হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলায় ব্যাঙ্ককের একটি তেলবাহী জাহাজে আগুন ধরে যায়
ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের ৩৫তম ধাপ শুরু করেছে ইরান। বুধবার ইসরাইল, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও সৌদি আরবের একাধিক স্থাপনায় হামলা করে ইরানের বিপ্লবী বাহিনী।
মঙ্গলবার রাতে ইরানের একাধিক স্থাপনায় আক্রমণ করে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র। এক হামলায় দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আহত হন। তবে ইরানের এই নেতা সুস্থ রয়েছেন বলে দেশটির একাধিক গণমাধ্যমের খবরে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এদিকে ইরানে হামলার নিশানা বানানোর মতো বাস্তবিক অর্থেই আর কিছুই অবশিষ্ট নেই এবং সেখানকার যুদ্ধ খুব শীঘ্রই শেষ হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে এই তথ্য জানান তিনি।
টেলিফোনে প্রায় পাঁচ মিনিটের সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘এখানে-ওখানে সামান্য কিছু লক্ষ্যবস্তু অবশিষ্ট থাকতে পারে। তবে আমি যখনই চাইব, এটি শেষ হবে, তখনই এটি শেষ হয়ে যাবে।
যুদ্ধ কি খুব দ্রুতই শেষ হতে যাচ্ছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে গত কয়েক দিনে ভিন্ন ভিন্ন বার্তা দিয়েছেন মার্কিন এই প্রেসিডেন্ট। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, প্রাথমিক অভিযানের পরিকল্পনাটি ছিল ছয় সপ্তাহের এক লড়াই।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ খুব ভালোভাবেই এগোচ্ছে। আমরা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছি। এমনকি মূল ছয় সপ্তাহের পরিকল্পনায় যতটুকু সম্ভব ভেবেছিলাম, তার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতি আমরা করতে পেরেছি।’
ট্রাম্প বলেন, ইরান শুধু ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রকেই হুমকি দিচ্ছিল না, বরং তারা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় ছিল। তিনি বলেন, ৪৭ বছর ধরে তারা যে মৃত্যু ও ধ্বংসলীলা চালিয়েছে, এখন তারই মাশুল দিচ্ছে। এটি ছিল তাদের কর্মের ফল। তারা এত সহজে পার পাবে না। খবর বিবিসি, আলজাজিরা ও সিএনএন অনলাইনের।
ইরানে মঙ্গলবারের হামলা নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন ও ইরানের স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, এটি ছিল চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত হওয়া সবচেয়ে তীব্র হামলা।
ইরানের বিপ্লবী বাহিনী-আইআরজিসি বলেছে, তারা বুধবার কাতারে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি এবং ইরাকের কুর্দিস্তানে আল-হারির ঘাঁটিতে সফল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনের জুফায়ের নৌঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের ওপর ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। বুধবার ভোরে
বাহরাইনে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় আরও একটি হামলা হয়েছে। এ ছাড়া ভোরে ইরান থেকে ইসরাইলের কেন্দ্রস্থল লক্ষ্য করে বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান।
এদিকে বুধবার তেহরান সাফ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে ‘এক লিটার তেলও’ পার হতে পারবে না।
ইরানের প্রতিশোধমূলক পাল্টা হামলার নীতি ‘শেষ হয়েছে’ বলে এক বিবৃতিতে জানায় তেহরানের খাতাম আল-আনবিয়া সামরিক কমান্ড সদর দফতরের একজন মুখপাত্র। মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারি বলেন, তেহরানের বর্তমান নীতি হবে ‘আঘাতের বদলে আঘাত। জোলফাকারি আরও বলেন, তেহরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং তাদের অংশীদারদের কাছে ‘এক লিটার তেলও’ পৌঁছুতে দেবে না।
তাদের অনুগত যে কোনো জাহাজ বা ট্যাঙ্কার বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য হবে।
তিনি আরো বলেন, ‘ব্যারেল প্রতি তেল ২০০ ডলার হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন, কারণ তেলের দাম এই অঞ্চলের নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল যা আপনারা নষ্ট করেছেন।’ বুধবার হরমুজ প্রণালিতে অন্তত তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে একটি ছিল থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী জাহাজ।
কুয়েতের আদিরি হেলিকপ্টার ঘাঁটিতে দুটি শক্তিশালী ও যুগপৎ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করা হয়েছে, এতে আহত একশ’ জন ব্যক্তিকে দেশটির আল জাবের এবং আল মুবারাক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে।
বিউরিং ঘাঁটি আগে আদিরি নামে পরিচিত ছিল এবং এটি কুয়েতের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। বিবৃতিতে আইআরজিসি আরো জানিয়েছে, তারা বাহরাইনের ‘মিনা সালমান বন্দরে অবস্থিত আমেরিকান ঘাঁটিতে’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
এ ছাড়াও বিবৃতিতে বলা হয়, কুয়েতের দুটি নৌঘাঁটি ‘মোহাম্মদ আল আহমদ’ ও ‘আলী আল সালেম’ এ অবস্থিত ক্যাম্প প্যাট্রিয়ট এবং মার্কিন সন্ত্রাসী সেনাদের আবাসন ও সরঞ্জাম রাখার গুদামগুলোতেও ভয়াবহভাবে হামলা।
আমরা কেবল শত্রুর সম্পূর্ণ পরাজয় শিকারের কথা ভাবছি। আমরা তখনই এই লড়াই শেষ করব যখন দেশ থেকে যুদ্ধের ছায়া অপসারিত হবেÑ এমন ঘোষণা দিয়ে বিবৃতিটি শেষ করেছে আইআরজিসি।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আহত হয়েছেন-এমন খবরে তিনি ‘নিরাপদ’ আছেন বলে জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ছেলে ইউসুফ পেজেশকিয়ান।
বুধবার টেলিগ্রামে তিনি লিখেছেন, তিনি ‘শুনেছেন’ সর্বোচ্চ নেতা আহত হয়েছেন। তিনি বলেন, আমি কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলেছি, যাদের সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ রয়েছে। তারা বলেছেন, আল্লাহর কৃপায় তিনি নিরাপদ আছেনএবং কোনো সমস্যা নেই।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগের পর থেকে মোজতবা খামেনি কোনো বিবৃতি দেননি বা প্রকাশ্যে উপস্থিত হননি।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধের কঠোর সমালোচনা করেছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। এই যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতাবহির্ভূত ক্রমবর্ধমান ও বিপজ্জনক হস্তক্ষেপের অংশ বলে অভিহিত করেছেন।
বুধবার ইতালির পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তৃতায় ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের সমালোচনা করেছেন মেলোনি। তার ডানপন্থি সরকার মিত্রদের প্রতি অত্যন্ত নমনীয় আচরণ করছে বলে দেশটির বিরোধী দলগুলোর অভিযোগের মাঝে ওই সমালোচনা করেন তিনি।
স্পেন ছাড়া ইউরোপের অন্যান্য দেশ সাধারণত মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার সরাসরি সমালোচনা এড়িয়ে চলেছে এবং সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে এক্ষেত্রে মেলোনি সবাইকে ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সরাসরি সমালোচনা করেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও মেলোনি বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া যাবে না। কারণ এটি আন্তর্জাতিক পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ কাঠামোকে ভেঙে ফেলবে; যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য নাটকীয় পরিণতি হতে পারে। ইতালি ও ইউরোপ তেহরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক হুমকির মুখে পড়তে পারে।
তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এই কাঠামোগত সংকটের প্রেক্ষাপটে আমাদের ইরানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আমেরিকান ও ইসরাইলি হস্তক্ষেপকে মূল্যায়ন করতে হবে। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় হুমকিগুলো ক্রমশ ভয়ংকর হয়ে উঠছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতাবহির্ভূত একতরফা হস্তক্ষেপ বাড়ছে। মেলোনি বলেন, তেহরানের হামলার শিকার উপসাগরীয় দেশগুলোকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে সহায়তা করছে রোম। তিনি বলেন, এটি শুধু এই কারণে নয় যে তারা ইতালির বন্ধুরাষ্ট্র ও কৌশলগত অংশীদার, বরং ওই অঞ্চলে আমাদের হাজার হাজার ইতালীয় নাগরিক রয়েছেন; যাদের আমাদের রক্ষা করতে হবে। এ ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে ইতালির প্রায় ২ হাজার সৈন্য মোতায়েন রয়েছে।
ইসরাইল থেকে রাষ্ট্রদূত স্থায়ী প্রত্যাহার করল স্পেন
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার বিরোধিতা করায় দেশ দুটির সঙ্গে স্পেনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন ব্যাপক জটিল আকার ধারণ করেছে। এর জেরে ইসরাইল থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে স্পেন।
প্রায় ১৪০ জন মার্কিন সেনা আহত
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় ১৪০ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পেন্টাগন। মঙ্গলবার পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আহতদের অধিকাংশই সামান্য আঘাত পেয়েছেন এবং ১০৮ জন সেনা ইতোমধ্যে কাজে ফিরে গেছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আটজন সেনা গুরুতর আহত অবস্থায় তালিকাভুক্ত রয়েছেন এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন।’
এর আগে মার্কিন সেনাবাহিনী জানায়, যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানি হামলায় সাতজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছয়জন কুয়েতে এবং একজন সৌদি আরবে নিহন হন।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৭ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের আগ্রাসনের জবাবে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে দূতাবাসে, মার্কিন সেনারা নিহত হয়েছেন এবং সামরিক ঘাঁটি ও আকাশ প্রতিরক্ষা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস অন্তত ১৭টি ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামো শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে কয়েকটিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একাধিকবার হামলা হয়েছে। বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ছবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যাচাই করা ভিডিও এবং মার্কিন কর্মকর্তা ও ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বক্তব্যের ভিত্তিতে এ সবকিছু বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
পুরো অঞ্চল পোড়ার আগেই ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে
পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল ‘আগুনে নিক্ষিপ্ত’ হওয়ার আগেই ইরানের যুদ্ধ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। একই সঙ্গে যে কোনো সংকটে যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনীতিকে সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বুধবার তুরস্কের পার্লামেন্টে দেওয়া এক বক্তৃতায় ওই মন্তব্য করেছেন তিনি।
পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গত সপ্তাহে তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলের দিকে ধেয়ে আসা ইরানি দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। ওই অঞ্চলে ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত বিমান ও রাডার ঘাঁটি রয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টার পর পশ্চিমা ওই সামরিক জোট সেখানে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে।
সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে এরদোয়ান বলেছেন, ‘আরও ছড়িয়ে পড়া এবং সামগ্রিকভাবে পুরো অঞ্চল আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগেই এই যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। যদি কূটনীতিকে সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে এটি অর্জন করা একেবারে সম্ভব।
প্যানেল হু








