বাংলাদেশ বিকল্প জ্বালানি উৎস ও নতুন রপ্তানি বাজারের সন্ধানে
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য জ্বালানি সরবরাহ সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বিকল্প জ্বালানি উৎস ও নতুন রপ্তানি বাজারের সন্ধানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট এসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এসিয়ান নেশন (আসিয়ান)-এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে।
কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সূত্র বলছে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যকরণের লক্ষ্যে সরকার আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য, জ্বালানি এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
তবে নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের মতে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আসিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো অত্যন্ত সীমিত। বাজার বিশ্লেষণ, পণ্যের বৈচিত্র্য, লজিস্টিক সুবিধা এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অভাবের কারণে এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশ কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি উদ্বেগ ॥ সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট সামরিক উত্তেজনা এবং ইসরাইল সমর্থিত যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ স্টাইট অব হরমুজ এ সম্ভাব্য অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যার বড় অংশই এশিয়ার বাজারে যায়। ফলে ওই পথের সরবরাহে বিঘœ ঘটলে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলো সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে।
বাংলাদেশের জ্বালানির বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো-সৌদি আরব, কাতার, আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক এবং ওমান থেকে। এই প্রেক্ষাপটে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার নতুন উৎস খুঁজছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যকরণের উদ্যোগ নিয়েছে এবং বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
ব্রুনাইসহ আসিয়ান দেশগুলোর দিকে নজর ॥ জ্বালানি খাতের সূত্র জানায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জ্বালানিসমৃদ্ধ দেশ ব্রুনাই থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন তেল আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়া সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার কাছ থেকেও পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে তৎকালীন পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্রুনাইয়ে সফর এবং ২০২২ সালে ব্রুনাইয়ের সুলতান হাসানাল বলকিয়ার ঢাকা সফরের সময় জ্বালানি সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নতুন করে এসব আলোচনাকে গতি দিয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বিঘœ ঘটলে এশিয়ার অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও চাপের মুখে পড়তে পারে। তাই বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
আসিয়ান বাজারে বাংলাদেশের সীমিত উপস্থিতি ॥ জ্বালানি সহযোগিতার পাশাপাশি বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও আসিয়ান অঞ্চলকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮.২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮.৫৮ শতাংশ বেশি। তবে এর মধ্যে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে রপ্তানির অংশ মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ।
একই সময় বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ডে প্রায় ৬১ মিলিয়ন ডলার, ইন্দোনেশিয়ায় ৫৬ মিলিয়ন ডলার, ব্রুনাইয়ে প্রায় ১৩ মিলিয়ন ডলার, সিঙ্গাপুরে ১১০ মিলিয়ন ডলার, ফিলিপিন্সে ৮৬ মিলিয়ন ডলার এবং মিয়ানমারে প্রায় ৩৪ মিলিয়ন ডলার পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আসিয়ান দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয়েছে প্রায় ১০.৫৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা মোট আমদানির প্রায় ১৬.৭ শতাংশ। অর্থাৎ বাণিজ্যে একটি বড় ঘাটতি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে আসিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশের রপ্তানি কম হওয়ার অন্যতম কারণ হলো পণ্যের সীমিত বৈচিত্র্য এবং বাজারভিত্তিক কৌশলের অভাব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষক অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো মূলত তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আসিয়ান বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে ওষুধ, আইসিটি পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, চামড়া ও কৃষিপণ্যসহ নতুন খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বাংলাদেশের খুব কাছাকাছি হলেও বাণিজ্যিক সংযোগ যথেষ্ট উন্নত হয়নি। সরাসরি শিপিং ও বিমান যোগাযোগ বাড়ানো গেলে রপ্তানি অনেক বাড়তে পারে।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, আসিয়ান অঞ্চলের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি না থাকায় বাংলাদেশের পণ্য অনেক ক্ষেত্রে শুল্ক সুবিধা পায় না।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, ‘আসিয়ান অঞ্চলের সঙ্গে যদি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা যায় তাহলে বাংলাদেশের রপ্তানি কয়েকগুণ বাড়তে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের বড় বাজার তৈরি হবে।’
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ দ্রুত শিল্পায়ন করছে এবং তাদের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশ এই সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত হতে পারে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ও প্রযুক্তি খাত ॥ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা মনে করছেন, শুধু পণ্য রপ্তানি নয়, মানবসম্পদ রপ্তানিও আসিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আলমগীর জামিল জনকণ্ঠকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা অনেক বেশি। বাংলাদেশ যদি প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি করতে পারে তাহলে এই বাজারে বড় সুযোগ তৈরি হবে।’
তিনি জানান, প্রযুক্তি খাতেও সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের একটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ায় সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি করছে।
থাইল্যান্ডের সঙ্গে এফটিএ আলোচনা ॥ বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহ দেখিয়েছে থাইল্যান্ড। ঢাকায় নিযুক্ত থাই রাষ্ট্রদূত থিতির্পন চিরাসাওয়ার্দি সম্প্রতি সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাতে দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এছাড়া থাইল্যান্ডের রানং পোর্ট এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সরাসরি সমুদ্রপথ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এই রুট চালু হলে পরিবহন ব্যয় কমবে এবং বাণিজ্য বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
থাই বাণিজ্য কাউন্সেলর খেমাথাত আর্চাওয়াথামরং বলেন, দুই দেশের মধ্যে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানো গেলে ব্যবসা ও বিনিয়োগ অনেক বাড়বে।
আসিয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার ॥ সম্প্রতি ঢাকায় আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ শাখায় আসিয়ান কূটনীতিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। সভায় আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহাবুবুর রহমান বলেন, আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন এবং এ অঞ্চলের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা সময়ের দাবি।
ঢাকায় আসিয়ান কূটনৈতিক কমিটির চেয়ারম্যান এবং ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূত নগুয়েন মান কুওং বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আসিয়ান দেশগুলো এখানে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের বড় সম্ভাবনা দেখছে।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশের পণ্যের প্রচারণা বাড়ানো এবং বাজারভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করলে আসিয়ান অঞ্চলে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আসিয়ানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার জন্য আবেদন করেছে এবং ভবিষ্যতে সংগঠনটির সঙ্গে আরও গভীর অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায়।
কূটনীতিকদের মতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া কূটনীতিকরা বাংলাদেশের জ্বালানি, পর্যটন, আইসিটি এবং সেবা খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন।
ইন্দোনেশিয়ার প্রতিনিধি বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, পর্যটন এবং সেবা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ যদি অবকাঠামো উন্নয়ন, লজিস্টিক সুবিধা এবং বাণিজ্য নীতিতে সংস্কার আনতে পারে তাহলে আসিয়ান অঞ্চলের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক দ্রুত সম্প্রসারণ হতে পারে।
আসিয়ান অঞ্চল বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রায় ৬৫ কোটির বেশি মানুষের এই বাজারে প্রবেশ করতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
তবে এজন্য বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করা, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর, সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পরিবর্তনের এই সময়ে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাজার বৈচিত্র্য দুইটিই বাংলাদেশের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। আসিয়ান অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা সেই কৌশলেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
প্যানেল হু








