বিত্র মাহে রমজানের সমাপনী দশক শুরু হলো
পবিত্র মাহে রমজানের সমাপনী দশক শুরু হলো। এ মাস দানÑসদকার মাস। যাকাত-ফিতরা দানের মাস। গরিবদের প্রতি অকাতরে সাহায্য-সহযোগিতার মাস। কিন্তু কোনো কোনো ধনী ও কৃপণ ব্যক্তি তার ধনসম্পদের যাকাত যথাযথভাবে হিসাব করে দেয় না। এ আর্থিক ইবাদত সম্পাদনের ক্ষেত্রেও নানা ছলছুঁতা ও ফাঁকিঝুঁকির আশ্রয় নিয়ে থাকে। যা কখনো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য সৌভাগ্য ও কল্যাণ নিয়ে আসে না। টাকা-পয়সা, সোনাদানা, সহায়সম্পদের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন ও অপ্রতিরোধ্য। বস্তুত ধনের মায়া প্রাণের মায়ার চাইতেও বেশি। এ কথা হয়ত অনেকেই স্বীকার করবে না।
কেননা সবাই জানে যে, প্রাণের চাইতে মানুষ অন্যকিছুকেই বড় মনে করে না। এ কথা স্বীকার করলেও বলতে হয় যে, প্রত্যক্ষ বিপ্লব ও রক্তারক্তি সংঘটিত হওয়ার মূল কারণ এই ধন। ধনের লোভে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়। প্রাণের মায়া থাকে না। তাই চুরি-ডাকাতি করতে গিয়ে প্রাণ হারায়। যুদ্ধ করতে গিয়ে নৃশংসভাবে জীবনলীলা সংবরণ করে। ছেলে বাবাকে হত্যা করে, স্ত্রী স্বামীকে চুপি চুপি বিষ পান কারায়। প্রতিবেশী এই ধরনের লোভেই একে অন্যের গলায় ছুরি দেয়।
প্রেম-ভালোবাসা, মোহ-মায়া সব এ ধনের কাছেই পরাজিত। ধনের লোভ পরিত্যাগ করতে না পারলে হৃদয়ে সহানুভূতি আসে না। ভালোবাসার প্রবৃত্তি জন্মে না, আত্মা প্রসারিত হয় না, বুদ্ধি পরিপক্ক হয় না। তীক্ষè দূরদৃষ্টি আসে না, পরের তরে জীবন উৎসর্গ করার কামনা জাগে না। তাই সমাজ হয়ে পড়ে দুর্বল, পরিবেশ হয় ঘোলাটে, আবহাওয়া হয় অস্বাস্থ্যকর।
সূরা তাকাসুরে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন: ‘আধিক্যের আকাক্সক্ষাই তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে যে পর্যন্ত না তোমরা কবরে নিপতিত হও।’ বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে একটা প্রবৃত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং মৃত্যু পর্যন্ত তা চলে। এই প্রবৃত্তি হলো লোভ এবং লালসা। ধনের লোভ, সম্পত্তির লোভ, বিলাসিতার লোভ, পুণ্যের লোভ, ভোগের লোভ ইত্যাদি। হযরত রাসূলে করীম (স)ও এক বাণীতে এ কথা বলেছেন: ‘দুটি দ্রব্য বৃদ্ধের হৃদয়কে যৌবনত্ব দান করে। একটি পার্থিব দ্রব্যের প্রতি ভালোবাসা, অপরটি সুদূরপ্রসারী আশা।’ (সহীহ আল্ বুখারী)।
লোভের বশে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়। বিবেক-বিবেচনা হারিয়ে ফেলে। আপনজনকে দূরে ঠেলে। অন্যায়, অত্যাচার ও অবিচার সমাজে বিভীষিকার ঢেউ তোলে। দয়া-মায়া থাকে না, হিতাহিত জ্ঞান থাকে না, পরের তরে চক্ষু থেকে অশ্রু ঝরে না। সমাজকে করে পঙ্গু, জাতিকে করে ধ্বংস এবং নিজের আত্মাকে করে কলুষিত।
হযরত নবী করীম (স) এ ভয়াবহ চরিত্রের কথা জানতেন বলেই বলেছেন: ‘ধন ও সম্মানের প্রতি লোভ মানুষের ধর্মীয় ব্যাপারে যেরূপ বিবাদের সৃষ্টি করে দুটি ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রকে একটি ছাগলের পালের মধ্যে ছেড়ে দিলেও তদ্রƒপ বিবাদের সৃষ্টি করে না।’ (তিরমিজী)।
ধন-দৌলতের লোভ তিনি কিভাবে পরিহার করেছেন তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত তুলে ধরে সমগ্র মানবজাতিকে শিক্ষা দিলেন তাঁর নিজ জীবনের পরিচয় দিয়ে, এই বলে: আল্লাহতায়ালা আমার জন্য মক্কার প্রস্তরগুলোকে স্বর্ণে পরিণত করতে চেয়েছিলেন কিন্তু আমি বললাম, না প্রভু বরং আমি একদিন তৃপ্তিসহকারে আহার করব, অন্যদিন ক্ষুধার্ত থাকব, যখন ক্ষুধার্ত থাকব তখন তোমার নিকট প্রার্থনা করব এবং তোমার আরাধনা করব আর যখন আহার করব তখন তোমার প্রশংসা ও শোকর করব।’- (তিরমিজী)।
আল্লাহ যেন এ পবিত্র মৌসুমে আমাদের ধনীদের মনে নবীজীর (স.) এসব হাদিসের বাস্তব প্রতিফলন ঘটান। ধনের লোভ হতে পরিত্রাণ পাওয়ার যেসব পন্থা তিনি নির্দেশ করলেন তার মধ্য হতে সামান্য কয়েকটি বাণী এখানে উল্লেখ করা হলো। মহানবী (স.) সুন্দর বলেছেন: ‘ধন-সম্পত্তির প্রাচুর্যই মানুষকে ধনী করে না বরং হৃদয়ের প্রফুল্লতাই মানুষকে প্রকৃত ধনী করে তোলে।’ (তিরমিজী)।
পক্ষান্তরে ধন মানুষকে যেমন নিকৃষ্ট হতে নিকৃষ্ট স্তরে পৌঁছে দেয় তেমনি তা সম্মান ও মর্যাদার উচ্চতর শিখরে আরোহণ করায়। ধন যেমন কুপ্রবৃত্তির সহায়তা করে তেমনি বৃষ্টি ধারার ন্যায় সৎগুণাবলীও বিকাশ করে। ধন ছাড়া মান বাড়ে না, ধন ছাড়া বিদ্যা উপার্জন হয় না, ধন ছাড়া পেটের অন্ন সংস্থান হয় না। নিশ্বাসে যেমন অক্সিজেন দরকার, জীবনের প্রতিটি পদে পদে তেমনি টাকা-পয়সা দরকার। আলো-বাতাস, পানি যেমন অপরিহার্য পরিমিত ধন-সম্পত্তিও তেমনি বাঞ্ছনীয়। সৎ কাজ করতে গেলে, ক্ষুধার কঠোর জ্বালা মেটাতে হলে, দাম্পত্য জীবনের আরাম-আয়েশ ভোগ করতে হলে, নিপীড়িত মজলুমের মুখে হাসি ফুটাতে হলে, সন্তানকে সুসন্তানরূপে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে গেলে দরকার এই ধন। ধনের অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়, ধনের অভাবে মানুষ চোর-ডাকাত হয়, ধনের অভাবে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়, ধনের অভাবে আত্মীয়তা ভঙ্গ হয়, ধনের অভাবে স্ত্রী-পুত্র শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।
কারুনের ধন, ফেরাউনের ধন ও নমরুদের ধন যেমন নাগিণীর ফনা তুলে বিভীষিকার সৃষ্টি করেছিল, অত্যাচার, অবিচার ও শোষণের সীমা লঙ্ঘন করেছিল তেমনি আবু বকর, ওমর, উসমানের (রাদি.) ধন দয়া ও মায়ার জাল বিস্তার করে মানব সমাজের অন্তরে এক সঞ্জীবণী শক্তি এনে দিয়েছিল। ধন ইহকাল ও পরকালের সম্পদ। যার ধন নেই সে ইহকালেও যেমন গরিব পরকালেও তেমন গরিব। ইহকালের মান-মর্যাদা তার যেমন সীমাবদ্ধ পরকালের মান-মর্যাদাও তেমনই নগণ্য। মহানবী (স.) সত্যিই বলেছেন: ‘সমস্ত পার্থিব দ্রব্যের স্থায়িত্ব চার ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে। যথা: ১. শিক্ষিত সংযমী ২. ধনী দাতা ৩. ধৈর্যশীল কাফির ও ৪. ন্যায় বিচারক।
তাই আমরা আমাদের মহান নবীজী হযরত মুহাম্মদ (স.) এঁর প্রাত্যহিক মুনাজাতের মতো এভাবে কল্যাণময় ও বরকতের জীবন কামনা করব- হে আমার পরওয়ার দিগার! যে বিদ্যা ভালো, যে কার্য তোমার প্রিয়, যে ধন সৎভাবে অর্জন করা যায়, যে স্বাস্থ্য ধার্মিকতা, ন্যায়পরায়ণতা ও শিষ্টাচার আমাদের ভাগ্যে নির্ধারিত আছে তাতে সন্তুষ্ট থাকার শক্তি আমাদের দান কর; আমাদের আন্তরিকভাবকে বাহ্যিক ভাবের চেয়ে সুন্দর কর এবং বাহ্যিক ভাবকে নির্মল কর। আমাদের সাধ্বী স্ত্রী, নির্দোষ ধন এবং যারা পথভ্রষ্ট হয় না বা পথভ্রষ্ট করে না এরূপ সুসন্তান দান কর।-(তিরমিজী)।
প্যানেল হু








