বই নিয়ে আবেগ ও ভালোবাসার গল্পময় যাত্রাটা শুরুটা হয়েছিল গত ২৬ ফেব্রুয়ারি। তবে বৃহস্পতিবার অবধি আট দিন পেরুলেও মলিনতার ছাপ ছিল অমর একুশে বইমেলার শরীরে। রমজান মাসের কারণে পাঠকখরার সমান্তরালে দর্শনার্থীদের আনাগোনাও ছিল অল্পস্বল্প। ফলে বাঙালির মননের প্রতীকী প্রাণের উৎসবে যেন চলছিল বিরহকাল। চোখে পড়ছিল বই নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব। ক্রেতা না থাকায় বিরস বদনে আলসে সময় পার করছিলেন বই বিতানের বিক্রয়কর্মীরা। লোকসানের বোঝা বহনের চিন্তায় প্রকাশকদের কপালে লেপটেছিল চিন্তার ভাঁজ। বইপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের অনুপস্থিতিতে অধিকাংশ সময় মেলা প্রান্তরে বিরাজ করেছে সুনসান নীরবতা। অবশেষে শুক্রবার ছুটির দিনে ভাঙল সেই নীরবতা। গ্রন্থানুরাগীদের পদচারণায় সরব হলো মেলার দুই ক্যানভাস- সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি আঙিন। বিশেষ করে সৃজন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসমূহের অবস্থান উদ্যান অংশে এদিন প্রাণবন্ত দৃশ্যের দেখা মিলেছে। হাতে হাতে ঘুরেছে বই। বইয়ের ব্যাগ হাতে নিয়ে ঘোড়াফেরা করা মানুষের সংখ্যাটাও নেহাত কম ছিল না। সেই সুবাদে অধিকাংশ প্রকাশনীতে ভিড় জমেছিল বই পোকাদের।
ফাগুনের সকাল থেকে খুলে যায় বইমেলার দুয়ার। শিশুপ্রহরের হাতছানিতে অভিভাবকদের সঙ্গী করে বইয়ের উৎসবে শামিল হয়েছিলেন সোনামণিরা। তাদের পদচারণায় মুখরিত হয়েছে শিশু কর্নারের স্টলগুলো। এরপর মুখরতা ছাপিয়ে বইয়ের রাজ্যে ডুবে যায় ছোট ছোট বইপ্রেমীরা। বাবা-মা কিংবা মামা-চাচার হাতের বাঁধনটি আলগা করে খুঁজতে থাকে নিজের পছন্দ ও মননের উপযোগী বইটি। সেই তালিকায় উঠে আসে রূপকথার গল্প থেকে শুরু করে, সুন্দরবনের প্রাণীরাজ্যের গল্প, ছড়ায় ছবিতে বাংলার ষড়ঋতুর গল্প, মহাকাশের রহস্যময় জগতের তথ্য মেলে ধরা বই, কল্পবিজ্ঞান, অ্যাডভেঞ্চার, ভূতের গল্প, ম্যাজিক বুক, টোনাটুনি কিংবা ঈশপের গল্পসহ বিচিত্র বিষয়ের বই। ছোটদের উপযোগী মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বইয়ের প্রতিও ছিল অনেকের প্রবল ঝোঁক। আর বই সংগ্রহের আনন্দকে সঙ্গী করে কাকতাড়ুয়া থিয়েটারের উপস্থাপিত বায়োস্কোপ কিংবা পুতুল নাচ দেখে কেটেছে তাদের সুন্দরতম সময়।
সকাল গড়ানো দুপুর এবং বিকেলে মেলায় ভিড় জমিয়েছিলেন জ্যেষ্ঠ পাঠকরা। অনেকে ইফতার শেষে সন্ধ্যার পর এসেছিলেন। সব মিলিয়ে ছুটির দিনে পাঠক ও দর্শনার্থীর পদচারণায় সরগরম হয় প্রাণের মেলা। যেহেতু এসেছিল কাক্সিক্ষত পাঠক তাই বইয়ের বিক্রিও অন্যান্য দিনের তুলনায় ভালো হয়েছে। আর বই বিকিকিনির হিড়িকে হাসি ফুটেছে প্রকাশের মুখে। কাক্সিক্ষত বেচাকেনায় ছোট-বড় সব প্রকাশক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন।
বসন্ত বিকেলে কথা হয় ঐতিহ্যের ব্যবস্থাপক আমজাদ হোসেন কাজলের সঙ্গে। আলাপচারিতায় বলেন, আজ যারা মেলায় এসেছেন তাদের অধিকাংশই বই কিনেছেন। বইকে ঘিরে আসা মানুষের এই পদচারণা আমাদের স্বস্তি দিয়েছে। সেই বাস্তবতায় মেলা শুরুর পর থেকে আজ (শুক্রবার) নবম দিনে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে। বই বিকিকিনির এই স্বতঃস্ফূর্ত ধারাটা মেলার আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকুক।
নতুন বইয়ের তথ্য
বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগের তথ্যানুযায়ী মেলার নবম দিনে এসেছে সর্বোচ্চসংখ্যক ১৯৯টি বই। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে বিদ্যাপ্রকাশ থেকে এসেছে মোহিত কামালের উপন্যাস ‘হৃৎপিণ্ডে অশরীরী রক্তস্রোত’। মেডিকেল কলেজের অ্যানাটমি ল্যাবের বাস্তব পরিবেশকে উপজীব্য করে রচিত এ উপন্যাসে বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব ও অজানা অতিপ্রাকৃত শক্তির এক টানটান থ্রিলারধর্মী কাহিনী উঠে এসেছে। পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে এসেছে দীপু মাহমুদের শিশুতোষ গল্প সংকলন ‘শিশুদের মায়ার রাজ্যে ভ্রমণ’। গল্পগুলো খুদে পাঠককে নিয়ে যাবে এক অদ্ভুত জগতে; যেখানে গল্পগুলোতে মিলেমিশে আছে প্রকৃতি, প্রাণী এবং মানবিক ভালোবাসা। এই প্রকাশনী থেকে এসেছে কিযী তাহনিনের গল্পের বই ‘মসলার কৌটা’। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত ইসরাইল খানের গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘সাময়িকপত্রে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক’য় এনেছে ইউপিএল। ১৯০১ থেকে ১৯৪৭ সালের বাংলা অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতের বিশ্লেষণ উঠে এসেছে বইটিতে। রাজনৈতিক ইতিহাসের সমান্তরালে সেই সময়ের হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক, জমিদারি প্রথা, শিক্ষার অগ্রগতি এবং মধ্যবিত্তের উত্থানসহ সমাজের বহুমাত্রিক পরিবর্তনগুলোকে সাহিত্য ও চিন্তাধারার সঙ্গে সংযুক্ত করে পাঠকের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে। কণ্ঠধ্বনি প্রকাশনী এনেছে ড. মুহম্মদ এমদাদ হাসনায়েন ও ড. সারিয়া সুলতানার গবেষণাধর্মী বই ‘কুষ্টিয়ার মৃৎশিল্প’। অন্যধারা থেকে এসেছে সময়ের তুমুল জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইনের উপন্যাস ‘নীলকণ্ঠী’। নালন্দা থেকে এসেছে কবি রাসেল আসাদের কাব্যগ্রন্থ ‘অনুসূর্যের উত্তাপ’। অনন্যা থেকে এসেছে তৌহিদুর রহমানের কাব্যগ্রন্থ ‘কী মায়ায় বেঁধেছো আমায়’
শিশুকিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতা
এদিন সকালে বাংলা একাডেমির সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সভাগৃহে অমর একুশে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
মেলামঞ্চের আয়োজন : বিকেলে মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় জন্মশতবর্ষ : কলিম শরাফী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অণিমা রায়। আলোচনায় অংশ নেন সাইম রানা। সভাপতিত্ব করেন সাধন ঘোষ।
অণিমা রায় বলেন, কলিম শরাফী সেই বিরল প্রতিভার অন্তর্গত, যার কণ্ঠস্বর সংগীতের সুষমা বহনের পাশাপাশি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের সংকটময় মুহূর্তে হয়ে উঠেছিল অস্তিত্ব-সংরক্ষণের উচ্চারণ। তিনি যেমন দীর্ঘকাল সংগীত সাধনা করেছেন, তেমনি সংগীতকে প্রতিষ্ঠিত করতে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন ও সাংস্কৃতিক অবদমনের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল অনমনীয়। অন্যদিকে, সংগীতের শুদ্ধতা ও সংযমে অবিচল থেকে এক আদর্শনিষ্ঠ সাংস্কৃৃতিক কর্মী হিসেবে তিনি নিজেকে প্রকাশ করেছেন। কলিম শরাফীর কণ্ঠস্বর সেই বিরল ধারার অন্তর্ভুক্ত, যেখানে নান্দনিকতা কোনো চটুল প্রদর্শন নয়, বরঞ্চ এক নৈতিক অনুশাসন। তিনি শিল্পকে অভিজাত পরিসরের একচ্ছত্র সম্পদ হিসেবে স্বীকার করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্প-সংগীতের আসল অধিকারী সাধারণ মানুষ-যাদের শ্রমে সমাজের কাঠামো নির্মিত হয়। এই বিশ্বাস তাঁকে শিল্পকে গণমুখী করার প্রয়াসে উদ্বুদ্ধ করে।
সাইম রানা বলেন, শিল্পী হিসেবে কলিম শরাফী সচেতনভাবে রাজনীতির মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন। বাংলার সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিকতা, প্রজ্ঞা, ব্যক্তিত্ব ও দরাজ কণ্ঠ দিয়ে তিনি মানুষকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রসংগীত আন্দোলনের পাশাপাশি সাংগঠনিক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও এদেশে কিশোর-তরুণদের সংগীতচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি জনমানুষের জন্য সারাজীবন ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং তাঁর নিজের বীক্ষণ ও প্রজ্ঞাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
সাধন ঘোষ বলেন, কলিম শরাফী ছিলেন বাংলাদেশের একজন সর্বজনীন সংগীতগুরু। তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভা দিয়ে তিনি আমাদের জীবনকে আলোকিত করেছেন। তাঁর সংগীতের মাঝে একজন সত্যিকারের সংগীত সাধকের একাগ্রতা ও নিবিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায়।
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন মৃদুল মাহবুব ও এহসান মাহমুদ।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন শাহীন রেজা। আবৃত্তি পরিবেশন করেন শওকত আলী, রবিউল মাশরাফী, রূপশ্রী চক্রবর্তী এবং মোহাম্মদ কামাল হোসেন। সংগীত পরিবেশন করেন মহাদেব চন্দ্র ঘোষ, মো. হারুনুর রশিদ, সঞ্চিতা রাখি, মো. রমজান হোসেন, শিরিন জাহান, রতন কুমার সাহা এবং নূরতাজ পারভীন।
আজকের মেলা
আজ শনিবার মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত থাকবে শিশুপ্রহর।
এদিন একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে শিশুকিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে।
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জন্মশতবর্ষ : নূরজাহান বেগম শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ইসরাইল খান। আলোচনায় অংশ নেবেন সোহরাব হাসান। সভাপতিত্ব করবেন লুভা নাহিদ চৌধুরী। বিকেলে রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
প্যানেল / জোবায়ের








