ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩

লাইফস্টাইল বিভাগের সব খবর

শিশুর স্বাচ্ছন্দ্য

শিশুর স্বাচ্ছন্দ্য

ঈদের উৎসব প্রতিটি শিশুর কাছে অনেক রঙিন। রোজার শুরু থেকেই তাদের ঈদ নিয়ে থাকে নানা জল্পনা-কল্পনা। বন্ধুদের মধ্যে হয় উৎসবমুখর কথোপকথন। কে কয়টা ড্রেস কিনল, কীভাবে সাজবে এমন অনেক কিছু। সকাল, দুপুর ও রাতের পোশাকের সঙ্গে সাজ ও গহনা এক্সেসরিজের বিষয়ে বর্তমানে বড়দের থেকে ছোটরা  বেশি স্মার্ট ও সচেতন। আর তাদের বায়না পূরণ করতে বাবা-মায়েরা ছুটছে বিভিন্ন শপিং মল ও মার্কেটে। প্রকৃতির বদলের খেলায় বাড়ছে তাপদাহ। তাই পরিবর্তন আসেেছ পোশাকেও। বিশেষ করে এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ভাবতে হয় বাড়ির শিশুদের নিয়ে। কেননা গরমে শিশুর পোশাক কেমন হবে, কী ধরনের পোশাক শিশুদের জন্য আরামদায়ক হবে। এসব ভাবনা চলে আসে প্রকৃতির রূপ বদলের সঙ্গে সঙ্গে। এ কারণে আমাদের দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোও এ সময়ে শিশুদের জন্য তৈরি করে ফ্যাশনেবল সব আরামদায়ক পোশাক। বাজার ঘুরে দেখা গেল, বিভিন্ন রং ও নকশায় অলঙ্কৃত করা হয়েছে শিশুদের পোশাক। প্রায় সব মার্কেট আর ফ্যাশন হাউসে এখন মিলবে শিশুদের জন্য সুতির পোশাক। ভয়েল, সুইস ভয়েল, আদ্দি, ভিসকস, মিক্সড ভয়েল, বেক্সি ভয়েলসহ নানারকম সুতি কাপড়ে তৈরি হচ্ছে কোমলমতিদের পোশাক। এ ছাড়া কটনের সঙ্গে ফেব্রিক দিয়েও তৈরি হচ্ছে পোশাক। বাজারে আছে সুতি, লিনেন ও গেঞ্জি কাপড়ের বিভিন্ন ডিজাইনের পোশাক। আরামদায়ক উপকরণ হিসেবে ডিজাইনাররা বেছে নিয়েছেন সুতি, গ্যাবার্ডিন, লিনেন ও নরম জিন্স এর মতো নরম কাপড়। শিশুরা যেহেতু বেশি ছোটাছুটি করে তাই ঘাম হয় বেশি। এ কারণে গরমকালে শিশুদের পোশাক নির্বাচনে সুতির কাপড় বেছে নিতে হবে। বিভিন্ন ধরনের ভয়েল, পাতলা তাঁত কাপড়ও আরামদায়ক। গরমে যেসব কাপড় তাপ শোষণ করে কম এমন হালকা রঙের পোশাক যেমন আকাশি, হালকা সবুজ, গোলাপি, সাদা, ধূসর, বাদামি ইত্যাদির ওপর রঙিন ছাপা বা প্রিন্টের পোশাক বেছে নিতে পারেন। এতে শিশুদের দেখতে বেশ ভালো লাগে। তবে তারা যেহেতু খেলাধুলা বা ছোটাছুটি করে বেশি, তাই রঙিন পোশাক পরাতে চাইলে ব্লক বা বাটিকের পাতলা সুতি পোশাক বেছে নিতে পারেন। এছাড়াও শিশুদের জন্য ছোট বা মাঝারি প্রিন্টের পোশাক বেশি মানানসই। ফুল, পাতা, পাখি, জ্যামিতিক নকশা বা বল প্রিন্টের পোশাকও পরাতে পারেন। এতে শিশুদের প্রাণবন্ত ও উচ্ছল লাগে। তবে শিশুদের জন্য যে ধরনের পোশাকই নির্বাচন করা হোক না কেন, তা যেন খুব বেশি আটসাঁট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাতাস চলাচল করতে পারে এমন ঢিলেঢালা পোশাক শিশুদের জন্য বেশি উপযোগী। ছেলে ও মেয়ে শিশুদের পোশাকে খুব একটা পার্থক্য দেখা যায় না বললেই চলে। ছেলেদের জন্য আছে ঢিলেঢালা গেঞ্জি, টি-শার্ট, ফতুয়া, নিমা, হাফ-প্যান্ট ও থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট, ট্রাউজার, ফুল-প্যান্ট। মেয়েদের জন্য এসব ছাড়াও পাওয়া যাচ্ছে নানারকম ডিজাইনের ফ্রক, লেহেঙ্গা, সালোয়ার-কামিজ, স্কার্ট, টপস, প্লাজো, শার্ট, টি-শার্ট, পোলো টি-শার্ট ইত্যাদি। এক ডিজাইনার বলেছেন, ‘আমরা সবসময়ই বাংলাদেশের আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে কাপড় বেছে নেই। গরমে শিশুদের পোশাকটা যেন স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়। সোনামণিদের পোশাকে প্যার্টানের দিক থেকে রয়েছে লিল্যাকজিন সিস্টেম যেমন প্রয়োজনে পোশাকটি ছোট-বড় করা যাবে এবং ঢিলেঢালা হলে টাইট করে নিতে পারবেন।’ কোথায় পাবেন লা রিভ, টুয়েলভ, আড়ং, রঙ বাংলাদেশ, বিশ্বরঙ, কে ক্র্যাফট, অঞ্জন’স, মেনজ ক্লাব, সীমান্ত স্কয়ার, বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্কসহ বিভিন্ন শপিং মল ও মার্কেটে পাবেন শিশুর আরামদায়ক পোশাক। দাম পড়বে ৫০০ থেকে ৩০০০ টাকার মধ্যে। একটু কম দামের জন্য বেছে নিতে পারেন রাজধানীর নিউমার্কেট, নুরজাহান মার্কেট, বঙ্গবাজার, মৌচাক মার্কেট, তালতলা মার্কেট। গ্যাবার্ডিন ও জিনসের প্যান্টগুলোর দাম পড়বে ৩০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে।

আজও অধিকারহীনা

আজও অধিকারহীনা

সমাজের সমসংখ্যক নারী তাদের অধিকারের মাত্রায় কেন পিছিয়ে? সেই উত্তর না মেলা ও এক রুদ্ধতার জাল। দেশ উন্নয়ন কর্মযোগে এগিয়ে যাচ্ছে। দৃশ্যমান হতেও সময় ক্ষেপণই হয় না। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিবেদন, প্রতিবাদ, মিছিলে নতুন করে জেগে উঠছে অধিকারহীনতার দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ। যা কোনোভাবেই এড়ানো কিংবা ঠেকানো অসম্ভবের পর্যায়। বিভিন্ন সময় আওয়াজ উঠছে সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে স্বৈরাচারী শাসনে পতন হয়েছে। তাও এক বছর অতিক্রম করার দুঃসহ এক ক্রান্তিকাল। যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সেখানে পুরানো অপসংস্কার যেন এখনো জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে। কাঠামোর গভীরতম গহিন শিকড়ে। সেটারই কোনো মূল উৎপাটন কেন সম্ভব হচ্ছে না তা খতিয়ে দেখার সময়ও দ্রুতগতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। কাজের কাজ কিংবা প্রচলিত সমস্যা বিপদশঙ্কুল রাস্তা আজও অনধিগম্য এক যাত্রাপথ। নতুন অন্তর্বর্তী সরকারও যথাযোগ্য কোনো সমাধান দিতে বারবার পিছু হটছে। তাহলে তাদের জন্য অবারিত, নির্বিঘ্ন হবে?  সম্মিলিত হয়ে বিভিন্ন নারী সংগঠন পুনরায় তাদের ন্যায্যতা, আইনি অধিকার পাবার বিষয়টি সামনে আনতে এক প্রকার বাধ্যই হচ্ছেন। এমন আশঙ্কা ও প্রকাশ করা হচ্ছে অধিকারের বিষয়টিই নাকি এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে?  সেই পুরানো কথা নারীদের অধিকার আদায়ের ব্যাপার নয় মূল বার্তাটিরই নড়বড়ে অবস্থা। আবারও সমস্বরে দাবি উঠছে আইন আর সংবিধান যদি নারীর ন্যায্য অধিকার দিতে পিছু হটে তাহলে শেষ অবধি স্বয়ং রাষ্ট্রকেই তেমন দায়বদ্ধতা নিতে হবে বলে প্রতিবাদী এমন আলোচনায় দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণাও আসে। সম্মিলিত এমন কর্মশালার আয়োজক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ।’ ইউএনডিপি জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির পক্ষ থেকে সহযোগিতার বিষয়টিও উঠে আসে। বিশেষ এমন আলোচনায় উঠে আসে বিষয় বিশ্বের বিভিন্নস্থানে দৃশ্যমান হলেও অধিকার আদায়ের মহৎ কর্মযোগটি কেন যে সংশ্লিষ্টদের জীবন ও কর্মে অবারিত হচ্ছেই না। তাই রাষ্ট্রকেই উদ্যোগ নিয়ে অমীমাংসিত দীর্ঘকালীন সমস্যাকে অতি অবশ্যই শুধু নজরে আনা নয় সমূলে উপড়ে ফেলা ও সময়ের অপরিহার্যতা। নারীরা প্রতিবাদী হয়ে তাদের কাক্সিক্ষত সমঅধিকার যা কিনা আইন, রাষ্ট্র, সমাজ দিতে কার্পণ্য না করলে ভেতরের অপশক্তি যারা বিভেদ বৈষম্য জিইয়ে রাখতে এগিয়েই থাকে তাদের প্রতি কঠোর বাণী ও আছে এই সম্মেলন থেকে। উত্তরাধিকার আইন নিয়েও আপত্তি তোলা হয়। সেখানে সমতাকে ন্যায্যতা দিয়ে অধিকার, স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়। বারবার হয়ে আসা সেই একই কঠিন বিধিবদ্ধ অব্যবস্থা যা অধিকারের মাঝখানে প্রাচীরসম ব্যবধান ফারাককে নিত্যনতুন অবস্থায় তৈরি করতেও অদম্য গতিতে ছুটে চলেছে। নারীর মৌলিক অধিকারের প্রতি আর কোনো আপোস কিংবা সমঝোতা একেবারেই নয়। দৃশ্যমান অবকাঠামো শিল্প প্রযুক্তির অবাধ প্রসার ঘটলেও মান্ধাতা আমলের ঐতিহ্যিক মানসিকতা যা সময়ের গতি প্রবাহে নিত্যই পরিবর্তনের আহ্বান দিয়ে যাচ্ছে সেভাবেই নারী সমাজকে কর্ম এবং মানসিকতায় দ্রুততার সঙ্গে গ্রহণ করার দাবিও আসে সম্মিলিত নারী সম্মেলন থেকে। নাগরিকে পাঁচ মৌলিক অধিকারই নারী জাতির প্রাপ্যতা। কোনো একটা লঙ্ঘিত হলেই মানুষের মর্যাদায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে যায়। তাই অধিকার স্বাধীনতার সব ক্ষেত্রে নারী অংশ নেওয়া সময়ের দাবি। 

উদ্যমী ও পরিশ্রমী  হোসনে আরা

উদ্যমী ও পরিশ্রমী হোসনে আরা

যারা উদ্যমী ও পরিশ্রমী কোনো বাধা-বিপত্তিই তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত প্রতিবন্ধী দশম শ্রেণির ছাত্রী হোসনে আরা। সেই ছোট বেলা থেকেই মেধাবী সে। নানা সংগ্রাম আর দারিদ্রতার কাছে হার না মেনে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। সে স্বপ্ন দেখে একদিন উচ্চ শিক্ষিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে। দেশের প্রতিবন্ধী মানুষসহ গরিব আর অসহায় মানুষের জন্য কাজ করবে। কিন্তু তার এই স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দরিদ্রতা। আদৌ কি তার এই স্বপ্ন পূরণ হবে? এমন চিন্তায় দিন কাটছে তার এবং তার পরিবারের মানুষদের। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মহিধর গ্রামের কিশোরী হোসেনে আরা। জন্ম থেকেই দুই পা ও একটি হাত অচল নিয়েই বেড়ে উঠেছে। তবু থেমে যায়নি তার স্বপ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে অন্যদের আলোর পথ দেখাতে চায় সে। আর সেই স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে নিজের জীবনের সবকিছু প্রায় ত্যাগ করেছেন তার বাবা দিনমজুর হোসেন আলী। শুধু সন্তানকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত ও তার চিকিৎসার জন্য বাড়ি-ভিটার ১৬ শতক জমি বিক্রি করেছেন। তিল তিল করে গড়ে তুলছেন মেয়ে হোসনে আরাকে। নিজের কাজের ক্ষতি করে প্রতিদিন বাইসাইকেলের পেছনে বসিয়ে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মেয়েকে তিন কিলোমিটার দূরের স্কুলে নিয়ে যান এবং নিয়ে আসেন। হোসনে আরার শরীরের  একপাশে অচল। কেবল বাম পাশ এবং  হাতটিই তার একমাত্র ভরসা। জন্মের পর থেকেই দারিদ্র্যতার মধ্যে কাটালেও তার সুস্থতার জন্য বাবা-মা শহর গ্রাম ও রংপুর মেডিকেলের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছিলেন। কিন্তু এত চিকিৎসায় ফেরেনি তার শারীরিক সক্ষমতা। তবুও হোসনে আরা ও তার পরিবার থেমে থাকেনি। ছোট বেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ হোসেনে আরার। প্রতিটি ক্লাসেই মেধার স্বাক্ষর রাখতো। সন্তানের পড়াশোনার আগ্রহ দেখে বাবা তাকে তিন কিলোমিটার দূরের সিংগীমারী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। সেখানেই প্রতি ক্লাসে ভালো রেজাল্ট করে আসছে। বর্তমানে হোসনে আরা সিংহীমারী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে বাবা মো. হোসেন আলী নিজের জীবিকাও বিসর্জন দিয়েছেন। আগে ভ্যান চালালেও মেয়েকে বারবার স্কুলে ও প্রাইভেটে আনা-নেওয়া করার প্রয়োজনে তাও ছেড়ে দিয়েছেন। এখন অন্যের জমিতে বর্গাচাষ ও দিন মজুরি করেই চলে তাদের সংসার।  এলাকাবাসীরা জানায়, ছোটবেলা থেকেই হোসনে আরাকে দেখি সে অসুস্থ। আমরা চাই সবাই যেন তাকে সহযোগিতা করে। সে যেন লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। নিজের কাজ নিজে করতে পারে। তার সহপাঠীরা বলেন, হোসনে আরা আমাদের বান্ধবী। সে যে প্রতিবন্ধী তাকে আমরা কখনোই বুঝতে দেই না। তার সঙ্গে আমরা হাসিখুশি চলাফেরা করি। স্কুলের কেউ তাকে খারাপ চোখে দেখে না। বাবা হোসেন আলী মা-আলুপা বেগম জানায় মেয়ের জন্য বাইরে গিয়ে কাজ করার সুযোগ পাই না। ওকে বার বার আনা-নেওয়া করতে হয়। সংসার চালানো এখন খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার থেকে যদি কোনো সহায়তা পাওয়া যায় তাহলে খুব উপকার হতো। শিক্ষার্থী হোসনে আরা জানায়, আমি বড় হয়ে শিক্ষক হতে চাই। আমার পড়াশোনা করতে ভালো লাগে। একটি অটোমেটেড (মোটরচালিত) হুইলচেয়ার থাকলে নিজেই স্কুলে যাতায়াত করতে পারতাম। বাবার কষ্টটা একটু কমতো। সিংহীমারী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক চালোক্য রায় জানায় হোসনে আরা একজন মেধাবী ছাত্রী। প্রতিবন্ধী হলেও তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ আছে। তার বাবা অনেক কষ্ট করে মেয়েকে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসিয়ে স্কুলে নিয়ে আসে। আমরা চেষ্টা করছি সে যেন আরও ভালোভাবে পড়াশোনা করে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান জানায় হোসনে আরা আমাদের স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল ৪ বছর আগে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সে হাঁটতে পারে না। ক্লাসের সহপাঠীরা তাকে সহযোগিতা করে। স্কুল থেকে তাকে সব রকম সহযোগিতা দেওয়া হয়। 

ঘুচল ডাঙ্গাপাড়ার নারীদের অভাব

ঘুচল ডাঙ্গাপাড়ার নারীদের অভাব

অভাবমুক্ত জীবনযাপন একটি সুন্দর স্বপ্ন। প্রত্যেকেই চায় অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে এবং তার পরিবারের জন্য ভালো জীবনযাপন নিশ্চিত করতে। অভাব ঘুচানোর প্রধান পথ হলো কঠোর পরিশ্রম সঠিক পরিকল্পনা এবং সততার সঙ্গে আয়ের উৎস বৃদ্ধি করা। দক্ষতা উন্নয়ন সঞ্চয় প্রবণতা অপচয় রোধ এবং সময়ানুবর্তিতা আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করে। এছাড়া সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস ও শুকরিয়া আদায় মনে প্রশান্তি আনে এবং অভাব দূরীকরণে মানসিক শক্তি জোগায়। দেশের উত্তরাঞ্চলের এক সময় মঙ্গাপীড়িত এলাকার মানুষজনের অভাবের কথা আমরা কমবেশি সকলে অবগত। এই মঙ্গাপীড়িত মানুষজন কিভাবে অভাবকে মোকাবিলা করেছে এমন একটি বাস্তবতা কল্পকাহিনীকেও হার মানায়।  সাদেকা আক্তার একজন গৃহবধূ। স্বামীর ঘরের অভাবে তিনি আর হাত পা গুটে বসে থাকতে পারেননি। সংসারের অভাবের সঙ্গে লড়াই করে নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নে তিনি একা দেখেননি। সঙ্গে গ্রামের অভাবী নারীদের নিয়ে জোটগতভাবে সেই সংসারের অভাবের সঙ্গে লড়াই করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এ জন্য সাদেকা নেতৃত্বের গড়ে তোলা হয় একটি সমিতি। সেই সমিতির মাধ্যমে অভাব ঘুচেছে গ্রামের অন্যান্য নারীদেরও। উত্তরজনপদের বাহের দ্যাশ খ্যাত রংপুর অঞ্চলের তারাগঞ্জ উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে এই সাদেকা আক্তারের নেতৃত্বে নিজেদের অভাব দূর করে এগিয়ে চলেছেন এক ঝাঁক নারী।  সাদেকার জীবনের গল্পটা ছিল অন্যরকম। ২০০০ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয় সাদেকা আক্তারের। শ^শুরবাড়িতে অভাব লেগেই থাকতো। কখনো খাবার জুটতো, কখনো জুটতো না। অভাব থেকে বাঁচতে ২০০৩ সালের দিকে গ্রামের নারীদের নিয়ে সমিতি গঠনের উদ্যোগ নেন সাদেকা। সিদ্ধান্ত নেন সপ্তাহে মাত্র ১০ টাকা করে জমা করবেন বলে। সাদেকা প্রথমে নিজে হস্তশিল্প পণ্য তৈরি প্রশিক্ষণ নেন তারাগঞ্জ পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি কেন্দ্র থেকে। তারপর সেই প্রশিক্ষণ দেন সমিতির অন্য সদস্যদের। এরপর জমা করা টাকা দিয়ে সেলাই মেশিন কিনে শুরু করেন পোশাক তৈরির কাজ।  এ বিষয়ে সাদেকা আক্তার বলেন, বর্তমানে আমাদের সমিতিতে প্রায় দুইশ জনের মতো সদস্য। প্রত্যেক সদস্যের জমা করা টাকা দিয়ে আমরা সেলাই মেশিন কিনে তৈরি করছি বিভিন্ন হস্তশিল্প। মেশিনে মেশিনে কাজের পাশাপাশি হাতের এমব্রয়ডারি কাজের ফাঁকে ফাঁকে করতেছি। আবার মেশিনের এমব্রয়ডারি কাজও চালাইতেছি।  রংপুর জেলার তারাগঞ্জ উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে সাদেকার নেতৃত্বে তৈরি হয় বেগম রোকেয়া মহীয়সী নারী মহিলা উন্নয়ন সমিতি। শুধুই কাপড় সেলাই নয়, গ্রামের শতাধিক নারী নানান পেশায় যুক্ত। কেউ সেলাইয়ে আবার কেউ কাপড়ে নকশা করায় আবার কেউ গরু পালন বা মাছ চাষ করে সফল হয়েছেন। স্থানীয় হাটসহ আশপাশের বিভিন্ন হাটে তাদের তৈরি পোশাক, ব্যাগ ও নকশি কাথার যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। স্থানীয়রা জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারাও বলছেন, এই গ্রামের প্রায় শতভাগ শিশু বিদ্যালয়ে যায় এবং বাল্যবিবাহ বন্ধে গ্রামের বাসিন্দারা সচেতন। এমনকি এ গ্রামে অপরাধ সংগঠনের হারও কম।  সাদেকা সমিতির এক নারী আঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, সমিতির কারণে এলাকায় কোনো নারী নির্যাতন নেই। বাল্য বিবাহ নেই। আরেকজন নারী আয়শা সিদ্দিকা বলেন, মেশিন চালিয়ে সংসারের অনেক উন্নতি হয়েছে। গত ৬/৭ বছর ধরে এই মেশিনে বিভিন্ন কাপড়ে নকশা তৈরি করে আধা-পাকা বাড়ি দিয়েছি। এছাড়া আমার স্বামীকে একটি ভ্যান কিনে দিয়েছে। সমিতির সদস্যরা যে টাকা জমান তা পাঁচ বছর পর পর নিজেরা ভাগ করে নেন। সেই টাকা দিয়েই তারা গরু ছাগল পালন ও পুকুরে মাছ চাষ করেন। এছাড়া সমিতির সঞ্চয়ের টাকায় ১০টি গরু কেনা হয়েছে যেগুলো বর্গা দেওয়া আছে। এছাড়া গ্রামের ৫০ শতক জমি বন্ধক নিয়ে ধান ও কলা চাষ করা হয়েছে। একটি পুকুর ইজারা নিয়ে বিভিন্ন জাতের মাছ চাষ করা হচ্ছে। যা পরে বাজারজাত করে সমিতির খাতে জমা দেওয়া হয়। এছাড়া সেলিই মেশিন ক্রয় করা হয়েছে ২০টি। এখন সমিতির সদস্য ১৩০ জন নারী। পাশাপাশি সমিতির নারীদের নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে অবদান রাখায় স্বীকৃতি স্বরূপ রংপুর বিভাগীয় পর্যায়ে জয়িতা নির্বাচিত হয়েছিলেন সাদেকা।

যুদ্ধকালে সহযোগী ভূমিকা

যুদ্ধকালে সহযোগী ভূমিকা

উত্তাল মার্চ। স্বাধীনতার মাস। বছর ঘুরে এ মাস এলেই দলে দলে মহান মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও অংশগ্রহণের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠে। আরও ভেসে উঠে পাকি হায়েনা দলের এবং তাদের সহায়তাকারী আলবদর আল সামস ও রাজাকার বাহিনীর নিষ্ঠুর নির্মম বর্বরতা দৃশ্য। দলে দলে ভীত সন্ত্রস্ত নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ বনিতা ও শিশুরা দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সেই দৃশ্য এখনো যাটোর্ধ্ব বয়সী মানুষের চোখের সামনে ভেসে উঠে। বিশেষ করে সেই সময়ে শিশু ও নারী এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের কষ্ট ছিল সবচেয়ে বেশি। ইতিহাসের নৃশংসতম এ গণহত্যা, নারী নির্যাতন এবং জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে বাংলার জমিন ছারখাড় করে দেওয়া স্বাধীন বাংলাদেশে অভ্যুদয়ের সাক্ষী।  উত্তাল মার্চের এই দিনে মনে পড়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাফিনা লোহানীর কথা। একাত্তরের মার্চে তিনি ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। তিনি জীবদ্দশায় রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীতে পাকি হায়েনা দলের লালসা ও লাঞ্ছনার শিকার নারীদের একত্রিত করে সামাজিকভাবে এবং মমতাময়ী মায়ের দরদে লালন পালন করেছেন। স্বাধীনতার চার দশক পরেও সমাজে তার ছিলেন যেন অবাঞ্ছিত। লাঞ্ছনা, ধিক্কার ও তিরস্কার ছিল তাঁদের অনেকের নিত্যসঙ্গী। এসব নারী ছিলেন সমাজে চরম অসহায় অবস্থায়। তাদের মধ্যে রাহেলা বেগম, হাজেরা বেগম, কমলা বানু, হামিদা বেগমসহ প্রায় ১৫ জন নারী যারা স্বাধীনতার পর সমাজে কোথাও ঠাঁই পায়নি। স্বামী কিংবা বাবা-মা কেউ তাদের ঘরে তুলে নেয়নি। অন্যের বাড়ি কাজ করে খাবেন, তা-ও সম্ভব হয়নি, কেউ কাজও দিতে চায়নি তখন। তারা নিজ এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন দূরে। ঠাঁই নিয়েছিলেন রেললাইন কিংবা ওয়াপদা বাঁধের পাশের সরকারি জায়গায়। ছোট একটি কুঁড়েঘরে থেকেছেন অনেক দিন। খুব কষ্টে কাটছিল দিন। সদ্য স্বাধীন দেশে তারা নিজেদের লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। এজন্য তাদের চরম আর্থিক কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। কখনো কখনো উপোষ করতে হয়েছে। কয়েক বছর পর হঠাৎ করেই সাফিনা লোহানী খুঁজে বের করেন তাদের। এই চরম দুঃসময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাফিনা লোহানী তাদের পাশে এসে দাঁড়ান। খুঁজে খুঁজে বের করেন ১৫ জন নারীকে। তিনি মায়ের স্নেহ দিয়ে বুকে তুলে নেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়ে গিয়ে তাদের পরিচয় করিয়ে দেন। অভাব দূর করতে বিভিন্নভাবে টাকা সংগ্রহ করে তাদের মধ্যে বিতরণ করেছেন তিনি। তাদের সমাজে প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেন। আর্থিক সাহায্য করে তাদের স্ব-স্ব মর্যাদায় সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীতে তাদের বীরঙ্গনা নারী হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তারা পরিচয় পেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। সেই মমতাময়ী সাফিনা লোহানী, যিনি তালিকাভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, তার স্মৃতির প্রতি অতল শ্রদ্ধা এই উত্তাল মার্চে।  তিনি উত্তরণ মহিলা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। ছিলেন নারী নেত্রী। নারীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য, অসাধারণ। তাঁর প্রধান কাজ ছিল প্রতিষ্ঠানে নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। তিনি করেছেনও। শিক্ষিত অথচ বেকার এবং অসহায় নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য তিনি কাজ করেছেন। অদম্য সাহসী এই নারী জীবন চলার পথে নানা ঘাত-প্রতিঘাতসহ্য করেছেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মনোবল না হারিয়ে সামনে এগিয়ে গেছেন। তিনি উন্নয়ন কর্মী হিসেবে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে একাধিক সম্মাননা এবং পুরস্কার পেয়েছেন।  তাঁর স্বামী ছিলেন সিরাজগঞ্জ তথা উত্তারঞ্চলের প্রখ্যাত সাংবাদিক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম চৌধুরী। আমিনুল ইসলাম চৌধুরী তৎকালীন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্রনেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের মধ্যে তরুণ সংগঠক। একাত্তরের ৭ মার্চের পর আমিনুল ইসলাম চৌধুরী সিরাজগঞ্জে ফিরে এসে সাংগঠনিক কাজ শেষ করে চূড়ান্ত মুহূর্তে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে চলে যান গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাহুকায়। দুস্তর রাস্তায় গরু গাড়ি ছিল একমাত্র বাহন। সেখানে স্ত্রীকে রেখে তিনি যান মুক্তিযুদ্ধে। সিরাজগঞ্জের ভাটপিয়ারির যুদ্ধে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় বাড়ি ফেরেন। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী তাকে সেবা দেন এবং ক্রমান্বয়ে সুস্থ হয়ে উঠেন। সাফিনা লোহানী শুধু স্বামীকেই নয় রণাঙ্গনে ক্লান্ত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় এবং সেবা দিয়েছেন। তিনি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার খান সোনতলা গ্রামের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ফতেহ লোহানী, বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানের খ্যাতনামা পরিচালক টিভি ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানী এবং সাংবাদিক নেতা ও কলামিস্ট কামাল লোহানী পরিবারের সন্তান।