War does not determine who is right, only who is left- বার্ট্রান্ড রাসেল এর বিখ্যাত উক্তিটি যুদ্ধ সম্পর্কে মানুষের নির্মম বাস্তবতার যে উপলব্ধি তা যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরের নিরব আর্তনাদের প্রতিধ্বনি। যুদ্ধ কখনো সত্যিকারের বিজয় নির্ধারণ করে না। বরং নির্ধারণ করে কে বেঁচে থাকে আর কে হারিয়ে যায়। যুদ্ধের ছায়ায় হারিয়ে যায় একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। বন্দি হয়ে পড়ে শহর আর মানুষের মন জুড়ে জন্ম নেয় এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা যেখানে শুধুই শান্তির জন্য অপেক্ষা। এই সত্যটি আমরা ইতিহাসের প্রতিটি সংঘাতে বারবার দেখেছি। ভূখণ্ডের মানচিত্র বদলেছে, সামরিক শক্তির পাল্লা বেড়েছে কিন্তু মানুষের চোখের জল এবং স্বপ্নভঙ্গের গল্প একই রয়ে গেছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই, যুদ্ধের গল্প মূলত মানুষের গল্প, ভাঙা ঘরের গল্প। ১৯৩৯ সালে যখন শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ তখন ইউরোপের বহু শহর রাতারাতি এক অদৃশ্য কারাগারে পরিণত হয়েছিল। লন্ডনের আকাশে জার্মান বোমারু বিমানের গর্জন, পোল্যান্ডের রাস্তায় উদ্বাস্তু মানুষের মিছিল আর হিরোশিমার আকাশে বিস্ফোরিত পারমাণবিক আগুন- সবই যেন এক বিশাল মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক। বিশেষ করে হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা হামলা মানবসভ্যতাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, প্রযুক্তির অগ্রগতি যদি মানবিক বোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য না হয় তবে তা সভ্যতার অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। যুদ্ধ কেবল সৈন্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত শহরকে বন্দি করে ফেলে। যুদ্ধের ছায়ায় স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে নিভে যেতে থাকে। রাস্তা হয়ে যায় ট্যাংকের পথ, হাসপাতাল হয়ে ওঠে আহত মানুষের কান্নার জায়গা, স্কুলের শ্রেণিকক্ষ পরিণত হয় আশ্রয় কেন্দ্রে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ- সব ক্ষেত্রেই একই দৃশ্য। ভিয়েতনাম যুদ্ধ দেখিয়েছিল কিভাবে একটি দীর্ঘ সংঘাত পুরো একটি সমাজকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে। সেই যুদ্ধে শুধু সৈন্য নয়, হাজার হাজার সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল, অসংখ্য গ্রাম ধ্বংস হয়েছিল এবং একটি প্রজন্মের মনোজগতে তৈরি হয়েছিল গভীর ক্ষত।
যুদ্ধের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো বন্দি শহরের বাস্তবতা। যখন একটি শহর অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে তখন সেখানে বসবাসকারী মানুষের জীবন হয়ে ওঠে এক অদৃশ্য কারাগার। খাবারের সংকট, বিদ্যুতের ঘাটতি, চিকিৎসার অভাব সব মিলিয়ে শহরটি ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লেনিনগ্রাদ অবরোধে প্রায় ৯০০ দিন ধরে চলেছিল, যেখানে লাখ লাখ মানুষ ক্ষুধা ও ঠান্ডায় মারা গিয়েছিল। সেই শহরের মানুষ প্রতিদিন অপেক্ষা করত, কবে যুদ্ধ শেষ হয়ে মানুষ স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে। একইভাবে ১৯৯০- এর দশকে সারাজেভো অবরোধে ইউরোপের আধুনিক ইতিহাসে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের উদাহরণ যেখানে একটি শহর বছরের পর বছর অবরুদ্ধ ছিল।
যুদ্ধ মানুষের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের আশাকে শেষ করে দেয়। ইতিহাসে অনেক লেখক যুদ্ধের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে মানুষের অন্তরের ক্ষয়কে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখিয়েছেন। রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তয় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ War and Peace- এ লিখেছিলেন, The strongest of all warriors are these two- Time and Patience। এই কথার গভীরে লুকিয়ে আছে একটি বড় সত্য। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত মানুষের ধৈর্যই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ শুরু হলে সেই ধৈর্যকে বহন করে সাধারণ মানুষ, যারা অস্ত্র ধরেন না কিন্তু যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
আজকের বিশ্বে যখন মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান ও ইসরাইলের সংঘাত তখন সেই সংঘাতের অদৃশ্য কেন্দ্রস্থলে রয়েছে অসংখ্য বন্দি শহর। যেখানে মানুষের জীবন প্রতিদিন নতুন করে ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে পরিচিত হয়। এই শহরগুলোকে মানচিত্রে চিহ্নিত করা যায় কিন্তু মানুষের ভাঙা মনকে কোন মানচিত্রে ধারণ করা যায় না। আমি সেই বন্দি শহরের গল্প বলি যেখানে প্রতিটি দেয়াল কেবল কংক্রিট নয়। সেখানে জমে আছে মানুষের আস্থা, ভেঙে যাওয়া আশা আর নিঃশব্দ আর্তনাদ। শহরটি হয়তো তেহরানের উপকণ্ঠে, হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের কোন শহরে কিংবা এমন কোনো সীমান্তবর্তী নগরীতে যেখানে আকাশের দিকে তাকালে যুদ্ধবিমানের ছায়া দেখা যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নিহতদের প্রায় ৮০ শতাংশই বেসামরিক মানুষ। এই পরিসংখ্যানে লুকিয়ে আছে অসংখ্য শিশুর গল্প। তারা স্কুলে যেতে পারে না, খেলতে পারে না, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়। এগুলো কোন রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তৃতায় নেই, কোনো কূটনৈতিক বৈঠকের কাগজেও নেই। পৃথিবীর গণতান্ত্রিক মানচিত্রে যত দেশ আছে, তাদের প্রত্যেকের নীতিনির্ধারকরা নিরাপত্তা, কৌশল, প্রতিরক্ষা- এই শব্দগুলো নিয়ে আলোচনা করেন।
ইরান-ইসরাইল ও আমেরকিার সংঘাতকে অনেক বিশ্লেষক একটি মাল্টিভেক্টর যুদ্ধ হিসেবে দেখেন। যেখানে কেবল তিন রাষ্ট্র নয় বরং আঞ্চলিক শক্তি, আন্তর্জাতিক জোট, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা একসঙ্গে জড়িত। এ সংঘাতের পেছনে রয়েছে পারমাণবিক কর্মসূচি, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে উত্তেজনা। এ জটিল বিশ্লেষণের ভেতরে সাধারণ মানুষের গল্পগুলো হারিয়ে যায়। সৈন্যদের মনোবল, সামরিক কৌশল, ক্ষেপণাস্ত্র, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা- এসব নিয়ে প্রতিদিন খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু ইরানের স্কুলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত শিশুদের জন্য দীর্ঘশ্বাস এবং আহত শিশুদের নিঃশব্দ আর্তনাদ সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না। অথচ যুদ্ধে প্রকৃত মূল্য সেই মানুষগুলোর জীবনেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি শিশু যখন স্কুলে যেতে পারে না, একজন মানুষ যখন প্রিয়জনকে হারায়, একজন রোগী যখন হাসপাতালে দাঁড়িয়ে আতঙ্কে কাঁদে, তখন বুঝা যায় যুদ্ধ আসলে কাকে আঘাত করে।
যুদ্ধের পটভূমিতে রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি এবং কূটনৈতিক ব্যর্থতার মিশ্রণ যেন বিষাক্ত কুসুম। একদিকে আছে দেশের নিরাপত্তা, অস্তিত্বের প্রশ্ন আর অন্যদিকে সেই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় ঘটে যাওয়া মানবিক অপচয়। যেখানে প্রতিটি বেসামরিক প্রাণ যেন প্রশ্নবোধক চিহ্নে পরিণত হয়েছে। ইরান-ইসরাইল ও আমেরকিার সংঘাতে অবরুদ্ধ শহরগুলো যখন ধ্বংসের মুখোমুখি, তখন প্রতিটি শহরে যেন ধ্বনিত হতে থাকে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের আর্তনাদ, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা স্বপ্ন আর আহতদের দীর্ঘশ্বাস। ভাঙা দেয়াল, ধুলোমাখা রাস্তা আর অন্ধকারে ডুবে থাকা জানালাগুলো যেন সাক্ষী হয়ে থাকে মানুষের অদম্য বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা। যেখানে প্রতি নিঃশ্বাসে থাকে বেদনা, তবু আশার আলো নিভে যেতে চায় না। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি স্মৃতি, প্রতিটি অদেখা অশ্রু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধের প্রকৃত পরাজিত মানুষ। আর যদি কখনো পৃথিবী এই সত্যটিকে সত্যিই উপলব্ধি করতে পারে, তবে হয়তো একদিন যুদ্ধ মানুষের অন্তর থেকেই হারিয়ে যাবে। তাই বলি, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও এখনো মানবতার আলো রয়ে গেছে।
লেখক : ব্যাংক কর্মকর্তা
[email protected]
প্যানেল/মো.








