ঈদকে ঘিরে জমে উঠেছে জালি টুপি শিল্প
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গ্রামগুলোতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন জালি টুপি তৈরির কারিগররা। হাতে বোনা এই টুপির কদর শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও ব্যাপক। প্রতি রমজান মৌসুমে এ অঞ্চলে প্রায় এক কোটি পিস জালি টুপি উৎপাদন হয়, যার বাজারমূল্য দাঁড়ায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, শেরপুরের এই টুপি সৌদি আরব, দুবাই, কাতার, পাকিস্তান, ভারত, ইরান, কিরগিজস্তান ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে রপ্তানি করা হয়। এই শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি নারী শ্রমশক্তি। শেরপুর উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার এবং পাশের ধুনট উপজেলায় প্রায় ৪০ হাজার নারী এই টুপি বুননের কাজে যুক্ত। সংসারের কাজের পাশাপাশি এটি অনেক নারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রায় ২৬ বছর আগে সুঘাট ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে এই কুটির শিল্পের সূচনা হয়। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে শাহ্ বন্দেগী, মির্জাপুর, কুসুম্বি ও বিশালপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায়। সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন ব্যবসায়ীরা গ্রামে গিয়ে কারিগরদের কাছ থেকে টুপি সংগ্রহ করেন। প্রতিটি টুপি ৩০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়, যেখানে চিকন সুতার টুপির চাহিদা বেশি। স্থানীয় উদ্যোক্তা খোকন আকন্দ জানান, টুপি তৈরির সুতা চীন থেকে আমদানি করা হয় এবং তা কারিগরদের সরবরাহ করা হয়।
পরে সংগ্রহ করা টুপি কারখানায় ধোয়া, প্যাকেটজাত ও রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হয়। তবে কোটি টাকার এই শিল্পে কাজ করেও অনেক কারিগর তাদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একজন প্রতিবন্ধী নারী কারিগর জানান, তিনি দিনে এক থেকে দুইটি টুপি তৈরি করতে পারেন। আগে যে মজুরি পেতেন, এখন তার চেয়ে প্রতিটি টুপিতে প্রায় ১০ টাকা কম পাচ্ছেন।
আরেক নারী কারিগর বলেন, একটি টুপি বুনে তিনি মাত্র ৩০ টাকা পান, যদিও বাজারে সেটি কত দামে বিক্রি হয় তা তার জানা নেই। আরও অনেকে জানান, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি টুপির জন্য মাত্র ১৬ টাকা পর্যন্ত মজুরি দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, একটি টুপি তৈরিতে দুটি সুতার ববিন লাগে, যার প্রতিটির দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা। তবুও অনেক সময় টুপি জমা দেওয়ার পর এক থেকে দুই মাস পর্যন্ত মজুরি পাওয়া যায় না। কারিগর লোপা খাতুন বলেন, সংসারের কাজের পাশাপাশি কয়েক বছর ধরে এই কাজ করছি। এতে মাসে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা আয় হয়। বাংলাদেশ জালি টুপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জুয়েল আকন্দ বলেন, কারিগররা সারা বছরই কাজ করেন। তবে রমজান এলেই কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায় এবং তখন টুপির চাহিদাও বেশি থাকে।
উপজেলা প্রশাসনের মতে, এই কুটির শিল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে কারিগরদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশ জালি টুপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জুয়েল আকন্দ বলেন, সারা বছরই কাজ চললেও রমজানে টুপির চাহিদা ও কাজের চাপ বেড়ে যায়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, এই শিল্প একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে কারিগরদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে উদ্যোক্তাদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
প্যানেল হু








