ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া

যশোরে মাতৃভাষা আন্দোলন

সাজেদ রহমান, যশোর

প্রকাশিত: ১৯:৩৯, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬; আপডেট: ১৯:৪১, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬

যশোরে মাতৃভাষা আন্দোলন

যশোর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের এই স্থানে ছিল লোলিতমোহন মিত্র হল -জনকণ্ঠ

১৯৪৮ সাল। সদ্য স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত তখনো কাঁচা, কিন্তু ভাষা নিয়ে দানা বাঁধছে গভীর সংকট।  কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী যখন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তে অনড়, তখন বাংলাভাষী জনগণের মনে জন্ম নিচ্ছে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে আন্দোলনের যে ঢেউ উঠেছিল, তার প্রতিধ্বনি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে জেলা শহরগুলোতেও। সেই ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে যশোরে এক ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চেতনার জনপদে। 
ভাষা আন্দোলনে যশোরের ভূমিকা জাতীয় ক্ষেত্রে তেমন প্রভাব রাখেনি সত্য কিন্তু এখানকার জন্য তার ব্যাপ্তি ছিল বিশাল। যশোরের পরবর্তীকালের রাজনীতিতে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এখানে ছাত্র আন্দোলনে যে প্রগতিশীল ধারার সূচনা হয়, শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তা অব্যাহত ছিল। যশোরের ভাষা আন্দোলনকে দু’পর্যায়ে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্যায়ে ভারত বিভাগ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্যায়। তবে প্রথম পর্যায়ের ইতিহাসটুকু পাওয়া যায় নানা সূত্র থেকে। কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ের ইতিহাস তেমন পাওয়া যায় না। 

যশোর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের এই স্থানে ছিল লোলিতমোহন মিত্র হল    -জনকণ্ঠ
১৯৪৭ সালের শেষ এবং ১৯৪৮ সালের প্রথম-এমন সময়ে যশোরে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। মুসলিম লীগ যেহেতু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এবং ভাষা আন্দোলনের বিরোধী, সে কারণে এখানকার কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থনের উপরই ভাষা আন্দোলনকারীরা বিশ্বাস স্থাপন করে। এছাড়াও যশোরে কংগ্রেস, ফরোয়ার্ড ব্লক ও সোশালিস্ট রিপাবলিকান পার্টির যে সমস্ত নেতা ও কর্মী ছিলেন তারাও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আন্দোলনে উৎসাহ জোগান। মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী সমর্থক নেতাদের অবদানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। যশোর থেকে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনার প্রথম প্রতিবাদ জানান ছাত্র ফেডারেশন কর্মী এমএম কলেজের ছাত্রী হামিদা রহমান। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় বাংলা ভাষাবিরোধী লেখা প্রকাশিত হয়। এ লেখার প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি পত্র লেখেন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায়। ১০ জুলাই ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা’ শিরোনামে পত্রটি প্রকাশিত হয়েছিল।
হামিদা রহমানের পত্রটি প্রকাশিত হলে এমএম কলেজের অনেক ছাত্রই বিশেষ করে ছাত্র ফেডারেশন সমর্থক ছাত্র-ছাত্রীরা এ ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে উঠেন। এর মাসাধিককাল পরে ১৪ আগস্ট জন্ম নেয় নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের দৃষ্টি স্বাভাবিক ভাবে চলে যায় অন্যত্র। ভাষা বিষয়ক ঘটনার দিকে বৃহত্তর অংশের তখন নজর দেয়ার সময়ও ছিল না।
২ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের উদ্যোগে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিশ’ গঠিত হয়। এই সংগঠন প্রকাশ করে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা-না উর্দু নামক একটি পুস্তিকা। ৫ ডিসেম্বর ভাষার দাবিতে তমদ্দুন মজলিশের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সভা ও বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। যশোরের ছাত্র সমাজ কলকাতার পত্র-পত্রিকা মারফত এসব খবর জানতে পারেন। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে এম এম কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্র ফেডারেশন কর্মী আফসার আহমেদ সিদ্দিকী বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সপক্ষে যুক্তি দেখিয়ে মিল্লাত পত্রিকায় একটি পত্র দেন। পত্রটি চিঠিপত্র বিভাগে প্রকাশিত হয়। ওই পত্রের বক্তব্য সমর্থন করে রাজশাহী সরকারি কলেজের ছাত্র একরামুল হক, আফসার আহমেদ সিদ্দিকীকে একটি ব্যক্তিগত পত্র লেখেন। এতে যশোরের ছাত্রদের বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন শুরু করতে তিনি আহবান জানান। পত্রটি পেয়ে আফসার আহমেদ সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং কিভাবে আন্দোলন শুরু করা যায় তা নিয়েও আলাপ হয় তাঁদের মধ্যে। কয়েক দিনের মধ্যে আফসার আহমেদ সিদ্দিকীর আরও একটি পত্র প্রকাশিত হয় দৈনিক ইত্তেহাদে।
এরপর জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে যশোরের ছাত্র সমাজের পক্ষে একটি যৌথ বিবৃতি প্রস্তুত করেন আলমগীর সিদ্দিকী। এটিতে স্বাক্ষর করেন আলমগীর সিদ্দিকী ছাড়াও নাজিম উদ্দিন, হায়বতুল্লা জোয়ার্দ্দার, আফসার আহমেদ সিদ্দিকী ও আরও কয়েকজন। দৈনিক ইত্তেহাদে এ বিবৃতিটি গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়। এ সময় কলেজে বসেই রনজিৎ মিত্র, হামিদা রহমান, আলমগীর সিদ্দিকী, আফসার আহমেদ সিদ্দিকী প্রমুখ নেতৃস্থানীয় ছাত্ররা একটি অনির্ধারিত সভায় বসেন। সিদ্ধান্ত হয় বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবিতে কলেজ এলাকায় পোস্টারিং করার।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুরানো খবরের কাগজ জোগাড় করা হয়। এতে হাতে তৈরি কালি দিয়ে লেখা হয় বাংলা ভাষার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান। জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ ও ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এ পোস্টারিং হয়।
তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত করা ও নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাস থেকেই যশোরে কমিউনিস্ট পার্টির ওপর নিপীড়ন নেমে আসে। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে যশোরের তৎকালীন ডিষ্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ নোমানী কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ফেডারেশন ও কৃষক সমিতির একতলা অফিসটি রিকিউজিশন করে নেন।
এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে কমিউনিস্ট পার্টি, সোস্যালিস্ট রিপাবলিকান পার্টি, মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী সমর্থক অংশ, কংগ্রেস ও ছাত্র ফেডারেশন এবং ছাত্রলীগের একাংশ মুসলিম লীগ নেতা এ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমানের বাসভবনে এক বৈঠকে মিলিত হন। প্রতিবাদ সভায় কর্তৃপক্ষের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্যে ‘বামপন্থী সমন্বয় কমিটি’ গঠন করা হয়। এর আহবায়ক হন অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান।
সভার এক প্রস্তাবে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়। ঢাকায় গঠিত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের মত যশোরেও একটি অনুরুপ সংগঠন করার প্রস্তাবও এতে নেওয়া হয়েছিল। এ ব্যাপারে ঢাকার সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করার দায়িত্ব দেয়া হয় আবদুল হক ও আলমগীর সিদ্দিকীর ওপর। প্রতিবাদ সভা শেষে একটি মিছিলও বের করা হয়।

মোহাম্মদ শরীফ হোসেন, আফসার আহমেদ সিদ্দিকী, ইয়াজদান চৌধুরী, ডাঃ জীবনরতন ধর
এদিকে বামপন্থি সমন্বয় কমিটি গঠন ও ভাষা আন্দোলন বিষয়ক প্রস্তাব নেয়ার খবর জেলা প্রশাসন অবগত হয়। তারা এর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে আটক করেন এবং তাদের জামিনের আবেদন আদালত নাকচ করে দেয়।
বামপন্থি সমন্বয় কমিটির নেতৃবৃন্দ গ্রেপ্তার হলে মুসলিম লীগের মধ্যে দারুণ প্রতিক্রিয়া হয়। সোহরাওয়ার্দী সমর্থকরা তাদের মুক্তির জন্য পার্টির অন্য নেতাদের ওপর চাপ দিতে থাকেন। এদিকে নাজিমুদ্দীন সমর্থক এক নেতা জেলখানায় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দেখা করে বলেন, ‘ভাষা প্রশ্ন নিয়ে ও কমিউনিষ্টদের স্বপক্ষে আন্দোলনে যাবেন না’-মুচলেকা লিখে দিলে সরকার আপনাদের ছেড়ে দেবে। কিন্তু বন্দিদের একজন এ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান ঘৃণাভরে সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৬ তারিখ পর্যন্ত যশোরের ছাত্র সমাজের কর্মকান্ড পোষ্টার মারা, দেয়াল লিখন ও আলাপ আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
২৬ ফেব্রুয়ারি আলমগীর সিদ্দিকীর বাসভবনে এক সভায় ঠিক করা হয় মাইকেল মধুসূদন কলেজের(এমএম কলেজ) এলভি মিত্র হলে নেতৃস্থানীয় ছাত্রদের ডেকে এ সংক্রান্ত বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ২৮ ফেব্রুয়ারি এই সভায় শতাধিক ছাত্র ছাড়াও বেশ কয়েকজন ছাত্রী উপস্থিত ছিলেন। এতে ভাষা আন্দোলনের জন্য রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের প্রস্তাব রেখে বক্তৃতা করেন ছাত্র ফেডারেশনের পক্ষে সুধীর রায়, হামিদা রহমান ও রণজিৎ মিত্র এবং ছাত্রলীগের পক্ষে আলমগীর সিদ্দিকী ও সৈয়দ আফজাল হোসেন। এলভি মিত্র হলের সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সরকারি নীতির প্রতিবাদে ২ মার্চ এম এম কলেজে ছাত্র ধর্মঘট আহবান করা হবে। সর্বস্তরের ছাত্রদের উপস্থিতিতে এদিন কলেজে একটি ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত করে সেখানে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণারও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
২ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এম এম কলেজে ছাত্র ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর সব রাজনৈতিক দলসমূহের স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ছিল-মুসলিমলীগ, কংগ্রেস, কমিউনিষ্ট পার্টি, ফরওয়ার্ড ব্লক ও সোস্যালিষ্ট রিপাবলিকান পার্টি। ছাত্ররা তাদের আন্দোলনে সমর্থদানের জন্য পার্টির নেতৃবৃন্দকে অনুরোধ জানান। কিন্তু একমাত্র কমিউনিষ্ট পার্টি ছাড়া অন্য কোন পার্টির কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে মুসলিমলীগ সোহরাওয়ার্দী সমর্থক নেতা হাবিবুর রহমান জেলখানায় বসেও আন্দোলনে সমর্থন দেন।
বাংলা ভাষার সপক্ষে ছাত্রদের পোষ্টারিং-এর সময়ে শহরে মুসলিমলীগ নাজিমুদ্দীন সমর্থক কতিপয় নেতা রটনা করেন এটা পাকিস্তান ভাঙ্গার একটা ষড়যন্ত্র। এর পিছনে কমিউনিষ্ট ছাড়াও একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মদদ আছে বলেও প্রচার চলে। সঙ্গত কারণে কংগ্রেস ও ফরওয়ার্ড ব্লক নেতৃবৃন্দ ছাত্রদের আন্দোলনের গতি প্রকৃতি লক্ষ্য করাই সে মুহূর্তে শ্রেয় বলে মনে করেন।
২ মার্চ ছাত্র ধর্মঘট বানচাল করার জন্য মুসলিমলীগ ছাত্রলীগের একাংশ গোপনে চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। 
২ মার্চ এম এম কলেজে পূর্ণ ছাত্র ধর্মঘট পালিত হল। সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে মিছিলও বের হলো কলেজ এলাকায়। সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখলেন মিছিল শেষে আয়োজিত এক ছাত্র সভায়।
৭ মার্চ এম এম কলেজে পুনরায় সংগ্রাম পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভা অনুষ্ঠানের একদিন আগে ঢাকা থেকে সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য কাজী আবদুর রকীব ঢাকা রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদের কিছু প্রচার পত্র আনেন। এসব প্রচারপত্র ছিল ১১ মার্চ সারা পুর্ববঙ্গে ছাত্র ধর্মঘট পালনের আহবান সংবলিত।
সংগ্রাম পরিষদ ঢাকার রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন এবং ১১ মার্চ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেন। ঢাকা থেকে আনা প্রচারপত্রও বিলি করা হয় বিভিন্ন স্থানে। বলা বাহুল্য ঢাকার রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যশোরের এই প্রচারপত্র গ্রহন ছাড়া আরা কোন সংযোগ স্থাপিত হয়নি।
১১ মার্চের ছাত্র ধর্মঘট ঘোষিত হওয়ায় ১০ মার্চ জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট নোমানী যশোরে ১৪৪ ধারা জারি করলেন। মাইকযোগে জেলা প্রশাসন প্রচার চালায় যে, ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের ১৪৪ ধারা অনুযায়ী মিছিল, মিটিং, পিকেটিং নিষিদ্ধ। কাজেই এ আইন ভঙ্গ করে কেউ কিংবা কোন দল যদি শোভাযাত্রা বের ও সমাবেশের আয়োজন করে তবে তাকে গ্রেফতারের পর আইন অনুযায়ী দন্ড দেওয়া হবে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী মিছিল বের করা হবে কিনা সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ছাত্র নেতারা এমএম কলেজে জরুরি বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে রণজিৎ মিত্র, আলমগীর সিদ্দিকী, হামিদা রহমান, আবদুর রকীব, অশোক ঘোষ, সুনীল রায়, দেবীপদ চট্রোপাধ্যায়, সুধীর রায়, হায়বতুল্লাহ জোয়ারদার প্রমুখ মত দিলেন ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার পক্ষে।
রাজনীতিকদের সাথে এ বিষয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো সোস্যালিষ্ট রিপাবলিকান পার্টি অফিসে। সভাপতিত্ব করলেন কংগ্রেস নেতা ডা. জীবন রতন ধর। ছাত্র নেতৃবৃন্দ ছাড়াও যে সমস্ত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এতে যোগ দেন। তারা হলেন মুসলিম লীগের মসিয়ুর রহমান ও আব্দুল খালেক এবং কমিউনিষ্ট পার্টির অনন্ত  মিত্র ও লুৎফর রহমান। ছাত্র নেতৃতৃন্দ বললেন, তারা ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার পক্ষে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির অনন্ত মিত্র ও লুৎফর রহমান ছাড়া অন্যান্যরা ১৪৪ ধারা না ভাঙ্গার পক্ষে মত দিলেন। অনেক আলাপ আলোচনার পর ১৪৪ ধারা না ভাঙ্গার পক্ষের নেতৃবৃন্দ ধর্মঘটের জন্য শান্তিপূর্ণ পিকেটিং করা পর্যন্ত রাজি হলেন। এ সময় অনন্ত মিত্র ওই সব রাজনীতিকদের সুবিধাবাদী হিসাবে আখ্যায়িত করায় তারা বৈঠক ত্যাগ করেন।
ধর্মঘট সফল ও মিছিল বের করতেই হবে-এই ছিল সংগ্রাম পরিষদের স্থির সিদ্ধান্ত।
সকাল ৭টার মধ্যে ছাত্ররা এম এম কলেজসহ শহরের প্রধান প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পিকেটিং শুরু করলেন। বেলা ১০টার মধ্যেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ধর্মঘটে সাড়া দিয়ে মিছিলসহকারে এম এম কলেজে এসে পৌঁছান।
বেলা ১১টা নাগাদ এম এম কলেজ থেকে শুরু হয় ছাত্রদের বিশাল মিছিল। এর সামনে ছিলেন স্কুল কলেজের ছাত্রীরা এবং তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন হামিদা রহমান। মিছিলকারীরা রাস্তায় বেরিয়ে জানতে পারেন সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ও যশোর পিটিআই স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষা ধর্মঘট পালন ও মিছিলে যোগ দিতে দিচ্ছেন না। তখন মিছিলটি ওই দুইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যায় এবং সেখানকার ছাত্রীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিছিলে যোগ দেয়। মিছিলটি পিটিআই সড়ক দিয়ে রেল রোড ও ভোলা ট্যাংক ঘুরে জেলা স্কুলের পাশ দিয়ে বার লাইব্রেরির সামনে এসে পৌঁছায়। ইতোমধ্যে মিছিলটিতে শহরের বহু সাধারণ লোক যোগ দিয়েছেন এবং এটি দীর্ঘ প্রায় এক কিলোমিটারের দাঁড়িয়েছে।
বার লাইব্রেরির বারান্দায় দাঁড়িয়ে মিছিল দেখছিলেন মুসলিমলীগ নেতা তরুন আইনজীবী মসিয়ুর রহমান। তিনি ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ বলে শ্লোগান দিয়ে মিছিলের সামনে এসে দাঁড়ান। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন আরও কয়েকজন আইনজীবী। এখানে উল্লেখ্য যে, মসিয়ুর রহমান আগের দিন সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে মিছিল না করার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু ছাত্র-জনতার বিশাল মিছিল দেখে তিনি তৎক্ষণাৎ নিজের পূর্ব সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। বেলা ১টার দিকে শহরে আরও কয়েকটি সড়ক প্রদক্ষিণ করে মিছিলটি তৎকালীন ট্রেডিং ব্যাংক ময়দানে(বর্তমানের টেলিফোন ভবন) এসে উপস্থিত হয়। এখানে সরকারের ভাষানীতির প্রতিবাদে আয়োজিত এক সভায় সভাপতিত্ব করেন এ্যাডভোকেট মসিয়ুর রহমান। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আলমগীর সিদ্দিকী, রণজিৎ মিত্র, হামিদা রহমান, সৈয়দ আফজাল হোসেন, এসএইচ জিন্নাহ প্রমুখ। সেদিনই পুলিশ নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার শুরু করলো। মোট ১৪ জন এদিন বিকালের মধ্যে গ্রেফতার হন। এদের মধ্যে ছিলেন এ্যাডভোকেট মসিয়ুর রহমান, সৈয়দ আফজাল হোসেন, এসএইচ জিন্নাহ, ঈমান আলী, রণজিৎ মিত্র, কাজী আবদুর রকীব, অনন্ত মিত্র, পবিত্র কুমার ধর(পিপলস রেডিও দোকানের মালিক), হবিবর রহমান (খোলাডাঙ্গা), লুৎফর রহমান (খয়েরতলা), আবদুর রাজ্জাক, গোলাম মোর্তজা চ্যাষ্ঠা, আমিনুল ইসলাম। গ্রেফতারকৃতদের মুক্তির দাবিতে ছাত্র জনতা পুনরায় মিছিল সহকারে কালেক্টরেট প্রাঙ্গণে জমায়েত হন। পুলিশ লাঠিচার্জ করে সবাইকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। আহত হলেন বেশ কয়েকজন। পরিস্থিতি যেন আয়ত্তের বাইরে না যায় এজন্যে পুলিশ দ্রুত আটককৃতদের যশোর জেলখানায় পাঠায়। এঘটনার প্রতিবাদে শহরের দোকানিরা স্বতঃস্ফুর্তভাবে তাদের সমস্ত দোকানপাট বন্ধ করে দেন। পুলিশি টহল জোরদার করা হলো শহরে। বিকাল ও সন্ধ্যার পর আনুমানিক আরও ২০জনকে পুলিশ আটক করে। এই পরিস্থিতির পেক্ষাপটে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের জরুরি সভা আহবান করা হলো। সভাস্থল নির্ধারণ করা হয় এমএম কলেজের ভবনের ছাদে, রাত ৮টায়। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেও আমন্ত্রণ জানানো হলেও কংগ্রেস নেতা ডাঃ জীবনরতন ধর ছাড়া কেউ উপস্থিত হতে পারেননি। ছাত্র নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন আলমগীর সিদ্দিকী, হামিদা রহমান, আফসার সিদ্দিকী, হায়বতুল্লাহ জোয়ারদার প্রমুখ।
সভায় সিদ্ধান্ত হয় গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১২ মার্চ কলেজে ছাত্র ধর্মঘট ও ১৩ মার্চ শহরে হরতাল পালন করা হবে। এছাড়াও পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য যশোরের খান বাহাদুর লুৎফর রহমানকে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে ঢাকায় টেলিগ্রাম করা হবে। বিষয়টি আইন পরিষদে যেন তিনি উপস্থাপন করেন সে অনুরোধও টেলিগ্রামে করা হবে।
সভা অনুষ্ঠানের খবর পুলিশ গোপনে অবগত হয়ে হাজির হলে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ কলেজের পিছনের দিক দিয়ে নিরাপদে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করেন কলেজের দারোয়ান কেশবচন্দ্র। কেশবচন্দ্র অবাঙালি হলেও বরাবর সংগ্রাম পরিষদকে বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেছিলেন।
১২ মার্চও এমএম কলেজে পূর্ণ ছাত্র ধর্মঘট পালিত হলো। সাধারণ ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে পরবর্তী কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্যে এগিয়ে এলেন। 
ছাত্ররা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে হরতালের স্বপক্ষে প্রচারের জন্যে শহরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ১৩ মার্চ শহরে হরতাল আহবান করা হলেও দুপুর থেকে স্বতঃস্ফুর্তভাবে শহরের সমস্ত দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। সংগ্রাম পরিষদকে হরতালের সমর্থনে প্রচার-প্রচারণার আর কোন প্রয়োজন ছিল না।
১৩ মার্চ সকাল ৮টার মধ্যেই ছাত্ররা এমএম কলেজে এসে উপস্থিত হয়। কলেজ ছাত্র ছাড়াও শহরের জেলা স্কুল, মুসলিম একাডেমি, সম্মিলনী ইন্সটিটিউশন, পিটিআই ও মোমিন গার্লস স্কুলের শিক্ষার্থীরা এদের মধ্যে ছিলেন। এমন অনেক ছাত্রও এতে যোগ দেন, যারা দৌলতপুর বিএল কলেজ ও ঢাকায় পড়তেন।
সকাল ১০টায় যখন কলেজ থেকে মিছিলটি বের হয় তখন পথিমধ্যে রিকশাচালক, দোকানদার ও শহরের বিপুল সংখ্যক মানুষ এতে যোগ দেন। মিছিলটি মোমিন গার্লস স্কুলের পাশ দিয়ে বার লাইব্রেরির সামনে হয়ে চৌরাস্তায় এসে পৌঁছায়। আলমগীর সিদ্দিকী, আফসার সিদ্দিকী, হায়বতুল্লাহ জোয়ারদার ছাড়াও যারা মিছিলটির নেতৃত্ব দেন তাদের মধ্যে ছিলেন দেবীপদ চট্রোপাধ্যায়, সুনীল রায়, অশোক ঘোষ, সুধীর রায়, নুরুল হক, শামসুল আলম, রফিউদ্দিন, গোলাম ইয়াজদান চৌধুরী, শেখ আমানুল্লাহ, আমির আহমেদ, আবুল হাসেম, ডাঃ জীবনরতন ধর প্রমুখ। হামিদা রহমান ছিলেন মেয়েদের নেতৃত্বে। তাকে সাহায্য করেন তৎকালীন এক ম্যাজিস্ট্রেটের মেয়ে কলেজ ছাত্রী রুবী আহমেদ। আর ছিলেন সুফিয়া খাতুন।
চৌরাস্তা থেকে মিছিলটি কালেক্টরেট ভবনের দিকে এগিয়ে যায়। তখন মিছিলে তিন হাজারের বেশি লোক।
মিছিলকারীরা দড়াটানা মোড়ে এসে দেখতে পান কালেক্টরেট ভবন পুলিশ ঘিরে রেখেছে। তৎকালীন কোতোয়ালি থানার ওসি জব্বার ও কয়েকজন দারোগা দড়াটানা থেকে কালেক্টরেটে ঢুকতে মিছিলটিকে বাধা দেন। কিন্তু মিছিলকারীরা তাদেরকে ঠেলে কালেক্টরেটে ঢোকার চেষ্টা করেন। এ সময় ওসি জব্বারের নির্দেশে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। নিরস্ত্র জনতা সাময়িকভাবে ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু হটে আসেন। এরাই কয়েকটি অংশে ভাগ হয়ে চলে যান কালেক্টরেটের উত্তর পাশে। এক অংশ পুনরায় ফিরে আসেন দড়াটানা মোড়ে। লাঠিচার্জের বদলে জনতা পুলিশের দিকে শুরু করে ইট পাটকেল নিক্ষেপ। প্রবল ইট নিক্ষেপের মুখে টিকতে না পেরে কালেক্টরেটের উত্তর বারান্দা থেকে পুলিশের লোকজন পূর্ব পাশে ট্রেজারির কাছে এসে দাঁড়ায়। তখন জনতার একটি অংশ পার্কের নিচু প্রাচীর পেরিয়ে ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেটের কক্ষে চড়াও হন। কিন্তু তাকে কক্ষে পাওয়া যায়নি। ইতোমধ্যে পুলিশ এসে লাঠিচার্জ করে জনতাকে সেখান থেকে পিছু হটতে বাধ্য করে।
এক পর্যায়ে একটি ইট খন্ডের আঘাতে ওসি জব্বারের কান ছিড়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে কোর্ট দারোগার কক্ষে চলে যেতে দেখে জনতা। ইতোমধ্যে আরও বহু পুলিশ আহত হয়। তারাও কোর্ট দারাগোর কক্ষে আশ্রয় নেয়। আর সে মুহুর্তেই শুরু হয় গুলি বর্ষণ। ট্রেজারির বারান্দা থেকে উত্তর ও পূর্বদিকে চলে একনাগাড়ে রাইফেলের ফাঁকা গুলি। তবে কিছু গুলি দড়াটানায় পাকা দালানে এসেও লাগে। গুলিবর্ষণে জনতা হতভম্ব হয়ে পড়েন। তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে দড়াটানা থেকে ঢুকে পড়েন হাজী মুহম্মদ মহসিন রোডের গলিতে। অন্য অংশটি নিয়াজ পার্ক থেকে ভৈরব পেরিয়ে চলে যায় ঘোপের দিকে। পুলিশ লাঠিসোটা নিয়ে ছত্রভঙ্গ জনতার পিছু পিছু তেড়ে আসে। দুপুর নাগাদ সমগ্র বাজার এলাকায় সংঘর্ষ বিস্তৃতি লাভ করে। পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে খুঁজতে তাকে মিছিলে অংশ নেয়া লোকজনদের। এ অবস্থায় শহরের সাধারণ লোকজন উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং পুলিশি হামলার প্রতিরোধে নামেন। চুড়িপট্রি এলাকার বহু ব্যক্তি সেদিন নিজ বাড়িতে ছাত্রদের লুকিয়ে রাখেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এদিন পালন করে শহরের ঝালাইপট্রি পতিতালয়ের মেয়েরা। পুলিশ এক পর্যায়ে এই এলাকাটি ঘিরে ফেলে ছাত্রদের খুঁজতে থাকে। এখানে প্রায় ৪০ জন ছাত্রকে পতিতারা তাদের একটি ঘরে লুকিয়ে রেখে বাইরে থেকে তালাবন্ধ করে দেয়।
সন্ধ্যার দিকে সংঘর্ষ থেমে গেলেও পুলিশি টহল বেড়ে যায়। তারা তাদের তালিকায় সন্দেহভাজন ছাত্র রাজনীতিক ও ব্যক্তিদের বাড়ি ঘেরাও করে তল্লাশি চালায়। এদিন পুলিশসহ আনুমানিক ২০০ জন আহত হয়েছিলেন। রাতে সংগ্রাম পরিষদ কমিউনিষ্ট পার্টির যশোর জেলা কমিটির সদস্য ও রিকশা এবং মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা লুৎফর রহমানের বাড়িতে গোপনে মিলিত হন। সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে গ্রেফতারকৃত ও পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে আগামীকাল ১৪ মার্চ পুনরায় হরতাল পালন ছাড়াও ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ ও পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদে একটি মুলতবী প্রস্তাব আনার জন্যে যশোরের তৎকালীন আইন পরিষদ সদস্য খান বাহাদুর লুৎফর রহমানের কাছে প্রতিনিধি পাঠানো হবে।
এদিকে সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত সে রাতেই ছাত্র ও অন্যান্যকর্মীরা শহরে প্রচার করে দেয়। ফলে পরদিনও শহরে যথারীতি হরতাল পালিত হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলতে থাকে অবিরাম ধর্মঘট।
১৫ মার্চ প্রতিনিধি হিসাবে ঢাকায় পাঠানো হয় সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হায়বতুল্লাহ জোয়ারদারকে। তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে চুয়াডাঙ্গা বাসষ্ট্যান্ডে বাসে উঠতে গেলে পুলিশের চোখে পড়েন। গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হলেও পালাতে গিয়ে আহত হন তিনি। ফলে তার পক্ষে আর ঢাকায় যাওয়া সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে সংগ্রাম পরিষদ যশোরের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ লিখে মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন, খান বাহাদুর লুৎফর রহমান ও পরিষদের বিরোধী দলীয় নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কাছে পৃথক পৃথক টেলিগ্রাম করেন।
১৪ মার্চ থেকে পরবর্তী ৪ দিন যশোর শহরে চাপা উত্তেজনা ও ক্ষোভ বিরাজ করে। সংগ্রাম পরিষদ ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আটক ছাত্র-জনতার মুক্তির দাবিতে ১৮ মার্চ মিছিল করে ডিস্ট্রিক ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ নোমানীর কাছে দাবিনামা পেশ করা হবে। এমন সময় আরও একটি শর্ত আরোপ করার জন্য জেলখানা থেকে গোপনে খবর পাঠালেন আটককৃত নেতারা। এ শর্তটি ছিল বামপন্থী সমন্বয় কমিটির আটক নেতাদের মুক্তি দাবি। এ খবর সংগ্রাম পরিষদের কাছে আসার পর তারা ১৮ মার্চকে ‘রাজবন্দি মুক্তি দিবস’ হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেন।
১৮ মার্চ সকাল ১০টায় এম এম কলেজ থেকে ছাত্ররা মিছিল বের করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এমন সময় সেখানে খবর পৌঁছালো হাজার হাজার অবাঙালি ঝুমঝুমপুর বিহারী কলোনী থেকে দড়াটানা মোড়ে এসে উপস্থিত হয়েছে। ছাত্র নেতৃবৃন্দ এ খবর পেয়ে দ্রুত দড়টানা মোড়ে গেলেন। আফসার আহমেদ সিদ্দিকীর লেখায়(যশোর পরিচিতি) এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে এভাবে- খবর এল প্রায় এক দেড় হাজার বিহারী রিফিউজি দাও, কুড়াল, টাঙ্গি, তরবারি, ছোরা, লোহার রড, লাঠি ইত্যাদি মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে ঢাকঢোল বাজাতে বাজাতে শহরের দড়াটানায় জমায়েত হয়ে নিরীহ জনসাধারণের ওপর হামলা শুরু করেছে। এছাড়া দড়াটানরায় অবস্থিত দুটি মিষ্টির দোকান লুটতরাজ করেছে তারা পুলিশের সামনে। জানা গেল পুলিশ কোন বাঁধা দিচ্ছে না। এই খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ দ্রুত ঘটনাস্থলে আসেন। তারা দেখতে পান সশস্ত্র মিছিলকারীরা উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছে বাঙালিদের বিরুদ্ধে এবং অস্ত্র হাতে লাফালাফি করছে। ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্র্রেট নোমানী সাহেব ও পুলিশ বাহিনী মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন। খবর নিয়ে জানা গেল, আগের দিন মিঃ নোমানী স্থানীয় কয়েকজন প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিমলীগ নেতৃবৃন্দের সাথে নিয়ে গোপন বৈঠকে শহরের উপকন্ঠে বসবাসকারী বিহারী রিফিউজিদের কলোনীতে গিয়ে বাঙালিদের বিরুদ্ধে তাদের উত্তেজিত এবং তাদের কিছু নেতৃবৃন্দকে পয়সা কড়ি দিয়ে এই সশস্ত্র মিছিলের ব্যবস্থা করেন। উদ্দেশ্য যশোর শহরে হিন্দু-মুসলিম বা বাঙালি বিহারী একটি দাঙ্গা বাধিয়ে ভাষা ও বন্দি মুক্তির আন্দোলনকে বানচাল করা। বিহারীদের এই সশস্ত্র মিছিল স্বভাবতই স্থানীয় জনসাধারণের মতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ইতোমধ্যে খবর রটনা করা হয় যে রেলস্টেশনে দু’ব্যক্তিকে(স্থানীয়) ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। আগুনের মতো এই খবর ছড়িয়ে পড়ে শহরে। ফলে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। সমগ্র পরিস্থিতি বিবেচনা করে সংগ্রাম পরিষদ যে কোন মুল্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুন্ন রাখার সিদ্ধান্ত নেন এবং তৎক্ষণিকভাবে মিছিলকে দাঙ্গা প্রতিরোধ মিছিলে পরিণত করেন।
সংগ্রাম পরিষদের দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সেদিন শহরে ভয়াবহ দাঙ্গার হাত থেকে রক্ষা পায়। বেলা ১২টার মধ্যে প্রায় তিন হাজার লোকের বিশাল দাঙ্গা প্রতিরোধ মিছিল শহরের সড়কসমূহ প্রদক্ষিণ শুরু করে। মিছিলে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের অনেকেই ছিলেন শহরের আশপাশের গ্রাম থেকে আসা। এর বিশালতা দেখে অবাঙালিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়।
১৮ মার্চের পর অবাঙালিরা যশোর শহরে আর চড়াও হতে সাহস পায়নি। অন্যদিকে ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর চুক্তি হবার পর ১৫ মার্চ ভাষা আন্দোলনে আটক ছাত্ররা মুক্তি পান। এ সংবাদ যশোরের সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দ দারুন উল্লসিত হন। অবশেষে বন্দিদের মুক্তির আদেশ যশোরে কর্তৃপক্ষের কাছে এসে পৌঁছায় এবং ২৮ মার্চ তারা মুক্তি পান।

প্যানেল/মো.

×