ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৪ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

বিশেষজ্ঞ মতে ৫-১০ বছরের সুস্পষ্ট লক্ষ্য, বাজেট বরাদ্দ কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন

নতুন সরকারের সামনে পরীক্ষা ডেঙ্গু দমন

আল জুবায়ের

প্রকাশিত: ২৩:১৫, ১৩ মার্চ ২০২৬

নতুন সরকারের সামনে পরীক্ষা ডেঙ্গু দমন

দেশে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর সমস্যা দীর্ঘদিনের। মশা ছোট প্রাণি হলেও এর কামড়ে প্রতিবছর শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। রোগটি দমনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বছরে বড় অঙ্কের বাজেট ব্যয় করেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়। বিশেষজ্ঞরা আগাম সতর্কবার্তা দিলেও তেমন আমলে নিতে দেখা যায়নি কাউকেই। এতে একদিকে যেমন মিলছে না সমাধান অন্যদিকে জনগণের অর্থ যাচ্ছে পানিতে, বাড়ছে ভোগান্তি আর মৃত্যু।
বিশেষজ্ঞ মতে, মশা নিয়ন্ত্রণণে মৌসুমি প্রকল্প হিসেবে নয় বরং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির স্থায়ী অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্তির পাশাপশি পাঁচ বছরের রোলিং অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করে নির্দিষ্ট সূচক ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিত। ধারাবাহিক বাজেট বরাদ্দ ছাড়া অবকাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাদের মতে, নতুন সরকারের উচিত একটি জাতীয় ডেঙ্গু ও আর্বোভাইরাস কৌশলপত্র প্রণয়ন করা, যেখানে পাঁচ থেকে দশ বছরের সুস্পষ্ট লক্ষ্য, বাজেট বরাদ্দ এবং কর্মপরিকল্পনা নির্ধারিত থাকবে। ডেঙ্গুকে জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংযুক্ত একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় বিএনপির অঙ্গীকার ॥
আগের সরকারের (আওয়ামী লীগ) দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপি ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে সরকারের অবহেলা ও দুর্নীতির ফল বলে সমালোচনা করেছিল। দলটির অভিযোগ ছিল ডেঙ্গু প্রতিরোধ নামে সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্যবিভাগ কোটি কোটি টাকা লোপাট করে কার্যকর মশা নিধন কার্যকর করছে না। এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে স্বাস্থ্যখাতকে ঘিরে বিএনপির ৮টি প্রস্তাবনার মধ্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ছিল অন্যতম। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধে বছরব্যাপী বিজ্ঞানভিত্তিক মশা নিধন এবং চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। প্রশ্ন উঠেছে এবার ডেঙ্গু মোকাবিলায় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে নতুন সরকার।  সেই ধারাবাহিকতায় মশার উপদ্রব থেকে নগরবাসীদের রক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বর্ষা মৌসুমের আগেই নগরবাসীকে ডেঙ্গু থেকে রক্ষা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস মশার কামড় থেকে মানুষ ডেঙ্গু কিংবা চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়। তাই ডেঙ্গু থেকে রক্ষা পেতে আগে থেকেই সব প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
গত ১১ মার্চ অপর এক ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ জনগণের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ সবাই সচেতন হলে এর প্রাদুর্ভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করা সম্ভব। তিনি বলেন, এ বিষয়ে ১৪ মার্চ থেকে সারা দেশে শুরু হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা অভিযান। ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া থেকে রক্ষা পেতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেশবাসীকে আহ্বান জানাই।
এদিকে মশামুক্ত ঢাকা গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তিনি বলেছেন, সরকারের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি জানানোর পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা অপরিহার্য। শপথ নেওয়ার পর থেকে এ নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পরই আমরা কীভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে পারি, সে ব্যাপারে তৎপর হয়েছি। আমরা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। পুরোদমে ওষুধ ছিটানো শুরু হবে। মশা ও লার্ভা নিধন করার ওষুধ সেটার স্যাম্পল নিয়েছি পরীক্ষা করার জন্য। আমদানি করা ওষুধের একাধিক নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।’
টাকা সব জলে
গত ১০ বছরে মশা নিধন কর্মসূচি ও কীটনাশক কেনায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এই দুই সিটি কর্পোরেশনে মোট ১০১২ কোটি টাকা ব্যয় করলেও গেল বছরও ডেঙ্গুতে মৃত্যু ঢাকায় ছিল শীর্ষে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে শুধু মশা নিধন কার্যক্রমের জন্য ৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে ব্যয় করা হয়েছে ৪৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর তথ্য বলছে, ঢাকায় সংগৃহীত মোট প্রাপ্তবয়স্ক মশার প্রায় ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির। এটি কোনো পরিসংখ্যানগত কাকতালীয় ঘটনা নয় বরং এটি নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার প্রতিফলন। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, বছরের পর বছর পরিষ্কার না হওয়া নালা, জলাবদ্ধ বেজমেন্ট ও পার্কিং এলাকা, সব মিলিয়ে ঢাকা শহর নিজেই যেন কিউলেক্স মশার জন্য এক আদর্শ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার জনকণ্ঠকে বলেন, মশার ওষুধে কাজ হচ্ছে কিনা, সেটি পরীক্ষার জন্য একটি কৌশল নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়েছে। এর আগে ওইসব এলাকার মশার ঘনত্বের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। অভিযানের পর বিকেলে আবার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে নমুনা মহাখালীর রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) পাঠানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর প্রথম ৫৩ দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৪৩৯ জন, মারা গেছেন চার জন। এছাড়াও ২০২৫ সালেও দেশে লক্ষাধিক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। এর আগে ২০২৩ সালে ডেঙ্গু ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি রোগের বিস্তার নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পরিকল্পনা ও শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
সম্প্রতি এক গবেষণায়, লার্ভা পরীক্ষা করতে বিভিন্ন জলাশয় থেকে ২৫০ মিলিলিটার পানি তুলে তাতে লার্ভার সংখ্যা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় সংগৃহীত পানিতে গড়ে ৮৫০টি লার্ভা পাওয়া যায়। ফেব্রুয়ারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় গড়ে ১ হাজার ২৫০।
প্রাপ্তবয়স্ক মশার উপস্থিতি যাচাইয়ের পদ্ধতিটিও অবাক করেছে। একজন মানুষের হাঁটু পর্যন্ত পা ও বাহু উন্মুক্ত রেখে এক ঘণ্টায় কতটি মশা কামড়াতে আসে, তা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ৪০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে ৮৫০।
মৌসুমি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ অভিযানের পরিবর্তে বার্ষিক, পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক কর্মসূচি অপরিহার্য বলে মনে করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক, কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, এডিস মশার প্রজননচক্র বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে দ্রুততর হয়, ফলে জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এটি মারাত্মক আকার ধারণ করে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকার ও নতুন মন্ত্রিসভা এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যখন দেশে মশার ঘনত্ব ইতোমধ্যেই অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় রয়েছে এবং আগামী মাসে তা আরও বেড়ে চরম অস্বস্তিকর ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
কবিরুল বাশারের মতে, এডিস মশার এই কমে যাওয়া কোনো স্থায়ী অর্জন নয়; বরং এটি এক ধরনের সাময়িক বিরতি। নগরের অলিগলি, বেজমেন্টে গাড়ি পার্কিং করার স্থান, পুরোনো বাড়ির নিচ তলায়, বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পানির ট্যাংক, প্লাস্টিক ড্রাম ও বালতির ভেতরে এখনো এডিস মশার প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান রয়ে গেছে। বর্ষা শুরু হলেই সামান্য অবহেলা এই মশাকে আবার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দেবে।
নতুন সরকারের উদ্দেশ্যে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকারের উচিত একটি জাতীয় ডেঙ্গু ও আর্বোভাইরাস কৌশলপত্র প্রণয়ন করা, যেখানে পাঁচ থেকে দশ বছরের সুস্পষ্ট লক্ষ্য, বাজেট বরাদ্দ এবং কর্মপরিকল্পনা নির্ধারিত থাকবে। ডেঙ্গুকে জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংযুক্ত একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ডেঙ্গু ও অন্যান্য আর্বোভাইরাল রোগের জন্য একটি একীভূত, রিয়েল-টাইম ডিজিটাল এন্টোমোলজিক্যাল এবং ডিজিস সার্ভেইলেন্স প্ল্যাটফর্ম চালু করা জরুরি।
সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে বাধ্যতামূলক রিপোর্টিং কাঠামোর আওতায় আনারও পরামর্শ দেন এই কীটতত্ত্ববিদ। তার মতে, ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুহার কমাতে প্রাথমিক পর্যায়েই রোগী শনাক্তকরণ ও ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু তাই নয় কবিরুল বাশারের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করাই হবে টেকসই সাফল্যের মূল ভিত্তি। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, পরিবেশ ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করে মাসিক পর্যালোচনা সভা ও অগ্রগতি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

 

প্যানেল / জোবায়ের

×