাউঞ্জ বাদে অন্যান্য স্থাপনাগুলো ইতোমধ্যে বসানো হয়েছে। তবে পরীক্ষামূলকভাবে এখনো এগুলো চালানো হয়নি।
প্যানেল / জোবায়ের








