ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৬ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩

বিশেষ সংখ্যা

বিশেষ সংখ্যা বিভাগের সব খবর

বাংলা ভাষার অস্তিত্বের লড়াই...

বাংলা ভাষার অস্তিত্বের লড়াই...

শৈশবে পন্ডিত মশায়ের কাছে শিখেছিলাম, বাংলা ভাষার প্রকারভেদ দুটো- সাধু রূপ ও চলিত রূপ। ভাষার এই প্রকারভেদের আলোকে প্রথমত আলোচনা করা যেতে পারে। পরবর্তীতে ভাষার প্রায়োগিক রূপ নিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে। ‘বর্ষার সন্ধ্যায় আকাশের অন্ধকার যেন ভিজিয়া ভারী হইয়া পড়িয়াছে। বর্ণহীন বৈচিত্রহীন মেঘের নিঃশব্দ শাসনের নিচে কলিকাতা শহর একটা প্রকান্ড নিরানন্দ কুকুরের মত লেজের মধ্যে মুখ গুঁজিয়া কু-লি পাকাইয়া চুপ করিয়া পড়িয়া আছে।’ উপরের এই উদ্ধৃতিটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ উপন্যাস থেকে নেওয়া হয়েছে।  এটি সাধু ভাষার একটি সঠিক রূপ। উদ্ধৃতিটির বিশ্লেষন করলে বাংলা ভাষার মৌলিক ব্যাকরণগত উপাদান সমূহের প্রয়োগ আমরা দেখতে পাবো। একথা বলা মূলত অত্যুক্তি হবে না যে, সাধু ভাষার এই রূপ প্রকৃত বিচারে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত নেই। বস্তুত কোলকাতার বাবুরা বাংলা ভাষার সাধুরূপের কিয়দাংশ বজায় রাখতে স্বচেষ্ট হলেও, শব্দগত অনেক বিকৃত রূপ প্রকাশ পায়। কোলকাতাবাসীদের মুখে তাই আজও আমরা শুনতে পাই-  ‘নারায়ণ কহিল, ধম্ম-কম্ম বুঝি না।’  এখানে বলিল-এর জায়গায় ‘কহিল’ এবং ধর্ম-কর্ম জায়গায় ‘ধম্ম-কম্ম’ ব্যবহৃত হয়েছে।  আবার হরিদাসদের মুখে শোনা যায়-   ‘রাজধানীতে গিয়েছিলুম।’ এখানে গিয়েছিলাম-এর জায়গায় ‘গিয়েছিলুম’ ব্যবহৃত হয়েছে। অনুতাপের বিষয় বাংলা ভাষার মৌলিকত্ব পুরোপুরি কোথাও প্রচলিত নেই। আমাদের দেশে বাংলা ভাষায় চলিত রূপটিই অক্ষুণ আছে। বলা বাহুল্য, চলিত রূপটির দ্বারাই আমাদের কৃষ্টির মানদন্ড বিচার করা হয়। ‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দ দেয়া, কারও মনোরঞ্জন করা নয়। এ দুয়ের ভেতর যে আকাশ- পাতাল প্রভেদ আছে, সেইটি ভুলে গেলেই লেখকরা নিজে খেলা না করে পরের জন্য খেলনা তৈরী করতে বসেন।’  উল্লেখিত উদ্ধৃতিটি সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীর ‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধ থেকে নেয়া হয়েছে, এখানে আমরা চলতি রূপের প্রয়োগিক রূপ দেখতে পাচ্ছি। মূলতঃ চলিত ভাষার প্রয়োগ শুধুমাত্র বর্তমান সাহিত্যেই অথবা ক্ষেত্রবিশেষে শহরের কৃষ্টিতে প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থান করছে। বর্তমানে চলিতভাষার যে রূপ তাকে আর বাংলা ভাষার পূর্ণাঙ্গরূপ বলা চলে না। কারণ আমাদের প্রচলিত ভাষার অভ্যন্তরে অন্যান্য অনেক ভাষার প্রতিশব্দগুলোর অনুপ্রবেশ হওয়াতে আমরা মুল বাংলা ভাষা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছি। যেমন-   * Sunrise Pre-cadet এ ভর্তি চলছে। * প্রাথীকে অবশ্যই সুদর্শন ও ঝসধৎঃ হতে হবে।  * Shwo room-এর জন্য যোগাযোগ করুন।   উপরের এই তিনটি বাক্যের মধ্যে প্রথম বাক্যে আমরা দেখতে পাই ঝঁহৎরংব চৎব-পধফবঃ দ্বিতীয় বাক্যে ঝসধৎঃ এবং তৃতীয় বাক্যে ঝযড়ি ৎড়ড়স এই তিনটি ইংরেজী শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বাক্য তিনটি এই আধুনিক যুগে আজ আমাদের কাছে স্বাভাবিক। সচরাচর এই বাক্যগুলি তথা এমন অজস্র বাক্য আমরা মুখে বলছি অথবা রাস্তাঘাটে অহরহ দেখতে পাচ্ছি। বিষয়টির একটু গভীরে প্রবেশ করলে আমরা দেখতে পাব, উল্লেখিত বাক্য তিনটি আর বাংলা ভাষার কোন রূপ বজায় রাখতে পারেনি, হয়ে গেছে সংমিশ্রিত ভাষা। তাহলে দৃশতঃ বিষয়টা দাঁড়াল আমরা একটি সংমিশ্রিত ভাষাকে আমাদের ভাষার চলিত রূপ হিসেবে চালিয়ে যাচ্ছি। এখন যদি আমরা বাক্য তিনটিকে বিপরীত ভাবে সাজাই তাহলে কি দাঁড়াবে -  * ভর্তি রং মড়রহম on Sunrise Pre-cadet. * প্রার্থী রিষষ নব handsome & smart.  * যোগাযোগ for shwo room.   এই তিনটি বাক্য কি আমরা ইংরেজী কোন গ্রন্থে দেখতে পাব? বাক্য তিনটি কি শুদ্ধ? ইংরেজ জাতি কি এগুলো মেনে নেবেন? সবগুলো প্রশ্নেরই উত্তর আসবে নেতিবাচক। কিন্তু আমরা আমাদের নেতিবাচককে মেনে নিলাম কোন যুক্তিকে? এ জিজ্ঞাসা কর্তাব্যক্তি ও বুদ্ধিজীবী মহলের কাছে। ডাঃ হুমায়ুন আজাদ ‘বাংলা ভাষার শত্রু মিত্র’গ্রন্থে এ বিষয়টি বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। চলতি ভাষার এই রূপে, শুদ্ধ বা পূর্ণাঙ্গ বাংলা ভাষার কোন রূপ নেই, সে স্থান দখল করে নিয়েছে এক অবাঞ্ছিত সংমিশ্রিত ভাষা। পন্ডিত মশাই ভাষার যে প্রকারভেদ করেছিলেন, সেই শ্রেণীবিভাগে ভাষার আর একটি রূপ সংযোজন করা যেতে পারে- তাহলো আঞ্চলিক রূপ। একজন মনীষীর উক্তি প্রাসঙ্গিকভাবে না বলে পারছি না।

মুক্ত হোক মায়ের ভাষা

মুক্ত হোক মায়ের ভাষা

‘জননীর স্তনদুগ্ধ যদ্রুপ অন্য সকল দুগ্ধ অপেক্ষা বল বৃদ্ধি করে; তদ্রুপ জন্মভূমির ভাষা অন্য সকল ভাষা অপেক্ষা মনের বীর্য প্রকাশ করে।’ -রাজনারায়ণ বসু। মাতৃভাষা হলো মানুষের আবেগ-অনুভূতির প্রকৃত প্রকাশ মাধ্যম। তার জিয়নকাঠির স্পর্শেই নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হয়, বোধের গভীরে চিন্তার বুদবুদ কারার দ্বার ভেঙে বাইরে এসে বাক্মূর্তি ধারণ করে। আর অন্যদিকে শিক্ষা হলো মানব জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। মানুষের সকল ধনসম্পত্তি মানুষকে ছেড়ে চলে গেলেও অর্জিত শিক্ষা ও জ্ঞান কখনো মানুষের সঙ্গ ছাড়ে না। তাই সেই অর্জিত শিক্ষার সঙ্গে মানুষের অন্তঃস্থলের আবেগের যোগ থাকা একান্ত আবশ্যক। সে কারণে শিক্ষার সঙ্গে মানুষের অন্তরের আবেগকে যুক্ত করার জন্য প্রয়োজন মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের। প্রাণের ভাষা ও প্রাণের জ্ঞান একত্রিত হলে তবেই একজন সার্থক মানুষরূপে পৃথিবীর বুকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব হবে।

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন ব্যতীত

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন ব্যতীত

পশ্চিমা বিশ্বের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেছেন, ‘তৃতীয় বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে নানা জটিল সমস্যা বিরাজমান। যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় তাদের ওপর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে অনেক বেশি। কারণ তারা নানা ধরনের অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণকে প্রলুব্ধ করে ভোট আদায় করে নেয়। কিন্তু বাস্তবসম্মত কারণেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পক্ষে গণচাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। ফলে অল্প দিনের মধ্যেই সাধারণ মানুষের মোহ ভঙ্গ হয়। তারা পরবর্তী নির্বাচনে নতুন কোনো রাজনৈতিক দলকে ভোট দিয়ে ক্ষমতাসীন করে। সম্ভাবনাময় নতুন কোনো রাজনৈতিক দল না পাওয়া গেলে তারা আবারও সেই পুরানো রাজনৈতিক দলকেই ভোট দেয়।’ বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে আমরা ওই রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর বক্তব্যের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারব। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। এই দীর্ঘ সময়ে যতটি স্বচ্ছ, সুষ্ঠু এবং জন অংশগ্রহণমূলক জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তার কোনোটিতেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল জয়লাভ করতে পারেনি। পঞ্চম (১৯৯১) ষষ্ঠ (১৯৯৬) সপ্তম (২০০১) এবং অষ্টম (২০০৮) জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সংসদ নির্বাচন, যা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। এ চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনোটিতেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল জয়লাভ করতে পারেনি।

জনতার আদালতের বিচার অত্যন্ত কঠিন

জনতার আদালতের বিচার অত্যন্ত কঠিন

বাংলাদেশ একটি দরিদ্র দেশ। গত কয়েক বছরে হাঁকডাক করে বলা হচ্ছিল দেশটি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছে। আরও বলা হয়েছে উত্তরণটি ঘটবে আগামী বছর ২০২৬ সালে। কিন্তু এখন বিতর্ক হচ্ছে-২০২৬ সালেই এ উত্তরণ মেনে নেওয়া ঠিক হবে কিনা। কারণ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে রূপান্তরিত হলে দেশটি আন্তর্জাতিক লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে যেসব ছাড় উপভোগ করছে, সেগুলো থেকে বঞ্চিত হবে। ইতোমধ্যে ব্যবসায়ী মহলের পক্ষ থেকে এ উত্তরণের রোডম্যাপ পিছিয়ে দেওয়ার দাবি উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকার এ ব্যাপারে দোদুল্যমানতায় থাকার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগামী বছরেই উত্তরণটি ঘটবে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে কিনা, তা নিরূপিত হয় বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও সূচকের দ্বারা। দেশের মানুষ রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান, বিশেষ করে শেখ হাসিনার আমলের পরিসংখ্যানের ওপর আদৌ বিশ্বাস রাখে না। এ সময় অর্থনীতি, উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে যেসব পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই বানোয়াট এবং বিভ্রান্তিকর। সত্যিকার পরিসংখ্যানকে দুমড়ে-মুচড়ে নিজেদের ইচ্ছামাফিক প্রচারণার স্বার্থে কাজে লাগানোর জন্য হেন অপচেষ্টা নেই, যা আওয়ামী লীগ সরকার করেনি। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সরকারের দুজন মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এবং মহীউদ্দীন খান আলমগীর অত্যন্ত নোংরা ভূমিকা পালন করেছেন।

যাপিত জীবনে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

যাপিত জীবনে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

সময় থেমে থাকে না। ঘড়ির টিক টিক শব্দে চলতে থাকে বহমান নদীর মতো। চলার পথে থাকে নানা চড়াই-উতরাই। তবু সময় আর জীবনের প্রয়োজনে আমরা ছুটে চলি। আর প্রত্যাশা করি- আগামী দিন যেন থাকে নির্ভেজাল, সুন্দর ও আলোকিত। আর নতুন বছরের প্রাক্কালে আমরা একান্তই চাই- বিগত বছরের কোনো কষ্ট, হারানো আর না পাওয়ার বেদনা যেন কখনো ফিরে না আসে। কিছু না কিছু পরিবর্তন তো সমাজ, দেশ ও জীবনে ঘটেই যায়। চোখে পড়ার মতো পরিবর্তনগুলোর মধ্যে কিছু আলোকপাত করা হলো- জীবনযাত্রার মান ॥ জীবন যাত্রা অনেক ব্যয়বহুল হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে অনেকগুণ। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর নাভিশ^াস উঠে যাচ্ছে তাল মিলিয়ে চলার। আর নি¤œ মধ্যবিত্তরা যতটুকু না হলেই নয়Ñ ততটুকুতে অভ্যস্ত হওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে আবার বিয়ে-শাদিতে বেড়েছে জাঁকজমক। যার যার সামর্থ্যমত চাকচিক্যময় করে তোলে বিয়ের অনুষ্ঠান। স্কুলের পড়াশোনা ॥ বিগত সময়ে সিলেবাস পরিবর্তন হওয়ায় পড়ায় যে বিঘœ ঘটেছিল, তা এখন ছেলেমেয়েরা অনেকটা কাটিয়ে উঠেছে। তবু এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবকরা কিছুটা শংকিত- সন্তান ভালো রেজাল্ট করবে তো! অনেকেরই ধারণা দীর্ঘদিন পড়া থেকে দূরে থাকার ফলে, এখনো তারা পড়ায় সেভাবে অভ্যস্ত হয়ে উঠেনি। তাছাড়া শিক্ষা উপকরণসহ যাবতীয় সবকিছুর মূল্য এত বেড়েছে, অভিভাবকরা চিন্তিত সন্তানকে সুন্দর একটা শিক্ষাজীবন দিতে পারবে কিনা।  সাজসজ্জায় সোনা ॥ রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে সোনার দাম। সর্বসাধারণের হাতের নাগালের বাইরে চলে গেছে স্বর্ণ নামক নারীদের সবচেয়ে পছন্দের সাজের এই অলংকার। একটা সময় মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে বা নিকট আত্মীয়ের বিয়েতে স্বর্ণ উপহার দিত। কিন্তু এখন নিজেদের বিয়েতেও একটুখানি সোনা কিনতে মানূষকে হাজারবার ভাবতে হচ্ছে। যানবাহন ॥ যানবাহন জগতে নতুন এক নাম টেসলা, যা রিক্সার চেয়ে দ্রুত গতিতে চলে। অনেকেই দ্রুত চলাচলের উদ্দেশ্যে রিক্সা সদৃশ্য এই বাহনে চড়তে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আর এর সংখ্যাও অত্যধিক পরিমাণে বেড়েছে। তবে এতে ঝুঁকিও অনেক বেশি। এদের বেপরোয়া চলাচলে ঘটছে অনেক দুর্ঘটনাও। ভোজনবিলাসী মন ও স্বাস্থ্যসচেতনতা ॥ ভোজন বিলাসী হয়ে উঠেছে দেশের মানুষ। এক সময় স্কুল/কলেজ/বিশ^বিদ্যালয়গামী ছেলেমেয়েরাই শুধু বাইরের খাবারে অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু বর্তমানে অবসরে বা ছুটির দিনে বাইরে বেড়ানো মানেই কোথাও খেতে যাওয়ার সংস্কৃতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এমনকি গ্রামে বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েদের মাঝেও এ বিষয়টি খুব প্রভাব ফেলেছে। সঙ্গে বেড়েছে স্বাস্থ্যসচেতনতাও। ঘরোয়া প্রাকৃতিক উপকরণে স্বাস্থ্য ধরে রাখার পাশাপাশি একদল ঝুঁকেছে জিম এ গিয়ে ফিটনেস ধরে রাখার প্রতি। নারী উদ্যোক্তা ॥ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বেড়েছে উদ্যোক্তা শ্রেণি। স্বকর্ম সংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছেন অনেক পরিবার। তবে আশার বিষয় হচ্ছে- গৃহিণীদের উদ্যোক্তা হওয়া। তারা যেমন ঘরে বসে কিছু করার চেষ্টা করছেন। তেমনি যারা কখনই কিছু করার কথা ভাবেননি, তারাও অন্যদের দেখে আয়ের চেষ্টা করছেন। তাতে যেমন সন্তানদের দেখভাল করে সংসার সামলাতে পারছেন, তেমনি উপার্জনও করতে পারছেন। তাতে তারা মানসিকভাবেও স্বস্তি পাচ্ছেন। তাছাড়া গত বছরের তুলনায় এ বছরে কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা স্ট্রিট ফুডের ব্যবসার প্রতি আরও বেশি পরিমাণে ঝুঁকেছে। এতে তারা নিজেদের খরচ নিজেরা চালানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে পরিবারেও কিছুটা সহযোগিতা করতে পারছে। অভিভাবকরাও এখন সন্তানদের এসব কাজ সহজভাবে নিচ্ছেন। তাদের ভাষায়- আর যা-ই হোক, খারাপ পথে যাওয়ার টেনশন মুক্ত থাকা যাচ্ছে। ফ্যাশন ॥ ফ্যাশন সচেতনতা বেড়েছে ছেলে-বুড়োসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের। ইন্টারনেটের মাধ্যমে কখন কোন ট্রেন্ড চলছে খুব দ্রুত সবাই তা জেনে যাচ্ছে। তাই এখন বিভিন্ন দিবসে মূল রঙের ছোঁয়া রেখে নানা রঙে রাঙিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। শীত পোশাকেও এসেছে পাশ্চাত্য ঢং- এ। রাউন্ড ও লং জামার ট্রেডিশনের পাশাপাশি ইদানীং শর্ট জামার ফ্যাশনও চোখে পড়ছে। তরুণ-তরুণীরা পাশ্চাত্য ফ্যাশনে অনেক বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ॥ ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে এখন শুধু বিনোদন বা প্রাতিষ্ঠানিক কাজই নয়, ঘরে বসে উপার্জনের চেষ্টা করছেন সব শ্রেণির মানুষ। ব্লগিং করেও অনেকে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করছেন। যারা ধৈর্য ধরে কাজটি করতে পারছেন, তারা টিকে যাচ্ছেন। একটা সময় ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে তরুণরা ঝিমিয়ে পড়েছিল। নানা নিষিদ্ধ কন্টেন্ট দেখে তারা বিপথগামী হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এখন তারা এর সঠিক ব্যবহার করে খুঁজে নিচ্ছে নিজেদের আত্মপরিচয়। অনেক ধরনের স্বকর্ম সংস্থানের সূত্র মিলছে তাতে। মিলছে নানা রকম প্রশিক্ষণ। অনেকেই সেই লক্ষ্যে সফলও হচ্ছে। তারুণ্যের জয়জয়কার ॥ দেশের কোনো বড় শংকটে তরুণরাই সব সময় উদ্যোগী হয়েছে। তাদের প্রতিবাদই এনেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। এবার তারা আরও বেশি সোচ্চার হয়েছে ন্যায্য দাবিতে। যে কোনো অন্যায়ে তারা প্রতিবাদের ঝড় তুলছে। এসব কিছুই তাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও দায়বদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ। ভবিষ্যতে যে কোনো খারাপ পরিস্থিতিতে যে তারা দেশ ও দেশের মানুষের পাশে দাঁড়তে পারবে তার কোনো সন্দেহ নেই। তবে তাদের আরও সজাগ থাকতে হবে সিংহভাগ মানুষের সুযোগ-সুবিধার দিকে। প্রতিবাদ আর আন্দোলনে যেন সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কারণ না হয়। জনগণ যেন কারো রোষানলের শিকার না হয়, সেদিকেও তাদের খেয়াল রাখতে হবে। ঋতুর পরিবর্তন ॥ দীর্ঘদিন বাংলাদেশ শীত ঋতু থেকে প্রায় বঞ্চিতই হয়ে পড়েছিল। পৌষ-মাঘ এসে চলে যায়। কিন্তু ‘মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে’- প্রবাদটি প্রায় হারিয়েই যাচ্ছিল। গত শীতকালে কিছুদিন দেশের মানুষ শীত উপভোগ করেছে। এ বছরও শেষ প্রান্তে এসে শীত ছুঁয়ে গেল সবাইকে। নতুন বছরেও প্রবল শীত ও শৈত্যপ্রবাহ ‘কনকন’ আসছে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে। মার্কেট আর শপিং মলগুলোতে উঠেছে বাহারি ডিজাইনের শীতের কাপড়। আমার দেশ আমার ভালোবাসা ॥ বিভিন্ন কারণে এ বছর বেশির ভাগ সময়ই সারাদেশ ছিল উত্তাল। নানা ধরনের প্রতিবাদ-সমাবেশের কারণে বিভিন্ন রাস্তা ব্লক থাকায় জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। যানজটে নাকাল হতে হয়েছে। কোথাও যাওয়ার জন্য রওনা হলে নির্দিষ্ট করে বলার কোনো সুযোগ ছিল না যে, কতক্ষণে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে। তাছাড়া বছর শেষে দুজন মানুষের পৃথিবী থেকে বিদায়- পুরো দেশের মানুষের মাঝে বিষাদ ছড়িয়ে দিয়েছে। একজন সম্ভাবনাময় তরুণ আর একজন জনপ্রিয় প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তরুণরাই এক সময় দেশের হাল ধরবে। আর প্রবীণরা পথ দেখাবেন, শক্তি জোগাবেন। তাই এ দুজনের বিদায়ে শোকে মুহ্যমান সারাদেশ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও ঢাকায় মানুষের ঢল নেমেছিল তাদের জানাজায়। যা কিছু হারিয়েছি তার শোক কাটিয়ে উঠার শক্তি দিক আল্লাহ সবাইকে। আগামী বছর দেশ ও জনগণের জীবনযাত্রা সহজ হোক- এটাই কাম্য সবার। ইন্টারনেটের এই যুগে আমরা অনেক বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি পাশ্চাত্য সভ্যতার দিকে। দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতিও। তাই খেয়াল রাখতে হবে যেন সেই ¯্রােতে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বদলে না দেই। শুধু বিশেষ দিনেই যেন আমাদের ধর্ম, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে মনে না করে সব সময় মনে রাখি, পালন করিÑ নতুন বছরে এই প্রত্যাশা।

সংস্কারের বছর

সংস্কারের বছর

বিদায়ী বছরজুড়েই আলোচনার শীর্ষে ছিল রাষ্ট্র সংস্কার তথা জুলাই জাতীয় সনদ। জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতেও ছিল আলোচিত এই ইস্যুটি। ২০২৫ সাল জুড়ে এই সংস্কার প্রক্রিয়া দেশের রাজনীতিতে ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, যা একটি নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভবিষ্যতের দিকে দেশকে পরিচালিত করবে। প্রায় ৯ মাসব্যাপী ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা শেষে প্রণীত হয় ‘জুলাই চার্টার’, যা সংবিধানের প্রায় অর্ধেক সংশোধনীসহ প্রায় ৮০টিরও বেশি প্রস্তাবকে একত্রিত করে একটি ঐতিহাসিক চূক্তিতে পরিণত হয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোটের মাধ্যমে জুলাই চার্টারের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। গণ-অভ্যুত্থানের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর প্রধান লক্ষ্যই ছিল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার সাধন। বিদায়ী বছরের শুরুতেই সংবিধান সংস্কার কমিশন তাদের সুপারিশ জমা দেয়, যা ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের একটি বড় ধাপ। মূল সংস্কার কমিশনগুলোর চেয়ারম্যানরা একটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে, যার কাজ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সাংবিধানিক ও অন্যান্য সংস্কারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা।  দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়, যা সংবিধান, নির্বাচনী ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ এবং দুর্নীতি দমন কাঠামোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনে রূপরেখা দেয়। আর আলোচনার ভিত্তিতেই এই সনদ বাস্তবায়নের জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়, যা ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সামগ্রিকভাবে, ২০২৫ সাল ছিল বাংলাদেশের জন্য পুরানো ব্যবস্থা ভাঙ্গাগড়া এবং নতুন একটি গণতান্ত্রিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির প্রস্তুতির বছর, যা ‘জুলাই সনদ’-এর মাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। আর ৩০টি রাজনৈতিক দল বছরজুড়ে দফায় দফায় আলোচনার টেবিলে বসে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্রীয় সংস্কারে উপনীত হওয়ার বিষয়টিও ছিল দেশের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা।  বিদায়ী বছরের শুরুতে নির্বাচনী ব্যবস্থা, সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রশাসন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন- এই প্রধান ছয়টি সংস্কার কমিশন তাদের সুপারিশমালা সরকারের কাছে জমা দেয়। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য, শ্রম, গণমাধ্যম, নারী বিষয়ক ও স্থানীয় সরকার সংস্কারে আরও পাঁচটি কমিশন গঠন করা হয়, যারা মে মাসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে বিদায়ী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়।  দীর্ঘ আলোচনার পর গত ১৭ অক্টোবর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো (বিএনপি ও অন্যান্য ২৪টি দল) ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ স্বাক্ষর করে, যেখানে ৮০টিরও বেশি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। তবে দীর্ঘ আলোচনায় অংশ নিলেও সুনির্দিষ্ট কয়েকটি দাবিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাসদ ও বাংলাদেশ জাসদ জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি। যেভাবে শুরু এবং শেষ ॥ রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত ঐকমত্য কমিশন ছয়টি সংস্কার কমিশনের কয়েকটি সুপারিশকে তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করে, যেগুলো আইনগত বা প্রশাসনিক উপায়ে বাস্তবায়ন করা হবে। পরে ১৬৬টি মূল প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে কমিশন। প্রথম পর্যায়ে, কমিশন ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে প্রায় তিন মাস ধরে আলাদাভাবে বৈঠক করে, এবং পরে ২০টি অমীমাংসিত মৌলিক প্রস্তাব নিয়ে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা শুরু করে।  আলোচনার টেবিলে ৬২টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো হয়, যার বেশির ভাগই বিচার বিভাগ সংস্কার  এবং দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে, পাশাপাশি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ছয়টি প্রস্তাব। সংবিধান সংস্কার কমিশন ১৮টি প্রস্তাব জমা দেয়, যার মধ্যে একটি [দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ] গঠনের প্রস্তাবও ছিল, যা ৩০টি দলের সমর্থন পেলেও এর কাঠামো নিয়ে মতবিরোধের কারণে অমীমাংসিত থাকে। দ্বিতীয় পর্যায়ে, আরও ১৪টি বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত সাত সদস্যের জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ১১টি সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের একটি ঐকমত্যভিত্তিক রূপরেখা তৈরির লক্ষ্যে তিন দফায় মোট ৭২ দিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের সঙ্গে সংলাপ চালায়; প্রথম ধাপে উত্থাপিত ১৬৬টি বিষয়ের মধ্যে ৬৪টিতে ঐকমত্য গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে ২৮ দফা প্রতিশ্রুতিসংবলিত ‘জুলাই সনদ ২০২৫’-এর ভিত্তি নির্ধারণ করে। সনদের খসড়া গত বছরের ২৮ জুলাই চূড়ান্ত করে দলগুলোর কাছে মতামতের জন্য পাঠানো হয়, আগস্ট-সেপ্টেম্বর জুড়ে বাস্তবায়নপদ্ধতি নিয়ে সংলাপের পর ১১ সেপ্টেম্বর খসড়া চূড়ান্ত হয় এবং ১৪-১৫ অক্টোবর চূড়ান্ত অনুলিপি দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়। সনদটিতে রাষ্ট্র কাঠামো, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ-সংক্রান্ত সংস্কার অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ২৫টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এতে স্বাক্ষর করেন। আমন্ত্রিতদের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও কিছু বাম দল সই থেকে বিরত থাকে।  জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে প্রায় ৯ মাস ধরে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা করে। আলোচনায় ৮৪টি প্রস্তাব নিয়ে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়। এগুলো নিয়েই তৈরি হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ, যা সই হয় গত ১৭ অক্টোবর (এনসিপি ও চারটি বাম দল সই করেনি)। এর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের জন্যই জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি হয়েছে এবং তা নিয়ে গণভোট হবে। জাতীয় জুলাই সনদের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, যেদিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে, সেদিনই গণভোট হবে। নির্বাচনের প্রার্থীকে ভোটের জন্য ভোটারদের যেমন ব্যালট দেওয়া হবে, তেমনি দেওয়া হবে গণভোটের ব্যালট। গণভোটে প্রশ্ন থাকবে একটি, যেখানে ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে হবে। প্রশ্নের অধীন প্রস্তাব থাকবে চারটি। গণভোটের ব্যালটে যে প্রশ্নটি থাকবে তা হলো- ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার-সম্পর্কিত নি¤œলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’ এছাড়া গণভোটের অধীনে একটি প্রশ্নের মধ্যে চারটি প্রস্তাব থাকছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। ২. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। ৩. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। ৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে। এই চার প্রস্তাবের মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ৪৮টি সংবিধানসংক্রান্ত সুপারিশের সব কটিই রয়েছে। গণভোটে এক প্রশ্নের অধীন চার প্রস্তাব কেন? উত্তর বলা হয়েছে- মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি আমলে নিতে গিয়ে এটা করা হয়েছে। কোন দলের আপত্তি কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে ॥ (ক) জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারির বিপক্ষে ছিল বিএনপি। তারা চেয়েছিল, প্রজ্ঞাপন জারি করে এটা হোক। তাদের যুক্তি, এ ধরনের আদেশ জারির এখতিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। যদিও জামায়াত সাংবিধানিক আদেশের পক্ষে ছিল। (খ) বিএনপি চেয়েছিল গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ একই দিনে হোক। সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট দিয়েছে। ফলে বিএনপির এ দাবি পূরণ হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে জামায়াতের এই দাবি পূরণ হয়নি। জামায়াত জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোটের দাবি করেছিল। (গ) সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন পিআর (সংখ্যানুপাতিক) পদ্ধতি নিয়ে বিএনপির আপত্তি ছিল। বিএনপির চাওয়া ছিল, উচ্চকক্ষে ১০০ আসন বণ্টন হোক নি¤œকক্ষের আসনের অনুপাতে। ধরা যাক, নি¤œকক্ষে একটি দল ১৫০টি আসন পেয়েছে। তাহলে উচ্চকক্ষে তাদের আসন হবে ৫০টি। উচ্চকক্ষ নিয়ে বিএনপির এ ভিন্নমত আমলে নেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে জামায়াত ও এনসিপির দাবি পূরণ হয়েছে। অর্থাৎ সংসদ নির্বাচনে দলগুলো যে অনুপাতে ভোট পাবে, সে অনুপাতে আসন বণ্টন হবে উচ্চকক্ষে। যদি কোনো দল ১০ শতাংশ ভোট পায়, তাহলে উচ্চকক্ষে আসন পাবে ১০টি। সদস্যদের নাম তারা ঠিক করবে। (ঘ) সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা, অর্থাৎ ১০০ জনের মধ্যে অন্তত ৫১ জনের ভোট দরকার হবে। বিএনপি সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি উচ্চকক্ষে নেওয়ার বিপক্ষে। বিএনপির ভিন্নমত আমলে নেওয়া হয়নি। (ঙ) বিএনপি চেয়েছিল নোট অব ডিসেন্ট, অর্থাৎ ভিন্নমত অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা হোক। অর্থাৎ নির্বাচনে জয়ী হলে তারা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ভিন্নমত থাকা প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করবে। এ বিষয়ে বিএনপির দাবি আংশিক পূরণ হয়েছে। মূল বিষয়গুলোতে বিএনপির ভিন্নমত আমলে নেওয়া হয়নি। যেমন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি), মহাহিসাব নিরীক্ষক নিয়োগ ও ন্যায়পাল নিয়োগ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিএনপি চেয়েছিল দুদকে নিয়োগ আইনের মাধ্যমে সরকার করবে। সেটি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে রাখা হয়নি। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে দুদকে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ হবে বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটির মাধ্যমে। এই কমিটি আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতির (প্রধান বিচারপতি ব্যতীত) নেতৃত্বে হবে। কমিটিতে হাইকোর্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান, সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার একজন করে প্রতিনিধি এবং প্রধান বিচারপতি মনোনীত একজন নাগরিক প্রতিনিধি থাকবেন। এই কমিটি নাম প্রস্তাব করবে, রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন। (চ) তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত নেই। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন কীভাবে হবে, তা নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত ছিল। তা আমলে নেওয়া হয়নি। (ছ) এনসিপি জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি চেয়েছিল। সেটি অনেকটা হয়েছে। তবে ঐকমত্য কমিশনের একটি বিকল্প সুপারিশে বলা হয়েছিল, নির্দিষ্ট সময়ে সংসদ সংস্কার প্রস্তাবগুলো অনুমোদনে ব্যর্থ হলে সেগুলো ২৭০ দিন পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে। এটি নিয়ে (এরপর ৮ পৃষ্ঠায়)  আপত্তি ছিল বিএনপির। সরকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান সংশোধনের সুপারিশটি আমলে নেয়নি। (জ) এনসিপি চেয়েছিল প্রধান উপদেষ্টা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করবেন। কারণ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে আপত্তি ছিল, যদিও বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী আদেশ জারি করতে পারেন রাষ্ট্রপতি। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির নামেই আদেশ জারি হয়েছে।  (ঝ) এনসিপি গণপরিষদ গঠন অথবা আগামী সংসদকে দ্বৈত ভূমিকা দেওয়ার পক্ষে ছিল। জামায়াতও দ্বৈত ভূমিকা দেওয়ার পক্ষে। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে আগামী সংসদকেই সেই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আগামী সংসদ সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে। যদিও বিএনপি সংসদকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের ক্ষমতা দেওয়ার বিপক্ষে ছিল। ঐকমত্য কমিশন মত-দ্বিমত-ভিন্নমত যেখানে ॥ দুই দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ৯৫টি ইস্যুতে ঐকমত্য কমিশন আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছে ৬৮টি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নিতে মার্চের মাঝামাঝি থেকেই একে একে রাজনৈতিক দলগুলো হাজির হয় রাজধানীর বিভিন্ন ভেন্যুতে। কেউ মতামত জমা দেয়, কেউ সরাসরি মুখোমুখি বসে আলোচনা করে। কারও কারও বক্তব্য ছিল ক্ষীণ, কেউ আবার দিয়েছেন ১০৮টি পর্যন্ত পরামর্শ। এসব নিয়েই গঠিত হয় একটি বড় রাজনৈতিক নথি- জুলাই সনদ। তবে সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সরকারি কর্ম কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে জোরালো আপত্তি জানিয়েছে বিএনপিসহ কয়েকটি দলের। তারা এ সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে যুক্ত না করে আইনের মাধ্যমে নিয়োগ করার পক্ষে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে দলগুলো একমত হলেও উচ্চকক্ষের নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে মতভিন্নতা শেষ পর্যন্ত কাটেনি। সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব ছিল, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে অর্থাৎ সারা দেশে একটি দল যত ভোট পাবে, তার অনুপাতে তারা উচ্চকক্ষে আসন পাবে। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বেশির ভাগ দল এই প্রস্তাবে একমত। তবে বিএনপিসহ কয়েকটি দলের এতে আপত্তি জানিয়েছে। রাষ্ট্রের মূলনীতি প্রশ্নেও দলগুলো মোটাদাগে বিভক্ত থেকেছে শেষ পর্যন্ত। সংবিধানে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ করার প্রস্তাব নিয়েও এখন পর্যন্ত সেভাবে আলোচনা হয়নি। রাষ্ট্রপতির নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হলেও নিষ্পত্তি হয়নি। বছরজুড়ে আলোচনার মাধ্যমে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদের ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে রয়েছে- সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিত্ব, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা সংক্রান্ত বিধান, বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, সংবিধান সংশোধন, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধান, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট বিশেষত উচ্চকক্ষ গঠন, সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি ও এখতিয়ার, রাষ্ট্রপতির নির্বাচন পদ্ধতি, ইলেক্টোরাল কলেজ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার সমপ্রসারণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। আলোচনায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ রাজনৈতিক দল জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে বিদায়ী বছরের শুরু থেকে যে অনিশ্চয়তা-সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল, তা বছর শেষেও সেই সংশয় বা অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। আর এই গণভোটের নির্ধারিত হবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ভাগ্য। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার। আর ‘না’ জয়যুক্ত হলে নির্বাচিত সরকারের তা বাস্তবায়নের বাধ্যবাদকতা থাকবে না- এমনটাই বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাই দেশবাসীরও অপেক্ষা, গণভোটের ফলাফলের জন্য।

মুক্তিযুদ্ধ ও গণযুদ্ধ

মুক্তিযুদ্ধ ও গণযুদ্ধ

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া বাংলাদেশের শ্রেণিপেশা নির্বিশেষে কমবেশি সকলেই অংশগ্রহণ করেছে। যদিও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রণের নানারকম পদ্ধতি ও উপায়-কৌশল ছিল। একাত্তর সালের মার্চ থেকেই বাংলাদেশের সম্ভাব্য মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্মণগুলো স্পষ্ট হতে থাকে। মার্চ মাসের দুই তারিখ তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা ও ডাকসু ভিপি আ স ম আবদুর রব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে ছাত্র সমাবেশে আনুষ্ঠানিকভাবে মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন করেন। ৩ তারিখ পল্টন ময়দানে বিশাল ছাত্র-গণসমাবেশে ছাত্রলীগ নেতা শাহজাহান সিরাজ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন।

গল্প ॥ শান্তনুর অহঙ্কার

গল্প ॥ শান্তনুর অহঙ্কার

এক রাতে আব্বা এসে বললেন- দেশের অবস্থা খুব খারাপ। পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ মনে হয় ঠেকানো গেল না।  এর কয়দিন পর সত্যি সত্যি দেশে যুদ্ধ শুরু। শান্তনু তখন খুবই ছোট। আক্কাস মামার কাছে লেখাপড়ার হাতেখড়ি। অ, আ, ক, খ পড়ায় যতো না মনোযোগ, তার চেয়ে বইয়ের পাতায় আঁকা ছবি দেখায় মনোযোগ বেশি। পিংপং বল আর টেনিস বল নিয়ে খেলা করায় মনোযোগ বেশি।  যুদ্ধ শুরু হলো। আব্বা শান্তনুদের মামাবাড়ি সুন্দরপুর পাঠিয়ে দিলেন। কখনো মামাবাড়ি, কখনো মেজো বোনের শ্বশুরবাড়ি এই করে দিন কাটে। মেজোবু নিজের হাতের গোসল করিয়ে দিতেন। গা মুছে দিতেন। মায়ের স্নেহ দিয়ে আগলে রাখতেন। মন তবু ভরতো না শান্তনুর। মার জন্য কান্নাকাটি করতো। আব্বার জন্য কান্নাকাটি করতো। ওই সময় অনেক নতুন নতুন খেলার সাথী পেয়েছিল শান্তনু। ঢাকা, খুলনা, যশোর থেকে অনেক আত্মীয় সুন্দরপুর এসে আশ্রয় নেয়। বড়লোক আত্মীয়দের গাড়িগুলো কাছারি বাড়ির পেছনে বাগানে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা হতো। রেডিওতে নিয়মিত খবর শুনতো সবাই।  ওই সময় একদিন মুক্তিবাহিনীতে সদ্য যোগ দেয়া রজব আলীর সাথে শান্তনুর পরিচয় হয়। রজব আলী শান্তনুকে কাছে নিয়ে আদর করেছিল। বলেছিল- তোমার দুলা ভাইয়ের সাথে আমিও দেশ স্বাধীনের জন্য যুদ্ধ করছি। তার এতোসব কথা শান্তনু অতো বোঝেনি। শুধু বুঝেছিল, রজব আলী মেজো দুলা ভাইয়ের বন্ধু।  শান্তনুর ছোট মামার ঘরে রাতে ঘুমাতেন শান্তি মামা। উনার বাড়ি যশোরে। সারাদিন কোথায় কোথায় থাকতেন। একদিন শান্তি মামার বিছানার নিচে শান্তনু পিস্তল দেখেছিল। মামাতো ভাই অপু বলেছিল, শান্তি মামা মুক্তিযোদ্ধা। মাঝে মাঝে উনি তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। আর এ পিস্তল দুঃসময়ে ব্যবহার করার জন্য।  দুঃসময় কি, সুসময় কি অতো বুঝার বয়স শান্তনুর তখনো হয়নি। শুধু বুঝেছিল, মেজোবু শান্তনুকে মার কাছে নিয়ে যাবে বলেও নিচ্ছে না। আব্বার কাছে নিয়ে যাবে বলেও নিয়ে যাচ্ছে না।  একদিন শান্তনুর মেজো ভাই কামাল আর মেজো দুলাভাই শহিদুল ইসলাম সুন্দরপুর এলে মেজোবু বলেছিল- দাদুকে তোমরা মার কাছে নিয়ে যাও, আব্বার কাছে নিয়ে যাও। ওকে আর কতো ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখবো। মেজো দুলাভাই বলেছিল- আর ক’টা দিন সবুর করো। এরপর এক সকালে ঘুম ভেঙে শান্তনু দেখে, সে তার প্রিয় মেজো বোনের কাছে নেই। সে তার মায়ের কাছে। মা যেখানে ছিল সে গ্রামটার নাম জিতেরপুর। মাকে কাছে পেয়ে খুব ভালো লাগছিল শান্তনুর। আরো ভালো লাগছিল প্রতিবেশী খেলার সাথী মিন্টু, ভুট্টো, আকবরকে পেয়ে।  কিন্তু কয়েকদিন যেতেই আর এক সমস্যা। আব্বার জন্য বুক চিন চিন করছিল শান্তনুর। আব্বার কাছে যাবো, আব্বার কাছে যাবো বলে হু হু করে কাঁদছিল। আরো কিছুদিন অপেক্ষার পর এক দুপুরবেলা আব্বা এলো। সুখের খবর নিয়েই এলো। আব্বা এসে শান্তনুকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। বললেন, পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ।  চল বাজান বাড়ি যাই। তোর মাকে গুছিয়ে নিতে বল। এখন বাড়ি ফিরলে আর অসুবিধে নেই।  ওইদিনই বিকেল নাগাদ নদী পার হয়ে জিতেরপুর থেকে সলেমানপুর। সলেমানপুর শান্তনুদের বাড়ি। বসবাস না করায় বাড়িটাতে একটা ভূতুড়ে ভাব। আগাছায় ভরে গেছে পুরো বাড়ি। মা এসে সারা দিনরাত কাজ করে বাড়ির চেহারা আগের মতো ফিরিয়ে আনলেন। ফিরে এলো শান্তনুর বাকি সব ভাই-বোন। শুরু হলো এতোদিনের জমে থাকা আনন্দ-বেদনার গল্প। মা কতো খুশি। এই সময় বড় শহরের কিছু আত্মীয় শান্তনুদের বাড়িতে ভিড় জমায়। মার কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে দু-একটা বড় শহরে যুদ্ধ তখনো থামেনি। শান্তনুর আবছা আবছা মনে আছে পাঞ্জাবি সৈন্যরা, শিখ সৈন্যরা বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে যাওয়া- আসা করতো। পাঞ্জাবিরা এলে আব্বাদের মুখে কালো ছায়া দেখতো শান্তনু। মুক্তি বাহিনীরা এলে আব্বাদের খুশি খুশি লাগতো। ১৬ ডিসেম্বর অনেক রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হলো দেশ। রেডিওতে, মানুষের মুখে, হাইস্কুল মাঠে শান্তনু শুনলো বিজয়ের ধ্বনি। শান্তনু লাল সবুজের মাঝে স্বাধীন বাংলাদেশের হলুদ রঙের মানচিত্র আঁকা পতাকা নিয়ে বাড়ির ছাদে উঠলো। কারো মুখে বিজয়ের হাসি, কারো মুখে স্বজন হারানোর বেদনা। ওই সময় এক সন্ধ্যায় মায়ের কান্না শুনে শান্তনু।  মার বড় ধরনের কোন ক্ষতি হয়ে গেছে।  শান্তনু পরে শুনেছিল তার প্রিয় হেনা খালার স্বামী মনিরুজ্জামান দেশ স্বাধীন করতে গিয়ে সৈয়দপুরে শহীদ হয়েছেন। মার দুঃখ, হেনা খালার দুঃখ  সেই ছোট্ট বেলায় শান্তনু বোঝেনি। আজ বোঝে। আর বোঝে বলেই মাকে নিয়ে, হেনা খালাকে নিয়ে, প্রিয় খালু শহীদ মনিরুজ্জামানকে নিয়ে শান্তনুর অহঙ্কারের শেষ নেই। আনন্দের শেষ নেই।