অমর একুশে বইমেলা মানে শুধু বইয়ের বিকিকিনি নয়। জাতির মননের উৎকর্ষের প্রতীকী মেলার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে চেতনার বহ্নিশিখা। সেই চেতনায় মিশে আছে ভাষা আন্দোলনের খরস্রোতা সংগ্রামী অধ্যায়। শুধু কি তাই! এই মেলার সঙ্গে মিশে আছে মুক্তচিন্তার সমাজ গড়ার গল্প। যে গল্পে মিশে আছে মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন। সম্প্রীতির সমাজ বিনির্মাণের ভাবনাটাকেও বহন করে এই গল্প। তাই তো একুশে বইমেলায় অনেকেই আসেন আবেগের টানে। তারা নতুন বই সংগ্রহের আনন্দকে ছাপিয়ে অন্য কিছুরও সন্ধান করেন প্রাণের এই উৎসবে। হৃদয়ের অকৃত্রিম অনুরাগে শামিল হন ভাষাশহীদদের স্মৃতিতে নিবেদিত আযোজনটিতে। ঘুরে বেড়ান মেলার দুই ক্যানভাস সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি আঙ্গিনায়। ভালোলাগার অনুভবে নতুন বই নিয়ে নাড়াচাড়ার পাশাপাশি স্টল বিন্যাসের সৌন্দর্য অবলোকনে মুগ্ধতার সন্ধান খোঁজেন। উপভোগ করেন গান-কবিতার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে শিল্পী-সাহিত্যিক ও মনীষীদের স্মরণে অনুষ্ঠিত কথামালায় । কেউ বা লেখকদের লেখক হওয়ার ভেতরের গল্পটি শুনতে উপস্থিত হন লেখক বলছি মঞ্চের অনুষ্ঠানে। সব দেশের সবচেয়ে বড় এই সাংস্কৃতিক উৎসবটাকে তারা ভিন্নভাবে উপলব্ধি করেন। একরাশ ভালোলাগার অনুভব নিয়ের তারা প্রবেশ করেন প্রাণের মেলায়। উদ্যাপনের অপার আনন্দের শামিল হওয়া তেমনই এক কবি ও আবৃৃত্তিশিল্পী এবং উপস্থাপিকা তাসনুভা মোহনা।
শনিবার বসন্ত বিকেলে উৎফুল্ল মনে এই নারী চষে বেড়াচ্ছিলেন সোহরাওয়াদী উদ্যানের মেলা প্রান্তর। এই অংশের বাংলা একাডেমির প্যাভিলিয়নে দৃশ্যমান বাংলা বর্ণমালায় সজ্জিত রঙিন নকশা বোর্ডের সঙ্গে ফ্রেমবন্দি করছিলেন নিজেকে। এরপর ধীরে পায়ে চলে গেলেন প্রকাশনা সংস্থা বাতিঘরের স্টলে। হাতে তুলে নেন সদ্য প্রকাশিত মোস্তাক শরীফ রচিত ‘মির্জা গালিব’ শিরোনামের বইটি।
এ সময় কথা হয় তাসনুভা মোহনার সঙ্গে। আলাপচারিতায় এই পাঠক ও দর্শনার্থী বইমেলাকে দেশজ সংস্কৃতির অনন্য উদ্যাপন উল্লেখ করে বলেন, বইমেলা মানে কেবল বই কেনা এবং বেচার বিষয় নয়। কেবলই ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম নয়। শুধুমাত্র বই কেনার জন্য এখানে আসি না। এই মেলার সঙ্গে মিশে আছে আবেগের সম্পর্ক। যুক্ত রয়েছে ভাষা আন্দোলনের অবিনাশী চেতনা। মিশে আছে ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের সুন্দরতম অনুভূতি। অন্যদিকে এই মেলা যেন এক বিশালতম সংস্কৃতির সুন্দরতম প্রকাশ। এখানে একটা মঞ্চে দাঁড়িয়ে লেখকরা তাদের লেখক হওয়ার গল্পগুলোকে মেলে ধরেন পাঠকের সামনে। এতে লেখক-পাঠকের মাঝে গড়ে ওঠে নিবিড়তম সম্পর্ক। আবার গ্রন্থ মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে যখন লেখক তার সদ্য প্রকাশিত বইটির নিয়ে কথা বলেন তার অন্তর্গত আনন্দের রেশটা ছুঁয়ে যায় সেথায় উপস্থিত শ্রোতাদের মনে। এর বাইরে মেলামঞ্চের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটিও আমার কাছে দারুণ উপভোগ্য। কখনো বা মনীষী কিংবা কবি-সাহিত্যিকদের নিবেদিত আলোচনা শুনেও ঋদ্ধ হই। তাছাড়া মেলা মানেই হচ্ছে উৎসব। সব ধরনের মানুষের সমাগম ঘটে এ উৎসবে। সবাই মিলে আয়োজনটাকে উদ্যাপন করে। এ কারণে মেলা এখনো জমে না উঠলেও সুযোগ পেলেই এখানে ঢুঁ দেই। শনিবার নিয়ে দ্বিতীয় দিন নিলাম। এখনো তেমনভাবে নতুন বই না আসায় খুব একটা বই কেনা হয়নি। তবে মেলাটা পুরোদমে উপভোগ করছি। এর বাইরে বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দেওয়াসহ আনন্দের নানা অনুষঙ্গ আমাকে টেনে নিয়ে আসে এই মেলায়। আমার মতো অনেকেই অভিন্ন অনুভূতি নিয়ে প্রবেশ করেন ভাষা আন্দোলনের স্মৃতির স্মারক এই তীর্থস্থানে।
তৃতীয় দিনের সার্বিক চিত্র
শনিবার মেলার তৃতীয় দিনেও গুছিয়ে ওঠনি অনেক স্টল। খুলে যায়নি মেলায় অংশ নেওয়া সকল প্রকাশনীর স্টল। আবার অনেক প্রকাশনীর স্টল খুললেও আসেনি নতুন বই। আসেনি নতুন বইয়ের তালিকাযুক্ত ক্যাটালগ। এ ছাড়া এদিন পাঠকের পাশাপাশি দর্শনার্থীর সংখ্যাও ছিল হাতে গোনা। দুপুর থেকে বিকেল গড়ানো সন্ধ্যা অবধি পাঠকখরার চিত্র ধরা দিয়েছে। বিকিকিনি কম হওয়ায় বই বিতানের বিপণনকর্মীরাও অলস সময় কাটিয়েছেন। সেই সুবাদে প্রকাশকদের অনেকেই আগামী দিনে মেলা জমে ওঠার প্রত্যাশায় দিন গুনছেন।
নির্বাচিত নতুন বই
বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগের তথ্যানুযায়ী বইমেলার তৃতীয় দিন প্রকাশিত হয়েছে ৩৮টি নতুন বই। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে বাংলা একাডেমি থেকে বেরিয়েছে আকিমুন রহমানের গবেষণাগ্রন্থ ‘আধুনিক বাংলা উপন্যাসে বাস্তবতার স্বরূপ। বাঙ্গালা গবেষণা প্রকাশন থেকে বেরিয়েছে মাহবুব উল্লাহ রচিত ‘বঙ্গভঙ্গ তৎপরবর্তী সমাজ ও রাজনীতি’ এবং মেহেদী হাসানের ‘বাইশ পরিবারের অতীত ও বর্তমান’। আগামী এনেছে হুমায়ুন আজাদের দুই প্রবন্ধগ্রন্থ ‘এক একর সবুজ জমি’ ও ‘জর্নাল’। হুমায়ুন আজাদের অগ্রন্থিত দুর্লভ কিছু গদ্য একত্রিত হয়েছে এক একর সবুজ জমি নামের সংকলনে। গদ্যগুলো প্রকাশ পেয়েছিল বিশ শতকের সত্তর ও আশির দশকে। ময়ূরপঙ্খি এনেছে সাখাওয়াত টিপুর গল্পগ্রন্থ ‘বোমার দেশে ঘাসের দেশে’। কথাপ্রকাশ থেকে বেরিয়েছে আফসানা বেগমের ছোটগল্প ‘জাম্প অ্যান্ড দ্য আদার স্টোরিজ’ এবং মো. সফিকুল ইসলামের গবেষণাগ্রন্থ ‘অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় : বাংলা ইতিহাসচর্চার পথিকৃৎ’। পাঠক সমাবেশ এনেছে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ছোটগল্প ‘ভুলে থাকা গল্প’। ইউপিএল এনেছে বীর প্রতীক ডা. সিতারা বেগমের স্মৃতিকথা ‘ওয়েপিং হার্ট’? বইটিতে এই মহিয়সী মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অংশগ্রহণ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির কথা তুলে ধরেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের নানা প্রেক্ষাপট উঠে এসেছে বইটির নানা অধ্যায়ে। মর্মন্তুদ বর্ণনায় তিনি লিখেছেন একাত্তরের ভয়াল গণহত্যার কথা। সময় প্রকাশন এনেছে মুনতাসীর মামুনের ‘গুজব, রাজনীতি ও ইতিহাস : মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১’। পাঞ্জেরী থেকে বেরিয়েছে প্রসূন হালদারের ‘ছড়ায় ছড়ায় পশুরাজ্য’।
শিশুপ্রহর ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা
এদিন ছিল শিশুপ্রহর। তাই সকাল ১১টা খুলে যায় মেলার দুয়ার। সকালে মেলা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার প্রথমিক বাছাই পর্ব। প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করেন বাংলা একাডেমি মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ৭ মার্চ।
মেলামঞ্চের আয়োজন
বিকেলে বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ : আহমদ রফিক শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইসমাইল সাদী। আলোচনায় অংশ নেন মোস্তফা তারিকুল আহসান। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মনসুর মুসা।
ইসমাইল সাদী বলেন, আহমদ রফিক জীবনের অধিকাংশ সময়ই ব্যয় করেছেন বাংলাদেশের ভাষা ও সাহিত্য বিকাশে। প্রবন্ধ, কবিতা, গবেষণা, সাহিত্য সমালোচনা, নতুন লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা, সাহিত্যপত্রিকা সম্পাদনা, উদ্যোক্তা, সংগঠক-সব মিলিয়ে সৃষ্টি আর কর্মের এক অভূতপূর্ব সম্মিলন ঘটেছিল তাঁর যাপিত জীবনে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে আহমদ রফিক ছিলেন সংগঠকের ভূমিকায়। এ-পর্বে প্রতিটি সভা-মিছিল, প্রতিবাদী কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ভাষা আন্দোলনে যেমন আহমদ রফিক রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তেমনি সাহিত্য ও ইতিহাসচর্চার প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি অনুভব করতেন শৈল্পিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। সেই কারণে, মননশীল সাহিত্য ও ভাষা আন্দোলন-বিষয়ক গ্রন্থ রচনায় তিনি ক্রমশ অনালোকিত বিষয় নির্বাচন করে তাতে চিন্তা ও গবেষণার আলো ফেলে গেছেন।
অধ্যাপক মনসুর মুসা বলেন, আহমদ রফিক কেবল ভাষাসংগ্রামী ছিলেন না, তিনি জীবনসংগ্রামীও ছিলেন। মানুষের জীবনকে উন্নত করার জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তাঁর বৈচিত্র্যময় সৃজনশীল কাজের মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন আহমাদ মাযহার।
বিকেলের সাংস্কৃতিক পর্বে কবিতা আবৃত্তি পরিবেশন করেন কাজী বুশরা আহমেদ তিথি, ইশরাত শিউলি, জান্নাতুল ফেরদৌস মুক্তা ও নাসিম আহমেদ। সংগীত পরিবেশন করেন সালাউদ্দিন আহমেদ, শহীদ কবীর পলাশ, ইয়াকুব আলী খান, নন্দিতা মণ্ডল, অপর্ণা মজুমদার, নুসরাত জাহান জেরিন ও মো. জাকির হোসেন আখের।
আজকের মেলা
আজ রবিবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায়। শেষ হবে রাত ৯টায়। বিকেলে মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণ : হামিদুজ্জামান খান শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন নাসিমুল খবির। আলোচনায় অংশ নেবেন আইভি জামান। সভাপতিত্ব করবেন লালারুখ সেলিম। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
প্যানেল / জোবায়ের








