শুক্রবার সকাল থেকেই খুলে যায় অমর একুশে বইমেলার দুয়ার। স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা অনুযায়ী ছুটির দিনে বিপুলসংখ্যক পাঠক ও দর্শনার্থী ভিড় জমিয়েছিল প্রাণের মেলার। সেই সুবাদে প্রতিটি বই বিতানে দেখা মিলেছে বইপ্রেমীদের সরব উপস্থিতি। এছাড়া এদিন দর্শনার্থীর চেয়ে পাঠকের সংখ্যাটাই ছিল বেশি। সেই সুবাদে যারাই মেলায় এসেছেন তাদের হাতে হাতে ঘুরেছে গুচ্ছ গুচ্ছ বইয়ের ব্যাগ। তাই সকাল থেকে দুপুর এবং রোদ গড়ানো বিকেলে দৃশ্যমান হয়েছে বই নিয়ে উচ্ছ্বাসমুখরতার গল্প। এই বইপ্রেমীদের মধ্যে অনেকেই পরিবারের ছোট্ট সদস্যদের সঙ্গী করে হাজির হয়েছিলেন সকালে। কেউবা এসেছিলেন রোদজ্বলা আলসে দুপুরে। বই সংগ্রহের জন্য বিকেলটাকেই আদর্শ সময় বিবেচনায় করেছিলেন অনেকে। বইপ্রেমীদের একটি অংশ আবার সন্ধ্যার পর প্রবেশ করেছেন মেলা প্রাঙ্গণে। তবে সারাদিনের উৎসবমুখর আবহের ছন্দপতন ঘটেছে সন্ধ্যার অবকাশে। আকাশ গড়িয়ে পড়া জলের ধারা এবং শিলাবৃষ্টির দাপটে এ সময় বন্ধ হয়ে যায় মেলার সব স্টল। এমনকি বৃষ্টির জলে ভিজে নষ্ট হয়েছে অনেক প্রকাশনা সংস্থার বই। একইভাবে আকস্মিক বৃষ্টিতে পাঠকেরাও ভিজেছেন। ছোটাছুটি করে বিভিন্ন স্টলে কিংবা ছাউনির তলে আশ্রয় নিয়েছেন। রাত আটটার পর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় নেমে আসে ঘুটঘুটে অন্ধকার।
বৃষ্টির তোড়ে অনেক স্টলে পানি ঢুকে বই ভিজে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অ্যাডর্ন পাবলিকেশনসের প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসেন জানান, ভালো ত্রিপল দিয়ে স্টল মুড়ে রাখলেও পানি চুইয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। রাতে বড় ঝড় হলে অনেক স্টলের টিন উড়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে। একই চিত্র দেখা গেছে আগামীর স্টলে। স্টল ব্যবস্থাপক আমিরুল ইসলাম জানান, সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও পানি প্রবেশ ঠেকানো যায়নি। ফলে বেশ কিছু বই ভিজে নষ্ট হয়েছে।
এদিকে বৃষ্টির আগে বসন্ত বিকেলের মায়াবী আবহে অন্যপ্রকাশের স্টলে সময়ের তুমুল জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইনের দেখা মেলে। তাকে ঘিরে সেথায় ভিড় জমিয়েছিলেন গ্রন্থানুরাগীরা। তার লেখা উপন্যাস ‘তোমার নামে সন্ধ্যা নামে’ ও ‘নির্বাচিত কবিতা’সহ কয়েকটি বই সংগ্রহ করেছিলেন বইপ্রেমীরা। সেসব বইয়ে অটোগ+্রাফসহ শুভেচ্ছা বাণী লিখে দিচ্ছিলেন লেখক। সুযোগ বুঝে কেউবা লেখকের সঙ্গে মেতে উঠেছিলেন আড্ডায়। এ সময় আলাপচারিতায় সাদাত হোসাইন জনকণ্ঠকে বলেন, বিগত মেলাগুলোয় সারি বেঁধে বই কিনতে আসা মানুষের জটলা দেখেছি। অটোগ্রাফ ও শুভেচ্ছা বাণী লিখে দেওয়ার পর কারও সঙ্গে কথা বলার অবসর মিলত না। এবার পাঠক সমাগম কিছুটা কম হলেও হতাশাব্যঞ্জক
নয়। কারণ, কিছু মানুষ সময় করে ঠিকই মেলায় আসছে। আমাদের মতো লেখকদের জন্য এটাও অনেক বড় প্রাপ্তি। তবে আগামী বছরও যেহেতু ফেব্রুয়ারিতে রমজান মাস পড়বে সেই বিবেচনায় জানুয়ারিতে মেলা আয়োজন করা উচিত হবে। তাহলে পাঠক-দর্শনার্থীতে ভরপুর পুরানো সেই জমজমাট মেলার দেখা মিলবে।
মেলা প্রান্তরের বিভিন্ন স্টল ঘুরে বই কিনতে দেখা যায় ফারহানা আহমেদ নামের এক কর্মজীবী নারীকে। উচ্ছ্বাসমাখা অভিব্যক্তিতে এই বইপ্রেমী বলেন, বছরজুড়ে এই বই উৎসবের অপেক্ষায় থাকি। কাজের চাপ এবং পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে এর মধ্যে আসা হয়নি। তবে আসতে না পারলেও ঈদের পোশাক কেনার বাজেট কমিয়ে একটি অংশ রেখেছি বই কেনার জন্য। মানুষ কম থাকায় নিরিবিলি পরিবেশে বই কেনার সুযোগ পাচ্ছি। আমি বিচিত্র বিষয়ের বই পড়ি। এ কারণে পার্বত্য অঞ্চলে বিরাজমান সংঘাতময় চালচিত্র নিয়ে ওয়াসি আহমেদের লেখা উপন্যাস ‘কার্পাস মহল’ কিনেছি। সংগ্রহ করেছি মহিউদ্দিন মোহাম্মদের বই ‘বানরের আয়না’। সংগ্রহ করেছি অনুবাদ গ্রন্থ ‘আমার যুদ্ধ আমার ফিলিস্তিন’ এবং কবি পিয়াস মজিদের ‘নির্বাচিত কাব্যসমগ্র’। এছাড়া পুরো মেলা ঘুরে তালিকা করে নিয়ে আরও কিছু বই কিনব।
এদিনের বইয়ের বিকিকিনি প্রসঙ্গে ঐতিহ্য প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক আমজাদ হোসেন কাজল বলেন, শুক্রবারের হিসেবে আমরা ভেবেছিলাম মেলায় ব্যাপক জনসমাগম হবে। কিন্তু রোজার কারণে প্রত্যাশা অনুযায়ী পাঠক হয়নি। তারপরও কিছু মানুষ এসেছে শুধুই বইয়ের টানে। এটাও আমাদের উজ্জীবিত করে। অন্যদিকে কথা প্রকাশের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইউনূস বলেন, গত শুক্রবারের তুলনায় কিছুটা কম হলেও যতটুকু বিক্রি হয়েছে সেটাও কম নয়। কারণ, যারাই মেলায় এসেছে তারাই বই কিনেছে। মেলার এই শেষ সময়ে দর্শনার্থীর চেয়ে পাঠকের সংখ্যাই বেশি। তাছাড়া পাঠকদের একটি অংশ আছে যারা সন্ধ্যার পর এসে বই সংগ্রহ করে। কিন্তু এদিনের সান্ধ্যকালীন বৃষ্টি সারাদিনের উৎসবমুখর আবহকে কিছুটা হলেও মলিন করেছে।
এদিন ফাগুনের সকাল থেকে খুলে যায় বইমেলার দুয়ার। শিশুপ্রহরের হাতছানিতে অভিভাবকদের সঙ্গী করে বইয়ের উৎসবে শামিল হয়েছিল সোনামণিরা। তাদের পদচারণায় মুখরিত হয়েছে শিশু কর্নারের স্টলগুলো। এরপর মুখরতা ছাপিয়ে বইয়ের রাজ্যে ডুবে যায় ছোট ছোট বইপ্রেমীরা। তাদের পছন্দের সংগ্রহের তালিকায় উঠে আসে রূপকথার গল্প থেকে শুরু করে সুন্দরবানের প্রাণীরাজ্যের গল্প, ছড়ায় ছবিতে বাংলার ষড়ঋতুর গল্প, মহাকাশের রহস্যময় জগতের তথ্য মেলে ধরা বই, কল্পবিজ্ঞান, অ্যাডভেঞ্চার, ভূতের গল্প, ম্যাজিক বুক, টোনাটুনি কিংবা ঈশপের গল্পসহ বিচিত্র বিষয়ের বই। ছোটদের উপযোগী মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইয়ের প্রতিও ছিল অনেকের প্রবল ঝোঁক। আর বই সংগ্রহের আনন্দকে সঙ্গী করে কাকতাড়ুয়া থিয়েটারের উপস্থাপিত বায়োস্কোপ কিংবা পুতুল নাচ দেখে কেটেছে তাদের সুন্দরতম সময়।
নতুন বই : বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগের তথ্যানুযায়ী এদিন জমা পড়েছে ২৭৭টি নতুন বই। উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে কথাপ্রকাশ থেকে এসেছে রামেন্দু মজুমদারের নাটকের বই ‘ভ্রান্তিবিলাস ও হালাকুর প্রত্যাবর্তন’। শেক্সপিয়ারের চিরায়ত সৃষ্টি ‘দ্য কমেডি অব এরারস’ অবলম্বনে ভ্রান্তিবিলাস এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের শেখ সুলতানের লেখা আরবি ভাষার নাটকের অনুবাদ হালাকুর প্রত্যাবর্তন। একই প্রকাশনী থেকে এসেছে আহমাদ মোস্তফা কামালের দার্শনিক চিন্তার প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘যৎসামান্য’। অন্যপ্রকাশ থেকে এসেছে ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস ‘মুখোশ পরা মানুষ’। কবি প্রকাশন এনেছে মোশতাক আহমেদের উপন্যাস ‘কবি ও প্রতিদ্বন্দ্বীগণ’। অন্যপ্রকাশ এনেছে নাসরীন জাহানের কাব্যগ্রন্থ ‘মুখস্থ সংসারের সন্ন্যাস’।
আজকের মেলা : আজ মেলা খুলবে সকাল ১১টায়। চলবে রাত নয়টা পর্যন্ত। মেলায় থাকবে শিশুপ্রহর। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জন্মশতবর্ষ : মুসলিম সাহিত্য সমাজ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মোরশেদ শফিউল হাসান। আলোচনায় অংশ নেবেন মমতাজ জাহান। সভাপতিত্ব করবেন আবুল আহসান চৌধুরী। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
আইনমন্ত্রীর লেখা বইয়ের
মোড়ক উন্মোচন
অমর একুশে বইমেলায় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের লেখা মুক্ত গদ্যের বই ‘শুধু মাধবীর জন্য’ এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। শুক্রবার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অন্যপ্রকাশ-এর স্টলে আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বইটি লেখার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে উপস্থিত দর্শক ও পাঠকদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, মাধবীকে লেখা লেখকের চিঠিগুলোতে সুখ, দুঃখ, রাজনীতি এবং একাকিত্বের নানা অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে।
বইটির প্রধান চরিত্র ‘মাধবী’ আসলে কে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মাধবী কে এটা অনেক বড় প্রশ্ন। এই প্রশ্নের জবাব যদি আগেই দিয়ে দিই, তাহলে পাঠক বইটি পড়ার আগ্রহ হারাতে পারেন। তাই বিষয়টি আপাতত অপ্রকাশিতই থাকুক।’
তিনি আরও বলেন, বইটিতে মানুষের অন্তর্গত একাকিত্বের অনুভূতি তুলে ধরা হয়েছে। চারপাশে অনেক মানুষ থাকা সত্ত্বেও মানুষ অনেক সময় নিজের ভেতরে একা থাকে এবং মনের অনেক কথাই সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে না। সেই অনুভূতিরই প্রকাশ ঘটেছে ‘মাধবী’র কাছে লেখা চিঠিগুলোতে।
আইনমন্ত্রী জানান, বইটিতে সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা ও ক্ষোভের পাশাপাশি রাজনীতি, রাষ্ট্র, সমাজনীতি ও দর্শনের বিভিন্ন দিকও উঠে এসেছে। তিনি মাধবীকে মোট ২৫৩টি চিঠি লিখেছেন, যার মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ১২৫টি চিঠি প্রকাশ করা হয়েছে। পাঠকদের সাড়া বিবেচনা করে পরবর্তীতে দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, পাঠকদের আগ্রহই একজন লেখকের অনুপ্রেরণার প্রধান উৎস। পাঠক যদি কোনো লেখাকে গ্রহণ করেন, তাহলে লেখক আরও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে লিখতে পারেন এবং নতুনভাবে অনুপ্রাণিত হন। এ কারণে তিনি পাঠকদের বইটি পড়ার পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে মতামত জানাতে অনুরোধ করেন।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, বইটি সম্পূর্ণ হৃদয়ের অনুভূতি থেকে লেখা। ভালো লাগা এবং একাকিত্বের অভিজ্ঞতা থেকেই এই লেখার সৃষ্টি। তিনি সবাইকে বইটি পড়ার জন্য আন্তরিকভাবে আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে অন্যপ্রকাশ-এর স্বত্বাধিকারী, লেখকের সহধর্মিণী, শুভানুধ্যায়ী, বিশিষ্টজন এবং মেলায় আগত অনেক দর্শক ও পাঠক উপস্থিত ছিলেন।
মোড়ক উন্মোচন শেষে আইনমন্ত্রী ‘শুধু মাধবীর জন্য’ বইটি ক্রয়কারী পাঠকদের জন্য অটোগ্রাফ প্রদান করেন এবং তাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
প্যানেল / জোবায়ের








