ছবি: দৈনিক জনকণ্ঠ।
গোল গাছ—একটি অর্থকরী ফসল। উপকূলীয় সাগরপারের এ জনপদে গোল গাছ সকল শ্রেণির মানুষের কাছে পরিচিত। বহুমুখী ব্যবহারে এর বিকল্প নেই। এক সময় (ষাটের দশকে) অধিকাংশ গ্রামে গোল গাছ ছিল। অনেকের বড় আকৃতির বাগানও ছিল। বিশেষ করে জোয়ারের পানি প্রবাহমান এমন খালের পাড়ে কিংবা বিলে গোলগাছের বাগান দেখা যেত। খাল-বিলের এই অঞ্চল মাইলের পর মাইল গোলবাগানে পরিপূর্ণ ছিল। গোল গাছের কদর ছিল অনেক বেশি। তবে বাণিজ্যিকভাবে গুড় তৈরির কার্যক্রম ছিল না। গত এক যুগ ধরে গোলের গুড়ের কদর বাড়তে থাকে। এখন তো গোলের গুড়ের রয়েছে আলাদা কদর।
কৃষিকাজের পাশাপাশি গোলগাছের আবাদ করছেন, করছেন পরিচর্যা ও সংরক্ষণ। আশির দশক পর্যন্ত অধিকাংশ মানুষ ঘরের চালের ছাউনি ও বেড়া দিত গোলপাতা দিয়ে। আর গোলপাতা কাটার পর গোড়ার অংশ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিছুই ফেলনা নয়। বর্তমানে গোল গাছ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। তবে যাদের যতটুকু গোলবাগান রয়েছে, তা দিয়ে গুড় উৎপাদন করে আয়ের পথ দেখছেন, দেখছেন সফলতা।
ষাটের দশকে কৃষিজমি চাষাবাদের উপযোগী করতে লোনা পানির প্লাবন ঠেকাতে নদীর পাড় ঘিরে বেড়িবাঁধ নির্মাণ শুরু হয়। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় এবং ধানসহ রবিশস্য ও সবজির আবাদ করতে এসব বাঁধ দেওয়া হয়। নির্মিত হয় বাঁধের ভেতরের খালের সঙ্গে পানি নিয়ন্ত্রণে স্লুইসগেট। জোয়ার-ভাটার লোনা পানিতে বেঁচে থাকা এই গাছ তখন থেকেই কমতে থাকে। এখনও সবকটি ইউনিয়নে বেড়িবাঁধের বাইরে গোল গাছ রয়েছে। বেড়িবাঁধের ভেতরে কিছু কিছু গোলবাগান দেখা যায়।
তবে সবচেয়ে বেশি গোল গাছ রয়েছে নীলগঞ্জ ইউনিয়নে। বিশেষ করে নবীপুর ও সোনাতলা গ্রামের চাষিরা এখনও গোলবাগান সংরক্ষণ করে আসছেন। সুস্বাদু হওয়ায় গোলের গুড় সংগ্রহ ও বিক্রি করছেন। বাণিজ্যিকভাবে নতুন নতুন বাগানও করছেন কেউ কেউ। লাভের মুখ দেখছেন প্রায় একশ’ কৃষক পরিবার। এখন গোলের গুড়ের চাহিদা এই অঞ্চল ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয়রা তাঁদের প্রিয়জনদের জন্য গোলের গুড় দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
গোলগাছ ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের উপকূলীয় ও মোহনা এলাকার একপ্রকার পামজাতীয় উদ্ভিদ, যা নিপা পাম নামে পরিচিত। এটি পামের একমাত্র প্রজাতি, যা ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে পাওয়া যায়। এটি গণ নিপা থেকে উদ্ভূত একমাত্র প্রজাতি, যার উপপ্রজাতি নিপোডিয়া।
এই অঞ্চল ছাড়াও বাগেরহাটের মোংলার মিঠাখালীতে খোনকার বেড় গ্রামে এক কৃষকের প্রায় দুই বিঘা জমিতে গোলগাছের বাগান রয়েছে, যেখানে কৃষি অফিসের পরামর্শে ২০১০ সালের দিকে রস থেকে গুড় তৈরিতে সহায়তা করা হয়েছিল। মোংলা উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও পরিবেশবাদী সংগঠক মো. নুর এ আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে বর্তমানে সেখানে গোলের গুড় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে গোল গাছ রয়েছে। তবে নীলগঞ্জে বাণিজ্যিকভাবে গুড় সংগ্রহের জন্য কিছু গোলবাগান রয়েছে। বিশেষ করে নবীপুরের চাষিরা গোলবাগানের আলাদা পরিচর্যা করেন। তাঁরা শীত মৌসুমে গোলের গুড় উৎপাদনের মাধ্যমে আর্থিক সফলতার মুখ দেখেন। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
গোল গাছ দেখতে গোল নয়। এর পাতা নারিকেল গাছের মতো লম্বা হয়। ১০ ফুট থেকে কোনো কোনো উর্বর জায়গায় ১৫–১৬ ফুট দীর্ঘ গোলগাছ দেখা যায়। শীত মৌসুমের আগেই গোল গাছে ফল ধরে। একটি কাণ্ডে ফল ধরে, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘গাবনা’ বলা হয়। তালগাছের ডগার মতো গোলগাছের কাণ্ডে এই গাবনা বা ফল ধরে। ফলওয়ালা কাণ্ড কেটে রস সংগ্রহ করা হয়।
নির্দিষ্ট সময় ছড়াসহ গাবনাটি কোনো এক পূর্ণিমায় পায়ের চাপে কাণ্ডসহ নিচের দিকে বাঁকানো হয়। কেউ কেউ কাদা মেখে রাখেন। গোলচাষিদের ধারণা বা বিশ্বাস, নির্দিষ্ট গণনায় গাবনাসহ কাণ্ড বাঁকালে বেশি রস পাওয়া যায়। এরপর ফলটি থোকাসহ এক কোপে কেটে কাণ্ডটি তালের রস সংগ্রহের মতো ধাপে ধাপে কেটে রস সংগ্রহ করা হয়।
গুণগত কারণে গোলের ও খেজুরের গুড় সহজেই আলাদা করা যায়। এরপর খেজুর গুড়ের মতো আগুনে জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করা হয়। কিছুটা নোনতা-মিঠা স্বাদের এই গুড় ডায়াবেটিস রোগীরাও খেতে পারেন বলে সংগ্রহকারীদের মত। আবার খেজুরের রসের মতো গোলের রসও পান করতে সুস্বাদু। স্বাদের পাশাপাশি গোলের গুড়ে রয়েছে ওষধিগুণ। কথিত আছে, গোলের গুড় বা রস পেটের কৃমি বিনাশে সহায়ক। আবার বাসি রস খেলে তাড়ির মতো নেশা হয়।
কলাপাড়া উপজেলার সাবেক পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (স্বাস্থ্য প্রশাসক) ডা. চিন্ময় হাওলাদার জানান, এই গুড়ে এক ধরনের ভিন্নতর স্বাদ রয়েছে এবং এতে থাকা খনিজ লবণ মানুষের জন্য অনেক ক্ষেত্রে উপকারী।
নীলগঞ্জের নবীপুর গ্রামের প্রবীণ চাষি হরি নারায়ণ মিত্র (৮২) জানান, ব্রিটিশ আমল থেকেই তাঁর দাদা বৈকুণ্ঠ মিত্র গোলগাছের গুড় সংগ্রহ করতেন। বর্তমানে তাঁর দুই একর জমিতে প্রায় চারশ’ গাছ রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় দুইশ’ গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা যায়। প্রতিদিন দুই বারে চার কলসি রস সংগ্রহ করে গড়ে ৫–৬ কেজি গুড় তৈরি করেন। অগ্রহায়ণ থেকে চৈত্র পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা যায়।
তিনি জানান, ১৯৭৪ সালে যেখানে গুড়ের দাম ছিল ৫–৬ টাকা কেজি, বর্তমানে ভালো মানের গুড় বিক্রি হচ্ছে ২৩০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে। প্রায় ২৫ লিটার রস থেকে পাওয়া যায় ৪–৫ কেজি গুড়। গোলগাছের চাষ লাভজনক ও সহজ। এতে রাসায়নিক সার বা কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না।
চাষিদের অভিযোগ, ভরাট খাল কৃষিজমি দেখিয়ে বন্দোবস্ত দেওয়ায় অনেক জায়গায় গোলবাগান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। একসময় এসব খালে কুমিরও ছিল বলে জানান হরি নারায়ণ মিত্র।
নীলগঞ্জ ইউনিয়নে বর্তমানে প্রায় ৮০ জন চাষি বাণিজ্যিকভাবে গোলের চাষ ও গুড় উৎপাদন করছেন। একেকটি পরিবার মৌসুমে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা লাভ করেন। সাপ্তাহিক হাটে প্রতি সপ্তাহে ৩০–৪০ মণ গোলের গুড় বিক্রি হয়। বছরে কলাপাড়ায় প্রায় কোটি টাকার গোলের গুড় উৎপাদন হয় বলে চাষিদের দাবি।
কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরাফাত হোসেন জানান, গোলচাষিদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং চাষ সম্প্রসারণে পরিকল্পনা রয়েছে। বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে আন্ধারমানিকসহ বিভিন্ন নদীতীরবর্তী চরে প্রায় ৬০ হাজার গোলগাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও ব্যাপকভাবে গোলবাগান গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
লেখক: মেজবাহউদ্দিন মান্নু, কলাপাড়া, পটুয়াখালী।
এম.কে








