ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

বায়ু দূষণে মৃত্যু

প্রকাশিত: ২০:৩২, ১২ জুন ২০২৪

বায়ু দূষণে মৃত্যু

সম্পাদকীয়

সারাবিশ্বে ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বায়ু দূষণে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটেছে। এর জন্য প্রধানত দায়ী অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বনাঞ্চল ধ্বংস, ইটভাঁটি, কলকারখানার কালো ধোঁয়া, জীবাশ্ম জ্বালানি, যুদ্ধবিগ্রহ, দাবানল, মানবসৃষ্ট নির্গমন সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব। সিঙ্গাপুরের নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় উঠে এসেছে এ উদ্বেগজনক তথ্য।

তাতে বলা হয়েছে, উষ্ণ মহাসাগরীয় স্রোত এল নিনো এবং ভারত মহাসাগরে ডাইপোলের মতো আবহাওয়ার ঘটনাগুলো বাতাসে দূষণের মাত্রা বাড়াচ্ছে। ফলে, বায়ু দূষণে সর্বোচ্চ মৃত্যু ঘটছে এশিয়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বস্তুকণা পিএম-২৫ হলো বাতাসে থাকা সব ধরনের কঠিন ও তরল বস্তুকণার সমষ্টি, যেগুলোর  বেশিরভাগই বিপজ্জনক। প্রাণঘাতী ক্যান্সার ও হৃদরোগের সমস্যা তৈরি করে থাকে।

এনভায়রনমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল সাময়িকীতে প্রকাশিত সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এ সময় সীমার মধ্যে এশিয়ার ৯ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটেছে। যাদের বেশির ভাগই মারা গেছে চীন, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও জাপানে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শুধু বায়ু দূষণের কারণে  বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৬৭ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। 
রাজধানী  ঢাকা বায়ু দূষণের জন্য বিশ্বে প্রায়ই শীর্ষ স্থান দখল করে থাকে। বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী  আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে  ঢাকার অবস্থান ২ থেকে ৪ এর মধ্যে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,  ঢাকার বায়ু দূষণের জন্য দায়ী প্রধানত নির্মাণ কাজের ধুলা, শিল্পকারখানা-ইটভাঁটি ও যানবাহনের ধোঁয়া। রান্নাবান্না ও শীত নিবারণে কয়লা, লাকড়িসহ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারও কম দায়ী নয়।

প্রতিনিয়ত বায়ু দূষণের জন্য এমনকি প্রতিবেশী দেশের সীমান্তের ওপার থেকে ধেয়ে আসা দূষিত বায়ুকেও দায়ী করা হয়েছে। দেশে পরিবেশ অধিদপ্তর ও দুই সিটি করপোরেশনের দায়ও কম নয় কোনো অংশে। বলাবাহুল্য, তাদের কার্যক্রম সীমিত ও অপর্যাপ্ত। বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে ২৯ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তবে বায়ু দূষণসহ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সংশ্লিষ্টদের বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ ও কার্যক্রম দৃশ্যমান নয় এখনো। ফলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, সর্দিকাশি, জ্বরসহ রোগব্যাধি বাড়ছেই। বিশ্বব্যাংক বলেছে, বায়ু দূষণের কারণে বিভিন্ন  রোগ-বালাইয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিবছর ১ লাখ ৮৬ হাজার মানুষ মারা যায়, যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশও।
বাংলাদেশে বায়ু দূষণের ফলে প্রতিবছর জাতীয় প্রবৃদ্ধির প্রায় ৯ শতাংশ ক্ষতি হয়ে থাকে। ৩২ শতাংশ মৃত্যু ঘটে থাকে পরিবেশ দূষণের কারণে। বায়ু দূষণ ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য যথাযথ নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব। সেটি সম্ভব হলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় দশ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা পেতে পারে।

ঢাকায় বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আয়োজিত ‘কান্ট্রি ক্লাইমেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণ ২১ দশমিক ৮ শতাংশ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মাধ্যমে বায়ু দূষণ কমানো, স্বাস্থ্য ব্যয় হ্রাস এবং কর্মসংস্থানের সুবিধা পাওয়া যাবে।

বায়ু দূষণ প্রতিরোধে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতেও গুরুত্বারোপ করতে হবে। এর পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ মাত্রায় দায়িত্বশীল সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

×