ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১

নারী ফুটবল দল অলিম্পিক বাছাইয়ে খেলতে না পারায় তোলপাড়

দুর্ভাগ্য ওদের না গোটা জাতির?

মজিবুর রহমান

প্রকাশিত: ২৩:২৬, ১ এপ্রিল ২০২৩

দুর্ভাগ্য ওদের না গোটা জাতির?

দেশে ফেরার পর ছাদ খোলা বাসে সাফ চ্যাম্পিয়ন নারী ফুটবলাররা

টাকার অভাবে অলিম্পিক বাছাই খেলতে পারল না নারী ফুটবল দল। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কি হতে পারে। অথচ মাত্র ছয় মাস আগেও পুরো বাংলাদেশ তাকিয়ে ছিল তাদের দিকে। কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনের পর অপেক্ষায় ছিল গোটা জাতি কখন দেশে ফিরবেন তারা। ধর্ম-বর্ণ পেছনে ফেলে গোটা জাতিকে এক মঞ্চে দাঁড় করিয়েছিলেন তারা দক্ষিণ এশিয়া জয় করে। অথচ সাফ জয়ী সাবিনা, সানজিদা কৃষ্ণারা টাকার অভাবে প্রাক অলিম্পিক খেলতে পারলেন না, এর চেয়ে লজ্জা আর কি হতে পারে।

৫ থেকে ১১ এপ্রিল  অনুষ্ঠিতব্য আসরে নারী ফুটবল দলকে মিয়ানমার পাঠাতে ব্যার্থ হয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। সাহায্য চেয়েও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন থেকে সাড়া মেলেনি, বলছেন বাফুফের শীর্ষ কর্মকর্তারা। যদিও এ নিয়ে রয়েছে মতবিরোধ। তবে বাস্তব সত্য হচ্ছে আক্ষেপে পুড়তে হচ্ছে জাতিকে গর্বিত করা নারী ফুটবলারদের। অনেকের মতে এটা জাতীয় লজ্জা। ধিক্কার জানানোর ভাষা নেই। মাত্র ৬০/৭০ লাখ টাকার জন্য ভেঙে চূর্ণ হয়ে গেল একটি স্বপ্ন। 
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক দেশ কি দেউলিয়া হয়ে গেছে? বাস্তবতা হচ্ছে মোটেই না, দেশ দেউলিয়া হয়নি। দেউলিয়া হয়ে গেছে দেশের ফুটবল ফেডারেশন। খেলাধুলার দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্তা-ব্যক্তিদের উদাসিনতাও কম দায়ী  নয়। ’টক অব দ্য কান্ট্রিতে’ পরিণত হওয়া এই ঘটনায় হতভম্ভ দেশের ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ। ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী  থাকতে সামান্য টাকার জন্য নারী ফুটবল দল অলিম্পিক বাছাই খেলতে পারল না, এটা বিশ্বাস করার মানুষ দেশে খুবই কম।

মেয়েদের যে কোনো বড় সাফল্যের প্রধানমন্ত্রী দেওয়া সংবর্ধনা ও আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টা সর্ব মহলে প্রশংসিত। গোটা দলকে তিনি কোটি কোটি টাকা দিয়েছেন। আর অলিম্পিক বাছাই খেলার জন্য প্রধানমন্ত্রী ৬০ লাখ দেবেন না এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে সময়ের সঙ্গে একে একে বেরিয়ে আসছে গাফিলতির চিত্র। জানা গেছে বাফুফে অবহিত করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে। কিন্তু মন্ত্রণালয় অবহিত করেনি দেশের খেলাধূলার ‘জননীখ্যাত’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। এটা কারও মনগড়া নয়, সচেতন মানুষের কথা।

প্রধানমন্ত্রীর কানে গেলে কিছুতেই হ্নদয় ভাঙ্গা আর্তনাদ সঙ্গী হতো না দেশকে গৌরবময় সাফল্য উপহার দেওয়া নারী ফুটবলারদের। এই দায় এড়াতে পারবে না মন্ত্রণালয়। তার চেয়েও বড় কথা ফেডারেশন শেষ মুহূর্তে টাকার অভাবের কথা বলে কেন বাতিল করলো সফর। আন্তর্জাতিক শিডিউল অনুযায়ী দুই বছর আগেই নির্ধারিত ছিল অলিম্পিক বাছাইয়ে অংশ নেবে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। ফলে দল পাঠানোর প্রক্রিয়া আগেই কেন চূড়ান্ত করা হয়নি। অর্থ সংকটের বিষয়টা আরও আগে কেন  সরকারকে অবহিত করা হয়নি? 
যদিও এ প্রসঙ্গে বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের সাফ কথা, আমি চেষ্টায় ছিলাম। যখন দেখলাম পারছি না তখন সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়েছি। কিন্তু কেউ সাড়া দেয়নি। সবাই না করে দিয়েছে। মাফ চেয়ে ভিখারীকে যেভাবে বিদায় করা হয়, আমাকেও তাই করা হয়েছে। এই মেয়েদের টানা ১০/১২ বছর তো চালিয়েছি। চেষ্টা করেছি সব ধরনের টুর্নামেন্টে খেলাতে। এখন আর পারছি না। ভিক্ষা করতে আর ভালো লাগেনা। আজকাল কেউ দিতেও চায় না। দুই মিলিয়েই বাফুফে এখন অসহায়। মেয়েদের কস্ট আমি বুঝি। আমারও খুব খারাপ লাগছে।

মুঠোফোনে গতকাল শনিবার  সালাউদ্দিন জনকন্ঠকে আরও বলেন, আশা করি আগামীতে এই সমস্যা থাকবে না। সরকারের সহযোগিতা ও স্পন্সরের মাধ্যমে আবার নতুন দিগন্তের পথে হাঁটবে মেয়েরা। মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে দেরি করে চিঠি দেওয়া হয়েছে, মাত্র দুই সপ্তাহ আগে। সরকারী অর্থ ছাড়ের নির্ধারিত একটা সময় লাগে। সালাউদ্দিনের উত্তর, আমি চেষ্টা না করে তো আপনার কাছে হাত পাততে পারি না। যখন অনুমান করলাম হবে না, তখনই জানিয়েছি। আমি মনে করি সময় কোনো বিষয় না। সদিচ্ছার অভাব।
বাফুফে নারী ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণের প্রতিক্রিয়া, বিষয়টা দুঃখজনক। খুবই খারাপ লাগছে। তবে বাস্তবতাও মানতে হবে। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের  বক্তব্যের সঙ্গে আমিও একমত। চিঠি একটু দেরীতেই পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তারা বলতে পারত, আপনারা চালিয়ে নেন, আমরা দেখছি। এই কথা বলে অন্তত আশ্বস্ত করলেও যে কোনো উপায়ে, ধারদেনা করে মেয়েদের খেলতে পাঠাতাম। ওখান থেকে তো সরাসরি না’ করে দেওয়া হয়েছে।

ফলে নিরুপায় হয়ে প্রতিযোগিতা থেকে নাম প্রত্যাহার করতে হয়েছে। এখন নানা জায়গা থেকে শুনছি, অনেকেই সহযোগিতা করতে চাচ্ছেন। কিন্তু সে সুযোগ নেই। দুই তিনদিন আগে  বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে ফিফা, এএফসি ও অলিম্পিককে। কিরণ বলেন, আগামীতে মেয়েদের অনেক প্রোগ্রাম আছে। তখন চিঠি দিয়ে  উনাদের কাছে সহযোগিতা চাইব প্রয়োজনে।  
এদিকে বাফুফের সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম জনকণ্ঠকে জানান, অংশগ্রহণ না করায় সাত থেকে আট হাজার ডলার জরিমানা গুনতে হবে বাংলাদেশকে। নাম প্রত্যাহারের বিষয়ে তারও একই কথা ’টাকার অভাব’। তিনি জানান, আগামীকাল সোমবার বাংলাদেশ নারী দলের মিয়ানমার যাওয়ার কথা ছিল। প্রতিযোগিতায় স্বাগতিক মিয়ানমার, ইরান ও মালদ্বীপের সঙ্গে খেলার কথা ছিল বাংলাদেশের।

উল্লেখ্য, গত বুধবার আবু নাঈমের ঘোষণার পরই সবাই জানতে পারেন অলিম্পিক বাছাই খেলা হচ্ছে নারী ফুটবল দলের। তার এই ঘোষণার পর যেন আকাশ ভেঙে পড়ে ফুটবলারদের ওপর। অনুশীলন মাঠ থেকে ক্যাম্পে ফিরেন তারা একরাশ হতাশা নিয়ে। বাফুফের নির্দেশ, গণমাধ্যমে  প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে না। ফলে নিজেদের কষ্টের কথা বলতে পারছেন না তারা।
নেপালের কাঠমান্ডুতে সাফ চ্যাম্পিয়ন  হয়ে এই মেয়েরা উৎসবে ভাসিয়েছিলেন দেশের মানুষকে।  বিমানবন্দর থেকে ছাদখোলা বাসে করে তাদের মতিঝিলের ফুটবল ভবনে আনা হয়েছিল রাজসিক সংবর্ধনা দিয়ে। দক্ষিণ এশিয়া জয় করে ফেরা বাংলার বাঘীনিদের বহনকারী বাসের সামনে-পেছনে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা। বিজয়ীদের এক নজর দেখতে, স্বাগত জানাতে সড়কের দুইপাশে দীর্ঘ লাইন। লাখো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত  সেই মেয়েরাই এখন অবহেলিত।

মাত্র ৬ মাসের ব্যবধানে  নারী ফুটবল দলকে হতাশার আগুনে পুড়তে হচ্ছে নিজ মাটিতে। অথচ এই মেয়েরা দেশে ফেরার পর তাদের পাশে বসা ও দাঁড়ানো নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা। লড়াই শুরু হয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ও মিডিয়া ব্রিফিংয়ে মেয়েদের পাশে থেকে চেহারা দেখানোর। সেই দলটিকেই বঞ্চিত করা হয়েছে অলিম্পিকের মতো বড় মঞ্চের বাছাইয়ে অংশ নেওয়া থেকে। মেয়েদের ফুটবলে বড় স্পন্সর ঢাকা ব্যাংক। বছরে তারা প্রায় দুই কোটি টাকা দিয়ে থাকে। সম্প্রতি তিন বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপ। দুই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেই নারী ফুটবলারদের সব ধরনের পৃষ্ঠযোষকতা করা। তারপরও কেন এই অর্থ সংকট?

×