ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

অপরাধ বৃদ্ধির নেপথ্যে বিচারহীনতা

মো.জাহিদুল ইসলাম জাহিদ

প্রকাশিত: ২১:৪৪, ১৩ মার্চ ২০২৬

অপরাধ বৃদ্ধির নেপথ্যে বিচারহীনতা

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় প্রতিনিয়ত হত্যা ও নৃশংস অপরাধের খবর সামনে আসছে, যেখানে শিশু থেকে বৃদ্ধ, শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক -কেউই নিরাপদ নয়। এসব ঘটনা প্রশ্ন তোলে, সমাজ কি ধীরে ধীরে অবক্ষয়ের দিকে যাচ্ছে, নাকি বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের সাহসী করে তুলছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, যখন অপরাধীরা ক্ষমতার প্রভাব বা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার আশা করে, তখনই সমাজে ভয়াবহ অপরাধ বাড়তে থাকে এবং মানুষের জীবনের মূল্য ক্রমেই কমে যায়।
গত ৪ মার্চ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে একই বিভাগের এক কর্মচারী প্রকাশ্য দিবালোকে জবাই করে হত্যা করে। একজন শিক্ষক যখন নিজের কর্মস্থলেও নিরাপদ নন, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
এর আগেও ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে হলের পুকুরে ফেলে রাখা হয়েছিল। বিদ্যাপীঠ যখন হত্যাকাণ্ডের মঞ্চে পরিণত হয়, তখন বুঝতে হবে বিচারহীনতার বিষবৃক্ষ কত গভীরে শেকড় গেড়েছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ইরা, রাজধানীর মগবাজারে তাহিয়া, ঝিনাইদহে তাবাসসুম, পাবনার ঈশ্বরদীতে দাদীকে হত্যা এবং নাতনিকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যা, হাজারীবাগে স্কুলছাত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে গত ৬ মার্চ ২০২৫ এ মাগুরার শ্রীপুরে আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণের শিকার হয়ে দীর্ঘ এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারায়।
এ ধরনের নৃশংসতার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো অপরাধের প্রমাণ লোপাটের প্রবণতা। নরসিংদীর শিবপুরের ওবায়দুল্লাহকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর তার দেহ টুকরো টুকরো করে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ফেলে দেওয়া হয়। গাজীপুরে মাদক সেবন দেখে ফেলায় ১৩ বছরের মাদ্রাসাছাত্র মাহাবুবকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। যেন অপরাধীরা নিশ্চিত-লাশ গুম করতে পারলেই আইনের হাত থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। নরসিংদীতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার আমেনার বাবা যখন বিচার পাননি, তখন সেই ক্ষোভ আর অপমানে সৎবাবা নিজেই আমেনাকে হত্যা করেন। এটি কেবল একটি হত্যা নয়, এটি আমাদের বিচার ব্যবস্থার গালে একটি কষানো চড়। যখন একজন বাবা বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে নিজের সন্তানকে হত্যা করতে বাধ্য হন, তখন বুঝতে হবে সেই সমাজ মৃতপ্রায়।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই অন্তত ৩২ জন নারী ও কন্যাশিশু হত্যার শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৯ জনই ছিল ১৮ বছরের নিচের শিশু।
গত ৪ ফেব্রুয়ারি মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএস (Human Rights Support Society) এর নির্বাহী পরিচালক জনাব ইজাজুল ইসলাম এর স্বাক্ষরিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৭ মাসে ২৬১৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১০১৬ জন ধর্ষণের শিকার, যাদের ৫৪ শতাংশই শিশু। গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৩০ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৩ জনকে এবং লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহত্যা করেছেন আরও ১১ জন। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, বরং এগুলো একেকটি পরিবারের কান্না এবং রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতার দালিলিক প্রমাণ।
একটার পর একটা খুনের ঘটনা ঘটার পেছনে কয়েকটি গভীর কারণ কাজ করছে। প্রথমত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা স্থানীয় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করতে দ্বিধায় পড়ে, আর গ্রেপ্তার হলেও দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসার ঘটনা দেখা যায়। দ্বিতীয়ত, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতি। অনেক মামলায় চার্জশিট দিতে বছরের পর বছর লেগে যায়। কোথাও ঘুষ বা প্রভাবের কারণে মামলার গতিপথ বদলে যায়, যা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে। তৃতীয়ত, সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতা। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী ভয় ও অনিশ্চয়তার কারণে আদালতে সাক্ষ্য দিতে চান না। যখন তারা দেখেন অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেকেই সত্য গোপন করেন। চতুর্থত, নৈতিক অবক্ষয় ও মাদকের বিস্তার। মাদকের প্রভাব সমাজের একটি অংশকে এমনভাবে গ্রাস করছে যে তারা নৃশংস অপরাধ করতেও দ্বিধা করছে না।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। অপরাধী যত ক্ষমতাবানই হোক, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শিশু ও নারী নির্যাতনের মামলাগুলো বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং সাক্ষী সুরক্ষা আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। 
সবশেষে বলা যায়, অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে বিচারহীনতা অন্যতম বড় কারণ। যখন অপরাধীরা দেখে যে আইনের ফাঁক গলে পার পাওয়া সম্ভব, তখন তাদের ভয় কমে যায় এবং সমাজে নৃশংসতা বাড়তে থাকে। তাই এই লাশের মিছিল থামাতে হলে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্যানেল/মো.

×