ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

প্রসঙ্গ ইসলাম

মহীয়সী মা হযরত ফাতিমাতুজ জোহরা (রা.)

মনিরুল ইসলাম রফিক

প্রকাশিত: ২০:৪৭, ১১ আগস্ট ২০২২

মহীয়সী মা হযরত ফাতিমাতুজ জোহরা (রা.)

ইসলাম প্রসঙ্গে

গত শুক্রবার আমরা এ কলামে শহীদে কারবালা ইমাম হোসাইনের মহীয়সী মা হযরত ফাতিমাতুজ জোহরা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা সম্পর্কে আলোচনা করেছিলামআজ তারই ধারাবাহিকতায় আরও কিছু কথাহযরত ফাতিমা একজন মহিলা হিসেবে, একজন গৃহকর্ত্রী হিসেবে, একজন মা হিসেবে আমাদের সকলের আদর্শকিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজ আমাদের সমাজে ফাতিমা, জোহরা নামের সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে মা ফাতিমার আদর্শের নারী সমাজ

ইসলামের ইতিহাসের অনেক ঘটনার সঙ্গে মা ফাতিমার ভূমিকা জড়িতযে রাতে রাসূল (সা.) মদীনায় হিজরত করলেন সে রাতে আলী (রা.) যে দুঃসাহসিক ভূমিকা পালন করেন, ফাতিমা (রা.) অতি নিকট থেকে তা প্রত্যক্ষ করেনআলী (রা.) নিজের জীবন বাজি রেখে কুরাইশ পাষ-দের ধোঁকা দেয়ার উদ্দেশ্যে রাসূল (সা.) এর বিছানায় শুয়ে থাকেনসেই ভয়াবহ রাতে ফাতিমাও বাড়িতে ছিলেনঅত্যন্ত নির্ভীকভাবে কুরাইশদের সব চাপ প্রত্যাখ্যান করেন

রাসূল (সা.) মদীনায় একটু স্থির হওয়ার পর  হিজরী দ্বিতীয় সনে বদর যুদ্ধের পরে আলী (রা.) এর সঙ্গে ফাতিমা (রা.) এর বিয়ে হয়একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা.) হযরত আয়িশাকে (রা.) ঘরে উঠিয়ে নেয়ার চার মাস পরে আলী ফাতিমা (রা.) এর বিয়ে হয় এবং বিয়ের নয় মাস পরে তাদের বাসর হয়বিয়ের সময় ফাতিমা (রা.) এর বয়স পনেরো বছর সাড়ে পাঁচ মাস এবং আলীর বয়স একুশ বছর পাঁচ মাস

ফাতিমা (রা.) এর সঙ্গে কিভাবে বিয়ে হয়েছিল সে সম্পর্কে আলী (রা.) এর বর্ণনা এ রকম: রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট ফাতিমার বিয়ের পয়গাম এলোতখন আমার এক দাসী আমাকে বললেন: আপনি কি একথা জানেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট ফাতিমার বিয়ের পয়গাম এসেছেবললাম: নাসে বলল: হাঁ পয়গাম এসেছেআপনি রাসূলুল্লাহ  (সা.) এর নিকট কেন যাচ্ছেন না? আপনি গেলে রাসূলুল্লাহ (সা.) আপনার সঙ্গে ফাতিমাকে বিয়ে দেবেনবললাম: বিয়ে করার মতো আমার কিছু আছে কি? সে বলল: যদি আপনি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে যান, তাহলে তিনি অবশ্যই আপনার সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেবেন

আলী (রা.) বললেন : আল্লাহর কসম! সে আমাকে এভাবে আশা ভরসা দিতে থাকেঅবশেষে আমি একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে  গেলামতাঁর সামনে বসার পর আমি যেন বোবা হয়ে গেলামতাঁর মহত্ত্ব ও তাঁর মধ্যে বিরাজমান গাম্ভীর্য ও ভীতির ভাবের কারণেই আমি কোন কথাই বলতে পারলাম নাএক সময় তিনিই আমাকে প্রশ্ন করলেন: কি জন্য এসেছ? কোন প্রয়োজন আছে কিআলী (রা.) বলেন: আমি চুপ করে থাকলামরাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, নিশ্চয় ফাতিমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে এসেছ? আম বললাম: হ্যাঁতিনি বললেন: তোমার কাছে এমন কিছু আছে কি যা দ্বারা তুমি তাঁকে হালাল করবে? বললাম: আল্লাহর কসম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! নেইতিনি বললেন: তিনি বললেন, যে বর্মটি আমি তোমাকে দিয়েছিলাম সেটা কি করেছ? বললাম, সেটা আমার কাছে আছে

আলীর জীবন যে সত্তার হাতে তাঁর কসম, সেটা তো হুতামীবর্মতার দাম চার দিরহামও হবে নারাসূলুল্লাহ বললেন, আমি তারই বিনিময়ে ফাতিমাকে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিলামসেটা তাঁর কাছে পাঠিয়ে দাও এবং তা দ্বারা তাঁকে  হালাল করে নাওআলী (রা.) বলেন: এই ছিল ফাতিমা বিনতে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর মহরআলী (রা.)  খুব দ্রুত বাড়ি গিয়ে বর্মটি নিয়ে আসেনকনেকে সাজগোজের জিনিসপত্র কেনার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) সেটি বিক্রি করতে বললেনবর্মটি হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) চারশত সত্তর (৪৭০) দিরহামে কেনেনসব ঠিকঠাক  হয়ে গেলে রাসূল (সা.) সাহাবীদের ডেকে পাঠানতারা উপস্থিত হলে তিনি ঘোষণা দেন যে, তিনি তাঁর মেয়ে ফাতিমাকে চারশমিছকাল রূপার বিনিময়ে আলীর সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেনতারপর আরবের প্রথা অনুযায়ী কনের পক্ষ থেকে রাসূল (সা.) ও বর আলী (রা.)  নিজে সংক্ষিপ্ত খুতবা দান করেনতারপর উপস্থিত অতিথি সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে খোরমা ভর্তি একটা পাত্র উপস্থাপন করা হয়

এভাবে অতি সাধারণ ও সাদাসিধেভাবে আলীর সঙ্গে নবী দুহিতা ফাতিমাতুজ  জোহরার শাদি মুবারক সম্পন্ন হয়অন্য কথায় ইসলামের দীর্ঘ ইতহাসের সবচেয়ে মহান ও গৌরবময় বৈবাহিক সম্পর্কটি স্থাপিত হয়

মদীনায় আসার পর রজব মাসে এ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় আর হিজরী দ্বিতীয় সনে বদর যুদ্ধের পর আলী (রা.) তাঁর স্ত্রীকে উঠিয়ে নেয়ার জন্য একটি ঘর ভাড়া করতে সক্ষম হনবানু আবদিল মুত্তালিব এই বিয়ে উপলক্ষে জাঁকজমকপূর্ণ এমন একটা ভোজ অনুষ্ঠান করেছিলেন যে, তেমন অনুষ্ঠান নাকি এর আগে তারা আর করেননিবিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে হযরত উম্মে সালমা কনেকে নিয়ে বরের বাড়িতে যান

ঈশার নামাযের পর দাফতরিক ঝামেলামুক্ত হয়ে নবীজী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আলী (রা.) এর বাড়ি গেলেনআলাপচারিতার ফাঁকে তিনি একটু পানি আনতে বললেনপানি আনা হলে কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে তাতে ফুঁক  দিলেনসেই পানির কিছু বর-কনেকে পান করাতে বললেনঅবশিষ্ট পানি দিয়ে রাসূল (সা.) নিচে ধরে রাখা একটি পাত্রের মধ্যে অজু করলেনসেই পানি তাদের দুজনের মাথায় ছিটিয়ে দিলেন

তারপর এই দুআ করতে করতে যাওয়ার জন্য উঠলেন: আল্লাহুম্মা বারিক ফীহিমা ওয়া বারিক আলাইহিমা ওয়া বারিক লাহুমা ফি নাসালিহিমা- হে আল্লাহ ! তুমি তাদের দুজনের মধ্যে বরকত দান করহে আল্লাহ! তুমি তাদের দুজনকে কল্যাণ দান করহে আল্লাহ! তাদের বংশধারায় সমৃদ্ধি দান কর

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, যাবার সময় তিনি মেয়েকে লক্ষ্য করে বলেন: ফাতিমা! তুমি মন খারাপ করবে না, তুমি বিশ্বাস রাখবে আমি আল্লাহ পাকেরই নির্দেশে ও ইশারায় আমার পরিবারের সবচেয়ে ভাল সদস্যের সঙ্গে তোমার  বিয়ে দেয়ার বিষয়ে কোন ত্রুটি করিনি

এর আগে ফাতিমা মনে হয় বর দরিদ্র হওয়ার কারণে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেনজবাবে হযরত বলেছিলেন: মা, সে দুনিয়াতে একজন নেতা এবং আখিরাতেও সে সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিদের একজন হবেসাহাবীদের মধ্যে তার জ্ঞান বেশিসে একজন বিচক্ষণওতাছাড়া সবার আগে সে ইসলাম গ্রহণ করেছে- (তাবাকাত ৮/১৫,২৮: তারাযিমু সাইয়েদাতি বাইত আন নবুয়াহ -৬০৮)। 

পিতৃগৃহ থেকে  ফাতিমা যে স্বামী গৃহে যান সেখানে কোন প্রাচুর্য ছিল নাবরং সেখানে যা ছিল তাকে দারিদ্র্যের কঠোর বাস্তবতাই বলা সঙ্গতসে ক্ষেত্রে তাঁর অন্য বোনদের স্বামীদের আর্থিক অবস্থা তুলনামূলক অনেক ভাল ছিলযায়নাবের বিয়ে হয় আবুল আস (রা.) এর সঙ্গেতিনি মক্কার অন্যতম ধনী ব্যক্তি ছিলেনরুকাইয়্যা ও উম্মে কুলসুমের বিয়ে হয় উসমান ইবন আফ্ফান (রা.) এর সঙ্গেআর উসমান ছিলেন একজন বিত্তবান ব্যক্তিতাঁদের তুলনায় আলী (রা.) ছিলেন একজন নিতান্ত দরিদ্র মানুষতাঁর পিতা মক্কার সবচেয়ে সম্মানীয় ব্যক্তি ছিলেন

তবে তেমন অর্থ-বিত্তের  মালিক ছিলেন নাতার সন্তান ছিল অনেকতাই বোঝা লাঘবের জন্য মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর চাচা আব্বাস তাঁর দুই ছেলের লালন পালনের  ভার গ্রহণ করেনএভাবে আলী (রা.) যুক্ত হয়েছিলেন মুহাম্মদ (সা.) এর পরিবারের সঙ্গে

ফাতিমা স্বামীর  ঘরে গিয়ে পেলেন খেজুর গাছের ছাল ভর্তি চামড়ার বালিশ, বিছানা, এক জোড়া যাঁতা, দুটো মশক, দুটো পানির ঘড়া, আর আতর-সুগন্ধিস্বামী দারিদ্র্যের কারণে ঘর গৃহস্থালীর কাজ-কর্মে তাঁকে সহায়তা করার জন্য অথবা অপেক্ষাকৃত কঠিন কাজগুলো করার জন্য কোন চাকর-চাকরানী দিতে পারেননিফাতিমা (রা.) একাই সব ধরনের কাজ সম্পাদন করতেনযাঁতা ঘুরাতে ঘুরাতে তাঁর হাতে কড়া পড়ে যায়, মশক ভর্তি পানি টানতে টানতে বুকে দাগ হয়ে যায় এবং ঘরবাড়ি ঝাড়দিতে দিতে পরিহিত কাপড়-চোপড় ময়লা হয়ে যেততাঁর এভাবে কাজ করা আলী (রা.) মেনে নিতে  পারতেন নাকিন্তু তাঁর করারও কিছু ছিল নাযতটুকু পারতেন নিজে তাঁর কাজে সাহায্য করতেনতিনি সব সময় ফাতিমা (রা.) এর স্বাস্থ্যের বিষয়ে সতর্ক থাকতেন

এসময় ফাতিমার পিতা রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও যুদ্ধবন্দীসহ বিজয়ীর বেশে একটি যুদ্ধ থেকে মদীনায় ফিরলেনআলী (রা.) একদিন বললেন : ফাতিমা! তোমার এমন কষ্ট দেখে আমার বড় দুঃখ হয়আল্লাহ তায়ালা অনেক যুদ্ধবন্দী দিয়েছেনতুমি যদি তোমার পিতার কছে গিয়ে তোমার  সেবার জন্য যুদ্ধবন্দী একটি দাসের জন্য আবেদন জানাতে! ফাতিমা ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় হাতের যাঁতা পাশে সরিয়ে রাখতে রাখতে বলেন: আমি যাব ইনশাআল্লাহতারপর বাড়ির আঙিনায় একটু বিশ্রাম নিয়ে চাদর দিয়ে গা-মাথা ঢেকে ধীর পায়ে পিতৃগৃহের  দিকে বেরিয়ে গেলেন

পিতা তাঁকে কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করলেন : মেয়ে ! কেন এসেছ? ফাতিমা বললেন: আপনাকে সালাম করতে এসেছিতিনি লজ্জায় পিতাকে মনের কথাটি বলতে পারলেন নাবাড়ি ফিরে এলেন এবং স্বামীকে সে কথা বললেনআলী (রা.) এবার ফাতিমাকে সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট গেলেনফাতিমা পিতার সামনে লজ্জায় মুখ নিচু করে নিজের প্রয়োজনের কথাটি এবার বলে ফেলেনপিতা তাঁকে বলেন: মাগো,আল্লাহর কসম! তোমাদেরকে আমি একটি দাসও দিতে পারছি নাগরিব নিঃস্ব আহলুস সুফ্ফার লোকেরা না খেয়ে নিদারুণ কষ্টে আছেতাদের জন্য আমি কিছুই করতে পারছি নাএগুলো বিক্রি করে সে অর্থ দিয়ে আমি তাদের জন্য খরচ করব

একথা শুনার পর তারা স্বামী-স্ত্রী দুজন  পিতাকে ধন্যবাদ দিয়ে ঘরে ফিরে আসেনতাদেরকে এভাবে খালি হাতে ফেরত দিয়ে স্নেহশীল পিতা যে পরম শান্তিতে থাকতে পেরেছিলেন তা কিন্তু  নয়সারাটি দিন কর্মক্লান্ত আদরের মেয়েটির চেহারা তাঁর মনের মধ্যে ভাসতে থাকেসন্ধ্যা হলোঠা-াও ছিল প্রচ-।  আলী-ফাতিমা শক্ত বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছেনকিন্তু এত ঠা-ায় কি ঘুম আসে? এমন সময় দরজায় করাঘাতের শব্দদরজা খুলতেই তাঁরা দেখতে পান পিতা মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) দাঁড়িয়েতিনি দেখতে পান, এই প্রবল শীতে মেয়ে-জামাই যে কম্বলটি গায়ে দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছে, তা এত ছোট যে দুজন কোন রকম গুটিসুটি মেরে থাকা যায়মাথার দিকে টানলে পায়ের দিকে বেরিয়ে যায়

আবার পায়ের দিকে সরিয়ে দিলে মাথার দিকে আলগা হয়ে যায়তাঁরা এই মহান অতিথিকে স্বাগতম জানানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েনতিনি তাঁদেরকে ব্যস্ত  না হয়ে যে অবস্থায় আছে সেভাবে থাকতে বলেনতিনি তাঁদের অবস্থা হৃদয় দিয়ে গভীরভাবে উপলব্ধি করেন, তারপর কোমল সুরে বলেন: তোমরা আমার কাছে যা চেয়েছিলে তারচেয়ে ভাল কিছু কি আমি তোমাদের বলে দেব? তাঁরা দুজনই এক সঙ্গে বলে উঠলেন: বলুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন: জিবরীল আমাকে এই কথাগুলো  শিখিয়েছেন: প্রত্যেক নামাজের পরে তোমরা দুজন দশবার সুবহানাল্লাহ, দশবার আলহামদুলিল্লাহ ও দশবার আল্লাহু আকবার পাঠ করবেআর রাতে যখন বিছানায় ঘুমাতে যাবে তখন সুবহানাল্লাহ তেত্রিশবার, আলহামদুলিল্লাহ তেত্রিশবার, আল্লাহু আকবার চৌত্রিশবার পাঠ করবেএকথা বলে তিনি মেয়ে জামাইকে রেখে দ্রুত চলে যান। (বুখারী, মুসলিম)     (চলবে)

 

লেখক :  অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতিব

[email protected]