শুক্রবার ৭ মাঘ ১৪২৮, ২১ জানুয়ারী ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

রাজনীতির সুখপাখি

  • ওবায়দুল কবির

প্রথিতযশা আইনজীবী ড. কামাল হোসেন মাঝে-মধ্যেই কথা বলেন। বিভিন্ন দিবসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বক্তৃতা করেন। এসব বক্তৃতার মূল বিষয় থাকে ঐক্যের আহ্বান। দেশের স্বার্থে তিনি সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তার এই ঐক্যের আহ্বান চলে আসছে সেই ১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগ ভেঙ্গে নতুন দল গণফোরাম করার সময় থেকে। এবারও বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে গণফোরাম আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি দেশ ও জাতির স্বার্থে বৃহত্তর ঐক্যের কথা বলেছেন। ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম বরাবরের মতোই অস্পষ্ট। অনেক ঘটা করে তিনি গণফোরাম নামক রাজনৈতিক দল গঠন করলেও এই দলটি আজ দ্বিধাবিভক্ত। তিনি একটি অংশের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। বিষয়টি এভাবেও বলা যায়, তিনি এখন রাজনীতির মূল ধারা থেকে দূরে সরে গেছেন। মাঝে-মধ্যে আসেন রাজনীতির সুখপাখি হয়ে।

ড. কামাল হোসেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে একই বিমানে দেশে ফিরেছিলেন। এর আগে তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। যদিও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী থাকার বিষয়টি নিয়ে অনেকের দ্বিমত রয়েছে, তবুও বাস্তবতা হচ্ছে তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেশে ফিরেছেন এবং বঙ্গবন্ধু তাকে ভরসা করতেন। বঙ্গবন্ধু তাকে সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কমিটির প্রধান হিসেবে তিনি সেই দায়িত্ব পালন করেন। প্রথমে আইন এবং পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বও তাকে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার ওপর ভরসা রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও। ১৯৮১ সালে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ড. কামাল হোসেনকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দিয়েছিলেন তিনি।

গণফোরাম প্রতিষ্ঠা প্রক্রিয়ায় ’৯৩ সালের জুলাই মাসে ড. কামাল হোসেনের একটি সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম তার মতিঝিলের কার্যালয়ে। আমি তখন জনকণ্ঠে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত। সরাসরি প্রশ্ন করেছিলাম কি কারণে তিনি এই প্ল্যাটফর্ম তৈরির চিন্তা করছেন। খোলামেলা কিছু বলেননি। যা বলেছেন আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা মাত্র। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি একটি উদ্যোগ মাত্র। সকল ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি উৎসাহিত করতে নাগরিক ফোরাম হিসেবে এটি কাজ করবে। রাজনীতিবিদসহ সকল মহলের সঙ্গে আলোচনায় যে মতামত আসবে সে অনুযায়ী ভবিষ্যত নির্ধারণ হবে।’ একটি কথা অবশ্য তিনি খুব স্পষ্ট এবং জোর দিয়ে বলেছিলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ এবং নির্দেশিত পথের বাইরে তিনি যাবেন না। আওয়ামী লীগ কি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের সঠিক প্ল্যাটফর্ম নয় প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, সময়ই সেটি নির্ধারণ করবে।

জনকণ্ঠ পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরুর প্রথম বছরই ড. কামাল হোসেনের এই প্রচেষ্টার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম। একের পর এক ঘটনাপ্রবাহ প্রত্যক্ষ করেছি খুব কাছে থেকে। সেদিনের চিত্র আর বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন মিল নেই। ড. কামাল হোসেন ছিলেন খ্যাতিমান আইনজীবী। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তাকে বন্দী করে পাকিস্তানের কারাগারে পাঠানো হয়। দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাকেও মুক্তি দেয়া হয় এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেই তিনি দেশে ফিরেন। বঙ্গবন্ধু তাকে সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব দেন। কমিটির প্রধান হিসেবে তিনি সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। বঙ্গবন্ধু তাকে প্রথমে আইন এবং পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ড. কামাল হোসেনের ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ¯েœহভাজন হয়েও সেদিন তিনি দায়িত্ব পালন করেননি। সরকারী কর্মচারী হয়ে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী যে দায়িত্ব পালন করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে ড. কামাল সেই দায়িত্ব এড়িয়ে গেছেন।’

মোশতাক মন্ত্রিসভায় যোগদান না করলেও তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার পরবর্তী পাঁচ বছর একেবারেই নিষ্ক্রিয় ছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে জাতির জনকের হত্যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিবাদ করার সুযোগ থাকলেও ড. কামাল সে পথে হাঁটেননি। জার্মানিতে হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত থেকেও তিনি একটি কথা বলেননি। পাঁচ বছরে নিজেকে কিছুটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে শেখ হাসিনা যখন লন্ডনে বঙ্গবন্ধু হত্যার তদন্তে কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করলেন তখন ড. কামাল হোসেন সেখানে হাজির হয়েছিলেন। ’৮১ সালে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচন করা হলে ড. কামাল আনুগত্য স্বীকারে দিল্লী গিয়েছিলেন। এত কিছুর পরও শেখ হাসিনা তাকে অবজ্ঞা করেননি। ১৯৮১ সালের ১৫ নবেম্বরে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী বিচারপতি সাত্তারের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা ড. কামাল হোসেনকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন।

নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের বিষয়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল- সূক্ষ্ম কারচুপির মাধ্যমে তাদেরকে পরাজিত করা হয়েছে। দলীয় ফোরামে আলোচনা এবং বিচার-বিশ্লেষণ করেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ড. কামাল হোসেন এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি দাবি করেন, নির্বাচন নিরপেক্ষ হয়েছে। দলীয় ফোরামে বক্তব্য না রেখে ড. কামাল হোসেন ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনাকে লেখা এক চিঠিতে দাবি করেন, সূক্ষ্ম কারচুপি নয়, ‘দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নির্বাচনে পরাজয় ঘটেছে।’ নির্বাচনে ড. কামাল হোসেনও পরাজিত হয়েছিলেন। ড. কামাল হোসেনের এই ভূমিকায় দলের ভিতরে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিমসহ কয়েকজন নেতা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ড. কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। দলীয় প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা ড. কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে গঠনতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিতে পারতেন। তিনি তা নেননি।

১৯৯২ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন ড. কামাল। এরপরই তিনি নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে একটি মঞ্চ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেন। ১৯৯২ সালের জুন মাসে তিনি গণতান্ত্রিক নাগরিক ফোরাম গঠনের ঘোষণা দেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, ড. মোজাফফর আহমেদ, প্রফেসর রেহমান সোবহান, প্রফেসর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ব্যারিস্টার আমীর-উর ইসলামসহ আরও অনেকে। প্রথম দিকে ড. কামাল সবাইকে এই নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন যে, এটি কোন রাজনৈতিক দল হবে না। রাজনীতির গুণগতমান বৃদ্ধির জন্য তিনি নাগরিক ফোরাম গঠন করেছেন মাত্র। এ কারণে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি তার অবস্থান বদলাতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি ফোরামের মহাসম্মেলন আহ্বান করে বলেন, ‘সবই মিলে যে সিদ্ধান্ত নিবেন তাই করা হবে।’

১৯৯৩ সালের ২৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয় গণতান্ত্রিক নাগরিক ফোরামের মহাসম্মেলন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানের সংবাদ সংগ্রহের জন্য আমিও উপস্থিত ছিলাম। উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তৃতা করেছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল, ড. আনিসুজ্জামান, বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য, ড. মোহাম্মদ ইউনূস প্রমুখ। ড. কামাল হোসেন সেদিন বলেছিলেন, আমাদের দেশে সবই আছে, প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা। অর্থাৎ মহাসম্মেনের প্রথম দিনই তিনি একটি রাজনৈতক দল গঠনের ইঙ্গিত দেন। ড. ইউনূস বলেন, রাজনীতি হওয়ার কথা মানুষের ভালবাসার পেশা। সেটা আজ রূপ নিয়েছে হিংসা-বিদ্বেষ চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে। তিনি ‘আমার দল’ নামে একটি আদর্শ রাজনৈতিক দলের ‘দিবাস্বপ্ন’ বর্ণনা করেন। তার বক্তব্যেও নতুন দলের ইঙ্গিত ছিল। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ড. ইউনূস এই দলের থাকেননি। সুফিয়া কামালের বক্তব্যে ছিল স্পষ্ট সতর্ক বার্তা। তিনি বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ স্বাধীন করেছেন। তিনি আজ নেই। তাঁর দুই কন্যা এখনও বেঁচে আছেন। তাদের নিয়েই ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়তে হবে।

ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম গঠন কার্যক্রম দেখে আমার মনে হয়েছিল, মুখে যাই বলুন প্রথম থেকেই তার উদ্দেশ্য ছিল নতুন রাজনৈতিক দল গঠন। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে ক্ষতিগ্রস্ত করার লক্ষ্যে একটি মহল ড. কামাল হোসেনকে বিভ্রান্ত করেছিল। তারা কামাল হোসেনকে বঙ্গবন্ধুর কাছাকাছি ব্যক্তিত্বের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করতে থাকে। বিভ্রান্ত ড. কামাল আওয়ামী লীগ থেকে সরে আসার অজুহাত খুঁজতে থাকেন। ’৯১ সালের নির্বাচনের পর দলীয় অবস্থানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি এর সূচনা করেন। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির ধারা থেকে বের হয়ে তৃতীয় ধারা তৈরির আকাক্সক্ষায় এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, নুরুল ইসলাম নাহিদের নেতৃত্বে তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির মূল অংশ। এই প্রক্রিয়ায় আরও যোগ দেয় পংকজ ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ন্যাপ এবং শাজাহান সিরাজের নেতৃত্বে জাসদের একটি অংশ। রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি গণফোরামের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। এর মধ্যে ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত, জিয়াউল হক, নূরজাহান মোর্শেদ, জামিল চৌধুরী, আয়শা খানম, আহম্মদ রফিক প্রমুখ। আওয়ামী লীগ থেকে যোগদান করেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, এ্যাডভোকেট জহিরুল হক, মোস্তফা মহসিন মন্টু প্রমুখ। তিনদিনব্যাপী মহাসমম্মেলনে দফায় দফায় বৈঠক শেষে তৃতীয় দিন অর্থাৎ ২৯ আগস্ট গণফোরাম নামে নতুন রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেয়া হয়।

পহেলা সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক। এর মধ্যে ড. কামাল হোসেন গণফোরাম গঠন করে ফেলেছেন। বৈঠকে কামাল হোসেন সম্পর্কে কি সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এ নিয়ে জনমনে উৎসুখ ছিল। প্রথম দিনের বৈঠকে কোন সিদ্ধান্ত আসেনি। ‘কৃষক বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ কর্মসূচী এবং বিভিন্ন সাব কমিটির রিপোর্ট নিয়ে দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার আলোচনার পর বৈঠক পরবর্তী দিনের জন্য মুলতবি করা হয়। ২ সেপ্টেম্বর মুলতবি বৈঠকে ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। কোন সিদ্ধান্ত না নেয়ার পক্ষে ছিলেন কোন কোন নেতা। তাদের যুক্তি ছিল, দলের কোন সিদ্ধান্ত বরং তাকে গুরুত্বই দেয়া হবে। বিপরীত মতের নেতাদের বক্তব্য ছিল, সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এ নিয়ে চুপ থাকার সুযোগ নেই। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে যারা গণফোরামে যোগ দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। শেষ পর্যন্ত তাদেরকে দলের সকল পদ থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত হয়। কামাল হোসেন ছাড়াও অব্যাহতি দেয়া হয় মতিউর রহমান, মেজর জেনারেল (অব) খলিলুর রহমান, মফিজুল ইসলাম কামাল এবং এ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলামকে।

গণফোরামের আত্মপ্রকাশে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ক্ষতি ছিল খুবই কম। প্রায় দুই বছর ধরে নানামুখী আলোচনায় সাধারণ মানুষের মনে ড. কামাল হোসেনের ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এ কারণে দলের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ হয়নি। পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে বরং আওয়ামী লীগের লাভই হয়েছিল বেশি। সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছিল ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। কমরেড ফরহাদের পর সিপিবিতে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নেতা ছিলেন সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক। তার নেতৃত্বে দলের মূল অংশই গণফোরামে বিলুপ্ত হয়ে যায়। পরবর্তী সময় এসব নেতার অধিকাংশই আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।

খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গণফোরমের রাজনৈতিক চমক ম্লান হতে থাকে। দল ত্যাগ করতে থাকেন আশা নিয়ে যোগদানকারী অনেক রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক নেতা। এমন একটি পর্যায়ে সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিকের একটি সাক্ষাতকার নিয়েছিলাম। তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘গণফোরামে যোগদানের মাধ্যমে সিপিবিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে আপনারা কি বাংলাদেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের ক্ষতি করেছেন? জবাবে মানিক ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক যুক্তি দেখাতে চাইলেও তার মধ্যে তীক্ষèতা ছিল না। বরং হতাশা ছিল স্পষ্ট। একটা সময় শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগের মতো প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠন থাকলেও প্রগতিশীল রাজনীতির মূলধারা বলা হতো ছাত্র ইউনিয়নকে। দেশের কোন অঞ্চলে ছাত্রমৈত্রীও ছিল বেশ শক্তিশালী। ছাত্র ইউনিয়ন তৃণমূল থেকে শিক্ষার্থীদের মোটিভেটেড করে প্রগতিশীল রাজনীতির দীক্ষা দিত। যুক্তি দিয়ে ছাত্রশিবিরের মতো প্রতিক্রিয়াশীল সংগঠনগুলো ঠেকানোর চেষ্টা করত। গায়ের জোরে না পারলে তারা ছাত্রলীগের সহযোগিতা চাইত- এমন অনেক উদারহণ রয়েছে এই দেশে। গণফোরামের রাজনীতি এই আদর্শিক ছাত্র সংগঠনের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন করে দেয়। ছাত্র ইউনিয়নের শূন্য স্থান দখল করতে থাকে ছাত্রশিবির নামে প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন। ধর্মের পাশাপাশি ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার পথ দেখিয়ে দেশের শিক্ষাঙ্গনে দ্রুত বিস্তার লাভ করতে থাকে সংগঠনটি। সাইফুদ্দিন মানিককে প্রশ্ন করেছিলাম, ছাত্রশিবিরের এই উত্থানে আপনাদের ভুল রাজনীতি কি কিছুটা হলেও দায়ী নয়? এরও তিনি জোরালো কোন যুক্তি দাঁড় করাতে পারেননি। দীর্ঘ আলাপচারিতায় তাকে বেশ হতাশ মনে হয়েছে। বিপরীত মেরুর রাজনীতি করেও জাসদের শাজাহান সিরাজ এক সময় বিএনপিতে যোগদান করেন। ড. কামাল হোসেনের ভুল তত্ত্বে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের প্রগতিশীল আন্দোলন। শুধু এখানেই শেষ নয়, ২০১৮ সালে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে যোগ দিয়ে তিনি তার ঘোষিত রাজনৈতিক বিশ্বাস ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শের’ কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিলেন।

লেখক : ডেপুটি এডিটর, জনকণ্ঠ

শীর্ষ সংবাদ:
২৪ ঘণ্টায় করোনায় মৃত্যু ৪, শনাক্ত ১০৮৮৮         দুর্নীতি রোধে ডিসিদের সহযোগিতা চাইলো দুদক         সন্ত্রাসীরা অস্ত্র তুললেই ফায়ারিং-এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী         সামাজিক অনুষ্ঠান বন্ধে ডিসিদের নির্দেশ         ব্যাংকারদের বেতন বেধে দিলো বাংলাদেশ ব্যাংক         মগবাজারে দুই বাসের প্রতিযোগিতায় প্রাণ গেল কিশোরের         জমির ক্ষেত্রে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বন্ধ হচ্ছে         ৪৩তম বিসিএস প্রিলির ফল প্রকাশ         শান্তিরক্ষা মিশনে র‍্যাবকে বাদ দিতে জাতিসংঘে চিঠি         ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হলেই সাংবাদিককে গ্রেফতার নয়, ডিসিদের আইনমন্ত্রী         আইপিটিভি-ইউটিউবে সংবাদ পরিবেশন করা যাবে না ॥ তথ্যমন্ত্রী         শাজাহান খানের মেয়েকে বিয়ে করলেন এমপি ছোট মনির         সাকিব আল হাসানের পিপলস ব্যাংকের আবেদন বাতিল         ‘সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের একসঙ্গে কাজ করার বিকল্প নেই’         ঠিকাদারি কাজে এফবিআই’র সাজাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান!         ক্ষমা চাইলেন টাকা ছুড়ে দেওয়া সেই বিদেশি         এক সপ্তাহে করোনা রোগী বেড়েছে ২২৮ শতাংশ         যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল কোর্টের প্রথম মুসলিম বিচারক হচ্ছেন বাংলাদেশি নুসরাত         সস্ত্রীক করোনা আক্রান্ত প্রধান বিচারপতি, হাসপাতালে ভর্তি         হাইকোর্টে আগাম জামিন পেলেন তাহসান