অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক সীমান্তবর্তী পর্যটন জেলা শেরপুর। কৃষি ও খাদ্যে সমৃদ্ধ এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ নদী ও পাহাড়ের পাশাপাশি রয়েছে বেশকিছু প্রাচীন ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। এর মধ্যে ঐতিহাসিক বারোদুয়ারি মসজিদ, মাইসাহেবা মসজিদ ও মোগল আমলের ঘাগড়া লস্কর জামে মসজিদ উল্লেখযোগ্য। মসজিদগুলো একদিকে যেমন কালের সাক্ষী, অন্যদিকে দৃষ্টি কাড়ছে পর্যটকদের।
মাইসাহেবা জামে মসজিদ : শেরপুরের এক প্রাচীন ও দৃষ্টিনন্দন নিদর্শন ‘মাইসাহেবা মসজিদ’। জেলা শহরের তিনআনী বাজার (রাজাবাড়ী) এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ওই মসজিদটি একদিকে যেমন শহরের প্রথম নির্মিত, অন্যদিকে এটি ধর্মীয় অনুভূতি, প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিক স্থাপত্যশৈলীমণ্ডিত জেলার অন্যতম প্রধান মসজিদ। শহরে প্রবেশের সময় মসজিদটির সুউচ্চ দুটি মিনার অনেক দূর থেকে দৃষ্টি কাড়ে উৎসুক মানুষের। প্রায় ৭৩ শতক জমির ওপর নির্মিত ওই মসজিদে প্রতিদিন নামাজ আদায় করেন হাজার হাজার মুসল্লি। ফলে কালের পরিক্রমায় মসজিদটি এক অনন্য ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে খ্যাতি পাওয়ায় প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছুটে আসেন তা একনজর দেখতে। এই সুবাদে মসজিদের মুসল্লি আর দর্শনার্থীদের কাছ থেকে অনেক অর্থও জমা পড়ে মসজিদ ও তার দানবাক্সে।
ঐতিহাসিক তথ্যমতে, তৎকালীন সুসঙ্গ মহারাজার কাছ থেকে এ মসজিদের জমিটুকু দান হিসেবে পেয়েছিলেন মুসলিম সাধক মীর আব্দুল বাকি। মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ’র নিয়োগপ্রাপ্ত সুবেদার ছিলেন মীর আব্দুল বাকি। গড়জরিপা কেল্লার দায়িত্ব নিয়ে তিনি আল্লাহর নৈকট্য লাভের কামনায় এতই ব্যাকুল হন যে, দিল্লির সম্রাটের কাছে তার পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে স্ত্রী সালেমুন নেছাসহ বেরিয়ে পড়েন সুফি সাধকদের সাহচর্যের আশায় শেরপুর অঞ্চলে এসে নিজেকে সমর্পিত করেন আল্লাহর ধ্যানে। এদিকে তৎকালীন শক্তিধর সুসঙ্গ মহারাজাকে শেরপুর পরিদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানান শেরপুরের নয়আনী জমিদার হরচন্দ্র চৌধুরী, তিনআনী জমিদার রাধাবল্লভ চৌধুরীসহ অন্যান্য জমিদারগণ। মহারাজা তাদের জানিয়ে দেন, অন্যের জমিতে তিনি আহার ও রাত্রিযাপন করেন না। ওইসময় শেরপুরের জমিদারগণ তিনআনী বাড়ির পশ্চিমাংশের ২৭ একর লাখোরাজ সম্পত্তি মহারাজার নামে লিখে দিলে তিনি শেরপুরে আসেন। শেরপুর ছাড়ার সময় মহারাজা ওই সম্পত্তি তাম্র দলিলের মাধ্যমে মুসলিম সাধক মীর আব্দুল বাকিকে দান করেন। পরে দানকৃত এ জমিটি তিনআনি জমিদার রাধাবল্লভ চৌধুরী মসজিদ স্থানের ৮ শতাংশ জমি ছাড়া সমুদয় নিজ নামে সিএস রেকর্ডভুক্ত করে নিজ দখলে নেন। এরপর তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেলে তার পাওয়ার অব এটর্নিমূলে ৬৫ শতাংশ জমির দায়িত্বপ্রাপ্ত হন মরহুম ফরিদ উদ্দিন। তিনি পরে মসজিদের কাছে ওই জমিটি বিক্রির মাধ্যমে হস্তান্তর করেন।
অন্যদিকে স্বামী মীর আব্দুল বাকির ইন্তেকালের পর ১৮৬১ সালে সালেমুন নেছা তার ভাগনে শহরের শেরীপাড়া মিঞাবাড়ির বাসিন্দা সৈয়দ আব্দুল আলীসহ স্থানীয় মুসলমানদের সহযোগিতায় দানের ওই জমিতে ৩ গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। ২ কাতার বিশিষ্ট এ মসজিদে ৩৬ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন। মসজিদ প্রতিষ্ঠার পর এ পূণ্যময়ী নারীর কৃতিত্বের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ এ মসজিদে নামাজ আদায় করতে আগ্রহী হয়ে উঠেন। দিন দিন মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকায় মসজিদটি সম্প্রসারণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ১৯০৩ সালে আরও ৩ কাতারের স্থান সংকুলান উপযোগী করে মসজিদ ভবনটি সম্প্রসারণ করা হয়। তার জীবদ্দশায় এ মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের সার্বিক দায়িত্ব তিনি নিজেই পালন করেন। এ বংশের নারীদের মাইসাহেবা এবং পুরুষদের মিঞা সাহেব বলে ডাকা হতো। সে হিসেবে সালেমুন নেছা বিবিকেও মাইসাহেবা বলা হতো। তিনিই মসজিদটি নির্মাণ করেন। তাঁরই নাম অনুসারে এই মসজিদকে মাইসাহেবা মসজিদ বলা হয়। প্রায় আটাশ হাজার বর্গফুট জায়গার পশ্চিম দক্ষিণ বরাবর আদি মসজিদ ভবনটির অবস্থান ছিল। আদি কাঠামোটি মূলত ৪০ ইঞ্চি পুরুত্বের ইট, সুরকি ও চুনের মিশ্রণে গাঁথুনির দেওয়াল ছিল। মসজিদটির প্রস্থ ২০ ফুট এবং দৈর্ঘ্য ৩০ ফুট। যার ছাদ তিনটি পাশাপাশি গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। এ আদি রূপের মসজিদটির ৫টি প্রবেশ পথ ছিল। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ প্রয়াত পণ্ডিত ফছিহুর রহমানের লেখা ‘শেরপুর জেলার অতীত ও বর্তমান’ বই থেকেও পাওয়া যায় একই তথ্য।

পরবর্তীতে মসজিদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় ২০০১ সালে শেরপুরের সৃজনশীল স্থপতি আব্দুল্লাহ ইবনে সাদিক (শাহীন) অনেকটা স্থাপত্যের সংমিশ্রণে আধুনিক রূপে বর্তমান মসজিদ স্থাপনাটির নকশা তৈরি করেন। শুভ্রতার প্রতীক সাদা রঙের প্রলেপে ৩ তলা বিশিষ্ট এ মসজিদটিকে ২টি মিনার ও ৮টি গম্বুজ দ্বারা অলংকৃত করা হয়েছে। যা ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের ইবাদতের প্রাণকেন্দ্র ও মুসলিম ঐতিহ্যের বাহক। এই মসজিদের নিচতলা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। বর্তমানে চারদিকে সীমানা প্রাচীরবেষ্টিত এই মসজিদে আছে আরবি ক্যালিগ্রাফিখচিত দুটি দৃষ্টিনন্দন প্রবেশপথ। এ মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদ ভবন কাঠামোর পূর্ব পাশে ৬টি পাশাপাশি দরজা বিশিষ্ট প্রধান প্রবেশ পথ রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব দিকের সিঁড়ি এবং উত্তর-পূর্ব দিকের সিঁড়ির ঠিক পূর্ব পাশে প্রথম তলা ছাদের ওপর যে দুটি গম্বুজ রয়েছে তার নিচ বরাবর আরও দুটি প্রবেশ পথ রয়েছে। সর্ব পূর্বে প্রধান প্রবেশ পথের ওপর উত্তর ও দক্ষিণ পাশে সুউচ্চ ২টি মিনারের অবস্থান। এ মিনার ২টি একটি অন্যটির চেয়ে একটু ছোট। একটির উচ্চতা ৯৫ ফুট ও অপরটির ৮৫ ফুট। দুটি গম্বুজের একটির অবস্থান প্রধান ফটকের দ্বিতীয় ছাদ বরাবর এবং অন্যটি সর্বশেষ ছাদের ওপর স্থাপন করা হয়েছে। মূল মসজিদ ভবনের ভিতরে নিচতলায় মাঝ বরাবর রয়েছে একটি কবরস্থান। এখানে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা সালেমুন নেছা, তার স্বামী মীর আব্দুল বাকি, ভাগনে সৈয়দ আব্দুল আলী, মসজিদের খতিব ও মসজিদ কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. মোহছেন, তার স্ত্রী উম্মে রেজা মরিয়ম, মসজিদের মোয়াজ্জিন আব্দুল জব্বারসহ আরও কয়েকজনকে দাফন করা হয়েছে। ২০০১ সালে মসজিদের মূল নকশার প্রথম অংশ অর্থাৎ দক্ষিণ-পশ্চিম কোন বরাবর প্রায় ৫ হাজার বর্গফুট বিশিষ্ট অংশটি নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে উত্তর বরাবর প্রথম কাঠামোর স্থাপত্য রূপকে ঠিক রেখে প্রথম কাঠামোর প্রায় সমপরিমাণ জায়গা নিয়ে মসজিদটি বর্ধিত করা হয়। এ বর্ধিত অংশের পূর্বদিক বরাবর নিচতলার প্রায় অর্ধেক অংশে জ্যামিতিক আকৃতির ফোয়ারা সম্বলিত অজুখানা এবং এর সর্ব উত্তরে শৌচাগারের অবস্থান। বাকি পশ্চিম বরাবর সম্পূর্ণ অংশ মূল মসজিদের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। এছাড়া বর্ধিত অংশের পূর্বাংশের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় রয়েছে একটি ইসলামিক সেমিনার কক্ষ ও একটি আধুনিক পাঠাগার। বিশাল এ মসজিদের সামনের অংশে রয়েছে অনেক জায়গা। এখানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। পরিকল্পিতভাবে এ মসজিদ ভবন কাঠামোটি বর্ধিতসহ পূর্ব ও উত্তর দিকে আধুনিক ইমারত গড়ে তোলায় স্থাপত্যের অপরূপ নিদর্শন এ মসজিদ ভবনটি একটি ইসলামিক কমপ্লেক্সে পরিণত হয়েছে। দিনে দিনে মসজিদটিতে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। বক্রাকারে খিলানের ব্যবহার ও স্থাপত্যকলার আধুনিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় মসজিদে। এর বাইরের সৌন্দর্য যেকোনো পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
মাইসাহেবা মসজিদে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ দান করে তৃপ্তিবোধ করেন। এমনকি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও এখানে নিয়মিত দান করেন। মাইসাহেবা মসজিদে বয়স্কদের বিনামূল্যে কোরআন শেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে। অসংখ্য বয়স্ক মানুষ প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর শুদ্ধভাবে কোরআন ও তাজভীদ শেখেন। মসজিদের একজন ইমাম, একজন পেশ ইমাম, একজন মুয়াজ্জিন, একজন কম্পিউটার অপারেটর ও ৩ জন খাদেম আছেন। পুরো মসজিদ পাহারা দেওয়ার জন্য ২ জন লোক নিয়োজিত রয়েছে। একজন মসজিদ কর্তৃপক্ষের, অন্যজন পৌর কর্তৃপক্ষের। এছাড়া একটি নির্বাহী কমিটির মাধ্যমে মসজিদটি সুচারুভাবে পরিচালিত হয়। এ মসজিদটি নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকা। এছাড়া প্রতি শুক্রবারে মসজিদের দানবাক্স থেকে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পাওয়া যায়।
সরেজমিনে গেলে কথা হয়, মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্য ও শহরের বাগরাকসা এলাকার অধিবাসী অ্যাডভোকেট শাহ মো. শাহীন হাসান খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, এই মসজিদে গড়ে ৩ হাজার মুসল্লি তারাবিহ ও জুমার নামাজসহ ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাসহ ধর্মীয় বিশেষ দিনগুলোতে প্রায় ৬ হাজার মুসল্লি এখানে ঈদের নামাজ আদায় করেন। নারীদের নামাজের জন্য আছে আলাদা ব্যবস্থা। প্রতি শুক্রবার দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মুসল্লি এই মসজিদে এসে জুমার নামাজে শরিক হন। এছাড়া রমজান মাসে প্রতিদিন প্রায় ৫শ মুসল্লি এ মসজিদে ইফতার করে থাকেন। ইফতারির খরচ মসজিদ কমিটির সদস্য ও জেলার বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ ব্যক্তিগতভাবে বহন করেন। মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি ও সাবেক কোষাধ্যক্ষ আলহাজ মজদুল হক মিনু বলেন, এ মসজিদে শেরপুর অঞ্চলসহ দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করতে আসেন। অন্যদিকে ঐতিহাসিক নিদর্শন হওয়ার কারণে মসজিদটি এক নজর দেখতেও ছুটে আসেন অনেকে। এছাড়া সওয়াব ও নিয়ত কবুল হওয়ার আশায় মসজিদে সরাসরি ও তার দানবাক্সে অনেকেই নীরবে দান করে থাকেন। মসজিদের সম্মুখের রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের চালকরাও গাড়ি থামিয়ে দানবাক্সে টাকা-পয়সা দান করেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ভিন্ন ধর্মের লোকজনও দানবাক্সে নীরবে টাকা-পয়সা দান করেন। এছাড়া বছরের দুটি ঈদ উৎসব ছাড়াও শবে বরাত ও শবে কদরসহ নানা ধর্মীয় দিনে হাজার হাজার মানুষের ভিড় জমে। সারারাত চলে এবাদত বন্দেগী।
এ ব্যাপারে মাইসাহেবা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল আওয়াল চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক তারা জানান, শেরপুর জেলার ঐতিহাসিক প্রাচীন নিদর্শন মাইসাহেবা মসজিদের উন্নয়নে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই অর্থ দান করে থাকেন। সমাজের সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় বিত্তশালী মানুষের দান ও অনুদানের মাধ্যমে এই মসজিদের ব্যয় নির্বাহ করা হয়। বর্তমানে মসজিদটির প্রাচীন খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ায় তা পর্যটকদেরও দৃষ্টি কাড়ছে। ফলে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তা দেখতে ভিড় করছেন। এ জন্য নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে মসজিদটি সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।
বারোদুয়ারি মসজিদ : শেরপুরের ঐতিহাসিক ও প্রাচীন ধর্মীয় নিদর্শন ‘বারোদুয়ারি মসজিদ’। শ্রীবরদী উপজেলার গড়জরিপা ইউনিয়নে অবস্থিত এ মসজিদ নিয়ে আছে বহু লোককাহিনী ও উপাখ্যান। ঐতিহাসিক বারোদুয়ারি মসজিদের নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। তবে ধারণা করা হয়, সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহের আমলে মসজিদটি নির্মিত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শতাব্দীকাল লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার পর মসজিদটি পুননির্মাণ করা হয়।

ঐতিহাসিক তথ্যমতে, প্রাচীনকালে এই অঞ্চলটি গড়জরিপা নামে খ্যাত ছিল। কামরূপের রাজার পক্ষ থেকে দলিপ সামন্ত অঞ্চলটি শাসন করতেন। এখানে তিনি একটি মাটির দুর্গও নির্মাণ করেছিলেন। ভিন্ন তথ্যমতে, জরিপ শাহ ফকির ছিলেন গড়জরিপার মুসলিম শাসক। তাঁর নামানুসারেই গড়জরিপা নাম হয়েছে। এখানে বাংলার সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহের (১৪৮৬-৮৯) একটি শিলালিপি পাওয়া গেছে। এতে তাঁর আমলেই দুর্গটি নির্মিত হয়েছিল বলে প্রবল ধারণা হয়। প্রাচীন এ মসজিদের ১২টি দরজা ছিল বলে এর নাম হয়েছে বারোদুয়ারি মসজিদ।
ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের অবসানের পর ইংরেজরা যখন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘লাখেরাজ’ (ভূমিকরের আওতামুক্ত) বাজেয়াপ্ত করে তখন বহু মসজিদ ও মাদ্রাসা বিরান হয়ে যায়। ঐতিহাসিক বারোদুয়ারি মসজিদটিও তেমনি একটি মসজিদ। দীর্ঘদিন বিরান হয়ে পড়ে থাকার পর ইংরেজ আমলে ভূমিকম্পের কারণে মসজিদটি মাটিচাপা পড়ে। মসজিদের স্থানে ঘন জঙ্গল তৈরি হওয়ায় দীর্ঘদিন তা লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। শ্রীবরদী উপজেলার ভূমি জরিপ কার্যালয়ের পিএলএ ও জামালপুরের শরীফপুর ইউনিয়নের পিঙ্গলহাটি গ্রামের বাসিন্দা মাওলানা আজিজুল হক বহু বছর চেষ্টার পর এই মসজিদ আবিষ্কার করেন। কথিত আছে, স্বপ্নযোগে আদেশ প্রাপ্ত হয়ে তিনি মসজিদটির সন্ধানে প্রায়ই গড়জরিপ করতে আসতেন। ১৯৬০-এর দশকে মসজিদের ওপর বেড়ে ওঠা বটগাছটি প্রচণ্ড ঝড়ে উপড়ে গেলে মসজিদটি দৃষ্টিগোচর হয়। তখন মাওলানা আজিজুল হক এলাকাবাসীর সহযোগিতায় খননকাজ শুরু করেন এবং মসজিদের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান। তবে খননকাজ শুরু করলেও প্রায় ১০ ফুট মাটি খুঁড়ে পানি ও কাদামাটির কারণে খনন কাজ বন্ধ করে দেন। ততদিনে মসজিদের অবয়ব সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পান তিনিসহ স্থানীয়রা। পরবর্তীতে মাটির নিচের মসজিদটির নকশা অক্ষুণ্ন রেখে সেই ভিত্তির ওপরেই আবারও নির্মাণ করা হয় বর্তমান মসজিদ। সাবেক ভিটির ওপর ১২ দরজা ও তিন গম্বুজ বিশিষ্ট নতুন মসজিদ নির্মাণ করা হয়। আগের মতোই মসজিদের সামনে ৯টি, দক্ষিণে দুটি, উত্তরে একটিসহ মোট ১২টি দরজা রয়েছে। এরপর ২০০৮ সাল থেকে মসজিদের বর্ধিতাংশের আধুনিকায়ন, দ্বিতল ভবন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করা হয়। এরইমধ্যে পাঁচতলার পাঁচটি ছাদ নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। মসজিদের দুই পাশে দুটি মিনার নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। মসজিদের প্রবেশমুখে সংযোজন করা হয়েছে নতুন ডিজাইনের নান্দনিক ১২টি দরজা। মসজিদের দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ সম্বলিত মেহরাব ও কার্নিশগুলো সহজেই সকলের নজর কাড়ে। অসাধারণ নকশা ও কারুকার্যমণ্ডিত মসজিদে এক ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে দূর-দূরান্ত থেকে আসেন মুসল্লিরা। এই মসজিদে প্রতি শুক্রবার প্রায় লক্ষাধিক টাকা দান আসে। দানের টাকায় মসজিদটির বাকি কাজ সম্পন্ন করতে আরও প্রায় চার বছর লাগতে পারে বলে জানিয়েছে পরিচালনা কমিটি। তবে সরকারি অনুদান পেলে মসজিদের কাজ দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা যাবে বলে আশা করেন মুসল্লিরা।
ঘাগড়া লস্কর জামে মসজিদ : শেরপুরের মোগল সাম্রাজ্যের স্থাপত্যকলার ঐতিহাসিক ও অনুপম নিদর্শন ‘ঘাগড়া লস্কর জামে মসজিদ’। মসজিদটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মসজিদটি ঝিনাইগাতী উপজেলার ঘাগড়া লস্কর গ্রামে অবস্থিত বিধায় কালের আবর্তে এ মসজিদের নাম ঘাগড়া লস্কর খান মসজিদ হিসেবেই পরিচিতি লাভ করেছে। মসজিদটি প্রায় সোয়া দুইশ বছরের পুরানো হলেও আজও অক্ষত অবস্থায় আছে। তবে জাতীয় যাদুঘরের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এর দেখাশোনা করলেও সঠিক পরিচর্যার অভাব ও অযত্ন-অবহেলায় তা দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
মসজিদটির বাইরে থেকে বিশাল আকার দেখা গেলেও ভিতরে খুব বেশি বড় নয়। একটি মাত্র গম্বুজের ওপর মসজিদটি তৈরি করা হয়েছে। মসজিদের উত্তর এবং দক্ষিণ পাশে রয়েছে দুটি জানালা। মসজিদের ভেতর ইমাম ছাড়া তিন সারি বা কাতারে ১০ জন করে মোট ৩০ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে মসজিদের বাইরের অংশে অর্থাৎ বারান্দায় আরও প্রায় অর্ধশতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের আকার বা পরিধি যাই হোক না কেন, মসজিদে ঢুকে নামাজ আদায় করার সময় মুসল্লিদের স্মৃতিতে দুইশ বছর পেছনের মোগল সাম্রাজ্যের অনুভূতি নাড়া দেয়।
শেরপুর জেলা সদর থেকে মসজিদটির দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। মসজিদের গায়ে যেসব নির্দশন পাওয়া গেছে সে অনুসারে ধারণা করা হয়, মোগল সম্রাটের আমলে বক্সার বিদ্রোহীদের নেতা হিরোঙ্গি খাঁর বিদ্রোহের সময় মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। তৎকালীন খান বাড়ির লোকজন এবং গ্রামের কয়েকজন ৫৮ শতক জায়গার ওপর মসজিদটি ওয়াক্ফ করে দেয়। এর মধ্যে মসজিদটির মূল ভবন ও বারান্দা বা বর্ধিত জায়গা রয়েছে ১৭ শতকের ওপর এবং ৪১ শতকের ওপর জমিতে রয়েছে কবরস্থান। মসজিদটির দরজার ওপর খোদাইকৃত মূল্যবান কষ্টিপাথরে খোদাই করে আরবি ভাষায় এর প্রতিষ্ঠাকাল উল্লেখ করা ছিল হিজরী ১২২৮ বা ইংরেজি ১৮০৮ সন। তবে কয়েক বছর আগে মূল্যবান ওই কষ্টিপাথরটি চুরি হয়ে গেছে।
মসজিদটির গঠনপদ্ধতি ও স্থাপত্য কৌশল শিল্পসমৃদ্ধ ও সুদৃশ্য। এক গম্বুজবিশিষ্ট ওই মসজিদের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ উভয়দিকেই সমান। মসজিদে দরজাও রয়েছে মাত্র একটি। এর ভেতরের অংশ ৩০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩০ ফুট প্রস্থবিশিষ্ট। এর ভিতরে রয়েছে দুটো সুদৃঢ় খিলান। মসজিদের মধ্যখানে বড় গম্বুজের চারপাশে ঘিরে ছোট-বড় দশটি মিনার। এরমধ্যে চারকোনায় রয়েছে চারটি। ভেতরে মেহরাব ও দেয়াল অঙ্কিত রয়েছে বিভিন্ন কারুকাজের ফুলদানী ও ফুল। স্থানীয়রা জানান, মাঝে-মধ্যে ঢাকা জাতীয় যাদুঘর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের লোকজন এসে মসজিদের ধোয়া-মোছা এবং সংস্কার কাজ করে গেলেও তা দায়সারাভাবে করে যায়। গত প্রায় ১৫ বছর আগে জাতীয় জাদুঘরের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটির দায়দায়িত্ব গ্রহণ করলেও একজন কেয়ারটেকার নিয়োগ, একটি সতর্কবাণী লাগানো ও বছরে একবার রং করা ছাড়া আর কোনো ভূমিকা পালন করেনি। ধীরে ধীরে মসজিদটির মেঝে দেবে যাচ্ছে, দেয়ালেও ফাটল ধরছে। দ্রুত সংস্কারের ব্যবস্থা না নিলে কালের সাক্ষী এ মসজিদটি একসময় নীরবেই হারিয়ে যাবে-এমন আশঙ্কা স্থানীয়দের। এজন্য মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন এ মসজিদটি রক্ষায় শিগগিরই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগসহ স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহল।
প্যানেল/মো.








