প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কারণেই পাইরেসিসহ নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে সৃজনশীল বই। সামাজিক যোগাযোগযোগ মাধ্যমে লেখা ছড়িয়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন লেখক। উল্টোদিকে আবার কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন ঘটিয়ে অনুমতি ছাড়াই প্রকাশিত হচ্ছে বিদেশি লেখকের অনুবাদ গ্রন্থ। দেখা মিলছে অনুমোদনহীন ভারতীয় লেখকের বই। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এমন বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে এবারে বইমেলায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশনীর পরিবর্তে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও এমন বই প্রকাশিত হচ্ছে। এ বিষয়ে মেলার আয়োজক বাংলা একাডেমি বলছে, পাঁচ শতাধিক ছড়িয়ে থাকা বিশালসংখ্যক বইয়ের মধ্যে পাইরেটেড কিংবা অনুমোদনহীন অনুবাদের বই চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। তবে অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
রবিবার একাদশতম দিনের মেলায় আইনের ব্যত্যয় ঘটানো তেমনই এক ঘটনার দেখা মেলে সূর্যোদয় প্রকাশনীতে। কপিরাইট আইনের নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রকাশনা সংস্থাটি প্রকাশ করেছে ড. ওয়াহিদুল আলম অনূদিত স্টিফেন হকিংয়ের বিশ্বখ্যাত বই ‘এ ব্রিফ টাইম অব স্টোরি’। একই প্রকাশনীটি থেকে বের হয়েছে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ.পি.জে আবদুল কালামের ‘উইংস অব ফায়ার’ শিরোনামের আত্মজীবনী। বইটির বঙ্গানুবাদ করেছেন মো. জাহিদুল আলম। গ্রন্থ দুটি প্রকাশে লেখকের পরিবার কিংবা সংশ্লিষ্টদের অনুমতি নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকাশনীটির প্রকাশক মো. আশরাফুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, এ বইগুলো তো আসলে আমাদের প্রকাশনীর না। পরিবেশক হিসেবে আমরা বই বিক্রি করছি। তাহলে গ্রন্থ দুটি প্রকাশ কে করেছে-এ প্রশ্নের জবাবে বলেন, ওয়াহিদুল আলম স্যার ব্যক্তিগতভাবে প্রকাশ করেছেন। তাই প্রকাশনীর নাম আমার জানা নেই।
এছাড়াও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র
‘লালসালু’, ‘কাঁদো নদী কাঁদো’সহ শহীদ জননী জাহানার ইমাম, শওকত ওসমান, জহির রায়হানসহ প্রয়াত অনেক লেখকের বই অনুমতিহীনভাবে বিভিন্ন প্রকাশনীতে বিক্রি হচ্ছে। অথচ এই প্রকাশনীগুলোর পক্ষ থেকে লেখক পরিবারের কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। উল্টোপিঠে মেলা ঘুরে কমপক্ষে দশটি প্রকাশনীতে পৃথিবীর নানা দেশের খ্যাতিমান লেখকের অনুমোদনহীন অনুবাদের বইয়ের দেখা মেলে। এমন বাস্তবতায় দেশের অনেক লেখক বলছেন, প্রকাশকদের একাংশ বই প্রকাশের পর লেখকের সম্মানীর অর্থ নিয়ে নানা টালবাহানা করেন। এমনকি কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন ঘটিয়ে লেখক-প্রকাশকের মধ্যে লিখিত কিংবা মৌখিক চুক্তিকেও পাত্তা দেন না।
কপিরাইট আইন কার্যকর ও পাইরেসি প্রতিরোধের পাশাপাশি লেখকের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ সৃজনশীল সাহিত্যকে বাঁচানোর অভিপ্রায়ে মেলায় স্টল দিয়েছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের বোর্ড সদস্য জামাল উদ্দিন বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল জনপ্রিয় লেখকও বই প্রকাশের পর কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হন। জনপ্রিয়তার বিপরীতে বই বিক্রির অনুপাতে বিব্রত হতে হয় লেখককে। অনলাইনেই যখন লেখকের অসাধারণ সব চিন্তা ও বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ লাইনগুলো বিনামূল্যে মিলে যায়, কার দায় পড়ে তার লেখা বই কিনে পড়ার! একদিকে বই না বিক্রি হওয়ায় লেখক বঞ্চিত হন তার প্রাপ্য সম্মানী থেকে। অন্যদিকে আপনার, আমার শেয়ার করা লেখার কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো লাভবান হলেও লেখক তার প্রাপ্য সম্মানী থেকে বঞ্চিত হয়। একসময় উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন লেখক। এভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাইরেসির কারণে প্রতিবছর ৩০ শতাংশ লেখক লেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আর লেখক হারিয়ে গেলে, হারিয়ে যাবে প্রকাশনীও! আমরা চাই এই অবস্থার পরিবর্তন হোক। আমরা চাই পাঠক যেন অনলাইন পাইরেসির আনন্দ থেকে সরে এসে প্রিয় লেখকের বই সংগ্রহ করে। এতে করে লেখকের প্রাপ্য সম্মানী নিশ্চিত হবে।
নতুন বইয়ের তথ্য
বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, এদিন প্রকাশিত হয়েছে ৭৫টি নতুন বই। সেই স্রোতধারা একাদশতম দিন পর্যন্ত নতুন বই এসেছে ৮৩৩ টি। রবিবার প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে অনন্যা এনেছে মহিউদ্দিন আহমদের প্রথম উপন্যাস ‘শেখ মুজিবের লাল ঘোড়া’। প্রসিদ্ধ প্রকাশন এনেছে ইমতিয়ার শামীমের কাব্যগ্রন্থ ‘চরসংবেগ’। পুন্ড্র এনেছে মতিন বৈরাগীর কাঠামোবাদী তত্ত্বে ‘আমিনুল ইসলামের কবিতা’। শব্দ প্রকাশনী এনেছে আহাম্মদ আলীর ‘ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ প্রামাণ্য জীবনী’। টাঙ্গন থেকে এসেছে জহিরুল ইসলামের ‘ইস্তাম্বুলের ভ্রমণকাহিনী : আয়া সোফিয়ার নীরবতা। বাতিঘর এনেছে বদরুদ্দীন উমরের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত : বাংলাদেশের কৃষক’। বইটি কেবল ইতিহাগ্রন্থ নয়, বরং এটি বাংলার কৃষি-কাঠামো এবং গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তনের এক গভীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ। বইটির মূল উপজীব্য হলো ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব। বদরুদ্দীন উমর ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে শ্রেণি-সংগ্রামের আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন। জাগৃতি থেকে এসেছে ঝর্ণা রহমানের ‘আমার গানের মৌমাছিরা’। বইটি লেখক ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সংগীতের নিবিড় সম্পর্কের বয়ান মেলে ধরেছেন। তার এক আশ্চর্য বয়ান। বাঙ্গালা গবেষণা এনেছে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের ‘রচনাবলী-১’। অনুপম প্রকাশনী এনেছে মৃত্যুঞ্জয় রায়ের ‘সুন্দরবনের অণুজীব বৈচিত্র্য’। বইটিতে সুন্দরবনের মাটিতে, জলে, এমনকি মরা কাঠ বা প্রাণীর দেহে বাস করা ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, শৈবাল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। প্রতীক এনেছে পলাশ পুরকায়স্থ থ্রিলারধর্মী উপন্যাস ‘মানিটো আওয়াসিস’। গবেষক বিলু কবীর সম্পাদিত সংকলন গ্রন্থ ‘রাণু ও রবীন্দ্রনাথ’ নেছে পুঁথিনিলয়। অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে এসেছে ইসমাইল সাদীর কাব্যগ্রন্থ ‘তিন শব্দের চোখ’।
মেলামঞ্চের আয়োজন : বিকেলে মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আসাদ চৌধুরী যাপন আর কবিতার মধ্যে ছিল একটা খাঁটি পূর্ববঙ্গীয় ব্যাপার শীর্ষক আলোচনাসভা। প্রবন্ধ উপস্থাপন করে কুদরত-ই-হুদা বলেন, কবি আসাদ চৌধুরী দীর্ঘ আশি বছর পুরোদস্তুর একজন কবির জীবনযাপন করেছেন। তাঁর কবিতায় সবসময়ই সক্রিয় থেকেছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি অপরিসীম দরদ। তাঁর যাপন আর কবিতার মধ্যে ছিল একটা খাঁটি পূর্ববঙ্গীয় ব্যাপার।
আলোচকের বক্তব্যে সৈকত হাবিব বলেন, আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম বরেণ্য ব্যক্তিত্ব কবি আসাদ চৌধুরী। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান সুদূরপ্রসারী। তিনি ছিলেন একজন গণমানুষ-প্রেমিক ব্যক্তিত্ব। একাধারে কবি, শিশু সাহিত্যিক, অনুবাদক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক ও জনপ্রিয় উপস্থাপক আসাদ চৌধুরী সকল ক্ষেত্রেই তাঁর মৌলিক প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।
সভাপতির বক্তব্যে সৈয়দ আজিজুল হক বলেন, কবিতার মধ্য দিয়ে বাঙালির ঐতিহ্যকে তুলে ধরার একটি প্রবণতা কবি আসাদ চৌধুরীর মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। বিচিত্র বিষয়ে লেখার প্রবণতা ছিল তাঁর।
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি, গবেষক ও সাংবাদিক মাহবুব হাসান।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন রহিমা আখতার কল্পনা। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আলো আরজুমান বানু, ফারজানা এ্যালি। সংগীত পরিবেশন করেন কল্যাণী ঘোষ, মোসা. নিপা আক্তার, জাকিয়া সুলতানা স্বর্ণলতা, আরিমা তাবাসসুম, সাধিকা সৃজনী তানিয়া, দিপু সমাদ্দার, মমতা দাসী এবং তাপসী রায়।
আজকের বইমেলা
আজ সোমবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায়। চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে শহীদুল্লা কায়সার শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন শিবলী আজাদ। আলোচনায় অংশ নেবেন প্রশান্ত মৃধা। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
প্যানেল / জোবায়ের








