ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৬ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩

সুলতান মাহমুদের মুখোমুখি মহাকবি ফেরদৌসী

অপূর্ব কুমার কুন্ডু

প্রকাশিত: ২১:৪৫, ১৭ মার্চ ২০২৬; আপডেট: ১২:৪৩, ১৯ মার্চ ২০২৬

সুলতান মাহমুদের মুখোমুখি মহাকবি ফেরদৌসী

সুলতান মাহমুদ ও মহাকবি ফেরদৌসী

[গজনীর সুলতান মাহমুদের রাজ সভায় বসে মহাকাব্য শাহনামা রচনা শেষ করেন মহাকবি ফেরদৌসী। সুলতান মাহমুদের সাথে ইরানের তুসনগরে জন্ম নেওয়া মহাকবি ফেরদৌসীর প্রথম সাক্ষাৎকারের কথা ভেবে কাল্পনিক রচনা সুলতান মাহমুদের মুখোমুখি মহাকবি ফেরদৌসী]

সুলতান মাহমুদ : আপনিই আবুল হোসেন। তুসনগরে বসেই আপনি লিখেছেন বীর রুস্তম আর যুবরাজ ইস্ফিন্দারের যুদ্ধ কাহিনী। বিষয়ের এত গভীরে আপনি গেলেন কীভাবে।
ফেরদৌসী : বিষয়ের গভীরে গিয়েছিল আমার কবি বন্ধু দকিকী। উৎসমূলে তার অসমাপ্ত শাহনামা। আমি সেখানে বিষয়ের বিস্তৃতি ঘটিয়েছি কল্পনার আশ্রয়ে।
সুলতান মাহমুদ : ইস্ফিন্দিয়ার যে রাজ সিংসাহাসনে বসার জন্য এত উতলা সেটি তো সে উতলা না হয়ে তার পিতার মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই পেতে পারত।
ফেরদৌসী : বাঘ মৃত প্রাণীকে শিকার করে না। লড়াই করে শিকার বধ করাতেই তার আনন্দ। পিতা রাজা গুশতাসপ তার পুত্র ইস্ফিন্দিয়ারকে রাজসিংহাসন দিতে অহেতুক বিলম্ব করছিল। পিতার নির্দেশ মেনেই সে সিংহাসনে বসতে সচেষ্ট ছিল। কিন্তু রাজা গুশতাসপ বারং বারং কথা দিয়েও কথার বরখেলাপ করছিল। সে কারণে ইস্ফিন্দিয়ার উতলা ছিল।
সুলতান মাহমুদ : তাই বলে সে বীর রুস্তমকে বন্দি করে আনতে যাবে।
ফেরদৌসী : এটি ছিল রাজা এবং পিতার আদেশ। রাজ আদেশ অমান্য করাই রাষ্ট্রদ্রোহ।
সুলতান মাহমুদ : ইস্ফিন্দিয়ার কি পরিণতি অনুমান করতে পারেনি। 
ফেরদৌসী : পরিণতির বিবেচনার সে পিছিয়ে আসতে পারেনি কারণ তার রাজধর্ম তাকে বীরের বেশে এগিয়ে চলাকে সমর্থন করে।
সুলতান মাহমুদ : আপনি ইস্ফিন্দিয়ার এবং বীর রুস্তমকে দ্বন্দ্বযুদ্ধের আগের রাতে নৈশ আসরে মুখোমুখি বসালেন কেন?
ফেরদৌসী : কারণ ইরানের সংস্কৃতিতে বীরেরা আক্রান্ত না হলে যেমন আক্রমণ করে না তেমনি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে না। ফলে দ্বন্দ্বযুদ্ধের আগের রাতে উভয়কে মুখোমুখি হতেই হতো। উভয়েই চেয়েছিল প্রতিপক্ষ আত্মসমর্পন করুক। সেটা যখন হলো না তখন যুদ্ধে ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে তারা দ্বন্দ্বযুদ্ধ করাকেই সমাধান বিবেচনা করল। তারা উভয়েই ইরানি এবং উভয়েই দেশপ্রেমিক, অহেতুক রক্তক্ষয় উভয়েরই অপছন্দ।
সুলতান মাহমুদ: অপছন্দই যদি তবে রুস্তম কি পারতো না যুবরাজ ইস্ফিন্দিয়ারের কাছে আত্মসমর্পণ করে শিকলবন্দি হয়ে যুবরাজকে জয়ী করে তুলতে। 
ফেরদৌসী : ইরানি বীর আত্মহত্যা করবে কিন্তু আত্মসমর্পণ করবে না। বীরের এই দৃঢ় সংকল্প আছে বলেই ইরানি শাহ্রা কখনো ইরানি সেনাপতিদের অপমান করেনি। সেনাপতির আনুগত্য প্রশ্নাতীত। রাজাকে সুরক্ষা দেওয়া তার ধর্ম। যে নিজে শূন্য রাজ সিংহাসন পেলেও রাজরক্তের উত্তরাধিকারীকে খুঁজে এনে রাজসিংহাসনে বসান, যার বংশ পরম্পরা রাজা এবং রাজসিংহাসন সুরক্ষায় নিবেদিত, তার আত্মসম্মানবোধ কতটা থাকতে পারে ইরানি বীর রুস্তম তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সুলতান মাহমুদ : কিন্তু সেই দৃষ্টান্তের রুস্তমকেও তো মরতে হলো বৈমাত্রেয় ভাই সুখদাদের হাতে। 
ফেরদৌসী : সুখদাদ কাবুল রাজের হাতের খেলার পুতুল ছিল। বিশ্বস্ততার সূত্রে বিশ্বাস ঘাতকতা হলো। রাজনীতির কূটচাল বোঝা রাজার পক্ষে যতটা সহজ একজন সেনাপতির পক্ষে বোঝা ততটা সহজ না। রুস্তম রণাঙ্গনে লড়াই করতে যেয়ে পরাজিত হয়নি, সে পরাজিত হয়েছে বিশ্বস্তদের পাতা ফাঁদে পড়ে। সেনাপতি যেমন রাজাকে সুরক্ষা দেয় তেমনি রাজা সুরক্ষা দেয় সেনাপতি। সেনাপতিকে রুস্তম তখন ছিল রাজবলয়ের বাইয়ে মৃগয়া শিকার উপলক্ষে বনে। ফলে ঐ নির্মম পরিণতি। এবাদেও মৃত্যু অলঙ্ঘনীয়, লোহা দ্বারা অবরুদ্ধ গৃহেও মৃত্যু হানা দেয়।
সুলতান মাহমুদ : সে কারণেই কি আপনার শাহনামা, যা মৃত্যুর হানাকেও রুখে দেবে বলে আপনার বিশ্বাস।
ফেরদৌসী : অতীত তো তাই বলে। রাজা রামচন্দ্র নেই কিন্তু রামায়ণ আছে। মহাবীর অর্জুন নেই কিন্তু মহাভারত আছে। রাজা আগামেনন নেই কিন্তু ইলিয়াড আছে। রাজা অডিসিয়াস নেই কিন্তু অডিসি আছে। দেহের মৃত্যু ঘটে কিন্তু কীর্তি সে তো অমর।
সুলতান মাহমুদ : সেই অমর কীর্তি রচনার জন্যই কি এখানে আপনার আগমন।
ফেরদৌসী : একটা আস্ত বড়ো ইলিশ মাছে দশহাজার কাঁটা। কাঁটা বেছে খেতে আপনার অসুবিধা হয় তবু হিন্দুস্তানে গেলে আপনি ইলিশ মাছই খান। কারণ আপনি সেটা ভালোবাসেন। আবার ইলিশ মাছের পেটে ডিম আসলে তারা আজিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে, পারস্য হয়ে প্রবেশ করে সিন্দু নদের উত্তরে না গিয়ে যায় দক্ষিণের গঙ্গাবক্ষে। গঙ্গবক্ষের অভয়ারণ্যে ডিম ছাড়তেই তার সুরক্ষা এবং আনন্দ। একই কথা আমার মতো যে কোনো কবির পক্ষে, মহামান্য সুলতান মাহমুদের রাজসভায়, কবিসভায় আশ্রয় পাওয়া। সেখানে বসে রচিত কাব্য যদি অমরত্বের দিকে ধাবিত হয় তবে সেটা মহামান্য সুলতানের মাহাত্ম্য, কবিদের সুরক্ষা দেওয়া এবং উৎসাহিত করার ফসল।
সুলতান মাহমুদ : এত বড় উপমা যে দিলেন তা তুস নগরের কবি আবুল হোসেন, তা আপনি আমার সম্পর্কে কতটা জানেন।
ফেরদৌসী : জানি আপনার মানবিকতার কথা। পৃথিবীর বিভিন্ন রণাঙ্গনে শুধুমাত্র সেনাপতি মারা গেলে তাকে স্বর্ণখচিত সম্মাননা প্রদান করা হয়। কিন্তু আপনি সেনাপতি থেকে শুরু করে একজন সাধারণ সৈনিকের ক্ষেত্র যথাযথ স্বর্ণখচিত সম্মান প্রদান করেন। যারা নিরাপত্তা প্রদান করে তাদের নিঃশর্ত সম্মান প্রদর্শনে আপনি সর্বাগ্নে।
সুলতান মাহমুদ : সবাই যে বলে আমি শুধু হিন্দুস্থানের সম্পদ লুট করি।
ফেরদৌসী : এটা সাধারণের কথা। কিন্তু যারা অসাধারণ তারা জানে, আপনার অন্বেষণে এমন বহুমাত্রিকতা সে কারণে গজনী সা¤্রাজ্যে হিন্দুস্থানিদের বসবাসের জন্য আপনি নির্মাণ করেছেন স্বাধীন ভূখ-। পড়ার জন্য রয়েছে বিদ্যালয় উচ্চ বিদ্যালয়। প্রার্থনার জন্য স্ব-স্ব উপাসনালয়। এমনকি আপনার সেনাবাহিনীতে রয়েছে হিন্দুস্থানী সেনা দল। একজন লুণ্ঠনকারী ঘৃণিত হয় আছত হয় না। আপনি হিন্দুস্তানিদের কাছে আদৃত কারণ আপনি তাদের বিশ্বাসে আঘাত না করে তাদের স্বকীয়তায় আপনি গড়ে তুলেছেন নগরী গজনী এবং তাদেরকে দিচ্ছেন সুরক্ষা।
সুলতান মাহমুদ : আমি নাকি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালাই।
ফেরদৌসী : চালালে আলবেরুনীকে সঙ্গে নিয়ে ধর্ম-ইতিহাস-ভূগোল-ভূতত্ত্ব জ্যোতিষ চিকিৎসা-গণিত-রাষ্ট্রনীতি-সমরণীতি প্রভৃতির আলোকে ‘প্রাচীন জাতির কালক্রম’ রচনা করাতেন না। সভাকবি আনসারীকে দিয়ে আরবি ও ফার্সি উভয় ভাষাতে সাহিত্যসৃজন করতেন না। ইবনে সিনাকে ডেকে পাঠাতেন না চিকিৎসাশাস্ত্রের উন্নতি ঘটাতে। রাজকবিসভায় স্থান করে দিতেন না দেশ-বিদেশের চারশত কবিকে। গজনী মিনার করতেন না জ্যামিতি-ক্যালিওগ্রাফি পোড়ামাটির সমন্বয়ে। আপনি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালান না, আপনি গড়ে তুলছেন বিশ্ব সংস্কৃতির মেলবন্ধন। 
সুলতান মাহমুদ : আমি নাকি দখলদার। অপরাপর রাজ্য দখল করি।
ফেরদৌসী : আপনি হিন্দুস্থানের উত্তর পশ্চিম পাঞ্জাব অঞ্চল, ইরানের উত্তর-পূর্ব সীস্তান-কাবুলিস্তান প্রভৃতি অঞ্চলকে ঘিরে গড়ে তুলেছেন গজনী সা¤্রাজ্য। আব্বাসীয় খলিফার শাসনে স্বাধীনভাবে এই সা¤্রাজ্য বিস্তার, বিশ্বের মাঝে গজনীর সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা বলয়ের উচ্চারণ। সমৃদ্ধি ধারণ ও বহনের জন্য এই প্রচেষ্টা দখলদারিত্ব না বরং সমঝদারিত্ব।
সুলতান মাহমুদ : ডাক টিকিট মুদ্রা কিংবা কিছু প্রতিষ্ঠানে আমার প্রতিচিত্র সংযোজনকে অনেকেই বলে আত্ম প্রচার। সেটাকে আপনি কী বলবেন।
ফেরদৌসী : রণাঙ্গনে সেনাদের পোশাক, পোশাকের কাঁধের ও বুকের উপর তারকাচিহ্ন কিংবা রাষ্ট্রীয় পতাকার কারণে সেনারা লড়াইটা চালিয়ে নিতে পারে দলবদ্ধ হয়ে। সীমান্তে ফলক চিহ্ন বুঝিয়ে দেয় সীমানা। জুঁই নদী সীমানা হয়ে বুঝিয়ে দেয় এপারে ইরান ওপারে তুরান। তদ্রুপ ডাকটিকেট, মুদ্রা কিংবা প্রতিষ্ঠানে আপনার প্রতিচিত্রের সংযোজন বুঝিয়ে দেয় এসবেরই দায়িত্বে গজনীর সুলতান মাহমুদ। গজনীর প্রত্যেক প্রজা আলাদা আলাদা ফুল কিন্তু সুতার মধ্যে দিয়ে যে গজনী মালা সৃষ্টি হয়েছে, মহামান্য সুলতান মাহমুদই তার অন্তরাত্মার মর্মমূল। ফলে এই প্রতিচিত্রের সংযোজন আত্মপ্রচার না বরং প্রতিটি গজনীর প্রজাদের আত্মার নির্ভার।
সুলতান মাহমুদ : কিন্তু গজনীতেও তো দুর্ভিক্ষ নামে।
ফেরদৌসী : অত্যাধিক খরা বন্যা ভূমিকম্পের ক্ষতির মুখে দুর্ভিক্ষ নেমেছিল সত্যিই। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে কর রাজস্ব মওকুফ করে, প্রণোদনার ঝাঁপি খুলে দিয়ে, বিদেশ থেকে অর্জিত সম্পদ দ্রুত পৌঁছে দিয়ে, জলসেচ দিয়ে, বাঁধ নির্মাণ করে যে তীব্র গতিতে মহামান্য সুলতান মাহমুদ দুর্ভিক্ষের বিপর্যয় মোকাবিলা করেছেন, খরা জমিনে উর্বরতা ফিরিয়ে এনেছেন এবং সর্বপরি গজনীবাসীর প্রত্যেক প্রজার পাশে দাঁড়িয়ে অভয় দিয়েছেন, দুর্যোগকালীন সময়ে আশ^স্ত করেছেন, প্রজাদের নিজের পরিবারের অংশ করে নিয়েছেন সেটা এক দৃষ্টান্ত।

যে সুলতান মাহমুদ দুর্ভিক্ষের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে মোকাবিলা করেছেন এত নিখুঁত সক্ষমতা দিয়ে, তার জন্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় এখন আর কোনো সংকট না বরং গজনীর সম্ভাবনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটা পথ পরিক্রমা। মহামান্য সুলতান মাহমুদ এখন এক উচ্চারিত শিরোনাম, সুলতান মাহমুদ প্রজার সংকটে সুলতান মাহমুদ প্রজার সম্ভাবনায়।
সুলতান মাহমুদ : বিজিত হবার সম্ভাবনায় দাঁড়িয়েও আমি কেন সুলতান হওয়া সত্ত্বেও রণাঙ্গনে স্বশরীরে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করি, সেনাপতি নির্বাচন করে তার উপর দায়িত্ব অর্পণ করি না, এ এক বড়ো জিজ্ঞাসা আমার সেনাদলে। নিজে লড়াইয়ের মধ্যে নেমে কেন যুদ্ধ করি এই প্রবণতা কি আমার সবলতা না দুর্বলতা।
ফেরদৌসী : কোনো রাজারই উচিত না রাজ্য-রাজ সিংহাসন নিরুদ্রপ জ্ঞান করে আসর-মৃগয়া কিংবা আত্মতুষ্টি নিয়ে সময় অতিবাহিত করা। রাজ সিংহাসন খুবই আকর্ষণীয় কিন্তু প্রাজ্ঞ রাজা মাত্র জানে তার আসনের দুই পাশে পোষ না মানা দুই বন্য হিং¯্র সিংহ, মাথার উপর জ্বলন্ত অগ্নি আর চারপাশে অবাধ্য রাজনীতি। ফলে সেনাপ্রধান, মন্ত্রী, পুরোহিত, জ্ঞানী ব্যক্তি সকলকে নিয়েই সকলের মতামত পরামর্শ এবং স্বকীয় সিদ্ধান্ত নিয়েই যেমন তাকে রাজকার্য সম্পাদনা করতে হয় তেমনি রণাঙ্গনে রয়েছে রণনীতির নিজস্ব রীতি। আপনি সে রীতি মেনেই ডান দিকে অশ্বারোহী, বা দিকে বর্শারোহী, সম্মুখে হস্তী বাহিনী, পেছনে তরবারীধারীর রণসজ্জা প্রস্তুত করে সম্মুখে অবস্থান নিয়ে, শত্রুর ওপর যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

আপনার সশরীরে উপস্থিত থেকে যুদ্ধে লড়া, আপনার অধীনস্ত সেনাদের মনোবল দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। আপনার ব্যূহবিন্যাস তাদের অভিভূত করে। বিজিত হলে অর্জিত অর্থ সম্পদ, মণিমুক্তা সৈন্যদের মাঝে সমবণ্টন করার আপনার নিজস্ব রীতি, তাদেরকে যুদ্ধজয়ের লক্ষ্য নির্ধারণে দৃঢ় সংকল্প করে তুলেছে। একদিকে দেশপ্রেম অপর দিকে সুলতান মাহমুদের সঙ্গী হতে পেরে যুদ্ধে নামা, তাদেরকে এতটাই শক্তিশালী করে যে কারণে যুদ্ধে নেমে পরাজিত হওয়াটাই আপনার কাছে অজানা। ফলে রণাঙ্গনে সম্মুখে থেকে সুলতান হওয়া সত্ত্বেও সেনাপ্রধান হয়ে এই দ্বৈতসত্তার উপস্থিতির লড়াই অব্যাহত করে যাওয়াটা কোনো দুর্বলতা না বরং সবলতা। যেখানেই মহামান্য সুলতান মাহমুদ উপস্থিত সেখানেই যত বড় শত্রু আর সেনাদল হোক না কেন, যুদ্ধজয় নিশ্চিত।
সুলতান মাহমুদ : এই যুদ্ধ জয়, এই রাজকার্য, এই কবি আসর এসব তো তাৎক্ষণিক। আজ আছি কাল নেই। আমি যখন থাকব না তখনো যাতে করে এসব কথা থেকে যায় সে ব্যাপারে আপনার কী মত।
ফেরদৌসী : এ ব্যাপারে যে মত সে মত দিতে পারবেন আপনার সভাকবি কবি আনসারী এবং তার কবিসভা। যদি বলেন আমি কী করতে চাই এবং করতে পারি তবে সেটা বলতে পারি।
সুলতান মাহমুদ : বলেন আপনি কী করতে চান এবং কী করতে পারেন।
ফেরদৌসী : দেখুন জগতে যত ধর্ম সব ধর্মেই এক এবং একাধিক গ্রন্থ আছে। ধর্মপালনের রীতি সেখানে আছে। মহৎ বাণী সেখানে আছে। পৃথিবীতে যতগুলি মহাকাব্য আছে সেখানে সেই দেশ জাতির সকল বৈশিষ্ট্য সেই কাব্যে আছে। আমাদের ইরান দেশ, পারস্য সভ্যতার তেমন কোনো মহাকাব্য নেই। আমি সেই ভাবনা থেকে ইরানের প্রাগ-ঐতিহাসিক যুগ থেকে আরম্ভ করে আরবদের পারস্য বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত মোট তিন হাজার আটশত চুয়াত্তর বৎসর সময়কে, ঊনচল্লিশ রাজবংশের শাসনামলকে, প্রাচীন লোকগাথা-গল্প-উপখ্যান-কিংবদন্তী-ইতিহাস-ধর্মগ্রন্থ প্রভৃতির উপকরণ নিয়ে, বৃহৎ ৭টি খ- রচনার লক্ষ্য নিয়ে শুরু করেছি রচনা শাহনামা।

ইতিমধ্যে আমি বিগত কুড়ি বৎসর ধরে লেখা লিখেছি যেখানে শেষ হয়েছে প্রাগ ঐতিহাসিক যুগ। এখন আমার লক্ষ্য ঐতিহাসিক যুগ রচনা করা। আর সেটা করতে হলে আমার দরকার রাজার বৈশিষ্ট্য, রাজকার্য পরিচালনার বৈশিষ্ট্য, রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা, রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি, আধুনিক যুদ্ধকৌশল, নৃবিজ্ঞান, ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনা, প্রকৃত জ্ঞানীদের কথোপকথন প্রভৃতি স্বচক্ষে দেখে অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে কল্পনার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে অসমাপ্ত শাহনামা সমাপ্ত করা। আর সেই অভিজ্ঞতা লাভের জন্য, সুলতান মাহমুদের রাজসভা, কবিসভা সর্বাপেক্ষা উত্তম। আমি যদি আপনার রাজসভার, কবিসভার সান্নিধ্য পেয়ে শাহনামা রচনা করতে পারি তবে আমার প্রচেষ্টা থাকবে এক আখ্যান শেষ এবং অপর আখ্যান শুরুর মাঝে মহামান্য সুলতানের মাহমুদের রাজবৈশিষ্ট্য নিয়ে কাব্যরচনা এবং তা শাহনামায় অন্তর্ভুক্ত করা।

এর পাশাপাশি যখন আমার শাহনামা শেষ হবে তখন আমি শাহনামা লিখিতভাবে ঊৎসর্গ করবো গজনীর মহামান্য সুলতান মাহমুদ আপনাকে। শাহনামা যদি উৎকৃষ্ট শাস্ত্র গ্রন্থ হয়, শাহনামা যদি ইরান দেশ পারস্য সভ্যতার ভরকেন্দ্র হয় তবে আশা করা যায় শাহনামা মহাকাব্য অমরত্ব পাবে। আর সেটি যদি অমরত্ব পায় তবে সেই মহাকাব্যের আখ্যানের মধ্য মধ্যে থকে যাবেন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে মহামান্য মুহাম্মাদ সুলতান। উৎসর্গনামায় উচ্চারিত হবে কাব্যের পৃষ্ঠপোষক মহামান্য সুলতান মাহমুদের নাম। ফলে তাৎক্ষণিকতার বিপরীতে মহামান্য সুলতান মাহমুদ হবেন এক অমরত্বের নাম।
সুলতান মাহমুদ : অমরত্বের নামই যদি হয় আমার নাম সুলতান মাহমুদ তাহলে বলেন আপনাকে দিতে হবে কতটা এনাম।
ফেরদৌসী: আপনি গজনীর জুঁই নদীর তীরে দিবেন আমার থাকার ও লিখার মতো একটা ছোট্ট গৃহকোণ। আর শাহনামা শেষ হলে দিবেন যত পঙ্ক্তি তত দিরহাম তথা স্বর্ণ মুদ্রা।
সুলতান মাহমুদ: দিরহাম, স্বর্ণমুদ্রা, হীরা, রৌপ্য, তামা নয় কেন?
ফেরদৌসী: ইরানের রাজারা যেখানেই হাত রাখেন সেখানেই সোনা ফলে। ফলে স্বর্ণের বাইরে আর কোনোা ভাবনা আসে না। উপরন্ত কাশাফ নদীতে পাহাড়ি বরফ গলে বান ডাকে। আর তাতে ভেসে যায় তুস নগরীর জনপদ, ঘটে প্রাণহানি, ভেসে যায় হ্রদের মাছ, খোয়াড়ের পশু, ফসলি জমিন। তাই কাশফ নদীর তীরে বাঁধ এবং উপরে সেতু গড়ে তোলার জন্য এই স্বর্ণমুদ্রা অতীব প্রয়োজন।
সুলতান মাহমুদ: অর্থের কার না প্রয়োজন। কিন্তু আপনি তো কবি। কবি তো কাব্যসৃজন করে মানুষের মনোলোকে। পাথর বালি চুনের কাজ কি আপনি পারবেন।
ফেরদৌসী : আমি শাহনামার রাজা শাপুরের রাজত্বকালে, সেতু নির্মাণ প্রক্রিয়া হাতে কলমে শিখে তারপর লিখেছি যেখানে ইরানি রাজ শাপুর রোমান যুবরাজ বাজানুশকে বলছেন, 
আপনি যখন স্থপতি তখন করুন সেতু স্থাপন
যাতে উভয় পারের যাত্রী দিবারাত্রি করতে পারে পরিভ্রমণ।
এক হাজার, হাত দৈর্ঘ্যরে সেতু নির্মাণে প্রয়োগ করুন রোমান দার্শনিকের জ্ঞান
আমি আপনি থাকবো না, থাকবে সেতু, ভান্ডার খুলে দিচ্ছি যতটা লাগে নিন।
আবার রাজা নওশেরওয়া ইরান সাম্রাজ্য পরিভ্রমণে যেয়ে তার অধীনস্ত কর্মীদের উদ্দেশ্য করে বাঁধ বাঁধার নির্দেশনা প্রসঙ্গে বললেন, 
পাথর চুন দিয়ে জলের গভীর থেকে তুলেন এক প্রাচীর
যথেষ্ট প্রশস্ত হবে উচ্চতায় সূর্যমুখী দেবদারু যেন ইরানি প্রতিরক্ষা বীর।
হিন্দুস্থান রোম চীন থেকে আনুন দক্ষ কর্মীগণ
আজীবন ইরানবাসীকে সুরক্ষা দেবে এই আমার পণ।
সুলতান মাহমুদ : পণ যখন করেছেন বর্শা ছুড়বেন তখন আপনার বর্শা লক্ষ্যভেদী। চাওয়া এবং পাওয়া উভয়েই আপনার কাছে মৃগয়ার জোড়া চোখের মতো স্বচ্ছ।
ফেরদৌসী: একজন মহামান্য সুলতান মাহমুদের মধ্যে যে কবিসত্তা সেখান থেকেই উচ্চারিত হতে পারে এত সুন্দর কাব্য উপমা।
সুলতান মাহমুদ : কাব্য উপমায় আপনি যদি এখন এই মুহুর্তে আমাকে বিস্মিত করতে পারেন তবে এই মুহুর্তে আমিও জানাবো আমার সিদ্ধান্ত।
ফেরদৌসী: 
চু কাওদক আয শিরে মাদর বেশাস্ত
ব-গাহওয়ারা মাহমুদ গোইয়াদ না খাস্ত
মাতৃদুগ্ধ পান শেষে শিশুর তৃপ্ত উচ্চারণ 
রাজা আমাদের সুলতান মাহমুদ যিনি প্রজার হৃদস্পন্দন।
সুলতান মাহমুদ:
আয় ফিদৌসী, ও দরবারে মে’রা ফিরদৌস করদী।
রাজ সভাকে বানালো যে স্বর্গীয় উদ্যান 
আছ থেকে স্বর্গীয় আলো উপাধিতে ফেরদৌসী করা হাল নামকরণ।
ফেরদৌসী নামের অতলে আজ থেকে হারিয়ে গেলেন বাবা-মায়ের দেওয়া নামধারী আবুল কাসেম। আজ থেকে আপনার নাম মহাকবি ফেরদৌসী। আমি মন্ত্রী হোসেন মায়মন্দীকে বলে দিচ্ছি সে জুঁই নদীর তীরে আপনার বাসস্থান এবং থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিবেন। আপনি নিমগ্নচিত্তে শাহনামা রচনা করে জান। প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার আপনি আপনার লেখা নিয়ে আসবেন। আমি পাঠ শুনব। আপনার রচনায় জাদু আছে। প্রতিটি পঙ্ক্তির জন্য আপনায় আমি এক দেরহাম তথা এক একটি স্বর্ণমুদ্রাই দেবো। দেখি আপনি কত লিখতে পারেন আর আমি কত দিতে পারি। আপনি শাহনামা রচনার মঞ্চে দিয়ে সুলতান মাহমুদ এবং মহাকবি ফেরদৌসীর সম্পর্কের সেতুবন্ধন করুণ, আমি আমার ওয়াদা রাখব। এখন আপনি আসুন। মনে রাখবেন, প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার রাতে বসবে আমাদের কাব্য আসর।
ফেরদৌসী : রাজ আদেশ শিরোধার্য। তাহলে আমি আসি। 
সুলতান মাহমুদ: আসুন। অমরত্বের কাব্যসৃজন করুন।

প্যানেল হু

×