ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৪ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

ঈদ উপলক্ষে জমে উঠেছে কেনাকাটা

দুই লাখ কোটি টাকা বাণিজ্যের আশা ব্যবসায়ীদের

নাজমুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২২:৪১, ১৩ মার্চ ২০২৬

দুই লাখ কোটি টাকা বাণিজ্যের আশা ব্যবসায়ীদের

দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই রাজধানীসহ সারা দেশে বাড়ছে মানুষের কেনাকাটার ধুম। ইফতারের পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট ও ফুটপাতের দোকানগুলোতে নেমে আসে ক্রেতাদের ঢল।
অনেকেই ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার আগে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা সেরে নিতে মার্কেটে ভিড় করছেন। পরিবার-পরিজনের জন্য নতুন পোশাক ও প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে খুশি মনেই বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন লাখো মানুষ।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, ঈদ আনন্দকে ঘিরে শহরের অলিগলি থেকে বড় মার্কেট, সবখানেই এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। নতুন পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও উপহারসামগ্রীর খোঁজে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের পদচারণায় মুখর  মার্কেট ও শপিংমলগুলো। বিশেষ করে ইফতারের পর কেনাকাটার চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।  
ব্যবসায়ীরা জানান, এবারের ঈদকে ঘিরে দেশের বাজারে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুই বছর আগের মন্দাভাব কাটিয়ে এবার দেশীয় বিপণিবিতান ও ফুটপাতের দোকানগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, ব্যাগ, ঘড়ি ও উপহারসামগ্রীসহ সব ধরনের দোকানে ক্রেতাদের উপস্থিতিতে জমে উঠেছে কেনাকাটা।
বিগত কয়েক মৌসুমের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে এবার ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছিলেন। সেই আস্থার প্রতিদান মিলছে এখন। বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-বোনাস হাতে আসায় বাজারে নতুন গতি এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর নিউমার্কেট, গাউছিয়া মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন বিপণিবিতান ঘুরে দেখা গেছে, নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভিড়। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে মার্কেটে আসছেন। শিশু ও কিশোরদের পোশাকের দোকানগুলোতে আগ্রহ তুলনামূলক বেশি লক্ষ্য করা গেছে। সন্ধ্যার পর মার্কেটগুলোতে কেনাকাটার চাপ আরও বাড়তে দেখা যায়।
ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদ মৌসুমে বছরের বড় একটি অংশ বিক্রি হয়ে থাকে। ফলে এ সময়কে কেন্দ্র করে আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়। দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলো নতুন নতুন নক্সার পোশাক বাজারে এনেছে। পাশাপাশি বিদেশি ব্র্যান্ডের পোশাকও পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন শপিংমলে।
শুধু আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শপিংমল নয়, সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে ফুটপাত ও অস্থায়ী বাজারগুলোও। নিউমার্কেট-সংলগ্ন রাস্তার ধারের দোকানগুলোতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ভিড় চোখে পড়ার মতো। সেখানে সাধ্যের মধ্যে পছন্দের জিনিসটি খুঁজে নিতে ব্যস্ত ক্রেতারা। টি-শার্ট, জিন্স কিংবা বাচ্চাদের রঙিন জামার পসরা সাজিয়ে বসেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি নাজমুল
হাসান মাহমুদ জনকণ্ঠকে বলেন, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ব্যবসায়ীরা অনেকটা স্বস্তিবোধ করছেন। বিশেষ করে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার থাকায় রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায় স্বস্তি ফিরেছে। এ বছর সারা দেশে ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা করা হচ্ছে। গত বছর সারা দেশে প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ হাজার কোটি টাকার ঈদ ব্যবসা হয়েছিল। আশা করছি এ বছর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, কিছুদিন আগেও ব্যবসায়ীরা নানা ধরনের হয়রানি ও মব আতঙ্কে ছিলেন। তবে নির্বাচনের পর পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। অতীতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনেক ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছিলেন। তাই ঢালাওভাবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা ঠিক নয়। তবে যারা অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে।
নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাতের পোশাক ব্যবসায়ী মো. মাহবুব জনকণ্ঠকে বলেন, শুরুতে বিক্রি খুব বেশি ছিল না। তবে গত কয়েক দিনে ক্রেতা বাড়তে শুরু করেছে। সারাদিন কিছুটা কম থাকলেও ইফতারের পর ভিড় অনেক বেড়ে যায়। এখন প্রতিদিনই রাত ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত কেনাকাটা হয়।
গাউছিয়া মার্কেটের মেয়েদের পাইকারি থ্রি-পিস ব্যবসায়ী ‘ফেব্রিক্স প্লাস’-এর কর্ণধার শামিম রহমান জনকণ্ঠকে জানান, প্রতিবছর ঈদকে কেন্দ্র করে আমাদের ব্যবসা ভালো হয়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার খুচরা ব্যবসায়ীদের চাহিদা বেশি। সব মিলিয়ে ব্যবসা আশানুরূপ হয়েছে।
পোশাকের পাশাপাশি গহনা ও প্রসাধনীর দোকানগুলোতেও নারী ক্রেতাদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। চাঁদনি চক ও গাউছিয়া মার্কেটে মেকআপ সামগ্রী ও ইমিটেশন গহনার বিক্রি কয়েকগুণ বেড়েছে। অন্যদিকে জুতার দোকানগুলোতেও ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বাটা বা এপেক্সের মতো বড় ব্র্যান্ডের পাশাপাশি স্থানীয় কারিগরদের তৈরি জুতাও বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
গাউছিয়া মার্কেটের গহনা ব্যবসায়ী মো. রাসেল জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা এক মাস ধরে দিন-রাত পরিশ্রম করেছি। ক্রেতাদের যে সাড়া পাচ্ছি, তাতে পেছনের সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। এবারের বাণিজ্য আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকে আগেভাগেই প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার চেষ্টা করছেন যাতে শেষ মুহূর্তের ভিড় এড়ানো যায়। আবার অনেকেই ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার আগে পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা সেরে নিচ্ছেন।
নিউমার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী জুবায়ের আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন পোশাক কেনা ঈদের অন্যতম আনন্দের অংশ। তবে এবার খরচ কিছুটা হিসাব করে করতে হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের চাপ থাকায় ঈদ বাজেট সীমিত রাখতে হচ্ছে।
এদিকে ঈদকে সামনে রেখে বাজার এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও মার্কেট এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে।

প্যানেল / জোবায়ের

×