মুগা খান মসজিদ
বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়নের চরামদ্দি গ্রামের মিয়া বাড়ির হাট সংলগ্ন বরিশাল চরকাউয়া গোমা সড়কের পূর্ব পাশে প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্যশিল্পের অন্যতম নিদর্শন মুগা খান জামে মসজিদ। মুঙ্গা খান সতের শতাব্দির শেষের দিকে মসজিদটি নির্মাণ করেন। প্রায় ৪ শ বছর আগে মুসলিম শাসনামলে স্থাপিত এই মুগা খান মসজিদ, যা আজও স্মরণ করিয়ে দেয় মুসলিম স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের কথা।
সরেজমিনে দেখা যায়, মুগা খান জামে মসজিদ বরিশালের প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম। অনিন্দ্য সুন্দর মসজিদটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট। মাঝেরটি অপেক্ষাকৃত বৃহৎ। মেঝ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ২৫ ফুট। মসজিদের ঠিক ওপরে একই সারিতে অবস্থিত। মূল মসজিদটি আয়তাকার। উত্তর দক্ষিণে এর দৈর্ঘ্য ৩৬ ফুট, পূর্ব পশ্চিমে প্রস্থ ১৮ ফুট। দেয়ালের প্রশস্ততা ৩৫ ইঞ্চি। ইট, চুন, সুরকি দিয়ে নির্মিত। মসজিদের পূর্বদিক দিয়ে ৩টি খিলান প্রবেশ পথ আছে। দরজার উপরিভাগ অলঙ্কৃত। এর উচ্চতা ৬ ফুট, চওড়া ৩ ফুট। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দু'টি জানালা আছে। আলো বাতাস প্রবেশের জন্যই এরূপ ব্যবস্থা। জানালার উপর-নিচের দৈর্ঘ্য সাড়ে ৪ ফুট এবং চওড়া ৪ ফুট। পশ্চিম দেয়ালে একটি মিহরাব। এর উপরিভাগ ফুল পাতার নকশায় আচ্ছাদিত। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় অলঙ্করণের ছাপ রয়েছে। মসজিদটির প্রধান আকর্ষণ ভিতরের চার দেয়ালের মাঝবরাবর এক ফুট চওড়া বেড় দিয়ে তার ভিতর কুরআনের আয়াত লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সূরা ফাতিহা, ইখলাস, আর রহমান প্রভৃতি সুন্দরভাবে লিখিত।
সেই আমলের একটি রেহাবিও মসজিদের ভিতরে সংরক্ষিত আছে। রেহাবির মধ্যাংশে ক্যালিওগ্রাফি স্টাইলে সূরা ইখলাস লিখিত। মসজিদের পূর্ব ও পশ্চিমপাশের দেয়ালের ওপরে রয়েছে ৪টি করে ৮টি মিনার। গম্বুজ ও মিনারের শিরোভাগে একটি করে পিতলের কলস সংযুক্তি ছিল। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ৩ টি কলস লক্ষ্য করা যায়। ৫টি চুরি হয়ে গেছে।
মসজিদের কলসগুলোতে এক সময় স্বর্ণের প্রলেপ ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু কালের স্রোতে তা মুছে গেছে। ২০০১ সালে মসজিদ সংলগ্ন ক্বেরাতুল কোরআন হাফিজিয়া মাদরাসা স্থাপিত হয়। মাদরাসার বর্তমান ছাত্রসংখ্যা ৭৫ জন। কয়েকবছর আগে পূর্ব, উত্তর, দক্ষিণদিকে মসজিদের জায়গা সম্প্রসারণ করে মসজিদের একটি দোতলা ভবন করা হয়েছে যেখানে একসাথে ১২০০ মুসল্লীরা নামাজ আদায় করতে পারেন। মূল মসজিদের বাহিরের অংশ কিছুটা সংস্কার করা হয়েছে। সংস্করণের ফলে প্রাচীন চিহ্ন কিছুটা লোপ পেয়েছে। তবে প্রধান অংশে দুই সারিতে ৫০ জন মুসুল্লি এক সাথে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের উত্তর-পূর্ব পাশেই দ্বিতীয় ভবন। ইমাম, মোয়াজ্জেনের থাকার জন্য এ ভবন নির্মাণ করেন মুগা খান।
মসজিদের দক্ষিণ পাশে গোরস্তান। এখানে শায়িত আছেন মুঙ্গা খান, দক্ষিণ বাংলার বিখ্যাত দরবেশ ইয়াকীন শাহ, দানবীর হাজী আছমত আলী খানসহ অনেকে। মসজিদের পূর্ব ফটক বরাবর আঙিনা। এখানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। আঙিনার পূর্ব দিকেই পুকুর। শান বাঁধানো ঘাট রয়েছে পুকুরে। পুকুরটি মুঙ্গা খান নিজ তত্ত্বাবধানে খনন করেন। পুকুরটি আয়তনে ছোট হলেও নানা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। সূচনালগ্নে এর চারপাশ উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। তবে বর্তমানে দেয়াল নিশ্চিহ্নপ্রায়। ভগ্নাবশেষ অবশিষ্ট আছে। সবচেয়ে আজ ব্যাপার হলো মসজিদের তলদেশও পাকা করা হয়েছিল। এর কারণ সম্পর্কে সঠিক কিছু জানা যায়নি। তবে বর্তমানে পুকুরের নিম্নভাগের পাকা ফ্লোরের ওপর কাদামাটির আস্তরণ পড়েছে। তাই পাকা অংশ দেখতে হলে কর্দমাক্ত মাটি উঠিয়ে আরো গভীরে যেতে হবে।
এ বিষয়ে মসজিদ কমিটির সভাপতি মিজানুর রহমান চুন্নু সিকদার জনকণ্ঠকে জানান, প্রায় ৪০০ বছর আগে নির্মিত মসজিদটি অবহেলা অযত্নে হারিয়ে যেতে শুরু করেছে। মসজিদটির বাহিরের অংশে সামান্য সংস্কার করা হয়েছে। তবে ভিতরের অংশে এখন পর্যন্ত সংস্কারের ছোঁয়া লাগেনি। মসজিদটি সংরক্ষণ ও সংস্কারে এখন পর্যন্ত সরকারি কোন সহায়তা পায়নি তারা। প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন মুগা খান মসজিদটি যাহাতে সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হয় সেজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ফুয়াদ








