একটি রঙিন প্রজাপতি
২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩ সাল, বাংলার আকাশে উড়ল এক রঙিন প্রজাপতি। সারা বাংলাদেশের মানুষ মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল- একজন স্বপ্নদ্রষ্টার মন ফুঁড়ে উড়ে চলা বিস্ময়কর এক রঙিন ডানার প্রজাপতিকে! সেই স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষটি বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ। ইতোমধ্যে তিনি তখন শিল্পপতি হিসেবে নাম লিখিয়েছেন। তার রয়েছে ক্যাবল, মেটাল আর কয়েলের ব্যবসা। কিন্তু তার মুক্তিযোদ্ধা মন এখন ডানা মেলে বাংলার আকাশে উড়ে বেড়াতে ইচ্ছে করছে।
আর তা যেনতেন উড়া নয়, সবার চোখে তাক লাগানো উড়া, যা আগে এ দেশে কেউ কখনো দেখেনি। খবর হয়ে সবার দ্বারে দ্বারে পৌঁছানোর ইচ্ছে হলো তার। মন হয়তো বলতে লাগল- ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখি/ সবার আগে কুসুমবাগে উঠব আমি ডাকি’। বড় বড় জ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরাও বললেন- এটা সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি পথ দেখালেন। সম্ভব- এভাবে এভাবে করো। সত্যিই একদিন ঘটল সেই অসম্ভব ঘটনা। যারা তার এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তারাও অবাক হয়েছেন- কিভাবে সম্ভব হলো! প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে চলতে থাকল। এরপর ১৯৯৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দেশের চারটি বিভাগ থেকে একযোগে প্রকাশ পেল ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’। সাথে যুক্ত হলো কয়েকটি রঙিন ফিচার পাতা।
দেশের প্রতিটি জেলায় প্রতিদিন ভোরেই পৌঁছে গেল রঙিন প্রজাপতি এই পত্রিকাটি। এর আগে সবাই পত্রিকা হাতে পেতেন দিন শেষে অথবা পরদিন। অসাধ্য সাধন করলেন দৈনিক জনকণ্ঠের প্রতিষ্ঠাতা, সম্পাদক মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ। এক স্বপ্নদ্রষ্টার স্বপ্ন ঠাঁই নিল বাংলার হাজার হাজার চোখের কোণে। বিশেষ আকর্ষণ ছিল ফিচার পাতাগুলো। আগে আমরা শুধু ম্যাগাজিনগুলোতেই দেখতে পেতাম রঙিন সব ছবি। এবার পত্রিকার পাতায় এসব রঙিন ছবির সাথে জীবন যাপনের নানাদিক উঠে আসতে থাকল এসব ফিচার পাতার বদৌলতে। দৈনন্দিন সাজ-পোশাক, খাওয়া-দাওয়া, গৃহসজ্জা, রূপসজ্জা- কি নেই সেখানে! মানুষ সচেতন হতে লাগল- নিজের প্রতি, ঘর-সংসারের প্রতি, সম্পর্কের প্রতি, রূপচর্চার প্রতি।
দৈনিক জনকণ্ঠই সর্বপ্রথম এই রঙিন ফিচার পাতাগুলো প্রকাশ করে। ত্বকের যতœ, চুলের যতœ, কাকে কি উপহার দিবেন, বিশেষ দিনে কীভাবে সাজবেন, কি রান্না করবেন ইত্যাদি আয়োজনসহ জীবনের নানাদিক নিয়ে সচেতনতামূলক লেখা প্রকাশ হতে থাকে। সদ্য কৈশোরে পা দেয়া আমি তেমন ফ্যাশন সচেতন ছিলাম না। বান্ধবীগুলোও ছিল তেমনি। পত্রিকার এসব ফিচারগুলো পড়ে নিজেকে কিছুটা হলেও গুছিয়ে নিতে শিখেছি। বৈশাখ ও ফাল্গুন হলুদ আর লাল-সাদা শাড়ি-পাঞ্জাবিতে সবাই পালন করলেও, ভালোবাসা দিবস, বাবা বা মা দিবসগুলোতে তেমন কোনো সাড়া তখন ছিল না। তখন ছিল না স্যাটেলাইট, ইন্টারনেট বা মোবাইল। পত্রিকাই মানুষের জাগতিক বিষয়ে জানার তৃষ্ণা মিটাতো।
এত দিবস তখন ঘটা করে পালনও হতো না। ধর্মীয় দিবসগুলো উদযাপন করেই কাটত সাদামাটা রঙিন জীবন। তাতেই আমরা সস্তুষ্ট ছিলাম। তাছাড়া তরুণ-তরুণীদের মাঝে বইমেলার জনপ্রিয়তাও বাড়িয়েছে এই ফিচার পাতা। তার আগে খুব পড়ুয়া যারা, তারাই বেশি যেতেন বই সংগ্রহের তাগিদে। এরপর থেকে তরুণ-তরুণী, কিশোর কিশোরীসহ যাদের বইয়ের প্রতি তেমন আগ্রহ নেই, তারাও যেতে শুরু করেন বইমেলায় সাদাকালো শাড়ি-পাঞ্জাবি পরে। অনেকটা মিলনমেলার মতো হয়ে যায়, যেন সবাই মেতে উঠে প্রাণের উৎসবে। সঙ্গে বইও কিনে নিয়ে আসে- কখনো নিজে পড়ার জন্য, আবার কখনো উপহার দেয়ার জন্য।
যাপিত জীবনসহ ফিচার পাতাগুলো থেকেই এসব দিবস পালনের উৎসাহ পেতে থাকে সবাই। বন্ধু দিবস, মা দিবস, বাবা দিবস, ভালোবাসা দিবসÑ এসব দিবস যেন সবার মনে অন্যরকম আনন্দ নিয়ে এলো। বিশেষ করে আমাদের মতো কিশোর-কিশোরীদের মন ছুঁয়ে গেল। এসব দিবসে কি করা যায়, কাকে কি উপহার দেয়া যায় বা ভালোবাসার কীভাবে বহিঃপ্রকাশ করা যায়, এসব কিছুই আসে যাপিত জীবনসহ এসব ফিচার পাতাগুলো থেকে। এসব দিবসগুলো সম্পর্কে যাপিত জীবন যেমন আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়, তেমনি মুখে না বললেও উপহারের মাধ্যমে কীভাবে বন্ধু, বাবা, মা, ভাই, বোনকে মনের কথা প্রকাশ করা যায়, তারও পরামর্শ পাওয়া যায় সেখানে। এমনকি বিয়ের পুরো আনুষ্ঠানিকতার কেনাকাটা, সাজ-পোষাক, সেন্টার সম্পর্কেও অনেক ধারণা পাওয়া যায়। বাঙালি হয়ে উঠে আরও বেশি উৎসবমুখর।
আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের বিশাল একটা প্রাপ্তি ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’। শৈশবের সেই প্রিয় পাতাটি আজ আমার হাতে, আমার দায়িত্বে প্রকাশিত হয়! আমারও লেখা থাকে! কখনো যা কল্পনাও করিনি। জনকণ্ঠ আমার অনেক স্বপ্নের অজানা বহিঃপ্রকাশ। মনের সুপ্ত অনেক ইচ্ছে পরিপূর্ণতা পেয়েছে এই জনকণ্ঠে। ইডেনে যখন এই পথে ক্লাস করতে যেতাম, একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে বলতাম- ইশ! এমন একটা অফিসে যদি চাকরি করতে পারতাম! নিজের অজান্তেই সেই ইচ্ছে একদিন পূরণ হয়ে যায়। এখানে যোগ দেয়ারও অনেকদিন পর খেয়াল করি- বাহ, আমি তো আমার সেই স্বপ্নের ভবনে!
এরপর খুঁজে পাই যাদের লেখা পড়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম, পত্রিকা হাতে নিয়েই পাতা উল্টাতাম। তারও অনেক বছর পর, একদিন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নিয়েই লিখতে গিয়ে আবিষ্কার করি- আরে! আমি তো সেই রঙিন পাতাটির রং লাগিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছি! শৈশবের প্রিয় রঙিন সেই ‘যাপিত জীবন’কে রাঙিয়ে নিয়ে বয়ে চলার প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাই সব সময়। জানি না শৈশবটাকে কতটা রঙিন রাখতে পারছি। এই ভবনটা আমার শৈশবের ‘এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’। আরও যে কতকিছু মিশে আছে তার সঙ্গে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ছুঁয়ে আছি তাকে। আর সবচেয়ে আলোড়িত যে অংশটুকু, যা ছোট-বড় প্রায় সবার খুব প্রিয়- সেই পাতাটাই ভালোবেসে আগলে নিয়ে পথ চলছি বেশ কয়েক বছর যাবত।
‘যাপিত জীবন’Ñ জীবনের যত রং সবটুকু যেন মিলেমিশে একাকার এই ফিচার পাতায়। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি পত্রিকায় এমন একটি ফিচার পাতা তাদের নিজস্ব নামে প্রচলিত, যার সূচনা হয় দৈনিক জনকণ্ঠ থেকেই। শুধু নেই সেই স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষটি। কেউ চিরদিন থাকে না। কিন্তু তার শূন্য জায়গাটা কখনো পূরণ হয় না। তাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এলেই মনের আকাশে একরাশ কালো মেঘ ভেসে বেড়ায়, চোখের কোণ চিকচিক করে উঠে।
একযোগে রঙিন হয়ে চারটি বিভাগ থেকে প্রকাশ হওয়া ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’ সূচনালগ্ন থেকেই ছিল ডাল-পালা নিয়ে সমৃদ্ধ ও পরিপূর্ণ একটি পত্রিকা। ৩৩ বছর ধরে অনেক ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করে, নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে জনকণ্ঠ এখনো স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। আরো ৩৩ বছর পার হতে চাই এই রঙিন প্রজাপতির ডানায় ভর করে।
লেখক: সহ-সম্পাদক
দৈনিক জনকণ্ঠ
প্যানেল হু








