সহিদুল হক মোল্লা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, মুদ্রাবাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পড়তে শুরু করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ব্যাংকিং খাতে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকদের বাড়তি ব্যয় গুনতে হচ্ছে।
অনেক ব্যাংক এলসি (Letter of Credit) খোলার সময় ঘোষিত বিনিময় হার ছাড়াও অতিরিক্ত ডলার মূল্য নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। ফলে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশের ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, দ্রুত নীতিগত সহায়তা না দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বেসরকারি খাতের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক এবং মোল্লা গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সহিদুল হক মোল্লা মনে করেন, ডলারের বাজার স্থিতিশীল করা, বন্দর চার্জ কমানো, ব্যাংক সুদহার কমানো এবং আমদানিতে ভ্যাট ও শুল্কহার হ্রাসের মাধ্যমে সরকার পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এই অঞ্চলে যেকোনো যুদ্ধ বা সংঘাত সরাসরি প্রভাব ফেলে তেল ও গ্যাসের বাজারে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি আমদানি বিল বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বীমা খরচ বৃদ্ধি এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে নিরাপত্তা ঝুঁকি। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সার্বিক খরচ বাড়ে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব দ্বিমুখী।
একদিকে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে ডলারের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, ব্যাংকগুলো অনেক সময় ঘোষিত বিনিময় হার ছাড়াও এলসি খোলার সময় অতিরিক্ত ডলার মূল্য নিচ্ছে। ফলে আমদানির প্রকৃত খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে। মোল্লা গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সহিদুল হক মোল্লা বলেন, ডলারের বাজার স্থিতিশীল না থাকলে ব্যবসা পরিচালনা করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ব্যাংক এলসি খোলার সময় অতিরিক্ত ডলার মূল্য নিচ্ছে। এতে আমদানিকারকদের খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমদানির খরচ বাড়লে শিল্প উৎপাদনের খরচও বেড়ে যায়। কারণ দেশের অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের পোশাক, কৃষিযন্ত্রপাতি, মোটর পাম্প, ওষুধ, ইস্পাত, প্লাস্টিক, কেমিক্যাল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বেশিরভাগ শিল্প খাত আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। ডলারের দাম বাড়লে এসব কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বাড়ে। ফলে শিল্প উৎপাদনের মোট ব্যয় বেড়ে যায়। উৎপাদকরা তখন পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন বন্দরে বিভিন্ন ধরনের চার্জ বেড়েছে। কন্টেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ, স্টোরেজ চার্জ এবং অন্যান্য ফি বাড়ার কারণে আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। মো. সহিদুল হক মোল্লা বলেন, ‘ডলারের দাম বাড়ছে, জ্বালানি খরচ বাড়ছে- তার ওপর যদি বন্দর চার্জও বাড়ে তাহলে আমদানিকারকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।’
তিনি মনে করেন, আমদানির খরচ কমাতে বন্দরের চার্জ কমানো জরুরি। এ ছাড়া বাংলাদেশে সুদের হার বৃদ্ধিও ব্যবসায়ীদের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী বলছেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসার ব্যয় বাড়ছে। সহিদুল হক মোল্লা বলেন, ব্যাংকের সুদের হার বেশি হলে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্যানেল হু








