ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৮ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২

লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীদের জন্য হুইল চেয়ারসহ নানা সুবিধা

এবার নৌপথে যাত্রায় সদরঘাটে ফ্রি কুলি

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৩:৫০, ১৭ মার্চ ২০২৬

এবার নৌপথে যাত্রায় সদরঘাটে ফ্রি কুলি

এবার নৌপথে যাত্রায় সদরঘাটে ফ্রি কুলি

পরিবার নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন রাইফা ইসলাম। তাদের গন্তব্য বরিশাল। তার সঙ্গে আছেন বৃদ্ধ বাবা-মা ও ছোট সন্তান। স্বামী কয়েকদিন পরে বাড়ি ফিরবেন। হাতে ব্যাগ, ট্রলি ও নানা মালামাল সব মিলিয়ে লঞ্চে ওঠা বেশ কষ্টকর হয়ে পড়ে তার জন্য।
বাড়ি যাওয়ার সময় মঙ্গলবার রাইফা ইসলাম বলেন, প্রতিবছরই সদরঘাটে এসে কুলিদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে ঝামেলা হয়। কে কত টাকা নেবে তা নিয়ে প্রায়ই বাগবিত-া বাধে। কিন্তু এবার নীল পোশাক পরা একজন এসে মালামাল ট্রলিতে তুলে দেওয়ার কথা বললেন। আমি আগে জিজ্ঞেস করলাম কত টাকা লাগবে। পরে তারা জানালেন ঈদ উপলক্ষে এই সেবা সম্পূর্ণ ফ্রি। শুনে সত্যিই অবাক হয়েছি। এতে আমাদের মতো যাত্রীদের অনেক সুবিধা হচ্ছে।
বরিশালগামী আরেক যাত্রী আব্দুল কাদের বলেন, আগে ঘাটে নামলেই কুলিদের নিয়ে ঝামেলা হতো। মাল তুলতে গেলেই অনেক বেশি টাকা চাইত। এবার দেখছি নির্দিষ্ট পোশাকের কুলি আছে, ট্রলিও আছে। এতে যাত্রীদের ভোগান্তি অনেক কমবে।
এ সময় কথা হয় পটুয়াখালীগামী বয়স্ক যাত্রী শাহানারা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি বয়স্ক মানুষ। আগে মালামাল নিয়ে লঞ্চে ওঠা খুব কষ্ট হতো। এবার হুইল চেয়ার আর ট্রলির ব্যবস্থা থাকায় অনেক স্বস্তি লাগছে।
ভোলাগামী যাত্রী সাইফুল ইসলাম বলেন, সদরঘাটে এবার অনেক পরিবর্তন চোখে পড়ছে। আগের চেয়ে পরিবেশও পরিষ্কার। ফ্রি কুলি সেবা থাকা যাত্রীদের জন্য ভালো উদ্যোগ।
ঝালকাঠিগামী কলেজছাত্রী মেহজাবিন আক্তার বলেন, ঈদের সময় যাত্রী বেশি থাকে, তখন ঘাটে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এবার ট্রলি আর নির্দিষ্ট কুলি থাকায় বিষয়টি অনেক সুশৃঙ্খল মনে হচ্ছে।
ঘাটে বাড়ছে যাত্রীর উপস্থিতি
সরেজমিনে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এলাকায় দেখা যায়, রাজধানীর তীব্র যানজট এড়াতে দূরপাল্লার অনেক যাত্রী আগেভাগেই ঘাটে চলে এসেছেন। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অপেক্ষা করছেন, আবার কেউ লঞ্চের নির্ধারিত সময়ের আগেই এসে টিকিট সংগ্রহ ও মালামাল গুছিয়ে রাখছেন। ঈদকে সামনে রেখে ঘাট এলাকায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় যাত্রী উপস্থিতি কিছুটা বেশি দেখা গেছে।
অনেক যাত্রীকে লঞ্চের কাউন্টারগুলোতে আসন টিকিট সংগ্রহ করতে দেখা যায়। বিশেষ করে বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার যাত্রীরা আগেভাগেই এসে টিকিট নিশ্চিত করছেন। এছাড়া মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুরসহ স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরা নির্দিষ্ট লঞ্চ ধরে নিজ নিজ গন্তব্যে রওয়ানা হচ্ছেন।
ঘাট এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদস্যদের তৎপরতাও লক্ষ্য করা গেছে। যাত্রীদের ওঠানামা, টিকিট সংগ্রহ ও মালামাল বহনে যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না হয় সেজন্য বিভিন্ন স্থানে নজরদারি রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সকাল থেকে যাত্রী উপস্থিতি ধীরে ধীরে বাড়ছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এজন্য ঈদযাত্রা নির্বিঘœ রাখতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাট হয়ে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ সামাল দিতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। নতুন সরকারের সময় যাত্রীসেবায় পরিবর্তন আনতে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীদের জন্য ফ্রি কুলি (পোর্টার) সেবা, ট্রলি ও হুইল চেয়ারসহ নানা সুবিধা চালু করা হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিএর বন্দর পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, নতুন সরকারের সময় যাত্রীদের কল্যাণে আরও উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আগে সদরঘাটের ওপরের অংশ কিছুটা পরিচ্ছন্ন থাকলেও ভেতরের অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। এবার পুরো এলাকায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন সদরঘাট অনেক বেশি সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন। সরেজমিনে এলে সেই পরিবর্তন বোঝা যাবে।
বন্দর পরিচালক জানান, ঈদের আগে পাঁচদিন এবং ঈদের পর পাঁচদিন মোট ১০ দিনের জন্য ফ্রি কুলি (পোর্টার) সেবা দেওয়া হবে। এসব কুলিকে বিআইডব্লিউটিএ নিজস্বভাবে মজুরি দিয়ে নিয়োগ দিয়েছে, যেন যাত্রীরা কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন। তিনি আরও জানান, যাত্রীদের মালামাল বহনের সুবিধার্থে ১০০টি ট্রলি রাখা হয়েছে, যেগুলো বিমানবন্দর থেকে আনা হয়েছে। যাত্রীরা চাইলে নিজেরাই এসব ট্রলি ব্যবহার করতে পারবেন।
অসুস্থ, অক্ষম ও বয়স্ক যাত্রীদের জন্য হুইল চেয়ারের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে সীমিত সংখ্যক হুইল চেয়ার ছিল, এবার সদরঘাটের ২০টি গেট এলাকায় মোট ৪০টি হুইল চেয়ার রাখা হবে। এসব ব্যবহারে সহায়তা করবেন ক্যাডেট সদস্যরা। ঈদযাত্রার চাপ সামাল দিতে সদরঘাটে অতিরিক্ত আরও দুইটি ঘাট চালু করা হয়েছে বলেও জানান বন্দর পরিচালক।
এদিকে ঈদ উপলক্ষে যাত্রীদের স্বস্তি দিতে লঞ্চ মালিকরা ভাড়া ১০ শতাংশ কমিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
বন্দর পরিচালক বলেন, সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সময় নদীপথের যাত্রীদের জন্য আরও উন্নত ও স্বস্তিদায়ক সেবা নিশ্চিতের চেষ্টা করা হচ্ছে।

প্যানেল হু

×