বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির মানচিত্রে যশোরের সাগরদাঁড়ি শুধুই মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবহ একটি প্রান্তর নয়; এটি এমন এক প্রাণময় পরিসর, যেখানে বহু যুগ প্রতিভার পদচিহ্ন আজও ইতিহাসের পাতায় দীপ্ত হয়ে আছে। একসময় এখানে সমবেত হয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের দুই অগ্রগণ্য কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। এসেছিলে ছিলেন ভারতের বিশিষ্ট সাংবাদিক, যুগান্তর-এর সম্পাদক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় এবং অমৃতবাজার পত্রিকা-এর প্রভাবশালী সম্পাদক তুষারকান্তি ঘোষ-বাংলা গণমাধ্যমের দুজন অবিস্মরণীয় পথপ্রদর্শক।
এই ঐতিহাসিক সমাবেশ আরও মহিমান্বিত হয়েছিল মধুসূদনের বন্ধু ভুদেব মুখোপাধ্যায়ের নাতনি, প্রতিভাবান সাহিত্যিক অনুরুপা দেবী ও নীল দর্পণখ্যাত দীনবন্ধু মিত্রের পুত্র, সাহিত্যিক ললিতচন্দ্র মিত্র। ব্যক্তিত্ব ও সৃষ্টিশীলতার এমন অপূর্ব সমাবেশ সাগরদাঁড়িকে এক অনন্য সাংস্কৃতিক অধ্যায়ে উন্নীত করেছিল। ব্রিটিশ আমলে মধু কবির মৃত্যুবার্ষিকী পালন হতো যশোর শহরে। বিভিন্ন সংগঠন ২৯ জুন দিন পালন করতো। তবে ‘যশোহর সাহিত্য সংঘ’ প্রতিষ্ঠিত হলে তার উদ্যোগে মধু কবির মৃত্যুবার্ষিকী পালন শুরু হয়। পরে জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানও শুরু হয় সাগরদাঁড়িতে। উপরের ব্যক্তিরা ছাড়াও সাগরদাঁড়ি এসেছেন ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কবি গোলাম মোস্তফা, জসীম উদদীন, মনোজ বসু, ধীরাজ ভট্টাচার্যসহ আরও অনেক বিখ্যাত, লেখক, কবি, সাহিত্যিকগণ।
আমরা ফিরে দেখবো সেই দিনগুলোর আবহ, যেখানে সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব মিলেমিশে রচনা করেছিল স্মরণীয় এক সাংস্কৃতিক পর্ব।
বাংলা ১৩২২ সনের ১৪ কার্তিক মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি ঘুরতে এসেছিলেন নীল দর্পণের লেখক দীনবন্ধু মিত্রের পুত্র ললিতচন্দ্র মিত্র। তিনি ছিলেন সাহিত্যানুরাগী। ‘পূর্ণিমা মিলন’ নামে এক সাহিত্য সভা পরিচালনা করতেন। সাগরদাঁড়ি থেকে কলকাতা ফিরে গিয়ে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় লেখেন ‘সাহিত্যিক তীর্থযাত্রা’ নামের একটি লেখা। লতিতচন্দ্র মিত্র লেখেন, ‘ছাব্বিশ বছরের কিছু বেশি হল, মধুসূদনের বন্ধু মনোমোহন ঘোষের সভাপতিত্বে মাইকেল মধুসূদন দত্তের সমাধিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেইদিন সেই স্তম্ভে লেখা কবিতায় যশোরের সাগরদাঁড়ি কপোতাক্ষ তীরে পড়ে ‘সাগরদাঁড়ি’ নামটি চিরকালের জন্য হৃদয়ে জাগ্রত আছে। গ্রামটি দেখার ইচ্ছা বহুদিনের। সে ইচ্ছা এখন পূরণ হচ্ছে। এর জন্য ‘বঙ্গীয় স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি’র ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডাক্তার ফণীভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (বাড়ি সাতক্ষীরা) কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। এটা একটি স্বদেশী প্রতিষ্ঠান। সাত বছর ধরে এই লঞ্চ চলছে। প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির বহু রকমের বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে এখনো চলছে এই প্রতিষ্ঠান।
বাংলা ১৩২২ সনের ১৩ কার্তিক রাত সাড়ে ১০টার সময় রেলগাড়িতে চড়ে কলকাতা থেকে রওনা দিলাম ঝিকরগাছার উদ্দেশ্যে। দেড় ঘণ্টা পর আমরা ঝিকরগাছা ঘাট স্টেশনে পৌঁছেছিলাম। কপোতাক্ষ বেয়ে চলাচল করে তাই এর নাম ‘কপোতাক্ষী’। রাত আড়াইটার সময় কপোতাক্ষ নদ দিয়ে স্টীমার চলতে লাগল। অনেক সুন্দর লাগল এই ভ্রমণ। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আমরা সাগরদাঁড়ি পৌঁছলাম। আমরা দুই পাতা ইংরেজি পড়ে, কলকাতার জলের কল, গ্যাসের আলো দেখে গ্রামের কথা ভুলে যাই। কিন্তু যিনি বিদেশি সাহিত্যে অসীম পণ্ডিত্য লাভ করেছেন, যিনি ইউরোপের অমরাবর্তীসহ বহু শহর দর্শন করেছিলেন তিনি অকৃত্রিম স্বদেশ প্রেমে অনুপ্রাণিত হয়ে লিখেছিলেন, ‘এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে’ লইছে যে তব নাম বঙ্গের সংগীতে’। ধন্য মাইকেল। তোমার বাইরের আবরণ বিদেশি হলেও তোমার হৃদয়ের অন্তস্থল স্বদেশীপ্রেমে পূর্ণ। তাই তুমি দেশবাসীকে শিখাইছো যে, দেশের নদী যথার্থই ‘দুগ্ধস্রোত রুপী তুমি জন্মভূমি স্তনে।’
নদের তীরে উপস্থিত হয়ে প্রথমেই ঘাটের পাশে বহৎ বটবৃক্ষ পথিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই বটবৃক্ষের উদ্দেশে বোধ হয় কবি চতুর্দশপদী কবিতাবলীর ‘বটবৃক্ষ’ সনেট রচনা করেছিলেন। আশৈশব যার ছায়া তিনি ভোগ করেছিলেন, তাকে তিনি মধুর ভাষায় বর্ণনা করেছেন তা উদ্ধৃত করার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না-‘দেব-অবতার ভাবি বন্দে যে তোমারে,/ নাহি চাহে মনঃমোর তাহে নিন্দা করি,/ তরুরাজ ! প্রত্যক্ষতঃ ভারত-সংসারে,/ বিধির করুণা তুমি তরু-রূপ ধরি!/
পাঠক এখানে লক্ষ্য করবেন, তিনি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করলেও মাইকেল বৃক্ষে দেবত্ব আরোপ করে পরম স্নেহের চোখে দেখেছেন। সেই শতপত্রময় মঞ্চ অতিক্রম করে, আমরা তাঁর বাড়ির সামনে উপস্থিত হলাম। এখানে একটি বড় বাদাম গাছ আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছিল নদ তীরে। এই বাদামবৃক্ষ তলে তিনি বিশ্রাম নিয়েছেন। স্থানটি যে কবি চিত্ত আকর্ষণের উপযুক্ত তা বলা নিষ্প্রয়োজন। বাস ভবনের ভগ্ন দশা দেখে মনে কষ্ট হলো। মাইকেল যে গৃহে ভূমিষ্ঠ হন, তার একটি দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। আমরা তাঁর জন্মস্থল আনন্দ ও বিষাদপূর্ণ হৃদয়ে নিরীক্ষণ করতে লাগলাম। আমাদের সঙ্গে ফটোগ্রাফার বাবু প্রাণতোষ বসু গিয়েছিলেন। তিনি এই স্থানটির একটি ছবি তুললেন। বাড়ির বাইরে সরকার কর্তৃক একটি ছোট স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে, সেটা দেখলাম। মনে হলো, যার অমরকীর্তি স্তম্ভ বঙ্গ সাহিত্য ক্ষেত্রে অনন্তকালের জন্য দেদীপ্যমান থাকবে, এ ক্ষুদ্র স্তম্ভ তাঁর স্মৃতিরক্ষার জন্য যথেষ্ট না। তবুও সরকার এই যা করেছে সেটার জন্য ধন্যবাদ দেওয়া যায়।

আমাদের সৌভাগ্য হয়েছিল মধুসূদনের ভ্রাতুষ্পুত্রী সুবিখ্যাত মহিলাকবি মানকুমারী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মাইকেলে চিত্র সম্বলিত আমার ‘মধু মাইকেল’ শীর্ষক সনেট এবং মাইকেল, বঙ্কিমচন্দ্র ও আমার পিত্রদেবের (দীনবন্ধু) চিত্র সম্বলিত ‘সাহিত্যিক ত্রয়াধিপ ‘সনেট সকলে আদরের সঙ্গে গ্রহন করলেন। বাড়ির ভেতরে দুই কপি পাঠালাম। অতিদ্রুত তিনি অভ্যর্থনাস্বরুপ একটি কবিতা লিখে পাঠালেন। কবিতার নাম ছিল ‘স্বাগত’। তিনি অল্প সময়ের মধ্যে এই যে কবিতা লিখলেন, তাতে আমরা আশ্চর্য হলাম। তাঁর প্রণীত বঙ্গ সাহিত্যের অমূল্য কাব্য রত্ন একখণ্ড আমাকে উপহার দিলেন। তাঁর এই কাব্যগ্রন্থ পেয়ে আমি নিজেকে সম্মানিত বোধ করেছিলাম।
সত্য সেদিন আমরা এক মহাতীর্থে গমন করেছিলাম। ‘সাগর দাঁড়ির’ কপোতাক্ষ জলধারা আমাদের সত্য সত্যাসত্যই মন্দাকিনী ধারা বলে মনে হলো। এই পবিত্র ক্ষেত্রের মহিমা প্রচারের জন্য মধুসূদনের ভ্রাতুষ্পুত্রী এখনো অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপে বিরাজ করছে।
১৯৪১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মভূমি সাগরদাঁড়ি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কলকাতা থেকে আসেন খ্যাতনামা পণ্ডিত ও লেখক ডা. সত্যনারায়ণ, ‘পথের পাঁচালী’ রচয়িতা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুর, সজনীকান্ত দাস ও সুবোল বন্দোপাধ্যায়। রেলে করে তারা কলকাতা থকে যশোর পৌঁছান। যশোর থেকে মোটরে তারা সাগরদাঁড়ি যান। ২ ফেব্রুয়ারি রবিবার সকালে যশোর টাউন হলে ‘যশোহর ইনস্টিটিউট’-এর পক্ষ থেকে উক্ত সাহিত্যিকদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ক্ষিতিনাথ ঘোষের সভাপতিত্বে উক্ত সংবর্ধনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রফুল্ল কুমার রায় চৌধুরী সকলকে অভিনন্দন জানানোর পর সভাপতির অনুরোধে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যে যশোরের দান, সজনীকান্ত মাইকেল মধুসূদনের বৈশিষ্ট্য এবং ডা. সত্যনারায়ন বাংলা সাহিত্যেও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মনোজ্ঞ বক্তৃতা দেন। প্রবোধেন্দু ঠাকুর মাইকেল মধুসূদনের সম্পর্কে তাঁর রচিত একটি মর্মস্পর্শী কবিতা পাঠ করে শোনান।
১৯৪১ সালের ২৯ জুন মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যু বার্ষিকীর অনুষ্ঠান হয়েছিল যশোর বি. সরকার মেমোরিয়াল হলে। যশোহর সাহিত্য সংঘের উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়। এর আগে তিনি সাগরদাঁড়ি ঘুরে আসেন। সভায় শহরের বিশিষ্ট ও গণ্যমান্য ব্যক্তি বর্গ অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে সুনীতি হালদারের পরিচালনায় বালিকাগণ উদ্বোধন সঙ্গীত পরিবেশন করে। সভায় কয়েকটি কবিতা ও প্রবন্ধ পঠিত হয় এবং বিনয় সেন মহাকবি মাইকেলের উদ্দেশে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করে বক্তৃতা শুরু করেন। সভাপতি বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় এরপর বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, বাংলা কাব্য সাহিত্যের পুরোভাগে যিনি বিশাল মহীরুহের মতো দন্ডায়মান, যে মহাকবি মধুসূদন এই যশোরের কপোতাক্ষ নদের তীরে জন্মেছিলেন। তাঁরই স্বদেশের স্মৃতিবাসরে আমরা আজ সম্মিলিত। মধুসূদনের স্বদেশবাসীদের সঙ্গে এই স্মৃতি সভায় দাঁড়িয়ে সেই মহাকবির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদনের যে সুযোগ আমি পেলাম, সেই সুযোগের জন্য আমি আজ ভাগ্যবান। তিনি আরও বলেন, এদেশে ধনীর দুলাল অনেক জন্মেছেন, কিন্তু মহাকালের গতিপথে তাঁদের কোনো পদচিহ্ন নেই। মাইকেল দত্ত ধনীর সন্তান ছিলেন এবং একমাত্র সন্তান ছিলেন। তথাপি প্রাণের কি তাড়নায়, এই সংসার ও সমাজের প্রতি গভীরতর কি বিতৃষ্ণায় মাত্র ১৭ বছরের কিশোর তরুণরূপে এই দেশের ধর্ম, লোকাচার ও প্রত্যাহিক জীবনকে তিনি অস্বীকার করলেন? গতানুগতিক সংসার ও সমাজ জীবনকে তিনি দৃঢ়চিত্ত পুরুষের মতই দুই পায়ে দলে ও মথিত করে অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, মাইকেল দত্তের জীবনদ্বন্দ্ব তাঁকে শেষ পর্যন্ত গভীরতর ট্রাজেডির পথে নিয়েছিল এবং এই নিয়ে আমাদের বাংলাদেশের শিক্ষিত অংশে কিছু বেদনার বাষ্প সঞ্চিত হয়েছিল। যে মহাপ্রাণ কবি ধনীর সন্তান হয়েও ভয়াবহ দারিদ্র্যের কবলে পড়েছিলেন এবং জীবনের অন্তিম নিঃশ^াস হাসপাতালের দাণিক্ষণ্যের মধ্যে ত্যাগ করেছিলেন। তাঁর জন্য হৃদয়বান মানুষের বেদনা ও দুঃখবোধ একান্ত স্বাভাবিক। তবুও মৃত্যুকে তিনি বারের মতই গ্রহণ করেছিলেন এবং সেক্সপীয়রের কবিতা আবৃতি করে সেই মৃত্যুশয্যা থেকে বারবার বলেছিলেন, ‘এ জীবন মম বাতির মৃদু শিখার মতো, এর নির্বাণ অনিবার্য, জীবন রঙ্গভূমিতে মানুষ অভিনেতা মাত্র, এখানকার সুখ দুঃখ দীর্ঘকালের নয়।’ মৃত্যুকে সত্যদ্রষ্টা কবির মতো গ্রহণের এই শক্তি নিতান্ত অপেক্ষার নয়। যাঁরা তাঁর দুঃখ ও দারিদ্র্য নিয়ে আপশোষ করেন, তাঁদের হৃদয়বত্তাকে আমি নিশ্চয় প্রশংসা করি। কিন্তু তবু আমি বলব, আমি তাদের সঙ্গে একমত নই। কারণ বিদ্রোহীর জীবননীতি এমন স্রোত ধরেই প্রবাহিত হয়।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই স্মৃতিবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, কি করে মহাকবির স্মৃতিরক্ষার যথাযোগ্য ব্যবস্থা করা যায়। এ সম্পর্কে যশোরের গৌরব মহাকবি মধুসূদন দত্তের নামানুসারে নব প্রতিষ্ঠিত যশোহর কলেজের নামকরণের কথা উঠে আসে। প্রফুল্লকুমার রায় চৌধুরী যশোরের সুসন্তান মহাকবি মাইকেলের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন প্রসঙ্গে উক্ত প্রস্তাবের অবতারণা করেন এবং প্রস্তাবটি সভার সকালের অনুমোদন লাভ করে। বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ও তাঁর অভিভাষণ শেষে যশোহর কলেজকে ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলেজ’ নামে অভিহিতের পক্ষে মতো প্রকাশ করেন।
এরপরের বছর অথাঁৎ ১৯৪২ সালের ২৯ জুন মধু কবির স্মৃতিবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এসেছিলেন সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এর আগের দিন তিনি সাগরদাঁড়ি যান। যশোহর সাহিত্য সংঘের উদ্যোগে ২৯ জুন সোমবার সন্ধ্যা ৭টার সময় কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে যশোরের স্বয়ম্ভু গোপাল মজুমদারের ভবনে সুসম্পন্ন হয়েছিল। সুসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। কুমারী জয়শ্রী, জয়ন্তী মজুমদার যমুনা ও কৃষ্ণা ধর উদ্বোধনী সঙ্গীত গওয়ার পর কুমারী সবিতা রায় চৌধুরী মেঘনাদ বধ কাব্য থেকে একটি দৃশ্য অভিনয় করেন। কুমারী মঞ্জু সেন নৃত্য করেন। সুশীল মিত্র গান করেন। মৌলভী সৈয়দ মোকাররম আলী একটি তথ্যপূর্ণ বক্তৃতায় কবির কাব্য আলোচনা করেন। সত্যব্রত সেন প্রবন্ধ, মম্মথনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রবন্ধ, হৃদয়রঞ্জন দাশ একটি কবিতা আবৃতি করেন। প্রফুল্ল কুমার রায় চৌধুরী, অবলাকান্ত মজুমদার, ও সভাপতি মহাশয় বক্তৃতায় কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সভায় মহাকবির একখানি চিত্র পুষ্পদানে সুসজ্জিত করা হয়। এই সভায় শহরের বহু বিশিষ্ট নরনারী অংশ গ্রহণ করেছিলেন।

অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদক তুষারকান্তি ঘোষ ১৯৪৩ সালে মধু কবির ৭০তম মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এসেছিলেন যশোর। ২৯ জুন যশোহর সাহিত্য সংঘের উদ্যোগে অনুষ্ঠানটি হয়েছিল যশোর শহরের ‘গোপাল গড়’ ভবনে। অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদক তুষারকান্তি ঘোষ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। কলকাতা থেকে সাহিত্যিক অনুরুপা দেবী এবং যশোরের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি ও নারী অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করেন। অনুরুপা দেবীর বাবা মুকুন্দদেব মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও লেখক এবং মায়ের নাম ছিল ধরাসুন্দরী দেবী। সাহিত্যিক ও সমাজ-সংস্কারক ভূদেব মুখোপাধ্যায় ছিলেন অনুরূপা দেবীর ঠাকুরদা এবং বঙ্গীয় নাট্যশালার প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তার দাদামশাই।
অনুষ্ঠানে যশোর শহরের প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে অন্যতম মিঃ ও মিসেস এসএন দত্ত, মি: ও মিসেস এসসি বসু, ডা. জীবন রতন ধর, মিঃ ও মিসেস এস সি মজুমদার, মিঃ জে সি দাস, সৈয়দ নওশের আলী, মি: আর এম সন্ন্যাল, অধ্যাপক বিএন দাশ শর্মা, মি: এনসি চক্রবর্তী, মি: পি সি দাস, জে আর ধর, সুরেন্দ্রনাথ হালদার, নগেন্দ্রনাথ ঘোষ, প্রফুল্ল কুমার রায় চৌধুরী, কুমার গুরুক্রম মজুমদার, অবলাকান্ত মজুমদার, টিকেন্দ্রজিৎ মজুমদার, তপন কুমার বসু, নলিনীকান্ত মজুমদার, নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদার, নিশিনাথ মুখার্জী, রাধাগোবিন্দ চন্দ্র, জিতেন্দ্রনাথ সেন, প্রফুল্ল কুমার মজুমদার, প্রফুল্ল কুমার বসু, বিমলাকান্ত সর্বজ্ঞ, কেদারনাথ ভারতী, হরিপদ ভারতী, অমুল্যরতন ধর, তারকনাথ গাঙ্গুলী, নগেন্দ্রনাথ সরকার, নির্মলচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে তুষারকান্তি বলেন, আমি সাহিত্যিক নই। বাংলা সাহিত্যের আমি একজন সাধারণ পাঠক মাত্র। তারপরও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবির স্মৃতি বাসরে পৌরোহিত্য করতে আমি যে সম্মত হয়েছি, তার একটি কারণ আছে। কবি মধুসূদন যে মাটিতে যে দেশে এবং যে নদী ধারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, আমিও সেই দেশের একজন নগন্য সন্তান। যে কপোতাক্ষী তীরে জন্মগ্রহণ করে মহাকবি মধুসূদন যশোহর জেলাকে ধন্য করেছেন, যার চরণস্পর্শে এই দেশের ধূলি কণা স্বর্ণরেনুর মতো সুন্দর হয়েছে, সেই যশোহর জেলার সঙ্গে আমার নাড়ীর যোগ-আমার পিতৃপুরুষ ও পূর্বপুরুষদের সঙ্গে সম্পর্ক। যে দেশে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো মহাকবির জন্ম, সেই দেশের সঙ্গে আপন পিতৃভূমির যোগ হওয়া কি আমার পক্ষে আরও বেশি গৌরবজনক এবং আরও বেশি সস্মানজনক নয়? এই যশোরের মাটি আমার কাছে তীর্থস্থানের ন্যায় পবিত্র। সেই পবিত্র ভূমিতে দাঁড়িয়ে আমি তীর্থ যাত্রীর মতোই শ্রদ্ধানত ও ভক্তিনত চিত্তে মহাকবি মধুসূদনের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত জীবনে বিদেশি আচার ব্যবহার তার বাঙালি হৃদয়ের সঙ্গে একটা প্রবল বিরোধের সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু কাব্যে তিনি যা সৃষ্টি করে গেছেন, তার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, তা অমৃত। সেই অমৃত আমাদের জাতীয় সম্পদ। আজ তাঁর জন্মভূমির পূণ্য অঙ্গনে দাঁড়িয়ে আমরা দেশবাসীরা তাঁকে স্মরণ করছি। আমাদের হৃদয়ের শ্রদ্ধার অঞ্জলি দিয়ে তাকে পূজা করছি। আমাদের পূজায় তাঁর অমর আত্মা তৃপ্ত হোক। হিন্দু কলেজের সপ্তম শ্রেণিতে ভুদেব যেদিন প্রথম ভর্তি হলেন সেদিন শিক্ষক রামচন্দ্র বাবু ভুদেবকে পড়াবার সময় পৃথিবীর গোলার্ধের কথা বোঝাতে গিয়ে তৎকালীন ইংরেজি শিক্ষিতের প্রথামত ব্রাহ্মণ পন্ডিতের সন্তান ভুদেবকে শ্লেষ করে বলেন, ‘পৃথিবীর আকার কমলা লেবুর মতো গোল, কিন্তু ভূদেব, তোমার পিতা এ কথা স্বীকার করবে না।’ ভূদেব কিন্তু এই শ্লেষবাক্য নীরবে পরিপাক করতে পারলেন না। বাড়ি ফিরে পিতাকে প্রশ্ন করে জানলেন, গোলাধারে লিখিত আছে ‘করতল কালতামলক বদমলং বিদন্তি যে গোলং।’ পরদিন স্কুলে এসে তিনি রামচন্দ বাবুকে সেই কথা বলাতে তিনি নিজের অন্যায় স্বীকার করেন। যে সময় শিক্ষকের সঙ্গে ভুদেবের এই সমস্ত বিতর্ক চলছিল সেই সময় ক্লাসের আর একটি সুশ্রী বালক বিশেষ মনোযোগের সঙ্গে তাকে লক্ষ্য করছিলেন। প্রতিভা ও তেজস্বিতায় এই দুই বালকের মধ্যে একটা স্বধর্মীয় ছিল, তাই তাদের মধ্যে অতি সহজেই বন্ধুত্ব জন্মে যায়। বলাবাহুল্য উল্লিখিত বালক ভবিষ্যতের মাইকেল মধুসূদন দত্ত। মধুসূদন প্রায়ই ভুদেবের বাড়িতে যেতেন এবং তার মাতাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। মাদ্রাজ থেকে তিনি ভুদেবকে যে পত্র লেখেন তাতে তার মাতার উল্লেখ করে লিখেছিলেন ‘আমার প্রণীত’ ক্যাপটিভলেডি’ নামক পুস্তকে যে রাণীর কথা আছে, সেই রাণী তোমার মাকে আদর্শ করে গঠন করা হয়েছে। ভুদেব জননীর অপরিমিত স্নেহ, যত্ন ও দেবীর মতো রূপ মাইকেল চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন এবং বন্ধুদের নিকট উল্লেখ করেছেন। মহাকবির জীবনে আমার পিতামহদেবের এবং তার জননীর আদর্শ কার্যকরী না হলেও তাদের সহচার্য তার কবি প্রতিভার স্ফুরণে স্পষ্ট সাহায্য করেছে-সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। দেশের দুর্ভাগ্য এই বন্ধুদ্বয়ের মধ্যে মতান্তর ঘটেছিল। মধুসূদন ধর্মান্তর গ্রহণ করলেও পূর্বে ভুদেবকে সে সম্বন্ধে ঘুণাক্ষরেও জানতে দিলেন না। ভুদেব এই ব্যাপারে মর্মাহত হন, কিন্তু তাদের স্নেহের স্বয়ং শেষদিন পর্যন্ত অক্ষুণ্ন ছিল। একজন বাংলার ইংরেজি শিক্ষিত সমাজের অগ্রণী থেকেও স্বাদেশিকতা ও ধর্মপ্রাণতার স্তম্ভস্বরুপ হয়ে দেশের ভাবরাজ্যে স্বধর্ম ও স্বজাতিপ্রীতির দ্বারা নবযুগের পথপ্রদর্শক হয়েছিলেন। আর একজন দীর্ঘকাল প্রবাস জীবন যাপন করে বহু বিভিন্ন ভাষা ও সমাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকেও বাংলা ভাষার সম্রাজ্যে যুগান্তর এনেছিলেন। প্রকৃত পক্ষে মধুসূদন বাংলা সাহিত্যে যে ভাষা ও যে ভাবার্থ এনেছিলেন তা অসাধ্য ব্যাপার। ইতালির কবি পেত্রকার বলেছিলেন, তিনি অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন করে ভাষাকে ভেঙে গড়লেন। তিনি শিশুকাল থেকেই আত্মশক্তিতে অতিরিক্ত বিশ^াসী ছিলেন। তার আবাল্যের উচ্চভিলাষ ছিল যে তিনি মহাকবি হবেন। ভুদেব বাবু লিখেছেন, ‘তিনি বলতেন-তোমরা আমার জীবনচরিত লিখিও, আমি পৃথিবীর সকল কবি অপেক্ষা বড় কবি হইব। আমি তাহার এই কথায় হাস্য করিতাম। কিন্তু সে যে একজন অতীব প্রতিভা সম্পন্ন যুবা তাহা আমি বেশ বুঝিতে পারিতাম। কর্মেক্ষেত্রে অবতরণ করিয়া ক্রমে আমার অন্যূন বিশ লাখ ছাত্রের সংশ্রবে আসিতে হইয়াছিল, কিন্তু মধুর ন্যায় প্রতিভা আমি আর কাহাকেও দেখিতে পাই নাই।’
প্যানেল/মো.








