ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

বৃহত্তর যশোরের নদ-নদীর ইতিহাস এখনও স্পষ্ট

সাজেদ রহমান, যশোর

প্রকাশিত: ১৯:০৫, ১৩ মার্চ ২০২৬

বৃহত্তর যশোরের নদ-নদীর ইতিহাস এখনও স্পষ্ট

বৃহত্তর যশোরে অনেক নদী একসময় প্রমত্তা স্রোতধারার সাক্ষী ছিল। আজ এই নদীগুলো আগের মতো প্রবাহিত হয় না, কিছু নদী শুকিয়ে গেছে, কিছু বর্ষার সময়ে পানি ধরে রাখে, বাকি সময় শুকিয়ে যায়। নদীর এই পরিবর্তন জীববৈচিত্র্যে নতুন প্রতিকূলতা নিয়ে এসেছে। তবুও এই নদীগুলোই গড়ে তুলেছিল জনপদ, গ্রাম, হাটবাজার। যদিও সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের সঙ্গে নৌপথের গুরুত্ব কমেছে, নদীর ইতিহাস ও প্রভাব এখনো স্পষ্ট।
স্রোতস্বিনী ভৈরব : অতীতের আয়নায় বর্তমান ॥ ‘ওগো ভৈরব, ওগো ভয়াল রূপধারী,/ তোমার বুকে জাগে কত অজানা ইতিহাস’ এই পঙ্ক্তির মতোই ভৈরব একসময় ছিল ভয়ঙ্কর, প্রাণময়, প্রবল। নামের মধ্যেই তার শক্তির পরিচয়। ‘সিন্ধু-ভৈরব-শোন’ এই একত্র উচ্চারণে তাকে নদপর্যায়ে মহিমান্বিত করা হয়েছে। ভারতবর্ষে বহু নদীর নামে অন্য নদীর নাম থাকলেও ভৈরবের নামে আর কোনো নদ নেই, এ এক অনন্য স্বাতন্ত্র্য। সে শুধু নদী নয়, এক তীর্থনদ; ইতিহাস, জনপদ ও সভ্যতার ধারক।
মালদহের দিক থেকে পদ্মায় মিলিত হওয়া মহানদের অপর পারে যেন ভৈরব নাম ধারণ করে তার যাত্রা শুরু। পদ্মার দক্ষিণবাহিনী শাখা জলঙ্গীর সঙ্গে মিলন, পুনরায় মুক্ত হয়ে মেহেরপুরের পাশ দিয়ে জয়রামপুর রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিমে মাথাভাঙ্গার সঙ্গে সংযোগ এইভাবে সে বহুসংযোগে সমৃদ্ধ। দর্শনা স্টেশনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে প্রকাণ্ড বৃত্তাকার বাঁক ঘুরে আবার যশোরে প্রবেশ, কোটচাঁদপুর পর্যন্ত পূর্বমুখী গতি, পরে দক্ষিণমুখী প্রবাহ ভৈরব যেন নিজের ইচ্ছায় পথ এঁকে চলেছে। তাহিরপুরে এসে কপোতাক্ষ শাখা ত্যাগ করে সে নিজে পূর্বদিকে গিয়েছে, আর কপোতাক্ষ দক্ষিণে। এই বিভাজনও এক ইতিহাসের সূচনা।
যশোর-খুলনার আর্যসভ্যতা এই নদীপথেই প্রবাহিত হয়েছে। বারবাজার, মুড়লী কসবা (বর্তমান যশোর), বসুন্দিয়া, সেখহাটি, আলিনগর (নওয়াপাড়া), ফুলতলা, দৌলতপুর, বাগেরহাট কত জনপদ তার কূলে কূলে গড়ে উঠেছে। নদীর বুকে ভেসে এসেছে বাণিজ্য, কৃষি, সংস্কৃতি, জ্ঞানালোক। নৌকার পাল ফুলে উঠত তার স্রোতে; ঘাটে ঘাটে বাজত জীবনের সুর।
কিন্তু ভৈরবের ইতিহাসে আছে মানুষের হস্তক্ষেপের করুণ অধ্যায়। তাহিরপুরে কপোতাক্ষের স্রোত রোধ করতে বাঁধ দেওয়া হলো; প্রবল স্রোত সেই বাধা মানল না। পরে দর্শনার কাছে নদীয়ার কালেক্টর সেক্সপীয়র সাহেবের খনন করা ক্ষুদ্র খাল মাথাভাঙ্গার পথ সোজা করে দিল। ফল হলো ভয়াবহ, মাথাভাঙ্গায় জল চলে গেল, ভৈরব ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ল। পদ্মার জল আর তেমন এ পথে এলো না; যা এলো, কপোতাক্ষ টেনে নিল। বসুন্দিয়ার নিচে নৌচলাচল বন্ধ হয়ে গেল। একসময়ের ভয়াল, সুদীর্ঘ নদ ক্রমে সঙ্কুচিত, নিস্তেজ।
তবু ভৈরব পুরোপুরি মরে যায়নি। মুজদখালি, আতাই, আঠারবাঁকী প্রভৃতি শাখা থেকে পার্বত্য স্রোত এসে তাকে কিছুটা পুষ্টি দিয়েছে। আলাইপুর থেকে যাত্রাপুর পর্যন্ত সে আবারও জলোচ্ছ্বাসে বিক্রম দেখিয়েছে। ইতিহাসের ধারায় সে আজ ক্ষীণ হলেও তার কূলে কূলে ছড়িয়ে আছে জনপদের স্মৃতি, সংস্কৃতির রেখাচিত্র। 
কপোতাক্ষ : জনপদের জীবনরেখা ॥ ‘সতত হে নদ, তুমি পড় মোর মনে’ মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই অমর উচ্চারণে যে নদীর কথা, সে কপোতাক্ষ। বাংলা সাহিত্যের স্মৃতিবিজড়িত এই নদী কেবল জলধারা নয়, এক আবেগের উৎস, প্রবাসী কবির হৃদয়ের অনির্বচনীয় টান।
তাহিরপুরে ভৈরব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কপোতাক্ষ দক্ষিণমুখী হয়েছে। চৌগাছা, কাবিলপুর, গঙ্গানন্দপুর, মাগুরা, ঝিখরগাছা, বাঁকড়া, ত্রিমোহানী, সাগরদাড়ি, এই সাগরদাঁড়িই মাইকেলের জন্মভূমি। কপোতাক্ষের তীরে দাঁড়িয়েই তিনি  শৈশবের আকাশ, কাশফুল, নৌকার ভাটিয়ালি দেখেছেন। পরে দূর বিদেশে বসে সেই নদীকেই স্মরণ করেছেন অশ্রুসজল কণ্ঠে। তার কাব্যে কপোতাক্ষ তাই রূপ পেয়েছে মাতৃভূমির প্রতীক হিসেবে।
কপিলমুনি, রাডুলি, বড়দল, চাঁদখালি পেরিয়ে সুন্দরবনের অন্তরে খোলপেটুয়ার সঙ্গে মিলন অবশেষে আড়পাঙ্গাসিয়া নামে বঙ্গোপসাগরে পতন। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে কপোতাক্ষ বহু জনপদের জন্ম দিয়েছে, বাণিজ্য ও কৃষির বিস্তার ঘটিয়েছে। তার স্রোতে ভেসে এসেছে লবণাক্ত হাওয়া, নোনা জলের গন্ধ, আবার লোকগানের সুর।

বেগবতী নদী    -জনকণ্ঠ
ঐতিহাসিকভাবে কপোতাক্ষ ভৈরবের শক্তি টেনে নিয়েছিল। পদ্মার জল যেখানে ভৈরবকে পুষ্ট করতে পারত, সেখানেই কপোতাক্ষ তার প্রবল স্রোতে সেই জল টেনে নেয়। ফলে  ভৈরব ক্ষীণ হয়, কপোতাক্ষ প্রবল। কিন্তু প্রকৃতির এই টানাপোড়নই ডেল্টা অঞ্চলের নদীগুলোর স্বভাব কখনো জন্ম, কখনো মৃত্যু, কখনো স্থানান্তর।
সাহিত্যে কপোতাক্ষ এক অনন্য নাম। মাইকেলের কবিতায় সে স্মৃতির নদী, ব্যথার নদী, মাতৃস্তনের সুধাধারা। ‘সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে’ এই স্বীকারোক্তি কেবল কবির নয়, দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার মানুষেরও। আজ নদীটি নানা স্থানে ভরাট, স্রোতহীন; তবু তার নাম উচ্চারিত হলেই জেগে ওঠে কাব্যের পঙক্তি, শৈশবের গ্রাম, কাশবনের দোলা।
কপোতাক্ষ ছাড়া মাইকেলকে ভাবা যায় না; আর মাইকেল ছাড়া কপোতাক্ষও যেন অপূর্ণ। 
বেতনা নদী : সীমান্ত পেরিয়ে বদলে যাওয়া নদীর জীবনকথা ॥ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীর ইতিহাসে বেতনা একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৬৪ হিসেবে চিহ্নিত এই নদী একাধারে আন্তঃসীমান্ত, বহুরূপী এবং বহু-নামে পরিচিত। সর্পিলাকার গতিপথে বয়ে চলা বেতনা নদীর  দৈর্ঘ্য প্রায় ১৯১ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ৫৫ মিটার।
বেতনার জন্ম ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুরে, ভৈরব নদের একটি শাখা হিসেবে। একসময় এর উৎসমুখ ছিল স্পষ্ট ও প্রবহমান; কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই মুখ এখন প্রায় বিচ্ছিন্ন। মহেশপুর এলাকার কয়েকটি বিল থেকে পানি সংগ্রহ করে নদীটি তার যাত্রা শুরু করে এবং দ্রুতই ভারত সীমান্তে প্রবেশ করে।
ভারতে প্রবাহিত হওয়ার পর আবার যশোর জেলার শার্শা উপজেলার নারিকেলবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে বেতনা পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসে। এই সীমান্ত অতিক্রমের অভিজ্ঞতাই নদীটিকে দিয়েছে এক বিশেষ ভূরাজনৈতিক চরিত্র। এরপর এটি যশোর অতিক্রম করে সাতক্ষীরা জেলায় প্রবেশ করে।
সাতক্ষীরায় এসে বেতনা নদী মরিচ্চাপ নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। এই মিলনস্থল থেকেই নদীটি নতুন নাম ধারণ করে খোলপেটুয়া। পরবর্তী অংশে এর নাম হয় কালিয়া নদী। কালিয়ার একটি শাখা দালুয়া নদী নামে পরিচিত। নদীর যাত্রা এখানেই থেমে থাকে না। সুন্দরবন অঞ্চলে প্রবেশ করলে বেতনা অর্পণগাছিয়া নামে পরিচিত হয়, এবং আরও দক্ষিণে গিয়ে মালঞ্চ নামে রূপান্তরিত হয়ে অবশেষে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়।
একটি নদীর এতগুলো নাম বেতনা, খোলপেটুয়া, কালিয়া, অর্পণগাছিয়া, মালঞ্চ আসলে তার ভৌগোলিক ও সামাজিক বিবর্তনেরই গল্প। নদীর প্রবাহ যেমন বদলায়, তেমনি বদলায় মানুষের ভাষা, স্মৃতি ও পরিচয়। বেতনা তাই কেবল একটি জলধারা নয়; এটি সীমান্ত, জনপদ, বনভূমি ও সাগরের সঙ্গে সংযোগ রচনা করা এক দীর্ঘ জীবন্ত ইতিহাস।
অপূর্ব মুক্তেশ্বরী : বিল থেকে টেকা নদী পর্যন্ত যাত্রা ॥ নামেই যেন সুর মুক্তেশ্বরী। তার সঙ্গে যখন যুক্ত হয় ‘অপূর্ব’ বিশেষণটি, তখন নদীটি আর কেবল ভৌগোলিক স্রোত থাকে না; হয়ে ওঠে অনুভবের এক জলরেখা। যশোরের বুকের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা এই মুক্তেশ্বরী নদীর জন্ম একেবারেই নিভৃত পরিবেশে যশোর সেনানিবাসের পশ্চিম পাশে একটি বিল থেকে। বিলের শান্ত জলে জমে থাকা বর্ষার সঞ্চয়, ঋতুর পালাবদল আর মাটির গর্ভে জমে থাকা জলধারাই যেন ধীরে ধীরে পথ খুঁজে নিয়েছে মুক্তেশ্বরীর প্রথম স্রোত হিসেবে।
উৎসমুখ থেকে নদীটি ভেকুটিয়া গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়। ভোরের কুয়াশা, ধানক্ষেত আর তালগাছের ছায়া মেখে সে এগিয়ে চলে পুলেরহাটের দিকে। পুলেরহাটের সেতু আর বাজারের কোলাহল তার জলে প্রতিফলিত হয়; নদী এখানে কেবল প্রকৃতি নয়, জনজীবনের অংশ। তারপর সতিঘাটা নামেই ইতিহাসের আভাস। এই পথ ধরে নদীটি পৌঁছে যায় মনিরামপুরে।
মণিরামপুরে এসে মুক্তেশ্বরী যেন আরও বিস্মৃত হয়। আশপাশের খাল-বিলের জল যুক্ত হয়ে তার স্রোতকে একটু ভারী করে তোলে। এখান থেকে নদীটি ঢাকুরিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। ঢাকুরিয়া অঞ্চলে নদীর বাঁক আরও স্পষ্ট, কোথাও সরু, কোথাও খানিক প্রশস্ত। বর্ষায় সে উচ্ছল, শুষ্ক মৌসুমে কিছুটা শান্ত কিন্তু তার গতি থেমে থাকে না।
অবশেষে মুক্তেশ্বরী টেকা নদীতে গিয়ে মিশে যায়। এই মিলনই তার যাত্রার শেষ অধ্যায়, তবে সেই শেষও আরেক নদীর ভেতর দিয়ে নতুন যাত্রার সূচনা।
‘মুক্তেশ্বরী’ নামটির মধ্যেই আছে এক ধরনের আধ্যাত্মিক সুর। ‘মুক্ত’ মানে স্বাধীন, আর ‘ঈশ্বরী’ মানে দেবীস্বরূপা অর্থাৎ এক স্বাধীন, মুক্তিদাত্রী জলধারা। হয়তো বিলের নিভৃত গর্ভ থেকে নিজের পথ নিজেই তৈরি করে নিয়েছিল বলেই এই নামের জন্ম। আবার স্থানীয় লোকবিশ্বাস, প্রাচীন কোনো পূজাস্থান বা দেবীর নাম থেকেও নামকরণ হয়ে থাকতে পারে। ইতিহাস যা-ই বলুক, নামটি নিঃসন্দেহে অপূর্ব শ্রুতিমধুর, অর্থবহ এবং স্মরণীয়।
বিলের নিস্তব্ধতা থেকে গ্রাম, বাজার, জনপদ পেরিয়ে টেকা নদীর বুকে মিলিয়ে যাওয়া মুক্তেশ্বরী তাই যশোরের ভূপ্রকৃতির এক অনন্য অংশ। ছোট হলেও তার পথচলা গভীর জলের ভেতর যেমন স্রোত থাকে, তেমনি নামের ভেতর থাকে ইতিহাস ও অনুভবের দীর্ঘ প্রতিধ্বনি।
হরিহর নদী : কপোতাক্ষের কোল থেকে ক্ষীণ স্রোতের দীর্ঘশ্বাস ॥ দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার নদী মানেই বাঁক, জোয়ার-ভাটা আর সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া স্রোত। যশোর জেলার হরিহর নদী তেমনই এক জলধারা মাত্র ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ, গড় প্রস্থ ১৮ মিটার, প্রকৃতিতে সর্পিলাকার; তবু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক বিস্তৃত জনপদের গল্প। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৯৭ হিসেবে চিহ্নিত এই নদী একসময় ছিল প্রাণবন্ত, এখন অনেকাংশে স্মৃতিবাহী।
হরিহরের জন্ম ঝিকরগাছা এলাকায় প্রবাহিত কপোতাক্ষ নদ থেকে। কপোতাক্ষের বুকে যে স্রোত একদিন শাখা হয়ে বেরিয়ে এসেছিল, তা-ই হরিহর নামে পরিচিতি পায়। কিন্তু সময়ের আবর্তে সেই উৎসমুখ এখন প্রায় বন্ধ। ফলে নদীতে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ কমে গেছে; উজানের টান না থাকায় অনেক স্থানে নদীটি হয়ে উঠেছে ক্ষীণধারা।
উৎসমুখ থেকে নদীটি প্রথমে গোয়ালদহ বাজার ছুঁয়ে এগিয়ে যায়। তারপর এঁকেবেঁকে প্রবেশ করে মণিরামপুর অঞ্চলে নাদড়া, কালারহাট, গরীবপুর, সোনাডাঙ্গা হয়ে মণিরামপুর বাজার পর্যন্ত তার বিস্তার। একসময় এই পথ ছিল নৌযান চলাচলের উপযোগী; বর্ষাকালে নদীর বুক ভরে উঠত, আর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিত। এখন অনেক জায়গায় নদীর বুকে পলি জমে গেছে, কোথাও কোথাও কেবল সরু জলরেখা টিকে আছে।
মণিরামপুর পেরিয়ে হরিহর আরও দক্ষিণে কেশবপুর বাজারের দিকে অগ্রসর হয়। সেখান থেকে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়ার অঞ্চলে গিয়ে আপার ভদ্রা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে তার যাত্রা শেষ করে। এই শেষ মিলন যেন এক দীর্ঘ ক্লান্তির পর বিশ্রাম।
হরিহর নদীর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি জোয়ার-ভাটার প্রভাবে প্রভাবিত। উজানের প্রবাহ কমে গেলেও ভাটির দিক থেকে জোয়ারের জল অনেক সময় নদীটিকে সাময়িক প্রাণ দেয়। আবার ভাটার সময় উন্মোচিত হয় পলিমাটি, জেগে ওঠে চর, দেখা দেয় সংকুচিত স্রোতপথ।
আজ হরিহর অনেকাংশে তার প্রাচীন রূপ হারালেও, তীরবর্তী জনপদের স্মৃতিতে সে এখনো জীবন্ত। নদীর বাঁক ঘেঁষে গড়ে ওঠা বাজার, কৃষিজমি আর মানুষের জীবনযাপন তার অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করে। 
কুমার দক্ষিণের প্রাচীন স্রোতধারা ॥ মাথাভাঙ্গার বুক চিরে যে নদী একদিন ঝিনাইদহের দিকে পূর্বমুখে ছুটে গিয়েছিল, তার নাম কুমার। নামের মধ্যেই এক রাজকীয় ধ্বনি যেন কোনো তরুণ রাজপুত্র। প্রায় দেড়শ’ বছর আগে যখন মাথাভাঙ্গার মূলস্রোত দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন কুমারের প্রতাপ খর্ব করতে তার মুখে বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। মানুষের চিরন্তন প্রবৃত্তি নদীকে নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু নদী আপন পথ লয়; সে বাধা মানে না। স্রোত ফেরানোর সেই চেষ্টা সফল হয়নি। বরং কুমার নিজের স্বভাবসিদ্ধ প্রবাহে বহুদিন ধরে বছরভর সুপেয় জল বহন করে সর্ববিধ তরণীর গমনপথ হয়েছিল।
একসময় তার বুকে পালতোলা নৌকা ভেসেছে, ঘাটে ঘাটে বাণিজ্যের কোলাহল উঠেছে। নদীর জল ছিল নির্মল, ‘সুধাসম স্বাদু নীর’ যেমন জীবনানন্দ লিখেছিলেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে’ সেই ফিরে আসার আকাক্সক্ষা যেন কুমারের তীরেও জাগে। কৃষকের খেত, জেলের জাল, গৃহস্থের দুধ-দই সবকিছুর প্রাণশক্তি ছিল এই নদী। এখন তার স্রোত অনেক স্থানে ক্ষীণ, কোথাও কোথাও ভরাট; তবু কুমারের স্মৃতি এখনো জীবন্ত।
গৌরীতে মিলন, চন্দনার সঙ্গে সংযোগ, পরে ফরিদপুর জেলায় পুনরায় আত্মপ্রকাশ এই ধারাবাহিকতায় কুমার কেবল একটি শাখা নদী নয়, বরং এক জটিল জলপ্রবাহ-ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। তার সঞ্জীবনী শক্তি বহু উপনদীকে পুনর্জীবিত করেছে, বিশেষত নবগঙ্গাকে।
নবগঙ্গা: দক্ষিণ-পশ্চিমের জীবনরেখা ॥ মাথাভাঙ্গা থেকে বেরিয়ে চুয়াডাঙ্গার পূর্বদিকে বিলের মধ্যে পড়ে নবগঙ্গার মুখ একসময় প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। মূলস্রোতের সঙ্গে সংযোগ নষ্ট হওয়ায় নদীটি জলজবৃক্ষে পরিপূর্ণ হয়ে রুদ্ধগতি হয়। কিন্তু নদীর ভাগ্যেও কখনো পুনর্জন্ম আসে। মাগুরার উত্তরে মুচিখালির খাল দিয়ে কুমারের সঙ্গে নবগঙ্গার মিলন সেই মিলন যেন মৃতপ্রায় দেহে প্রাণসঞ্চার।
কুমারের জলে সঞ্জীবিত হয়ে নবগঙ্গা স্বচ্ছসলিলে উভয় কূলে সোনা ফলিয়েছে। ঝিনাইদহ জেলার উত্তরাংশে তার শ্রীবৃদ্ধি সুস্পষ্ট। মাগুরা, বিনোদপুর, সত্রাজিৎপুর, নহাটা, সিঙ্গিয়া, নলদী, রায়গ্রাম, লক্ষ্মীপাশা, লোহাগড়া এই জনপদগুলোর বিকাশে নবগঙ্গার অবদান অনস্বীকার্য। মাগুরা থেকে কয়েক মাস এবং বিনোদপুর থেকে লোহাগড়া পর্যন্ত বারোমাস নৌযান চলত এ এক বিরল প্রাপ্তি।
লোকমুখে প্রচলিত ছিল, নবগঙ্গার জল স্বাস্থ্যসম্মত; তার তীরের মাটি অপরিমিত শস্যে পরিপূর্ণ। খাদ্যসংকটের সময়েও এই অঞ্চলে মৎস্য-দুগ্ধের অভাব কম অনুভূত হয়েছে। নদীর এই দানশীলতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথের সেই চিরন্তন চিত্র ‘নদীর পারে বসে আছি, দেখি শুধু ধারা।’ নবগঙ্গা যেন সেই ধারা, যা জনজীবনকে নীরবে পুষ্ট করে। তবে লোহাগড়া থেকে কালনার কাছে মধুমতীতে যে মিলনপথ ছিল, তা মজে গেছে; বাণকাণা শাখা জল টেনে নিয়ে কালীগঙ্গায় দিয়েছে। নদীর ভাগ্যচক্রে এই পরিবর্তন স্বাভাবিক, কিন্তু তার ঐতিহ্য অম্লান।
চিত্রা সংকটে ॥ জয়রামপুর স্টেশনের উত্তরে মাথাভাঙ্গা থেকে বের হওয়া চিত্রা নবগঙ্গার মতোই বঞ্চিত ভাগ্যের নদী। মূলস্রোতের জল না পেয়ে আঁকাবাঁকা পূর্ব-দক্ষিণমুখে তার যাত্রা। তবু চিত্রা থেমে থাকেনি। ঝিনাইদহের উত্তর-পশ্চিমে ব্যাঙ বা বেগবতী নামে এক ক্ষুদ্র স্রোত, পরে ফটকী বা যদুখালি নাম ধারণ করে তার সঙ্গে মিলেছে। আবার ঘোড়াখালির খনিত খাল নবগঙ্গাকে এনে চিত্রার সঙ্গে যুক্ত করেছে। এইসব মিলনে চিত্রা নতুন শক্তি পেয়েছে।
নড়াইলের পাশ দিয়ে বিস্মৃত নদীরূপে তার প্রবাহ একসময় ছিল প্রবল। প্রাচীনকালে আফ্রার খালই ছিল তার মূল প্রবাহ; ঐ পথে চিত্রা আফ্রা ও সেখহাটির কাছে ভৈরবে মিলত। তন্ত্রশাস্ত্রে চিত্রা-ভৈরব সঙ্গমের প্রসিদ্ধি আছে এ এক আধ্যাত্মিক স্মৃতি। আজ সেই পথ পরিবর্তিত; গোবরা থেকে খাল বেয়ে গাজীরহাটের কাছে আতাই নদীতে তার মিলন।

কপোতাক্ষ নদ    -জনকণ্ঠ
জীবনানন্দ দাশের কাব্যে যেমন চিত্রা নামটি স্বপ্নময় হয়ে ওঠে, তেমনি এই নদীও গ্রামীণ বাংলার এক নীরব স্বপ্ন। ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ এই উচ্চারণ যেন চিত্রার তীরেও প্রযোজ্য। তার কূলে কূলে কৃষিজমি, তাল-খেজুরের সারি, ভাটিয়ালির সুর সব মিলিয়ে চিত্রা এক অন্তরঙ্গ নদী।
ব্যাঙ বা বেগবতী নদী ॥ মথুরাপুরের কাছে নবগঙ্গা থেকে বের হওয়া ক্ষুদ্র স্রোত ব্যাঙ নাম শুনলে যেন ছোট নদীর ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু তার আরেক নাম বেগবতী। ক্ষুদ্র হলেও সে বেগে প্রবাহিত; নামের মধ্যেই সেই শক্তির পরিচয়। নলডাঙ্গা পেরিয়ে কিছু দূরে ফটকী বা যদুখালি নামে পরিচিত হয়ে চিত্রায় মিশেছে।
বাংলার বহু নদীর মতোই ব্যাঙ নদীর পরিচয় স্থানীয়, লোকজ। তার তীরে গ্রামীণ জনপদ, ধানের খেত, ছোট নৌকার চলাচল। কবির ভাষায়, ‘ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে’ ব্যাঙ নদী যেন সেই ছোট নদীরই প্রতিচ্ছবি। বৃহত্তর জলপ্রবাহের অংশ হয়ে সে চিত্রাকে শক্তি জুগিয়েছে।
ফটকী বা যদুখালি নদ ॥ ব্যাঙ নদীরই পরিণত রূপ ফটকী বা যদুখালি। নামের ভিন্নতা তার পথের ইতিহাস বহন করে। স্থানভেদে নাম বদলালেও স্রোতের ধারাবাহিকতা অটুট। চিত্রার সঙ্গে মিলনে সে বৃহত্তর জলপ্রবাহের অংশ হয়।
এই নদীপথ স্থানীয় বাণিজ্য, কৃষি ও যোগাযোগে একসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ছোট ছোট খেয়া, নৌকাবাইচ, বর্ষার জলোচ্ছ্বাস সব মিলিয়ে ফটকী নদী ছিল জনজীবনের অংশ। সাহিত্যে বড় নদীর কথা বেশি থাকলেও, এইসব ছোট নদীই বাংলার প্রকৃত সুর রচনা করেছে।
আফ্রা খাল ॥ আজ যাকে আফ্রার খাল বলা হয়, একসময় সেটিই ছিল চিত্রার মূল প্রবাহ। আফ্রা ও সেখহাটির কাছে ভৈরবের সঙ্গে চিত্রার সঙ্গম এই পথেই ঘটত। প্রাচীন তন্ত্রশাস্ত্রে সেই সঙ্গমের উল্লেখ আছে অর্থাৎ এই জলপথ কেবল ভৌগোলিক নয়, আধ্যাত্মিক গুরুত্বও বহন করেছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীর মূলধারা সরে গেছে; আফ্রা খাল আজ অতীতের স্মারক। তবু বর্ষায় যখন জল বাড়ে, তখন মনে হয় পুরানো চিত্রা আবার ফিরে এসেছে। ইতিহাসের স্তরে স্তরে এই খাল আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় নদীর পথ যেমন বদলায়, তেমনি বদলায় জনপদের মানচিত্র।
কালীগঙ্গা নদ ॥ বাণকাণা শাখা নবগঙ্গার জল নিয়ে কালীগঙ্গায় মিশিয়েছে। কালীগঙ্গা গাজিরহাটের কাছে আতাই নদীতে পড়েছে। পরে বড়দিয়ার হ্যালিফেক্স খাল কেটে মধুমতীর সঙ্গে কালীগঙ্গার যোগ স্থাপন করা হয়। এর ফলে মধুমতীর মিষ্টিজল কালীগঙ্গা, আতাই ও মুজদখালি হয়ে ভৈরবে পড়ে তার বেগ বৃদ্ধি করেছিল।
কালীগঙ্গা তাই এক কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক স্রোতের সম্মিলন। মানুষের খননকাজ নদীর গতিপথে নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। এই নদী দেখায় প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক কখনো বিরোধ, কখনো সহযোগিতা। কালীগঙ্গার তীরে আজও গ্রামীণ জীবন প্রবাহমান; জেলেদের জাল, কৃষকের খেত, মন্দিরের ঘাট সবই তার সাক্ষী।
আতাই নদ ॥ প্রাচীন মালুয়ার খাল বা আতাই নদী বহু নদীর জলভার বহন করেছে। চিত্রা ও কালীগঙ্গার জল নিয়ে আতাই ভৈরবে মিলেছে; আবার কিছু জল সুজদখালি হয়ে ভৈরবকে দিয়েছে। শোলপুরের কাছে তার বিলীন হওয়া এক দীর্ঘ যাত্রার পরিসমাপ্তি।
আতাই নদী যেন সংযোগের প্রতীক। বিভিন্ন নদীর স্রোত একত্র করে সে বৃহত্তর ভৈরবের দিকে এগিয়েছে। তার বুকে বর্ষার জোয়ার, শুষ্ক মৌসুমের শান্ত জল সব মিলিয়ে তাই দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার জলজ ইতিহাসের অংশ।
এই সমগ্র নদীব্যবস্থা কুমার, নবগঙ্গা, চিত্রা, ব্যাঙ, ফটকী, আফ্রা, কালীগঙ্গা, আতাই মিলে এক বিস্তৃত জল-সভ্যতার চিত্র। কোথাও বাঁধ, কোথাও খাল, কোথাও বিলের মধ্যে রুদ্ধগতি তবু নদী আপন নিয়মে পথ খুঁজে নিয়েছে। কবির ভাষায়, ‘নদী চলে যায়, কূল ভেঙে গড়ে আবার’ এই চিরন্তন সত্যই এ অঞ্চলের নদীগাথার মর্মকথা।

প্যানেল/মো.

×