ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া

মাগুরার রাজবাড়ি : পুরাকীর্তি সংরক্ষণযোগ্য

সঞ্জয় রায় চৌধুরী, মাগুরা

প্রকাশিত: ১৯:১৯, ৯ জানুয়ারি ২০২৬; আপডেট: ১৯:২৬, ৯ জানুয়ারি ২০২৬

মাগুরার রাজবাড়ি : পুরাকীর্তি সংরক্ষণযোগ্য

দক্ষিণ পঞ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার খ্যাত ছোট জেলা মাগুরা। আয়তনে মাগুরা ছোট জেলা হলেও মাগুরার অতীত ইতিহাস রয়েছে গৌরবময়। মাগুরার মহম্মদপুর এক কালের বিশাল প্রমত্তা মধুমতির তীরে আবস্থিত। মহম্মদপুরে আনুমানিক ১৬৮৭-১৬৮৮ সালে স্বাধীনচেতা রাজা সীতারাম রায়ের হাত প্রজাপত্তন শুরু হয়। মহম্মদপুর ছিল তার রাজ্যের রাজধানী। রাজা সীতারাম রায় বর্তমানে না থাকলেও তার স্মৃতিকে ধারণ করে রয়েছে মহম্মদপুরের মাটি। একদিন যে এক রাজ্যের রাজধানী ছিল কালের পরিক্রমায় আজ তা কেবলই স্মৃতি। এক কালের জাঁকজমকপূর্র্ণ পরগনা এখন কেবলই স্মৃতি আর চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। ইটের ভাঙা অবকাঠামোর চিহ্ন। কিছু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে আর কিছু অতীতকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, যা জানান দিচ্ছে কয়েশ বছর পূর্বে এখানে এক স্বাধীনচেতা রাজার রাজধানী ছিল। মাগুরা জেলার রয়েছে অনেক প্রাচীন স্থাপনা এর মধ্যে স্বাধীনচেতা রাজা সীতারামের রাজবাড়ী ও রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ ও রামসাগর, দুধ সাগর, সুখসাগরসহ বড় বড় দীঘিগুলো অতীতের স্মৃতিকে বহন করে আজও কালের সাক্ষী হয়ে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, যা বর্তমান প্রজন্মকে তাদের গৌবরময় অতীতের কত স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। প্রাচীর রাজবাড়ী কাছারির বাড়ির ভগ্নদশা অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এক কালে যে রাজবাড়ী শত শত মানুষের পদচারণায় মুখরিত হতো। কালের পরিক্রমায় আজ তা মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। হারিয়ে গেছে সব জৌলুস। শুধু কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভাঙা বাড়ির আবকাঠামোগুলো। প্রতিদিন বহু দর্শনার্থী এই ভগ্নদশা রাজবাড়ী ও নতুন সংস্কার করা কাছারি বাড়ি দেখতে আসেন। স্বাধীনচেতা রাজার স্মৃতিচিহ্ন দেখে স্মৃতিমন্থনের চেষ্টা করেন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কাছারি বাড়িটি সংস্কার করলেও রাজবাড়ীটি ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। ফলে কাছারীবাড়ি কালে সাক্ষী কিছু স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজবাড়ির কাছারি বাড়ির ভগ্নদশা অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয়    -জনকণ্ঠ

দর্শনার্শীদের কয়েক শত বছর পূর্বে কারুকার্যময় কাছারি বাড়ির সৌন্দর্য এবং লোহার খিলেন ছাড়া বাড়ি সকলকে অবাক করে। সেই সময় শুধু ইট সুড়কি চুনের গাঁথুনি ছিল। আর সেই সময়ের শিল্পীদের সূক্ষ্ম কারুকাজ সকলকে অবাক করে। মাগুরার মহম্মদপুরে রাজা সীতারাম রায় মধুমতি নদীর তীরে রাজ প্রসাদ, কাছারি বাড়ি নির্মাণ করেন। খনন করেন বিশাল বিশাল দীঘি, যা কালের সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। রাজবাড়ীটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। শুধু ঠিকে রয়েছে ইট সুড়কির কিছু ইটের গাঁথুনি। কাছারি বাড়িটি ধ্বংস হলে তা রক্ষার্থে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সংস্কার করেছে। ফলে কাছারি বাড়িটি নতুন রূপ পেয়েছে। সেই সময়ের সূক্ষ্ম কারুকাজ সকলকে মুগ্ধ করে। নতুন প্রজন্মের সকলকে বিমোহিত করে। অনেকে কাছারি বাড়ি দেখতে গিয়ে ছবি তোলেন। মনের অজান্তে রাজাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব দিল্লির মসনদে আরোহণের পূর্বে আনুমানিক ১৬৫৮ সালে রাজা সীতারাম রায ভারতের মুর্শিদাবাদ জলার ফতেশিং এলাকায় মহীপুতপুরের এক কায়স্ত পরিবারের জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম উদয়নারায়ন মুর্শিদাবাদের নবাবের একজন তফসিলদার ছিলেন। মাতা দয়াময়ী দেবী একজন সাহসী মহিলা ছিলেন। শৈশবে একদল ডাকাতদের মোকাবিলা করেছিলেন। সে সময় থেকে রাজা সীতারাম রায় তার সাহসিকতার প্রদান দিতে থাকেন। তার নামানুসারে বালিদিয়া ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম দয়াময়ী তলা রাখা হয়েছে। রাজা সীতারাম রায়ের পিতা উদয়নারায়ন তফসিলদার একটি তালুকের মালিক হলে সেখান থেকে রাজা সীতারাম রায় ধীরে ধীরে ভূষনার কর্তৃত্ব লাভ করেন। রাজা সীতারাম রায় অনুমানিক ১৬৮৭-১৬৮৮ সালে প্রজাপত্তন শুরু করেন। রাজা সীতারাম রায় তার জমিদারি পাবনা জেলা দক্ষিণভাগ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত এভং নদীয়া জেলার পূর্বপ্রাপ্ত থেকে বরিশাল জেলার মধ্যভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। মাগুরার মহম্মদপুর পরগনাটি মধুমতি নদীর তীরে আবস্থিত বলে নদী পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো বলে একজন স্বাধীনচেতা রাজা এই এলাকাটিকে রাজধানীর করার জন্য পছন্দ করেন। রাজার মতো চৌকস বাহিনী গড়ে তোলেন। ধীরে ধীরে তার বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি গোলন্দাজ বাহিনী চালু করেন। মেনাহাতি নামে তার একজন সেনাবাহিনী প্রধান ছিলেন।

রাজা সীতারাম রায় না থাকলেও তার স্মৃতিকে ধারণ করে রয়েছে দীঘি এখনও অপরূপ সৌন্দর্য

এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল। নৈরাজ্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখায় সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে রাজা উপাধী প্রধান করেন। নলদী, সাতৈর, ভাঁটি অঞ্চলে রাজা হিসেবে শপথ লাভের পর সীতারাম রায় মধুমতি তীরবর্তী হরিহর নগরে একটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন। পানীয় জলের অভাব পূরণের জন্য তিনি বেশ কয়েকটি দীঘি খনন করেন। রামসাগর, সুখনাগর, কুষসাগার আজও কালের সাক্ষী হয়ে বিদ্যমান রয়েছে। তিনি মাগুরার মহম্মদপুরে রাজধানী স্থাপন করেন। এখানে তিনি রাজবাড়ী, কাছারি বাড়ি, মন্দির নির্মাণ করেন। যেগুলো আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দোল মন্দিরটি আজও রয়েছে। দুর্দান্ত প্রতাপের সঙ্গে রাজত্ব পরিচালনা করা কালে তিনি প্রভাবশালী হওয়ার কারণে নবাবের খাজনা প্রদান বন্ধ করে দেন এবং নিজেকে স্বাধীন রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন এবং মুঘলদের সঙ্গে বিরোধ চরমে ওঠে। মুঘল ফৌজদার বকস আলী ভূষনা আক্রমণ করেন এবং মধুমতি নদীর তীরে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। সম্মুখযুদ্ধে টিকতে না পেরে রাজা সীতারাম রায় তার দুর্গে ফিরে আসেন। সেনাপতি মেনাহাতি যুদ্ধ চালিয়ে যান। সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি মেনাহাতি ৭ দিন যুদ্ধ চালিয়ে যান এবং তিনি বন্দি হন। কথিত আছে নাটোর রাজার সেনাপতি দয়াময় রায় রাজা সীতারামকে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যান্। দিঘপতিয়ায় যাবার কালে পথিমধ্যে নাটোর রাজবাড়ীর কারাগারে তাকে বন্দি রাখা হয়। রাজা সীতারামকে যে কারাগারে রাখা হয় সেটি আজও সেখানে আছে। মুর্শিদাবাদে কয়েক মাস বন্দি খাকার পর নবাব তাকে মৃত্যু দণ্ড দেন। তবে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা কাহিনী লোকমুখে প্রচলিত কয়েছে। এই কাহিনী নিয়ে অনেক কথা প্রচলিত আছে তিনি নিশ্চিত মৃত্যু জেনে আংটির মধ্যে রাখা নিয়ে আত্মহত্যা করেন। আবার অনেকে বলেন, তার থননকৃত রামসাগর দীঘিতে সপরিবারে নৌকায় ওঠে নৌকায় কুঠার আঘাত করেন নৌকা তলিয়ে পরিবারসহ মারা যান। রাজা সীতারাম রাম ও তার সেনাপতি মেনাহাতি নিয়ে মাগুরায় নানা কল্পকাহিনী প্রচারিত রয়েছে। প্রায় ৩শ বছর অগের তার মৃত্যু হলেও আজও মাগুরাবাসী তার স্মৃতি রক্ষাতে কাজ করে চলেছে। তার আবদানকে স্মরণ করে চলেছেন। রাজবাড়ীটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। দ্বিতল রাজবাড়ীর কোনো চিহ্ন নেই। এখানে ভবন ও কক্ষ ছিল। যেখানে কাজ পরিবারের সদস্যরা বসবাস করতেন। তার কোনো চিহ্ন মাত্র নেই। শুধু ভগ্ন কিছু গাঁথনি রয়েছে মাত্র। যা থেকে অনুমান করা হয় এখানে দ্বিতল ভবন ছিল। সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ার মুহূর্তে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কাছারি বাড়িটি সংস্কার কাজ করেছে। মাগুরাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে রাজা সীতারাম রায়ের কাছারি বাড়িটি সংস্কার করে আগের সুন্দর অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সংস্কার করা হয়েছে একটি বিরাট দৌল মঞ্চেটি। কাছারি বাড়িটি সংস্কার করার পূর্বে বহু কিছু চুরি হয়েছে। নেই কোনো জানালা-দরজা। শুধু ইট সুড়কির অবকাঠামো রয়েছে। অনেকে খুলে নিয়েছে বলে প্রচলিত রয়েছে। অনেকে ইট কাঠ ইত্যাদি পর্যন্ত নিয়ে গেছে। পর্যন্ত নিয়ে গেছে। কথিত আছে রাজবাড়ী ও কাছারির মূল্যবান জিনিসপত্র বর্তমানে কিছুই নেই। বড় বড় দীঘিগুলো অবস্থা সেই রূপ।

নেই কোনো জানালা-দরজা শুধু ইট সুড়কির অবকাঠামো রয়েছে    -জনকণ্ঠ

রাজার অনেক জায়গা জমি বেদখল হয়ে গিয়েছে। অনেক কাগজপত্র তৈরি করে জমিজমা নিজেদের করে নিয়েছেন। তবে কয়েক বছর রাজবাড়ীটি রক্ষার তেমন কোনো অবস্থা নেই। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে এক শ্রেণির লোক রাজবাড়ী কাছারি বাড়ির সব কিছু রাতের বেলায় চুরি করে নিয়ে গেছে। সেই সময় কাছারি বাড়ি এলাকায় দোকানপাট বসে অন্য সময় বসে না। উৎসবের মৌসুমে লোকসমাগম বেশি হলেও বর্তমানে প্রতিদিন লোকসমাগম তেমন বেশি নয়। তবে এখানে কোনো পিকনিক স্পষ্ট নেই। নেই কোনো রান্নার জায়গা বা সেড। নেই কোনো বসার স্থান। ফলে দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকদের বিপাকে পড়তে হয়। ফলে ব্যথিত মনে মানুষ দেখে ফিরে যান। কোনো স্থায়ী দোকান গড়ে উঠেনি বা কর্তৃপক্ষ সে ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। শিশুদের বিনোদনের জন্য কোনো ব্যবস্থা এখানে নেই। নেই নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার জন্য স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়নি। মাগুরা জেলায় হাতেগোনা কয়েকটি দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এর মধ্যে রাজা সীতারারাম বায়ের রাজবাড়ী ও কাছারি বাড়িটি অন্যতম। মাগুরা জেলা রাজা সীতারাম বায়ের কাচারী বাড়ি ছাড়া কোন পুরাকীর্তি সংক্ষণ করা হয়নি। মহম্মদপুরের একটি এলাকা রাজবাড়ী নামে এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত। এখানে অনেকে নতুন নতুন বাড়ি তৈরি করেছেন। নামফলকে অনেকে লিখেছেন রাজা সীতারাম মডেল টাউন, যা রাজা সীতারাম রয়েকে শ্রদ্ধা জানানোর একটি উপায়। অন্যদিকে জেলার পুরাকীর্কিগুলোতে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এজন্য শুধু মাত্র প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও পর্যটন দপ্তরের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা সেদিকে দৃষ্টি দেবেন কিনা সেটা সময়ই বলতে পারবে। 

প্যানেল/মো.

×