ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৪ মার্চ ২০২৬, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২

লাইফস্টাইল বিভাগের সব খবর

আজও অধিকারহীনা

আজও অধিকারহীনা

সমাজের সমসংখ্যক নারী তাদের অধিকারের মাত্রায় কেন পিছিয়ে? সেই উত্তর না মেলা ও এক রুদ্ধতার জাল। দেশ উন্নয়ন কর্মযোগে এগিয়ে যাচ্ছে। দৃশ্যমান হতেও সময় ক্ষেপণই হয় না। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিবেদন, প্রতিবাদ, মিছিলে নতুন করে জেগে উঠছে অধিকারহীনতার দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ। যা কোনোভাবেই এড়ানো কিংবা ঠেকানো অসম্ভবের পর্যায়। বিভিন্ন সময় আওয়াজ উঠছে সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে স্বৈরাচারী শাসনে পতন হয়েছে। তাও এক বছর অতিক্রম করার দুঃসহ এক ক্রান্তিকাল। যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সেখানে পুরানো অপসংস্কার যেন এখনো জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে। কাঠামোর গভীরতম গহিন শিকড়ে। সেটারই কোনো মূল উৎপাটন কেন সম্ভব হচ্ছে না তা খতিয়ে দেখার সময়ও দ্রুতগতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। কাজের কাজ কিংবা প্রচলিত সমস্যা বিপদশঙ্কুল রাস্তা আজও অনধিগম্য এক যাত্রাপথ। নতুন অন্তর্বর্তী সরকারও যথাযোগ্য কোনো সমাধান দিতে বারবার পিছু হটছে। তাহলে তাদের জন্য অবারিত, নির্বিঘ্ন হবে?  সম্মিলিত হয়ে বিভিন্ন নারী সংগঠন পুনরায় তাদের ন্যায্যতা, আইনি অধিকার পাবার বিষয়টি সামনে আনতে এক প্রকার বাধ্যই হচ্ছেন। এমন আশঙ্কা ও প্রকাশ করা হচ্ছে অধিকারের বিষয়টিই নাকি এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে?  সেই পুরানো কথা নারীদের অধিকার আদায়ের ব্যাপার নয় মূল বার্তাটিরই নড়বড়ে অবস্থা। আবারও সমস্বরে দাবি উঠছে আইন আর সংবিধান যদি নারীর ন্যায্য অধিকার দিতে পিছু হটে তাহলে শেষ অবধি স্বয়ং রাষ্ট্রকেই তেমন দায়বদ্ধতা নিতে হবে বলে প্রতিবাদী এমন আলোচনায় দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণাও আসে। সম্মিলিত এমন কর্মশালার আয়োজক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ।’ ইউএনডিপি জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির পক্ষ থেকে সহযোগিতার বিষয়টিও উঠে আসে। বিশেষ এমন আলোচনায় উঠে আসে বিষয় বিশ্বের বিভিন্নস্থানে দৃশ্যমান হলেও অধিকার আদায়ের মহৎ কর্মযোগটি কেন যে সংশ্লিষ্টদের জীবন ও কর্মে অবারিত হচ্ছেই না। তাই রাষ্ট্রকেই উদ্যোগ নিয়ে অমীমাংসিত দীর্ঘকালীন সমস্যাকে অতি অবশ্যই শুধু নজরে আনা নয় সমূলে উপড়ে ফেলা ও সময়ের অপরিহার্যতা। নারীরা প্রতিবাদী হয়ে তাদের কাক্সিক্ষত সমঅধিকার যা কিনা আইন, রাষ্ট্র, সমাজ দিতে কার্পণ্য না করলে ভেতরের অপশক্তি যারা বিভেদ বৈষম্য জিইয়ে রাখতে এগিয়েই থাকে তাদের প্রতি কঠোর বাণী ও আছে এই সম্মেলন থেকে। উত্তরাধিকার আইন নিয়েও আপত্তি তোলা হয়। সেখানে সমতাকে ন্যায্যতা দিয়ে অধিকার, স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়। বারবার হয়ে আসা সেই একই কঠিন বিধিবদ্ধ অব্যবস্থা যা অধিকারের মাঝখানে প্রাচীরসম ব্যবধান ফারাককে নিত্যনতুন অবস্থায় তৈরি করতেও অদম্য গতিতে ছুটে চলেছে। নারীর মৌলিক অধিকারের প্রতি আর কোনো আপোস কিংবা সমঝোতা একেবারেই নয়। দৃশ্যমান অবকাঠামো শিল্প প্রযুক্তির অবাধ প্রসার ঘটলেও মান্ধাতা আমলের ঐতিহ্যিক মানসিকতা যা সময়ের গতি প্রবাহে নিত্যই পরিবর্তনের আহ্বান দিয়ে যাচ্ছে সেভাবেই নারী সমাজকে কর্ম এবং মানসিকতায় দ্রুততার সঙ্গে গ্রহণ করার দাবিও আসে সম্মিলিত নারী সম্মেলন থেকে। নাগরিকে পাঁচ মৌলিক অধিকারই নারী জাতির প্রাপ্যতা। কোনো একটা লঙ্ঘিত হলেই মানুষের মর্যাদায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে যায়। তাই অধিকার স্বাধীনতার সব ক্ষেত্রে নারী অংশ নেওয়া সময়ের দাবি। 

উদ্যমী ও পরিশ্রমী  হোসনে আরা

উদ্যমী ও পরিশ্রমী হোসনে আরা

যারা উদ্যমী ও পরিশ্রমী কোনো বাধা-বিপত্তিই তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত প্রতিবন্ধী দশম শ্রেণির ছাত্রী হোসনে আরা। সেই ছোট বেলা থেকেই মেধাবী সে। নানা সংগ্রাম আর দারিদ্রতার কাছে হার না মেনে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। সে স্বপ্ন দেখে একদিন উচ্চ শিক্ষিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে। দেশের প্রতিবন্ধী মানুষসহ গরিব আর অসহায় মানুষের জন্য কাজ করবে। কিন্তু তার এই স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দরিদ্রতা। আদৌ কি তার এই স্বপ্ন পূরণ হবে? এমন চিন্তায় দিন কাটছে তার এবং তার পরিবারের মানুষদের। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মহিধর গ্রামের কিশোরী হোসেনে আরা। জন্ম থেকেই দুই পা ও একটি হাত অচল নিয়েই বেড়ে উঠেছে। তবু থেমে যায়নি তার স্বপ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে অন্যদের আলোর পথ দেখাতে চায় সে। আর সেই স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে নিজের জীবনের সবকিছু প্রায় ত্যাগ করেছেন তার বাবা দিনমজুর হোসেন আলী। শুধু সন্তানকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত ও তার চিকিৎসার জন্য বাড়ি-ভিটার ১৬ শতক জমি বিক্রি করেছেন। তিল তিল করে গড়ে তুলছেন মেয়ে হোসনে আরাকে। নিজের কাজের ক্ষতি করে প্রতিদিন বাইসাইকেলের পেছনে বসিয়ে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মেয়েকে তিন কিলোমিটার দূরের স্কুলে নিয়ে যান এবং নিয়ে আসেন। হোসনে আরার শরীরের  একপাশে অচল। কেবল বাম পাশ এবং  হাতটিই তার একমাত্র ভরসা। জন্মের পর থেকেই দারিদ্র্যতার মধ্যে কাটালেও তার সুস্থতার জন্য বাবা-মা শহর গ্রাম ও রংপুর মেডিকেলের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছিলেন। কিন্তু এত চিকিৎসায় ফেরেনি তার শারীরিক সক্ষমতা। তবুও হোসনে আরা ও তার পরিবার থেমে থাকেনি। ছোট বেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ হোসেনে আরার। প্রতিটি ক্লাসেই মেধার স্বাক্ষর রাখতো। সন্তানের পড়াশোনার আগ্রহ দেখে বাবা তাকে তিন কিলোমিটার দূরের সিংগীমারী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। সেখানেই প্রতি ক্লাসে ভালো রেজাল্ট করে আসছে। বর্তমানে হোসনে আরা সিংহীমারী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে বাবা মো. হোসেন আলী নিজের জীবিকাও বিসর্জন দিয়েছেন। আগে ভ্যান চালালেও মেয়েকে বারবার স্কুলে ও প্রাইভেটে আনা-নেওয়া করার প্রয়োজনে তাও ছেড়ে দিয়েছেন। এখন অন্যের জমিতে বর্গাচাষ ও দিন মজুরি করেই চলে তাদের সংসার।  এলাকাবাসীরা জানায়, ছোটবেলা থেকেই হোসনে আরাকে দেখি সে অসুস্থ। আমরা চাই সবাই যেন তাকে সহযোগিতা করে। সে যেন লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। নিজের কাজ নিজে করতে পারে। তার সহপাঠীরা বলেন, হোসনে আরা আমাদের বান্ধবী। সে যে প্রতিবন্ধী তাকে আমরা কখনোই বুঝতে দেই না। তার সঙ্গে আমরা হাসিখুশি চলাফেরা করি। স্কুলের কেউ তাকে খারাপ চোখে দেখে না। বাবা হোসেন আলী মা-আলুপা বেগম জানায় মেয়ের জন্য বাইরে গিয়ে কাজ করার সুযোগ পাই না। ওকে বার বার আনা-নেওয়া করতে হয়। সংসার চালানো এখন খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার থেকে যদি কোনো সহায়তা পাওয়া যায় তাহলে খুব উপকার হতো। শিক্ষার্থী হোসনে আরা জানায়, আমি বড় হয়ে শিক্ষক হতে চাই। আমার পড়াশোনা করতে ভালো লাগে। একটি অটোমেটেড (মোটরচালিত) হুইলচেয়ার থাকলে নিজেই স্কুলে যাতায়াত করতে পারতাম। বাবার কষ্টটা একটু কমতো। সিংহীমারী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক চালোক্য রায় জানায় হোসনে আরা একজন মেধাবী ছাত্রী। প্রতিবন্ধী হলেও তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ আছে। তার বাবা অনেক কষ্ট করে মেয়েকে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসিয়ে স্কুলে নিয়ে আসে। আমরা চেষ্টা করছি সে যেন আরও ভালোভাবে পড়াশোনা করে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান জানায় হোসনে আরা আমাদের স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল ৪ বছর আগে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সে হাঁটতে পারে না। ক্লাসের সহপাঠীরা তাকে সহযোগিতা করে। স্কুল থেকে তাকে সব রকম সহযোগিতা দেওয়া হয়। 

ঘুচল ডাঙ্গাপাড়ার নারীদের অভাব

ঘুচল ডাঙ্গাপাড়ার নারীদের অভাব

অভাবমুক্ত জীবনযাপন একটি সুন্দর স্বপ্ন। প্রত্যেকেই চায় অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে এবং তার পরিবারের জন্য ভালো জীবনযাপন নিশ্চিত করতে। অভাব ঘুচানোর প্রধান পথ হলো কঠোর পরিশ্রম সঠিক পরিকল্পনা এবং সততার সঙ্গে আয়ের উৎস বৃদ্ধি করা। দক্ষতা উন্নয়ন সঞ্চয় প্রবণতা অপচয় রোধ এবং সময়ানুবর্তিতা আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করে। এছাড়া সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস ও শুকরিয়া আদায় মনে প্রশান্তি আনে এবং অভাব দূরীকরণে মানসিক শক্তি জোগায়। দেশের উত্তরাঞ্চলের এক সময় মঙ্গাপীড়িত এলাকার মানুষজনের অভাবের কথা আমরা কমবেশি সকলে অবগত। এই মঙ্গাপীড়িত মানুষজন কিভাবে অভাবকে মোকাবিলা করেছে এমন একটি বাস্তবতা কল্পকাহিনীকেও হার মানায়।  সাদেকা আক্তার একজন গৃহবধূ। স্বামীর ঘরের অভাবে তিনি আর হাত পা গুটে বসে থাকতে পারেননি। সংসারের অভাবের সঙ্গে লড়াই করে নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নে তিনি একা দেখেননি। সঙ্গে গ্রামের অভাবী নারীদের নিয়ে জোটগতভাবে সেই সংসারের অভাবের সঙ্গে লড়াই করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এ জন্য সাদেকা নেতৃত্বের গড়ে তোলা হয় একটি সমিতি। সেই সমিতির মাধ্যমে অভাব ঘুচেছে গ্রামের অন্যান্য নারীদেরও। উত্তরজনপদের বাহের দ্যাশ খ্যাত রংপুর অঞ্চলের তারাগঞ্জ উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে এই সাদেকা আক্তারের নেতৃত্বে নিজেদের অভাব দূর করে এগিয়ে চলেছেন এক ঝাঁক নারী।  সাদেকার জীবনের গল্পটা ছিল অন্যরকম। ২০০০ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয় সাদেকা আক্তারের। শ^শুরবাড়িতে অভাব লেগেই থাকতো। কখনো খাবার জুটতো, কখনো জুটতো না। অভাব থেকে বাঁচতে ২০০৩ সালের দিকে গ্রামের নারীদের নিয়ে সমিতি গঠনের উদ্যোগ নেন সাদেকা। সিদ্ধান্ত নেন সপ্তাহে মাত্র ১০ টাকা করে জমা করবেন বলে। সাদেকা প্রথমে নিজে হস্তশিল্প পণ্য তৈরি প্রশিক্ষণ নেন তারাগঞ্জ পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি কেন্দ্র থেকে। তারপর সেই প্রশিক্ষণ দেন সমিতির অন্য সদস্যদের। এরপর জমা করা টাকা দিয়ে সেলাই মেশিন কিনে শুরু করেন পোশাক তৈরির কাজ।  এ বিষয়ে সাদেকা আক্তার বলেন, বর্তমানে আমাদের সমিতিতে প্রায় দুইশ জনের মতো সদস্য। প্রত্যেক সদস্যের জমা করা টাকা দিয়ে আমরা সেলাই মেশিন কিনে তৈরি করছি বিভিন্ন হস্তশিল্প। মেশিনে মেশিনে কাজের পাশাপাশি হাতের এমব্রয়ডারি কাজের ফাঁকে ফাঁকে করতেছি। আবার মেশিনের এমব্রয়ডারি কাজও চালাইতেছি।  রংপুর জেলার তারাগঞ্জ উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে সাদেকার নেতৃত্বে তৈরি হয় বেগম রোকেয়া মহীয়সী নারী মহিলা উন্নয়ন সমিতি। শুধুই কাপড় সেলাই নয়, গ্রামের শতাধিক নারী নানান পেশায় যুক্ত। কেউ সেলাইয়ে আবার কেউ কাপড়ে নকশা করায় আবার কেউ গরু পালন বা মাছ চাষ করে সফল হয়েছেন। স্থানীয় হাটসহ আশপাশের বিভিন্ন হাটে তাদের তৈরি পোশাক, ব্যাগ ও নকশি কাথার যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। স্থানীয়রা জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারাও বলছেন, এই গ্রামের প্রায় শতভাগ শিশু বিদ্যালয়ে যায় এবং বাল্যবিবাহ বন্ধে গ্রামের বাসিন্দারা সচেতন। এমনকি এ গ্রামে অপরাধ সংগঠনের হারও কম।  সাদেকা সমিতির এক নারী আঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, সমিতির কারণে এলাকায় কোনো নারী নির্যাতন নেই। বাল্য বিবাহ নেই। আরেকজন নারী আয়শা সিদ্দিকা বলেন, মেশিন চালিয়ে সংসারের অনেক উন্নতি হয়েছে। গত ৬/৭ বছর ধরে এই মেশিনে বিভিন্ন কাপড়ে নকশা তৈরি করে আধা-পাকা বাড়ি দিয়েছি। এছাড়া আমার স্বামীকে একটি ভ্যান কিনে দিয়েছে। সমিতির সদস্যরা যে টাকা জমান তা পাঁচ বছর পর পর নিজেরা ভাগ করে নেন। সেই টাকা দিয়েই তারা গরু ছাগল পালন ও পুকুরে মাছ চাষ করেন। এছাড়া সমিতির সঞ্চয়ের টাকায় ১০টি গরু কেনা হয়েছে যেগুলো বর্গা দেওয়া আছে। এছাড়া গ্রামের ৫০ শতক জমি বন্ধক নিয়ে ধান ও কলা চাষ করা হয়েছে। একটি পুকুর ইজারা নিয়ে বিভিন্ন জাতের মাছ চাষ করা হচ্ছে। যা পরে বাজারজাত করে সমিতির খাতে জমা দেওয়া হয়। এছাড়া সেলিই মেশিন ক্রয় করা হয়েছে ২০টি। এখন সমিতির সদস্য ১৩০ জন নারী। পাশাপাশি সমিতির নারীদের নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে অবদান রাখায় স্বীকৃতি স্বরূপ রংপুর বিভাগীয় পর্যায়ে জয়িতা নির্বাচিত হয়েছিলেন সাদেকা।

যুদ্ধকালে সহযোগী ভূমিকা

যুদ্ধকালে সহযোগী ভূমিকা

উত্তাল মার্চ। স্বাধীনতার মাস। বছর ঘুরে এ মাস এলেই দলে দলে মহান মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও অংশগ্রহণের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠে। আরও ভেসে উঠে পাকি হায়েনা দলের এবং তাদের সহায়তাকারী আলবদর আল সামস ও রাজাকার বাহিনীর নিষ্ঠুর নির্মম বর্বরতা দৃশ্য। দলে দলে ভীত সন্ত্রস্ত নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ বনিতা ও শিশুরা দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সেই দৃশ্য এখনো যাটোর্ধ্ব বয়সী মানুষের চোখের সামনে ভেসে উঠে। বিশেষ করে সেই সময়ে শিশু ও নারী এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের কষ্ট ছিল সবচেয়ে বেশি। ইতিহাসের নৃশংসতম এ গণহত্যা, নারী নির্যাতন এবং জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে বাংলার জমিন ছারখাড় করে দেওয়া স্বাধীন বাংলাদেশে অভ্যুদয়ের সাক্ষী।  উত্তাল মার্চের এই দিনে মনে পড়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাফিনা লোহানীর কথা। একাত্তরের মার্চে তিনি ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। তিনি জীবদ্দশায় রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীতে পাকি হায়েনা দলের লালসা ও লাঞ্ছনার শিকার নারীদের একত্রিত করে সামাজিকভাবে এবং মমতাময়ী মায়ের দরদে লালন পালন করেছেন। স্বাধীনতার চার দশক পরেও সমাজে তার ছিলেন যেন অবাঞ্ছিত। লাঞ্ছনা, ধিক্কার ও তিরস্কার ছিল তাঁদের অনেকের নিত্যসঙ্গী। এসব নারী ছিলেন সমাজে চরম অসহায় অবস্থায়। তাদের মধ্যে রাহেলা বেগম, হাজেরা বেগম, কমলা বানু, হামিদা বেগমসহ প্রায় ১৫ জন নারী যারা স্বাধীনতার পর সমাজে কোথাও ঠাঁই পায়নি। স্বামী কিংবা বাবা-মা কেউ তাদের ঘরে তুলে নেয়নি। অন্যের বাড়ি কাজ করে খাবেন, তা-ও সম্ভব হয়নি, কেউ কাজও দিতে চায়নি তখন। তারা নিজ এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন দূরে। ঠাঁই নিয়েছিলেন রেললাইন কিংবা ওয়াপদা বাঁধের পাশের সরকারি জায়গায়। ছোট একটি কুঁড়েঘরে থেকেছেন অনেক দিন। খুব কষ্টে কাটছিল দিন। সদ্য স্বাধীন দেশে তারা নিজেদের লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। এজন্য তাদের চরম আর্থিক কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। কখনো কখনো উপোষ করতে হয়েছে। কয়েক বছর পর হঠাৎ করেই সাফিনা লোহানী খুঁজে বের করেন তাদের। এই চরম দুঃসময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাফিনা লোহানী তাদের পাশে এসে দাঁড়ান। খুঁজে খুঁজে বের করেন ১৫ জন নারীকে। তিনি মায়ের স্নেহ দিয়ে বুকে তুলে নেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়ে গিয়ে তাদের পরিচয় করিয়ে দেন। অভাব দূর করতে বিভিন্নভাবে টাকা সংগ্রহ করে তাদের মধ্যে বিতরণ করেছেন তিনি। তাদের সমাজে প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেন। আর্থিক সাহায্য করে তাদের স্ব-স্ব মর্যাদায় সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীতে তাদের বীরঙ্গনা নারী হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তারা পরিচয় পেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। সেই মমতাময়ী সাফিনা লোহানী, যিনি তালিকাভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, তার স্মৃতির প্রতি অতল শ্রদ্ধা এই উত্তাল মার্চে।  তিনি উত্তরণ মহিলা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। ছিলেন নারী নেত্রী। নারীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য, অসাধারণ। তাঁর প্রধান কাজ ছিল প্রতিষ্ঠানে নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। তিনি করেছেনও। শিক্ষিত অথচ বেকার এবং অসহায় নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য তিনি কাজ করেছেন। অদম্য সাহসী এই নারী জীবন চলার পথে নানা ঘাত-প্রতিঘাতসহ্য করেছেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মনোবল না হারিয়ে সামনে এগিয়ে গেছেন। তিনি উন্নয়ন কর্মী হিসেবে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে একাধিক সম্মাননা এবং পুরস্কার পেয়েছেন।  তাঁর স্বামী ছিলেন সিরাজগঞ্জ তথা উত্তারঞ্চলের প্রখ্যাত সাংবাদিক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম চৌধুরী। আমিনুল ইসলাম চৌধুরী তৎকালীন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্রনেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের মধ্যে তরুণ সংগঠক। একাত্তরের ৭ মার্চের পর আমিনুল ইসলাম চৌধুরী সিরাজগঞ্জে ফিরে এসে সাংগঠনিক কাজ শেষ করে চূড়ান্ত মুহূর্তে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে চলে যান গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাহুকায়। দুস্তর রাস্তায় গরু গাড়ি ছিল একমাত্র বাহন। সেখানে স্ত্রীকে রেখে তিনি যান মুক্তিযুদ্ধে। সিরাজগঞ্জের ভাটপিয়ারির যুদ্ধে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় বাড়ি ফেরেন। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী তাকে সেবা দেন এবং ক্রমান্বয়ে সুস্থ হয়ে উঠেন। সাফিনা লোহানী শুধু স্বামীকেই নয় রণাঙ্গনে ক্লান্ত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় এবং সেবা দিয়েছেন। তিনি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার খান সোনতলা গ্রামের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ফতেহ লোহানী, বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানের খ্যাতনামা পরিচালক টিভি ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানী এবং সাংবাদিক নেতা ও কলামিস্ট কামাল লোহানী পরিবারের সন্তান। 

আলো-আঁধারীর মায়া

আলো-আঁধারীর মায়া

সামনেই ঈদ। রোজার ব্যস্ততার মাঝেও চলছে ঈদের কেনাকাটা। সেই সাথে চলছে নিজের ঘরটাকেও সাজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। এবার ঘরকে সাজিয়ে নিতে পারেন নানারকম আলো দিয়ে। বাজারে নানা ধরনের ল্যাম্পশেড পাওয়া যায়। যেমন- স্ট্যান্ড ল্যাম্পশেড, ঝুলন্ত ল্যাম্পশেড বা টেবিল ল্যাম্পশেড। স্ট্যান্ড ল্যাম্পশেডগুলো ঘরের কোনো কোণে রাখতে পারেন। ঘরের জায়গা কম থাকলে ঝুলন্ত ল্যাম্পশেড বা টেবিল ল্যাম্পশেড ব্যবহার করা যেতে পারে। শোবার ঘরে টেবিল ল্যাম্পশেড রাখতে পারেন। ড্রইংরুমে ঝুলন্ত বা স্ট্যান্ড ল্যাম্পশেড মানানসই। গোলাপি, নীল, বেগুনি, কমলা, সবুজসহ অন্যান্য উজ্জ্বল রংয়ের ল্যাম্পশেড ব্যবহার করা যেতে পারে। বসার ঘরের ক্ষেত্রে হালকা রঙের ল্যাম্পশেড বেছে নিন। শোবার ঘরে গাঢ় নীল, সবুজ, লাল, হলুদ, ধূসর, নীলাভ ধূসর, ঘন সবুজ ধরনের ল্যাম্পশেড ভালো হবে। বাচ্চাদের ঘরে ঝুলন্ত ল্যাম্পশেড ব্যবহার করা উত্তম। ঘরটা ছোট হলে হালকা রঙের ল্যাম্পশেড কিনতে হবে। এতে ঘর বড় দেখাবে। ঘরের দেয়ালের রঙের সঙ্গে বিপরীত (কনট্রাস্ট) কোনো উজ্জ্বল রং যেমন লাল, কমলা, হলুদ ও বেগুনি রঙের ল্যাম্পশেড ব্যবহার করলে ঘরে একঘেয়ামি ভাবটা থাকবে না। টেবিল ল্যাম্প ঘরে স্নিগ্ধ ভাব এনে দেয় ও পর্যাপ্ত আলো ছড়ায়। পড়ার ঘর, শোবার ঘর বা বসার ঘরে এই ধরনের ল্যাম্পশেড রাখতে পারেন। খাবার ঘরে ল্যাম্পশেড রাখতে একই রকম ল্যাম্পশেড দুই দিকে মিলিয়ে রাখুন, দেখতে ভাল লাগবে। শোবার ঘরে আলো সরাসরি চোখে পড়লে তা অস্বস্তিকর হয়ে উঠে তাই পুরোটা ঢেকে থাকবে এমন কোনো ল্যাম্পশেড ব্যবহার করে শোবার ঘরকে প্রাণবন্ত করতে পারেন। ল্যাম্পশেড এমন স্থানে বসাতে হবে যেখান থেকে আলো ছড়িয়ে পড়তে পারে। ঘরের কোণে রাখতে চাইলে তার পাশে কোনো উঁচু ও ভারি কাজের আসবাব রাখবেন না। ল্যাম্পশেড যাতে বাচ্চাদের নাগালের বাইরে থাকে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। কোথায় পাবেন আড়ং, আলমাস, কে ক্রাফটসহ অনেক ফ্যাশন হাউসের আউটলেটে কারুকার্যময় ল্যাম্পশেড পাবেন। এছাড়া সোবাহানবাগ, নিউমার্কেট, দোয়েল চত্বর ও গুলশানের কয়েকটি দোকানে হরেক দামের ল্যাম্পশেড পাওয়া যায়। দাম সাধারণত নির্ভর করে ল্যাম্পশেডের কারুকার্য এবং এতে কি ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা হয়েছে তার ওপর। সময়ের বিবর্তনে ল্যাম্পশেডে এসেছে ভিন্নতা। পিতল কিংবা কাঁচের ল্যাম্পশেডের পাশাপাশি এখন কাঠ, বাঁশ, বেত দিয়ে তৈরি ল্যাম্পশেডও অনেক সহজলভ্য। ১৭ শতকের শেষের দিকে মশাল আলো সাজিয়ে প্যারিসের রাস্তা আলোকিত করার আয়োজন শুরু করা হয়। মূলত তখন থেকেই ল্যাম্পশেডের ধারণা আসে। ১৮৭৯ সালে বৈদ্যুতিক বাল্ব আসলে ল্যাম্পশেড তার নব যাত্রা শুরু করে। ব্রিটেনের রানী ভিক্টোরিয়ার সময় বাহারী ল্যাম্পশেড বানানোর তোড়জোড় শুরু হয়। মূলত সমানভাবে আলোর বণ্টন এবং আলোর বিচ্ছুরণ থেকে চোখ বাঁচাতেই ল্যাম্পশেডের প্রয়োজন পড়ে। পরে অবশ্য দেখা যায় ল্যাম্পশেড ব্যবহারে ঘরে নান্দনিক মাত্রা যোগ হয়। 

নবীন-প্রবীণের সিয়াম সাধনা

নবীন-প্রবীণের সিয়াম সাধনা

রমজান মাসটা সারাদিন কেমন যেন শান্ত আর স্নিগ্ধতায় ভরপুর থাকে। কোরআনের শব্দ, দোয়ার গভীরতা, রান্নার ব্যস্ততা, ইফতারের সুঘ্রাণ আর আজানের অপেক্ষা- সব মিলিয়ে বেলাশেষে যেন সবাই একত্রে বেহেশতের মেহমান হয়ে উঠে। অনেক বাসাতেই নবীন-প্রবীণ রয়েছে, যারা রোজা রাখে। ঘরে নামাজ রোজার পরিবেশ থাকলে ছোট শিশুটিও সবাইকে দেখে তাতে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করে। ৭/৮ বছরের বাচ্চারা রীতিমতো জিদ করে রোজা রাখার জন্য। ইসলাম ধর্মের নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক সুস্থ নর-নারীর জন্যে রোজা ফরয। বয়সন্ধিকালের লক্ষণ শুরু হলেই তার জন্যে রোজা ফরয হয়ে যায়। তবে ৭ বছর বয়স থেকে ছোটদের নামাজ রোজার জন্য অভ্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে। আপনার ঘরের ছোট সদস্যটি যদি রোজার জন্য বায়না করে তবে তাকে উৎসাহিত করুন। জাওয়াদের বয়স ৭ শেষ হয়েছে মাত্র। এ বছর সে সব রোজা রাখার আবদার করেছে। তার মা প্রথমে শঙ্কিত হলেও পরে আর আপত্তি করেনি। এ পর্যন্ত সে সব রোজাই করেছে। তার মা বলেন, অভ্যাস করতে দিচ্ছি। যে কয়টা পারে রাখুক। তবে সে স্বাভাবিক আছে। সারাদিন খেলাধুলা করছে। কখনো আমাকে ইফতার তৈরিতেও সাহায্য করছে। তিনি ইফতারে জাওয়াদকে ঘরে তৈরি ফলের জুস দিচ্ছেন তার এক্সট্রা এনার্জির জন্যে। এছাড়া ফল, দুধ, ডিমও দিচ্ছেন যাতে সে সঠিক পুষ্টি পায় এবং সতেজ থাকে। এ সময় ছোটমনিকে নানা কাজে ব্যস্ত রাখতে পারেন, যাতে সে ক্লান্ত অনুভব না করে। স্কুলগুলো এক মাসেরও বেশি সময় বন্ধ। তাদের অনেক পড়াও দিয়েছে স্কুল থেকে। দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময় সেই পড়া তৈরিতে ব্যস্ত রাখলে তাদের পড়া যেমন শেষ হবে, তেমনি কিছুটা সময়ও কাটবে। এছাড়া ছোট ছোট সুরা, দোয়া তাদের শিখাতে পারেন। সাথে নিয়ে নামাজ পড়ানোর অভ্যাস করাতে পারেন। আপনি কোরআন পড়তে বসলে তাদেরও আরবি পড়তে বসিয়ে দিন। সাধারণত বাসায় দাদা দাদি বা নানা নানি থাকলে বাচ্চারা তাদের অনেক বেশি অনুকরণ করে, মাথায় উড়না বা টুপি দিয়ে নামাজ ও আরবি পড়তে বসে যায়। তাদের দান করতে এবং অসহায়দের ইফতার করাতে উৎসাহিত করুন। ফেতরার টাকাটা তাদের দিয়ে দান করুন। এতে তারা ধর্মীয় দিকগুলো যেমন শিখবে, তেমনি তাদের মাঝে ধর্মীয় মূল্যবোধও জাগ্রত হবে। রোজায় প্রতিবেশীদের ইফতার প্রদানের কাজটিও তাদের দিয়ে করান। এতে তারা সৌহার্দ্য ও প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হবে। তেমনি অপরকে সহযোগিতা করার মনোভাবও তৈরি হবে। বাড়ির যারা বয়সে একটু বেশি প্রবীণ, রোজা রাখছেন, তাদের প্রতিও শিশুদের মতোই খেয়াল রাখতে হবে। আলাদা করে পুষ্টিকর খাবার ও পানীয় দিতে হবে। অনেকের ক্ষেত্রে তিনবেলার ওষুধ দুইবেলা খেতে হচ্ছে। আবার কেউ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা নানা রোগে আক্রান্ত, কিন্তু রোজা বাদ দিচ্ছেন না। তাদের দিকে বাড়তি নজর দিতে হবে এবং অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে পরমর্শে রাখতে হবে। ওষুধ, শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী খাবারও ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী দিতে হবে। রোজার দিনে বেলাশেষে প্রায় সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সঙ্গে সবার জন্য সারাদিন খেটে যাওয়া মানুষটির দিকেও ভালোবাসা ও মায়ার দৃষ্টিতে তাকাবেন। বাড়ির অন্যরা তার কাজে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করবেন। যাতে সমস্ত কাজ তাকে একলা করতে না হয়। কোনো একটা সময় তাকে একটু আরাম করতে দিবেন। তবেই রোজার সার্থকতা আসবে। 

ঈদে প্রিয়জনের অপেক্ষায়

ঈদে প্রিয়জনের অপেক্ষায়

‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার... আসছে সেদিন বছর ঘুরে/ দিচ্ছে রে ডাক আপন সুরে,/ যাচ্ছি আমার স্বপ্ন পুরে/ চেনা পথের বহু দূরে’ প্রতি বছর রোজা যত শেষ হতে থাকে, মনের মধ্যে এই কথাগুলোর গুনগুনানি তত বাড়তে থাকে। প্রিয়জনদের জন্য কেনাকাটা, বাড়ি ফিরে কী কী করবে তার নানা রকম পরিকল্পনা করতে থাকে, নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে চাওয়া মানুষগুলো। এই সুরকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৈরি হয় বাড়ি ফেরার নানা ভিডিও। যাদের বর্তমান স্থান ছেড়ে কোথাও যাওয়া হয় না, তাদেরও চোখের কোণ ভিজে ওঠে এই সুরে। কিন্তু আমরা কি কখনো তার বিপরীত দিকটা দেখেছি? বাড়ি ফেরার মানুষগুলোর অপেক্ষায় যারা আছে, তাদের অনুভূতিগুলো আমাদের ভাবনায় আসে না। তাদেরও মনের বেতর আকুলি-বিকুলি করে- আপনজনদের জন্য। দিন যেন ফুরায় না। ঘরে কত কাজ- বাড়িঘর পরিষ্কার করা, ঘর সাজানো, বিছানায় নতুন চাদর, জানালায় পর্দা টানানো, কার কি প্রয়োজন সেগুলো গুছিয়ে রাখা, সবার পছন্দের খাবার আর উপহার সংগ্রহ করা। আরও কত কি! গ্রামের মা বোনেরা পিঠা পুলি তৈরির আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে উঠে। উঠোনে কোথায় বসে সবাই রাত জেগে গল্প করবে তার পরিকল্পনা। উঠোনটা নতুন করে লেপে ঝকঝকে করা। বাবা বাজার করে রান্নাঘর ভরে ফেলে। পুকুর থেকে মাছ ধরার ব্যবস্থা করেন। ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনি আসলে তাদের সঙ্গে নিয়ে তাজা মাছ ধরে রান্না করে খাওয়াবেন। বাড়িতে বিশাল উৎসব লেগে যায়। শহরে এমন হৈ হৈ আয়োজন না হলেও, খুশি আর আয়োজনটা সবারই এক। গ্রামে হয়তো সবার আলাদা ঘর পাওয়া যায়। সবাই শহরমুখী হওয়ায় ঘরগুলো খালিই পড়ে থাকে। ঝেরে মুছে তৈরি করতে হয়। শহরে সব সময় সবার আলাদা ঘর হয় না। সেক্ষেত্রে কে কোন ঘরে থাকবে, কোন ফ্লোরে বিছানা পাতা হবে, কয়টা লেপ-কাঁথা-বালিশ লাগবে, সেগুলো কীভাবে গুছিয়ে রাখবে, কার কী পছন্দ- সে অনুযায়ী রান্নার পরিকল্পনা- ইত্যাদি নিয়ে সবার ব্যস্ততায় দিন কাটে। ছোটরা বড়দের তালিকা করে দেয়- এবার ঈদে তার কী কী চাই। আর গুনতে থাকে- আর কতদিন! ঘরে থাকা ছোট খালা, ফুপু, চাচাদেরও অপেক্ষার শেষ হয় না। ভাই বোনের ছেলেমেয়েদের জন্য কেনাকাটা, তাদের নিয়ে কোথায় ঘুরতে যাবে তার পরিকল্পনা ইত্যাদিতে। ছোটরাও যেন বাড়ির এই ছোট খালা, ফুপু আর চাচার জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে। শূন্য বাড়ি সবার কলকাকলিতে আবার পূর্ণ হয়ে উঠে। ঈদের উপহারগুলো দেখতে বসে হয় আরেক উৎসবমুখর পরিবশে। খুব অল্পদিনের জন্যে হলেও সবাই এই সময়টার দিন গুনে বছর ভরে। সবাই মিলে গেয়ে উঠে- ‘মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে/ শোন্ আসমানি তাগিদ...’ 

অস্বস্তিতে মায়েরা

অস্বস্তিতে মায়েরা

সমতাভিত্তিক সমাজের উন্নয়ন, এগিয়ে যাওয়া সর্বস্তরের মানুষের এক অবারিত যাত্রাপথ। সমাজ-সভ্যতা সঠিক পথ নির্মাণে প্রত্যেকের অংশগ্রহণের মধ্যেই অবারিত যাত্রায় এগিয়ে চলেছে। যে কোনো অংশ পিছিয়ে পড়লে সমাজ কাঠামোর যথার্থ পথ নির্ণীত হয় না। সৃষ্টির ঊষাকাল থেকেই। সভ্যতা সূর্যের উদয়ের প্রারম্ভিক পর্যায়ে নারীর অবস্থা ছিল গৌরবময় এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ও অভাবনীয় যাত্রাপথ। সঙ্গত কারণে সর্বংসহা জননীই ছিলেন শুধু মাতৃত্বের আবরণে নয় বরং সভ্যতার বীজ বপনের এক অবিস্মরণীয় অংশীদারিত্বে। এক সময় পরিবারহীন আর পিতৃত্বের পরিচয় আড়ালে থাকলেও যেমন কাঠামো গতিশীল হয়েছিল তাও নাকি নারীর হাত ধরেই। বিয়ে নামক সামাজিক প্রতিষ্ঠানটির জন্ম তো আরও পরের বিষয় অবাধ স্বেচ্ছাচার আর দলগত বিয়েতে বাবার কোনো চিহ্ন ছিল না বলে নৃতাত্ত্বিকদের বদ্ধমূল ধারণা। মায়ের গর্ভ থেকে সন্তান আসতো বলে মাকেই চেনা যেত। শুধু কি তাই? কৃষি সভ্যতার বীজ রোপণেও নারীদের অবস্থান ছিল ঐতিহাসিক, সামাজিক আর পারিবারিক বন্ধনের মিলন গ্রন্থি। আদিম সমাজের বন্যদশায় পুরুষরা ঘুরে বেড়াতো খাদ্য সংগ্রহ অর্থনীতির চাকা সচল করতে। ফলমূল হাতে করে নিয়ে আসতো। তেমন ফলমূলের বীজ থেকে খাদ্য উৎপাদন অর্থনীতি নারীদের অভাবনীয় কৃতিত্ব বলে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠিত। মাতৃত্ব আর কৃষি সভ্যতার বীজ বপন নারী সমাজকে যে উচ্চতর আসনে অভিষিক্ত করে সেটাই আদিম বন্য দশার পরম শক্তি আর সৌন্দর্য। তাই ঐতিহাসিক ধারায় নারীর যে প্রাসঙ্গিক এবং যৌক্তিক ভূমিকা তা আজও বহাল তবিয়তে টিকে আছে সন্দেহ নেই। কিন্তু সভ্যতা যত এগিয়েছে, সম্পদ ঐশ্বর্য যতই বাড় বাড়ন্ত হয়েছে সমাজ সংস্কার আধুনিক হলেও অপেক্ষাকৃত শারীরিকভাবে দুর্বল ও কোমল নারীদের অবস্থা উন্নত হলেও পুরুষের তুলনায় অনেকটা পেছানো। আর অধিকার, স্বাধীনতা খর্ব হওয়ারও চরম দুঃসময়। আধুনিক শিল্প প্রযুক্তি আমাদের প্রতিনিয়ত দুরন্ত গতিতে এগিয়ে নিলেও নারীরা কিন্তু বিভিন্নভাবে অবহেলিত আর পিছিয়ে পড়ার দৃশ্য উন্নয়নের ক্ষতচিহ্ন সমাজ ও নৃবিজ্ঞানীরা ধারণা দিচ্ছেন। আমরা এখন একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের অন্তিম প্রান্তে। সেখানে নারীর অবস্থানও চমকপ্রদ। নারী শিক্ষার হার বেড়েছে। কর্মজীবী নারীর সংখ্যকও হাতে গোনার জায়গায় নেই। একজন নারী গৃহিণী একই সঙ্গে যখন কর্মজীবীর অবস্থানে চলে যান তখন তার সন্তানের দেখভালের বিষয়টি সবার আগে উঠে আসে। যন্ত্র সভ্যতা যেমন অনেক উপহার দিয়েছে- বিপরীত প্রদাহ হিসেবে ঐতিহ্যিক প্রথা, বন্ধন, পারস্পরিক সম্পর্ক সৌহার্দ্য থেকেও পিছু হটেছে। এক সময়ের যৌথ পরিবার এখন এবার অবস্থানে ভিত্তি মজবুত করাও সমাজ সংস্কারের চলমান গতি। একক পরিবার শান্তি, স্বস্তি থাকলেও কত দুঃসময় মোকাবিলা করা যেন হিতে বিপরীতের চরম দাবানল। একজন কর্মজীবী মা যখন একক পরিবারের হাল ধরেন তখন তার কোলের সন্তানটিকে কোথায় রেখে নিশ্চিতে তিনি কাজে মন দেবেন? সমস্ত বিভাগীয় শহরের এমন দুরবস্থা। সেখানে বাসার রাতদিনের সাহায্যকারী অবস্থান দৃশ্যমান হলেও বিপদে বিপত্তি পিছু লেগে থাকে। পরম নিশ্চিন্তে, নির্দ্বিধায় কর্মক্ষেত্রে মনোনিবেশ করা সেটা কর্মজীবী নারীর প্রতিমুহূর্তের এক অসহনীয় সময় কাল। সঙ্গত কারণে তাকে মুষ্টিমেয় কয়েকটি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের জিম্মায় রেখে দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করতে হয়। আলোচনা করতে চাই মূলত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র নিয়ে। সব কর্মক্ষেত্রে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র  নেই। মুষ্টিমেয় হাতে মালা কয়েকটি। ঢাকা শহরে বাংলাদেশ ব্যাংকও সচিবালয়ে সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্র হিসেবে ‘শিশু-দিবা যত্ন কেন্দ্র আছে। আরও কিছু কেন্দ্র থাকলেও অবস্থা এত নিম্নমানের উল্লেখ করার মতোই নয়। শিশু দিবা যত্ন কেন্দ্রে কিছু বৈশিষ্ট্য নীতিমালা, করণীয় বিষয় নির্ধারণ করা থাকে। কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্য যেমন জরুরি একইভাবে তাদের মনোশক্তি বিকাশও অবধারিত এক পর্যায়। প্রতিষ্ঠান সমূহ সব ধরনের নীতিমালা যথার্থভাবে পালন করে তাও কিন্তু নয়। অনেক সংকট শিশুদের যত্নের প্রতি অবহেলা এমনকি তাদের নিয়মমাফিক খাবারের ওপরও তেমন সযত্ন পরিচর্যা হয় না বলে হরেক তথ্য উপাত্ত দৃশ্যমান হয়। তাদের জন্য বরাদ্দ পুষ্টিকর খাদ্য থেকে বঞ্চিত করা ছাড়াও তাদের শারীরিক, মানসিক বিষয়টাও নজরে রাখা হয় না আর যত্ন আত্তির? বিশুদ্ধ পরিবেশও যে বাচ্চাদের নাগালের বাইরে চলে যায় সেটাও ভিন্নমাত্রা বৈপরীত্য। জোর জবরদস্তিতে বাচ্চার শরীর মনের ওপর যে বিপরীত প্রভাব পড়ে তাতেও কোমলমতি শিশুটি কোনোভাবেই ভালো থাকে না। স্বাস্থ্য না মানসিক বিকাশে। মহিলা অধিদপ্তরের সরকারি প্রতিবেদনেও এমন সব অসহনীয় তথ্য গণমাধ্যমের পাতাকে ভারী করছে। শিশুর সংখ্যার চাইতে খাবারের বিল করা হয় অনেক বেশি। ৪৫ জনের বিপরীতে বিল উপস্থাপন করা ৫৭ জনের। এমন সব আর্থিক অসংগতি নিয়েই নাকি বিভিন্ন দিবাযত্ন কেন্দ্র ঢিলেঢালা অবস্থায় চালানো হচ্ছে। অসহায় মাও মনোযোগ দিয়ে তার দাপ্তরিক কর্মযোগ যথার্থভাবে পালন করতে কিছুটা পিছু হটে তো বটেই। যার কারণে বিভিন্ন সচিত্র প্রতিবেদনে কর্মজীবী মায়েদের পেশাগত অবস্থান নাকি তার পুরুষ সহকর্মীর চাইতে খানিকটা পিছিয়ে। শারীরিকভাবে তিনি অফিসে থাকলেও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্নতায় ভুগেন। ফলে কর্মক্ষেত্রেও যথেষ্ট মনোসংযোগ বিঘ্নিত হয়। মহিলা অধিদপ্তর কর্তৃক প্রাসঙ্গিক বিধিমালা প্রণীত থাকলেও বাস্তবে তার কোনো যথার্থ প্রযোগ এতই বিচ্ছিন্ন আর বিপদাপন্ন ধারণা করা যায় না। এমনিতে কর্মজীবী নারীর কাজের প্রতি অনীহা বিষয় নানাভাবে উঠে আসে। আবার শিশু দিবা যত্ন কেন্দ্রের হরেক দুর্ভোগ, দুঃসময়ও সংশ্লিষ্টদের নানামাত্রিক ভোগান্তির শিকার করে। সমস্যা শুধু ক্ষুদ্র বাংলাদেশের নয় বিশ্বময় এমন অপদৃশ্য মা ও শিশুকে বিপন্ন বিপাকে ফেলে পরিবার থেকে কর্মক্ষেত্র পরবর্তীতে যার ছাপ পড়ে পুরো সমাজ ব্যবস্থার বলয়ে। পরিত্রাণের উপায় বের করা নাকাল পরিস্থিতির চাইতে ততোধিক অসহনীয় ঘেরাটোপ। 

নারী মুক্তিযোদ্ধার অনন্য ইতিহাস

নারী মুক্তিযোদ্ধার অনন্য ইতিহাস

১৯৫৩ সালের ৪ মার্চ জন্ম নেওয়া সালেহা বেগম বেড়ে উঠেছিলেন এক সাধারণ পরিবারে। তাঁর বাবা মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার এবং মা মমতাজ আরা বেগম। ছাত্রজীবনেই তিনি ছিলেন সাহসী, সচেতন ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় তিনি যশোর মহিলা কলেজে স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্রী। কিন্তু ইতিহাসের ডাকে সাড়া দিতে তিনি কেবল একজন ছাত্রী হয়ে থাকেননি তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক সাহসী যোদ্ধা। ১৯৬৯ সালে যে ‘নিউক্লিয়াস’ গঠিত হয়, যার লক্ষ্য ছিল একটি স্বাধীন, সমাজতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত ও সাম্রাজ্যবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সালেহা বেগম ছিলেন তার একজন সক্রিয় সদস্য। স্বাধীনতার স্বপ্ন তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হয়নি, কিন্তু তরুণ প্রজন্মের অন্তরে স্বাধীনতার আগুন জ্বলে উঠেছিল। সংগঠিত হওয়ার লক্ষ্যে তারা গড়ে তোলেন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর থেকে সেখানে সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। প্রায় ২০০ জন ছেলে এবং মাত্র পাঁচজন মেয়েকে দেওয়া হয় অস্ত্র চালনা, বোমা তৈরি ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণের মতো কঠোর প্রশিক্ষণ। সেই পাঁচজন নারীর একজন ছিলেন সালেহা। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি আর পিছু হটেননি। প্রাণ বাজি রেখে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যশোরের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি অংশ নেন একাধিক যুদ্ধে। কেবল গোপন হামলা, গোয়েন্দাগিরি বা অস্ত্র সরবরাহের কাজেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; নিয়মিত বাহিনীর সদস্য হিসেবে লড়েছেন সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধে। খুব কাছ থেকে শত্রুপক্ষের ওপর আক্রমণ চালিয়েছেন। বহু ক্ষেত্রে পাক সেনাদের গুলি করে হত্যা করেছেন। তবে একবার ছাড়া পাক সেনাদের জীবিত ধরে আনার সুযোগ হয়নি। কারণ অধিকাংশ সময় শত্রুরা নিজেদের নিহত সদস্যদের লাশ নিয়ে পালিয়ে যেত। যুদ্ধের এক ভয়ংকর দিনের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে সালেহা জানান যশোর সদরের বাহাদুরপুর অঞ্চলের একটি ঘটনার কথা। তিনি সেদিন যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বাহিনীর সবাই বিভিন্ন স্থান থেকে এসে একত্র হয়েছে। এমন সময় তাঁর হাতে পৌঁছে একটি ছোট চিরকুট নির্দেশ ছিল, ‘আমরা না বলা পর্যন্ত আপনি বেরুবেন না।’ এটি ছিল থানা কমান্ডের নির্দেশ। তিনি ভাবলেন, নিশ্চয়ই গুরুতর কিছু ঘটেছে। নির্দেশ মেনে তিনি আর বের হননি। পরে জানতে পারেন, সেদিন তাদের সহযোদ্ধারা পাক সেনাদের ঘেরাওয়ে পড়ে প্রবল যুদ্ধে লিপ্ত হন। মাত্র পাঁচ-ছয়জন মুক্তিযোদ্ধা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করে শহীদ হন। সালেহা বলেন, সেদিন তিনি সেখানে গেলে হয়তো তিনিও শহীদ হতেন। সেই চিরকুট যেন ছিল তার জীবনের মোড় ঘোরানো বার্তা। আরেকটি ঘটনার কথা বলতে গিয়ে তিনি স্মরণ করেন যুদ্ধের শুরুর দিকের এক অভিজ্ঞতা। যশোর শহরের বারান্দিপাড়ায় তারা অবস্থান নিয়েছিলেন। ট্রেঞ্চ খুঁড়ে সেখানে শুয়ে গুলি চালানোর প্রস্তুতি ছিল। সবাই সমানভাবে প্রশিক্ষিত বা অভিজ্ঞ না হওয়ায় কিছুটা বিশৃঙ্খলা ছিল। গোলাগুলি শুরু হতেই হঠাৎ পেছন দিক থেকে গুলি এসে তাদের কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। সবাই হতবাক শত্রু তো সামনে, পেছনে নয়! পরে জানা যায়, ভুলবশত তাদের নিজেদের একজন যোদ্ধা পেছন থেকে গুলি ছুড়েছিলেন। দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। ভাগ্য ভালো, সেদিন কেউ আহত হননি। যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও এমন অভিজ্ঞতা তাদের আরও সতর্ক ও সংগঠিত করে তোলে। সালেহা বেগম শুধু একজন নারী মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু তাঁর তিনি সাহস, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক। সমাজের প্রচলিত ধারণাকে অতিক্রম করে তিনি প্রমাণ করেছেন, দেশপ্রেমের প্রশ্নে নারী-পুরুষের ভেদরেখা অর্থহীন। সম্মুখযুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণ, কঠোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং সহযোদ্ধাদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তাঁকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। স্বাধীনতার পেছনে অসংখ্য পরিচিত-অপরিচিত বীরের অবদান রয়েছে। সালেহা বেগম তাঁদেরই একজন, যাঁর জীবনকথা আমাদের নতুন প্রজন্মকে সাহস, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের শিক্ষা দেয়। তাঁর মতো সাহসী নারীদের ত্যাগের ফলেই আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। তাঁদের স্মরণ করা মানে কেবল অতীতকে স্মরণ করা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণা সংগ্রহ করা। সাহসী এই মুক্তিযোদ্ধা এক পুত্র সন্তানের জননী। যশোরে এখন আইন পেশার সাথে যুক্ত আছেন। 

নারীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

নারীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

প্রতি বছর ৮ মার্চ বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং এর পর থেকেই প্রতিটি দেশ অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দিবসটি পালন করে আসছে।  শুরুটা ছিল ১৮৫৭ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরোধিতা করে প্রথম রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানায়। সেই মিছিলে হামলে পড়ে সরকারি লেঠেল বাহিনী। ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জার্মান রাজনীতিবিদ ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে নিউইয়র্কে প্রথম নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর পরের বছর ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে ১৭টি দেশের ১০০ জন নারী প্রতিনিধির উপস্থিতিতে অনু্ষ্িঠত হয় ২য় নারী সম্মেলন এবং এখানেই ক্লারা ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব করেন। ১৯১৪ সাল থেকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করে বেশ কয়েকটি দেশ এবং সূচনাটা সেখান থেকেই। ১৯৭৫ সালে খোদ জাতিসংঘ সকল সদস্য রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করার জন্য।  বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা লাভের পূর্ব থেকেই নারী দিবস পালন করছে। প্রতি বছর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে পালন করে। নারী দিবস পালনের শত বছর পার হলেও নারীর সম-অধিকার কতটা নিশ্চিত করা গিয়েছে তা আলোচনার খোরাক জোগায় বটে। এখনো নারীদের যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয় অপরিণত বয়স থেকেই, কর্মস্থলে মানসিক নির্যাতনের বিষয়ে প্রায়ই মুখ খোলেন অনেক নারী বিশেষ করে যারা বেসরকারি খাতে চাকরি করেন। সরকারি চাকরিজীবী নারীদের সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলক সন্তোষজনক হলেও বেসরকারি খাত নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট সুযোগ আছে।  নারীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরও বেশি কাজ করার সুযোগ রয়েছে। থানাগুলোতে নারী ও শিশু ডেস্ক চালুর বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সরকারি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজে এমন এমন উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হয়।  শিক্ষায় নারীরা এগিয়ে থাকলেও চাকরির মাঠে নারীরা এখনো পিছিয়ে। এর কারণগুলো খুঁজে বের করে জরুরি ভিত্তিতে সমাধান খোঁজ করা জরুরি। রাজনীতিতে নারীরা যথেষ্ট পিছিয়ে আছে। সদ্য সমাপ্ত হওয়া জাতীয় নির্বাচনে নারী এমপি প্রার্থীদের মনোনয়ন হার এবং মন্ত্রিসভায় নারীর স্বল্প উপস্থিতি তেমনই বার্তা দেয়।  কর্মক্ষেত্রে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার, আধুনিক ডে-কেয়ার সেন্টার, প্রশিক্ষিত বেবি কেয়ার গিভারের অভাবসহ নানা কারণে কর্মজীবী মায়েরা কর্মক্ষেত্রে নিজের সর্বোচ্চ দক্ষতা প্রদর্শন করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন। গবেষণা, লেখালেখি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত কাজে সম্পৃক্ততা, রাজনীতি, সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে তাদের উপস্থিতি আরও বেশি কাম্য। আজও গৃহস্থালি সামলানোর মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজকে মর্যাদার চোখে দেখা হয় না। তেমনি নেই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও। তবে, সুখের বিষয় অতি সম্প্রতি বর্তমান সরকার ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছেন যেখানে গৃহিণী নারীদের বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা আছে। বলা বাহুল্য এই উদ্যোগ নারীদের ক্ষমতায়ন ও মর্যাদা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। পুরুষশাষিত সমাজ বলে পরিচিত বৈষম্যমূলক শব্দটির মূলোৎপাটন করে সম-অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুরুষদেরও কম নয়। একুশ শতকের এই আধুনিক বিশ্ব হোক নারী-পুরুষের সম-অধিকারের বিশ্ব। নারীদের ক্ষমতায়নের পথ সুগম হোক সেই প্রত্যাশা এবারের নারী দিবস ঘিরে।