ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

বেঁচে থাকার নীরব মহাকাব্য

দশ টাকায় উষ্ণতা, সৈয়দপুরে রেললাইনের ধারে ভ্রাম্যমান বাজার

‎নিজস্ব সংবাদদাতা, সৈয়দপুর, নীলফামারী

প্রকাশিত: ০৯:৫১, ১ জানুয়ারি ২০২৬

দশ টাকায় উষ্ণতা, সৈয়দপুরে রেললাইনের ধারে ভ্রাম্যমান বাজার

ভোরের আলোক রশ্মি ছড়ানোর আগে রেললাইনের ধারে শুরু হয় ভিন্ন জীবনের প্রস্ততি। কাঁকুরে মাটির ওপর পায়ের শব্দ, কাপড়ের বস্তার ঘর্ষণ, দূরে ট্রেনের লম্বা শিস। সব মিলিয়ে এ শহরের অচেনা দ্বিতীয় সকালে নিভৃতে জন্ম নেয় এক পুরোনো কাপড়ের বাজার। যেখানে বছরের পর বছর ধরে নাম মাত্র দরে  লাখ লাখ মানুষের বস্ত্রের চাহিদা পুরন করছে। 

‎সৈয়দপুর রেলস্টেশন সংলগ্ন পিডাব্লিউ অফিসের সামনে থেকে দক্ষিণে পার্বতীপুরগামী রেললাইনের পশ্চিম পাশে শীতের শুরুতেই দেখা যায় এই বাজারের অবয়ব। বছরের অন্য সময় এখানে শুধু রেললাইন, নুড়িপাথর আর আগাছা। কিন্তু শীত এলেই সেই নির্জন জায়গা রঙিন হয়ে ওঠে—পুরোনো সোয়েটার, জ্যাকেট, শাল, শাড়ি, শিশুদের গরম জামা ছড়িয়ে পড়ে মাটির ওপর।

‎প্রায় দেড় হাজার দোকানের ভ্রাম্যমাণ এ বাজার। কোনো স্থায়ী দোকান নেই, নেই ইট–সিমেন্টের অবকাঠামো। সবকিছুই অস্থায়ী—ঠিক যেমন এখানকার মানুষের জীবন। সকাল আটটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত এই বাজারে মানুষের ঢল নামে। শ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাচালক, গৃহিণী, শিক্ষার্থী—সবার পথ এসে মেশে এখানে। কারণ এই বাজারে পোশাক কেনা মানে বিলাসিতা নয়; এটি প্রয়োজন।

‎এই বাজারে প্রতি পিস কাপড়ের দাম শুরু হয় ১০ টাকা থেকে। ২০, ৩০ কিংবা ৪০ টাকায় মিলছে শীত নিবারণের পোশাক। এমন পোশাক, যা একদিন ছিল কোনো অচেনা শহরের মানুষের উৎসবের দিনের সঙ্গী, অফিসের সকাল কিংবা শীতের বিকেলের গল্প। আজ সেই পোশাক নতুন করে জীবন পায়—ভিন্ন শরীরে, ভিন্ন বাস্তবতায়।

‎শহরের নামি শপিং মলে যেসব পোশাক হাজার টাকার নিচে নামতে চায় না, সেগুলোরই কোনো কোনো ছায়া পাওয়া যায় এখানে। নকশা আছে, রং আছে—কিন্তু দাম নেই। এই বৈপরীত্যই এই বাজারের সবচেয়ে বড় শক্তি।

‎বর্তমান সময়ের ঊর্ধ্বমূল্যের বাজারে যেখানে মাস শেষে চাল, ডাল, তেল আর সন্তানের স্কুল ফি জোগাতেই মানুষ হিমশিম খায়, সেখানে এই পুরোনো কাপড়ের বাজার হয়ে ওঠে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শেষ ভরসা। রোদে শুকানো এই কাপড়গুলো যেন শহরের গরিব মানুষের কাছে প্রতিশ্রুতি—শীতের রাতটা অন্তত একটু উষ্ণ হবে। এই বাজারের পুর্ব প্রান্তে রেললাইনের ধারে  বিলুপ্ত বিজলি  হলের গলিতে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে  পুরাতন মোজা  বিক্রি করছেন মোঃ হাসিব(৬৫)।  তিনি জানান , এই ব্যাবসা করে ছেলে মেয়েকে বড় করেছেন। বিয়ে দিয়েছেন। সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। বিভিন্ন ধরনের প্রায় নতুন মোজা। যেগুলো ১০ থেকে ৩০ টাকা জোড়া। দাম কম, বিক্রি বেশি। এতেই লাভ হয়। 

‎অশেষ (৫০) নামে এক ব্যাবসায়ী জানান, আগের চেয়ে বেল্টের দাম বাড়িয়েছে মহাজনেরা। তাই কেনা বেশি।  তারপরেও চলবে। এই ‘চলে’ কথাটির ভেতর লুকিয়ে আছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। কোনো অভিযোগ নেই, নেই ক্ষোভ। আছে শুধু বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার দৃঢ়তা।

‎অন্যন্য ব্যাবসায়ীরা জানান,   শ্রমিক, রিকশাচালক,  গ্রাম থেকে শহরে আসা জীবনের ক্লান্ত পথিকরাই শুধু নয়, এখানে ধনাঢ্য পরিবারের সদস্যরাও আসেন।  নানান ক্রেতার আগমনে এই বাজারে প্রতিদিনই জন্ম নেয় ছোট ছোট গল্প। কোনো তরুণী হয়তো অনেক খুঁজে একটি ওড়না পায়—যেটি পরে সে যাবে কলেজে। কোনো মা ২৫ টাকায় সন্তানের জন্য কিনে নেয় একটি সোয়েটার। দাম কম, কিন্তু অনুভূতির গভীরতা অসীম।

‎একজন মা যখন সন্তানের গায়ে সেই সোয়েটার পরিয়ে দেয়, তখন তার চোখে জ্বলে ওঠে তৃপ্তির আলো। সামান্য সামর্থ্যের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করার যে আত্মসম্মান—এই বাজার সেই অনুভূতির জায়গা। এই আনন্দ বড় কোনো উৎসবের নয়, ছোট ছোট প্রয়োজন পূরণের আনন্দ। কিন্তু সেই আনন্দই অনেকের জীবনে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

‎তবে এই বাজারের আকাশ সব সময় পরিষ্কার নয়। প্রতিদিনই উচ্ছেদের শঙ্কা ঝুলে থাকে মাথার ওপর। রেল কর্তৃপক্ষের অভিযান এলে মুহূর্তের মধ্যে গুটিয়ে ফেলতে হয় পসরা। কোনো কোনো দিন ছুড়ে ফেলে যেতে হয় কাপড়, কোনো কোনো দিন লোকসান গুনে ফিরে যেতে হয় খালি হাতে।

‎তবু পরদিন আবার ফিরে আসে সবাই। কারণ তাদের জীবনের সঙ্গে এই বাজার এমনভাবে জড়িয়ে গেছে, যা ছাড়ার উপায় নেই। রেললাইন ছাড়াও তাদের জীবনের আর কোনো লাইন নেই।

‎এটি  শুধু কেনাবেচার স্থান নয়। এটি শহরের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক নীরব প্রতিবাদ। যেখানে মানুষ প্রমাণ করে—অভাব মানেই পরাজয় নয়। এখানে নেই আলোর ঝলকানি, নেই বড় বিজ্ঞাপন। কিন্তু এখানে প্রতিদিন মানুষ কেনে একটু উষ্ণতা, একটু নিশ্চয়তা, একটু আগামী দিনের সাহস। এখানে কাপড়ের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয় ধৈর্য, আর মানুষ কিনে নেয় বেঁচে থাকার সামান্য নিশ্চয়তা।

নোভা

×