ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০২ মার্চ ২০২৪, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০

তৈরি পোশাক খাত ॥ রুখতে হবে ষড়যন্ত্র

মিলু শামস

প্রকাশিত: ২০:২৯, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

তৈরি পোশাক খাত ॥ রুখতে হবে ষড়যন্ত্র

আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তৈরি পোশাক খাত নিয়ে

আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তৈরি পোশাক খাত নিয়ে। কাভার্ডভ্যানের নাটবল্টু খুলে বিদেশী শিপমেন্টের কাপড় চুরির যে অভিনব কৌশলের সংবাদ এসেছে তা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। কার্টন খুলে কাপড় বের করে সেখানে ভরে দেওয়া হয়েছে ঝুট জাতীয় আবর্জনা। এই বের করা এবং রি-প্যাকিং করার কাজটি কোনো দুর্বৃত্তের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়, এর পেছনে সংঘবদ্ধ চক্রের যোগসাজশ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। দেশ থেকে পণ্য রপ্তানি হয়ে ব্রাজিলের বাজারে গিয়ে ধরা পড়েছে এ কারসাজি। এরপর র‌্যাবের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে- সত্যিই এর পেছনে রয়েছে সংঘবদ্ধ চক্র। দুয়েকজন ধরাও পড়েছে ইতোমধ্যে। 
গত দু’দশকে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর অর্থনীতির মূল ঝোঁক অনুৎপাদনশীল খাতের দিকে হলেও বাংলাদেশ পোশাক শিল্পের মতো উৎপাদনশীল খাত নিয়ে বিশ্ববাজারে দাপটের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। করোনার প্রভাবজনিত অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে নেতৃত্ব দিয়েছে তৈরি পোশাক খাত। করোনাকালে ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত ক্রেতারা ফিরেছেন। ফিরেছে বাতিল হওয়া ক্রয়াদেশ। আগের বছরের তুলনায় সত্তর আশি শতাংশ বেশি ক্রয়াদেশ এসেছে।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায়ও এ খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের প্রায় সবই লকডাউনের জন্য বন্ধ থাকায় সেসব দেশের অর্ডারও বাংলাদেশ পেয়েছে। কেননা, লকডাউনে দেশের পোশাক কারখানা খোলা ছিল। গত বছর করোনার প্রকোপ বৃদ্ধি পেলে পোশাক কারখানাগুলোও লকডাউনের আওতায় রাখা হয়েছিল। তবে পোশাক শিল্প মালিক এবং শ্রমিকসহ এর সঙ্গে জড়িতদের চাওয়া অনুযায়ী পোশাক কারখানার লকডাউন তুলে দেওয়া হয়েছিল।

তাই বিদেশী ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ বাতিল হয়নি। মার খায়নি পোশাক শিল্প, ঝুঁকির মুখে পড়েনি প্রবৃদ্ধি। করোনার ঝড়ঝাপ্টা সফলভাবে কাটিয়ে আসার পর এ ধরনের আত্মঘাতী কর্মকা- খুবই দুঃখজনক। এর সঙ্গে যারা জড়িত কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত তাদের।
গত শতকের সত্তর দশকে এদেশের তৈরি পোশাকের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ। রফতানি প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা এই অর্জন অনেক সময়ই অনেকের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। বিশেষত প্রতিযোগীদের মধ্যে যখন রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দুই ক্ষমতাধর দেশ এবং এ অঞ্চলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভরকেন্দ্র হিসেবে ক্রমশ তাদের অবস্থান শক্ত। সুতরাং এ খাতকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যে নেওয়া উচিত তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এ শিল্পের সঙ্গে শুধু মালিকপক্ষের লাভ জড়িত নয়। এর সঙ্গে শ্রমিক, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, শিল্প ব্যাংক, বিমাসহ দেশের সার্বিক অর্থনীতি জড়িত। দু’হাজার দশ-এগারো অর্থবছরে দু’হাজার দু’শ’ বিরানব্বই কোটি ডলারের রফতানি আয়ের মধ্যে পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছে এক হাজার সাত শ’ একানব্বই কোটি ডলারেরও বেশি। তখন কারখানা বন্ধ থাকায় প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার রফতানি বন্ধ ছিল। অসংখ্য রফতানি আদেশ প্রত্যাহার হয়েছে। ক্রেতাদের কাছে যে মেসেজ গিয়েছিল, তাতে বাংলাদেশের ওপর আস্থা হারানো তাদের জন্য ছিল স্বাভাবিক।

বিজিএমইএ সভাপতি প্রচারমাধ্যমে জানিয়েছিলেন, পোশাক শিল্পে সহিংসতার প্রতিবাদে কারখানা বন্ধের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন দেশের অন্যসব তৈরি পোশাক কারখানা মালিকরা। সহিংসতা বন্ধ না হলে তারাও কারখানা বন্ধের ঘোষণা দিয়ে প্রতীকী চাবি তুলে দিয়েছিলেন তার হাতে। সব মিলে যে পরিস্থিতি তৈরি পোশাক খাতে চলেছিল, তাকে সুস্থ বা স্বাভাবিক বলা যায় না। অনেকে মনে করেছেন নেপথ্যে বড় ধরনের কোনো হিসাব-নিকাশের মহড়া রয়েছে। সব সহিংসতা ষড়যন্ত্র সামলে তৈরি পোশাক খাত এগিয়ে চলেছে। করোনা দুর্যোগেও আর্থিক স্থিতিশীলতার ভরসা দিয়েছে।
সামাজিক ব্যবসা, শেয়ার ব্যবসা, ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের ওপর বিমা, রিয়েল এস্টেট ব্যবসাকে উৎসাহিত করা ইত্যাদি অনুৎপাদনশীল খাতকে গত দু’দশকের বেশি সময় ধরে অনেক গুরুত্ব দিচ্ছে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদ। সেদিক থেকে বলা যায়, পুঁজিবাদের চরিত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বিশেষ করে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর আর্থিক খাত উৎপাদনশীলতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। উৎপাদনশীল খাতের চেয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে পুঁজির লগ্নি বহুগুণ বেড়েছে। পঞ্চাশের দশকে মার্কিন অর্থনীতিতে মোট কর্পোরেট মুনাফার শতকরা আট ভাগ এসেছিল অনুৎপাদনশীল খাত থেকে। দু’হাজার সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় শতকরা একত্রিশ ভাগে।

সে বছর অনুৎপাদনশীল আর্থিক খাতে মোট জাতীয় উৎপাদনের শতকরা সাড়ে তিনগুণ ঋণ দেওয়া হয়েছিল। পুঁজির এ অসামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থান বিশ্ব পুঁজিবাদের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। গত শতকের সত্তর দশক পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের শতকরা নব্বই ভাগ ছিল বাণিজ্য ও উৎপাদনশীল খাতের সঙ্গে জড়িত। এই পুরো অংশ এখন চলে গেছে অনুৎপাদনশীল খাতে। এর আন্তর্জাতিক প্রভাব থেকে মুক্ত নয় বাংলাদেশও। আটাত্তর সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে চলা উৎপাদনশীল তৈরি পোশাক খাত সে সময় টলে উঠছিল।
দারিদ্র্য ও  বৈষম্য দূর করতে ক্ষুদ্র ঋণের ফর্মুলা এসেছিল এক সময়। এ পদ্ধতি নাকি ধন্বন্তরী, দাওয়াই দিয়েছিলেন আমাদের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ। ইউনূস সেন্টারের আয়োজনে ওই অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ভাষণে ড. ইউনূস বলেছিলেন, সামাজিক ব্যবসার অর্থনৈতিক প্রভাবের কথা। বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামো আর প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনায় মানুষ ভুগছে। দারিদ্র্য দূর হচ্ছে না, তাই দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য দূর করার জন্য সবাইকে সোচ্চার হতে বলেছেন। ব্যক্তির ‘অপরিসীম’ ক্ষমতায় বিশ্বাসী তিনি বলেছিলেন, ‘ব্যক্তি নিজেই সব কিছু বদলে দিতে পারে, তাই আমরা যদি সামাজিক ব্যবসার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তাহলে দেখব অপরিসীম সম্ভাবনার এক নতুন পৃথিবী।’

কথাগুলোয় উত্তর আধুনিকতাবাদীদের কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনিই শোনা যায় যেন। উত্তর আধুনিকরা সংগঠিত জনশক্তিকে সমর্থন করেন না। কারণ, সংগঠন মানে তাদের মতে ব্যক্তির জন্য কারাগার। এতে ব্যক্তির স্বাধীনতা ক্ষুণœ হয়। তারা ঐক্যের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না, ব্যক্তির নিজস্বতার ওপর নির্ভর করতে চান। ড. ইউনূসও তাই। সামাজিক ব্যবসা নামের পরিবর্তনের চাবিকাঠি আসলে ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন রাখার ঢাল-তলোয়ারের একটি উপাদান মাত্র।

বিচ্ছিন্নতা সহিংসতা ছড়ায়, সংগঠন আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়। সামাজিক ব্যবসা, ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরাম ইত্যাদি অনুৎপাদনশীল খাতকেই উৎসাহিত করে। দেশের শক্তিশালী উৎপাদনশীল খাত যেন সব অপপ্রভাব কাটিয়ে সুসংগঠিতভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে এগিয়ে যেতে পারে, সেদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। 
পোশাক কারখানা চালু থাকা মানে অসংখ্য শ্রমিকের জীবনোপখ্যানের ভিত শক্ত থাকা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ছোটখাটো অনেক উৎপাদনশীল খাত। পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকরা বাঁচিয়ে রেখেছেন দেশী প্রসাধন কোম্পানি থেকে শুরু করে দেশী টেক্সটাইল, স্যান্ডেল-জুতা উৎপাদনকারী বহু প্রতিষ্ঠান। এসবের এক বড় অংশের ক্রেতা পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকরা। তাদের আয়ের উৎস সচল থাকা মানে এ সব কিছু সচল থাকা। তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতি ঘুড়ে দাঁড়ানোয় সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ নিয়ে যে কেনো ষড়যন্ত্র, আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড কঠোর হাতে রুখতে হবে।

×