ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২

রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে মুখোমুখি সরকার ও বিরোধী দল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পর্দা উঠছে আজ

সংসদ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ০০:২৩, ১২ মার্চ ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পর্দা উঠছে আজ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের পর্দা উঠছে আজ

গণতন্ত্রের সূতিকাগার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের পর্দা উঠছে আজ। সকাল ১১টায় শুরু হওয়া সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তবে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ইস্যুতে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে সরকারি ও বিরোধী দল। সরকার বলছে, সংবিধান অনুযায়ী অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন। অন্যদিকে সংসদে রাষ্ট্রপতির ‘বক্তব্য দেওয়ার অধিকার’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দল।
আজ বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া অধিবেশনে প্রথমে সভাপতিত্ব করবেন কে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন। ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু রয়েছেন কারাগারে। তাঁদের দুজনের অনুপস্থিতিতে অধিবেশনের শুরুতে স্পিকারের আসনে কে বসতে যাচ্ছেন তা নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। তবে বিএনপির জ্যেষ্ঠ একজন সংসদ সদস্য অধিবেশনের শুরুতে স্পিকারের আসনে বসবেন বলে দলটির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। সেক্ষেত্রে আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম। 
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনকে ঘিরে জাতীয় সংসদ ভবন ও আশপাশের এলাকায় সব ধরনের অস্ত্র বহন এবং সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। বুধবার ডিএমপির কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ারের সই করা এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এ ছাড়া অধিবেশনকে ঘিরে ইতোমধ্যে পুরো সংসদ ভবন এলাকায় নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। 
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সকাল ১১টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। রাষ্ট্রপতির এই ভাষণ মন্ত্রিসভা অনুমোদন করবে এবং পরে সংসদ সদস্যরা তা নিয়ে আলোচনা করবেন। এটি ২০২৬ সালের প্রথম অধিবেশন। সংসদীয় রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রপতি প্রতি বছর সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেন। 
এর আগে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেন। অধিবেশন শুরুর আগে সংসদের কার্যপ্রণালী নির্ধারণের জন্য সংসদীয় কার্য উপদেষ্টা কমিটির একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে, যেখানে অধিবেশনের সময়কাল ও এজেন্ডা নির্ধারণ করা হবে।
সংসদ অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে সরকারি দলের (ট্রেজারি বেঞ্চ) প্রধান কাজ হবে সরকার যে সব অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতে চায় সেগুলো সংসদের সামনে উপস্থাপন করা। সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার তাদের ১৮ মাসের মেয়াদকালে মোট ১৩০টি অধ্যাদেশ জারি বা সংশোধন করেছে।
সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এ অধিবেশন আহ্বান করেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়।
১৩তম জাতীয় সংসদে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতোমধ্যে সংসদ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। আর বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
আজ ত্রয়োদশ জাতীয়সংসদের প্রথম বৈঠক শুরু হওয়ার পরপরই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন এবং রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁদের শপথ পাঠ করাবেন। তাদের নির্বাচনের পর শপথগ্রহণের জন্য অধিবেশন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য মুলতবি করা হতে পারে।
এরপর নবনির্বাচিত স্পিকার অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন। প্রথম বৈঠকেই নতুন সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হবে, যার প্রধান থাকবেন নতুন স্পিকার। এই কমিটিই উদ্বোধনী অধিবেশনের মেয়াদ এবং সংসদের অন্যান্য কার্যসূচি নির্ধারণ করবেন। এ অধিবেশনেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠন করা হতে পারে। এ ছাড়া সংসদের আজকের প্রথম অধিবেশনে শোক প্রস্তাবও গৃহীত হবে।

রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে উত্তপ্ত হতে পারে অধিবেশন 
 ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ইস্যুতে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে সরকারি ও বিরোধী দল। সরকার বলছে, সংবিধান অনুযায়ী অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন। অন্যদিকে সংসদে রাষ্ট্রপতির ‘বক্তব্য দেওয়ার অধিকার’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দল।
বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই দিন বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠক করেছেন ১১ দলীয় জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। উভয় বৈঠকেই আজ বৃহস্পতিবার শুরু হতে যাওয়া সংসদ অধিবেশনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সরকারদলীয় বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় শুরু হবে এবং এতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ভাষণ দেবেন। তিনি আরও জানান, অধিবেশনেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে এবং রাষ্ট্রপতিই তাদের শপথ পড়াবেন।
তবে রাষ্ট্রপতির ভাষণকে ঘিরে বিরোধী দলে আপত্তি দেখা দিয়েছে। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের  ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতি ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ এবং সংসদে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার কোনো অধিকার নেই।
তিনি আরও জানান, বিএনপি কেন রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার পক্ষে, তা তার বোধগম্য নয়। এ ছাড়া ডেপুটি স্পিকার পদ নিয়েও বিরোধী দলে আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এলে তখন দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে উল্লেখ করেন ডা. তাহের।
এদিকে, নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন নিয়েও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকারি দলের বৈঠকে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর অর্পণ করেছেন। জুলাই সনদের আলোকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ডেপুটি স্পিকার পদ নেবে কি না, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।
বর্তমান সংসদ গঠিত হয়েছে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। এতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করে, যার মধ্যে বিএনপি একাই পেয়েছে ২০৯টি আসন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৬টি আসন, যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী একাই পেয়েছে ৬৮টি আসন।
প্রথম অধিবেশনের জন্য প্রস্তুত জাতীয় সংসদ 
 আজ বসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আন্দোলনকারীদের হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় সংসদ ভবন। এটি পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করতে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বড় কাজ করেছে গণপূর্ত বিভাগ। গুরুত্বের দিক থেকে এর পরের খাত হচ্ছে সংসদ সচিবালয়ের আইটি খাতের। বাকিটা সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো করেছে। 
এর মধ্যে শুধু বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম মেরামতের খরচ ৭৩ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভাঙচুরের কারণে সংসদ সচিবালয়ের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদের অধিবেশনের জন্য উপযোগী করে তুলতে এসব ধ্বংসযজ্ঞ মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আসন্ন অধিবেশনের জন্য বর্তমানে মোটামুটি প্রস্তুত জাতীয় সংসদ ভবন।
ইতোমধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনকে ঘিরে অনেকটাই নতুন করে সাজানো হয়েছে সংসদকে। ক্ষতিগ্রস্ত গুরুত্বপূর্ণ কক্ষগুলো মেরামত করে নতুন করে সাজানো হয়েছে। পুরো সংসদ ধোঁয়ামোছার কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। 
সংসদ সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সংসদ অধিবেশন বসার মতো প্রস্তুত হয়েছে। সংসদের অধিবেশন কক্ষ থেকে শুরু করে সংসদ নেতা, বিরোধী দলীয় নেতাসহ মন্ত্রীদের বসার কক্ষসহ সব কিছুতেই ছিল ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ। এগুলো মেরামতের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

প্যানেল হু

×