শিল্প-সাহিত্যে উপনিবেশ
লেনিন তাঁর ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ গ্রন্থে মার্কস ও এঙ্গেলসের চিন্তাধারা অনুসরণে রাষ্ট্রকে শাসক শ্রেণির নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র শ্রেণিবিভক্ত সমাজের ঐতিহাসিক ফল এবং এটি কোনো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান নয়। শ্রেণিবৈষম্য তীব্র হলে শাসক শ্রেণি তার আধিপত্য বজায় রাখতে আইন, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে। লেনিনের ভাষায়, ‘পুঁজিবাদী সমাজে রাষ্ট্র মূলত বুর্জোয়াদের শাসনের হাতিয়ার’।
কিন্তু বিপ্লবী চেতনার উত্থান যদি রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাবে বা নেতার প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রেখে থেমে যায়, তাহলে প্রতিক্রিয়াশীল ও সংশোধনবাদী শক্তি জনতার সচেতনতাকে শুষে নিতে সময়ের কার্পণ্য করে না। [বিগত জুলাই বিপ্লব এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ]। তাই জনতাকে লাগাতার সজাগ ও লড়াইমুখর রাখতে হয়। গণ-বিস্ফোরণের পর প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি প্রায়শই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নামের প্রহসনের আশ্রয় নেয়, আবার আমলাতান্ত্রিক ও সংগঠিত শক্তি জনতার স্মৃতি থেকে অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা মুছে ফেলতে তৎপর থাকে। তারা নেতৃত্বের অংশকে কিনে নেয় কিংবা নতুন প্রলোভন দেখিয়ে জনতার শক্তিশালী অংশকে আদর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন করে।
গ্রামশি তাঁর ‘প্রিজন নোট বুকস’-এ দেখিয়েছেন, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বা ক্ষমতার পালাবদলের পরও জনগণের চেতনায় ক্রমাগত বিপ্লবী বিকাশ না ঘটলে তারা পুরানো মতাদর্শিক কাঠামোয় ফিরে যায়। বিপ্লব স্থায়ী হয় তখনই, যখন তা বিপ্লবী নেতৃত্ব দ্বারা পরিচালিত ও বিপ্লবী আদর্শ দ্বারা ক্রমাগত পুষ্ট হতে থাকে। অর্থাৎ অভ্যুত্থানই চূড়ান্ত কথা নয়, বরং তার আদর্শচর্চা বিপ্লবী মোর্চার মাধ্যমে সমাজমনস্কতায় অব্যাহত রাখতে হয়। গ্রামশি ও আলথুসারের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, রাষ্ট্র নিপীড়নের পাশাপাশি সমাজ-সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তারা সাহিত্য, শিল্প, কাব্য, চিত্রকলাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিতেই দেখে। রফিক আজাদের ‘ভাত দে হারামজাদা/ নইলে মানচিত্র খাবো’ কবিতার জন্য যেমন কবি সাইয়িদ আতিকুল্লাহকে চাকরিচ্যুত হতে হয়েছিল, তেমনি মোহন রায়হানসহ একাধিক স্বাধীনচেতা শিল্পী ও কবি শাসকের রোষানলে পড়েছেন।
বিপ্লবের ব্যর্থতা ও শিল্পী-সাহিত্যিকের দায়
আল মাহমুদ জেলে ছিলেন, রফিক আজাদ নানা তদ্বিরে ধরপাকড় থেকে রক্ষা পেয়েছেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক-শিল্পীদের পাশাপাশি পরবর্তীতে তরুণ কবি গিয়াস গালিবও কারাবরণ করেছেন। মোহন রায়হান সামরিক শাসক এরশাদের কোপানলে পড়ে বেদনাদায়ক ভাবে নিগৃহীত হয়েছিলেন। বিপ্লব-বিদ্রোহ সমাজক্রিয়ারই ফল, যার চেতনাগত ভিত্তি নির্মাণ করেন সংস্কৃতিকর্মীরা। সংগঠিত হয় গণমানুষ, কিন্তু দূরদৃষ্টির সঙ্কীর্ণতা বা সাহসের দিকনির্দেশনার অভাবে তা কানাগলিতে ঘুরপাক খায়।
যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে জীবন দেয়, পঙ্গু হয়, চিকিৎসাহীনতায় মারা যায়, তারাই যদি বিপ্লবের মূল চেতনাকে সক্রিয় না রাখে, তবে এক সময় নিষ্ক্রিয় হয়ে গড্ডালিকার স্রোতে গা ভাসায়। লেখক-শিল্পী-সংস্কৃতি কর্মীরাও সৃষ্টির ক্ষেত্রে দিশা নির্মাণের দায়িত্বে প্রায়শই নিষ্ক্রিয় থাকেন। জনগণ ও তরুণরা ভুলে যায় যে বিপ্লব একটি লাগাতার প্রক্রিয়া। এই চেতনা অনুপস্থিত থাকায় জনহিতকর রাষ্ট্র অধরা থেকে যায়।
ফাননের মতে, ‘বিপ্লবের পরও বিপ্লবী চেতনা সক্রিয় রাখতে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; বরং জনগণের রাজনৈতিক চেতনা, অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক মুক্তির নিশ্চয়তা জরুরি।’ উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের পরও কাক্সিক্ষত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলেও জীবনযাত্রার মৌলিক পরিবর্তন দ্রুত না ঘটায় জনগণ হতাশায় ভোগে ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এখানেই শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের দায়। ‘উল্লাস-আনন্দে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার মতো এখনো/তেমন কোনো সময়/ কালো মেঘের গর্জনের আতঙ্ক ভেঙে জেগে ওঠেনি।/ কেবল সময় দরজায় কড়া নেড়ে/ সময়কে দিয়ে গেছে বার্তা,/ ওঠো জাগো, এখনো নিকট বহুদূর;/ দূর নিকটে ফেরে না বিরামে। [ম. বৈ.]’
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিগত দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের সমাজে এই সময়চেতনা অনুপস্থিত। ক্ষমতার পুনরাবৃত্তি ও পুঁজির দ্বন্দ্ব নতুন-পুরানো পোশাকে ফিরে আসে। সমাজের মৌলিক দ্বন্দ্বগুলোর অবসানের নামে উচ্চবিত্তদের স্বার্থই সংরক্ষিত হয়। শ্রেণিদ্বন্দ্ব, ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে জনগণের দ্বন্দ্ব চলমান থাকায় শাসকশ্রেণি একই রূপে শাসন-শোষণ টিকিয়ে রাখতে পারে না। পুঁজির দ্বন্দ্ব বুর্জোয়াকেও সংঘাতমুখর করে তোলে। তারা চেতনাহীন জনগণ বা শ্রমিকশ্রেণির একাংশকে পরস্পরের বিরুদ্ধে কিংবা ক্ষমতার বিরুদ্ধে উসকে দেয়। তখন শাসকশ্রেণি ছিটেফোঁটা সংস্কারের আড়ালে পুরানো কাঠামোকেই আরও নিখুঁত করে। নতুন আইন প্রণয়ন করে, কিন্তু তাতে জনগণের পক্ষে আশীর্বাদ থাকে না, থাকে লুটবাজ, ফেরেপবাজ, মাদক কারবারী, অস্ত্রবাজ ও উল্লাস করে ধর্ষণের নায়কদের রক্ষার ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আইনের রক্ষা।
শূন্যতার মুখে সৃজনশীলতা ও
নৈতিকতার শক্তি
উপনিবেশ-উত্তর সমাজের অবক্ষয় যখন তরুণদের মধ্যে শূন্যবাদ সৃষ্টি করে, তখন সেই শূন্যতা পূরণ ও নতুন পথের দিশা দেখাতে এমন সৃজনশীলতার দরকার, যা প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। এই দায়িত্ব বর্তায় সত্যনিষ্ঠ কবি, লেখক, শিল্পী ও সচেতন নাগরিকের ওপর। ক্ষমতালোভী বুদ্ধিজীবীদের মতো দালালির পথ বেছে না নিয়ে, যদি তারা নিজদের পরিশীলিত সৃষ্টিচিন্তাকে নতুন মূল্যবোধের ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলেন, তবে বিপ্লবের পক্ষের শক্তি হয়ে ওঠে। তারা দেখিয়ে দেন যে সমাজের বর্তমান অবক্ষয়ই চূড়ান্ত সত্য নয়; বরং এর বাইরেও সত্য আছে, সৌন্দর্য ও নৈতিকতার এক নতুন জগৎ সৃষ্টি সম্ভাবনা আছে। এই সৃজনশীলতা তরুণদের হতাশার বদলে আশা ও ঘুমন্ত বিবেক জাগ্রত করে।
জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নীৎশে তাঁর ‘উবারমেনশ’ বা ‘অতিমানব’ ধারণায় এই সৃজনশীল শক্তির কথাই বলেছেন। নীৎশের মতে, পুরানো মূল্যবোধের [ঈশ্বরের] মৃত্যু মানুষকে উদ্দেশ্যহীন শূন্যতায় ফেলে। এই শূন্যতা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন এমন মানুষের, যে নিজেই নতুন মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে পারে। [নজরুল তার বিদ্রোহীতে।] এই ‘অতিমানব’ কোনো রাজনৈতিক নেতা বা শারীরিক শক্তিধর ব্যক্তি নন; বরং তিনি একজন কবি, শিল্পী বা দার্শনিক, যিনি তার সৃজনশীলতায় নতুন নৈতিকতা ও জীবনের অর্থ তৈরি করেন। [নীৎশে, ‘জারথুস্ট্রা বলেন’] উপনিবেশ-উত্তর সমাজে দালাল বুদ্ধিজীবীরা যখন পুরানো আদর্শ বিকৃত করে, তখন একজন প্রকৃত শিল্পী তার সৃষ্টির মাধ্যমে সেই আদর্শকে নতুন রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন, যা তরুণদের নতুন জীবনবোধে উদ্বুদ্ধ করে। যেমনÑআখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’, শওকত আলীর ‘দক্ষিণায়নের দিন’, স্বাধীনতা-পরবর্তী হাসান আজিজুল হক, জাকির তালুকদার ও হুমায়ুন আহমদের রচনায় সমাজচিত্রের ঋজুতা ফুটে ওঠে।
উপনিবেশ ও উত্তর-উপনিবেশ
একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র অন্য কোনো ভূখ- প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দখল করে তার রাজনীতি, অর্থনীতি, উৎপাদন ব্যবস্থা ও সমাজ-সংস্কৃতির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলে সেই অঞ্চল উপনিবেশে পরিণত হয়। উপনিবেশিত দেশের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য থাকে না; এর শ্রম, সম্পদ ও মনন দখলদারদের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়। ভাষা, ধর্ম, শিক্ষা, শিল্প-সাহিত্য, খাদ্যাভ্যাসÑ সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয়। উপনিবেশিক শক্তি ভয়, শোষণ ও নির্যাতনের মাধ্যমে এই দখল টিকিয়ে রাখে। অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক তাঁর ‘মহাদেশের কথক : গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, স্পেনীয়রা ১৪৯২ সালে হাইতি ও ডোমিনিকান রিপাবলিক অঞ্চলে (এসপ্যানোলা) দুই লক্ষাধিক আদিবাসী পেয়েছিল।
১৫৪৮ সালের মধ্যে সেই সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ৫০০-এ। ভারতে ব্রিটিশ শাসনামলে দুর্ভিক্ষ ও শোষণে বিপুল মানুষের মৃত্যু হয়। অর্থনীতিবিদ জেসন হাইকেল ও ডিলান সুলিভানের গবেষণা অনুযায়ী, ১৮৮০ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত ৪০ বছরে ভারতের ৫ থেকে ১৬.৫ কোটি মানুষ মারা যায় দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষে। ব্রিটিশ নীতি ভারতীয়দের গড় আয়ু ও পুষ্টির হার কমিয়ে দিয়েছিল, যা মৃত্যুহার বাড়িয়ে দেয়। ১৭৬৯-৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে প্রায় ১ কোটি, আর ১৯৪৩ সালের পঞ্চাশের মন্বন্তরে আনুমানিক ৩০ লক্ষ লোক মারা যায়। শেষোক্তটির জন্য প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের যুদ্ধকালীন নীতি, যার অধীনে ভারত থেকে বিপুল খাদ্যশস্য রপ্তানি করা হচ্ছিল, দায়ী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করে দখলদাররা নিজেদের বসতি স্থাপন করে, যাকে ‘সেটলার কলোনিয়ালিজম’ বলে।ভারতবর্ষে প্রায় দুইশত বছর ব্রিটিশ শাসন স্থায়ী ছিল।
ষড়যন্ত্র, ঘুষ ও যুদ্ধের মাধ্যমে স্থানীয় রাজা-নবাবদের পরাজিত করে তারা উপনিবেশ কায়েম করে। একইভাবে লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকা মহাদেশও ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের শিকার হয়। পঞ্চদশ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটেন, স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস প্রভৃতি শক্তি বিশ্বজুড়ে উপনিবেশ স্থাপন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে এই উপনিবেশগুলো স্বাধীনতা পেলেও প্রাক্তন শাসকদের চিহ্ন সম্পূর্ণ মুছে যায়নি; বরং শাসনভার তাদের দালালদের হাতেই অর্পিত হয়, যার ব্যতিক্রম বাংলাদেশও নয়। এই প্রক্রিয়াই উত্তর-উপনিবেশিকতা। বর্তমানে পুয়ের্তো রিকো যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে, যা বিশ্বের প্রাচীনতম উপনিবেশগুলোর অন্যতম (১৮৯৮ সাল থেকে)।
উত্তর-উপনিবেশ ও সাহিত্য
উপনিবেশ-পরবর্তী ‘উত্তর-উপনিবেশিক’ বাস্তবতা কেবল রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক ও মানসিক স্তরেও গভীর প্রভাব ফেলে। ঔপনিবেশিক আমলের শাসনব্যবস্থা, ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি বহু দেশে এখনো বহাল। উপনিবেশিক শক্তির তাঁবেদার উচ্চবিত্ত শ্রেণি সেই কাঠামো টিকিয়ে রেখেছে। এই প্রেক্ষাপটে জন্ম নেয় ‘উপনিবেশ-উত্তর সাহিত্য’, যা ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতি, ভাষা ও আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। এখানে লেখকরা ঔপনিবেশিক ভাষাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন, কিন্তু তাকে স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতির আলোকে রূপান্তরিত করেন। যেমনÑ চিনুয়া আচেবে তাঁর ইংরেজি রচনায় ইগবো ভাষার ছায়া ব্যবহার করে এক নতুন ভাষিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।
আমাদের লেখকদের মনস্তত্ত্ব ॥ সাহিত্য-কাব্যে উপনিবেশচেতনা
উত্তরআধুনিকতা ক্ষমতা ও আধিপত্যকে প্রশ্ন করে, কিন্তু এটি মূলত একটি নান্দনিক-দার্শনিক প্রবণতা, যা সত্যের আপেক্ষিকতা ও অর্থের অস্থিরতার ওপর জোর দেয়। অন্যদিকে, উত্তর-উপনিবেশিকতা একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক অভিসন্ধি; এটি উপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা, প্রতিক্রিয়া ও উত্তরাধিকার বিশ্লেষণ করে, ঔপনিবেশিক ক্ষমতার ভাষা, পরিচয় ও ইতিহাসের নির্মাণকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং প্রান্তিক কণ্ঠস্বরকে কেন্দ্রে আনে। উত্তরআধুনিকতা ‘অন্য’-এর ধারণাকে বিভক্ত ও বিকেন্দ্রীভূত করে, আর উত্তর-উপনিবেশিকতা সেই ‘অন্য’-এর অভিজ্ঞতাকেই ভাষা দেয়, যা দীর্ঘদিন ঔপনিবেশিক কাঠামোয় নিরব ছিল।
অনেক উত্তর-উপনিবেশিক লেখক তাদের রচনায় উত্তরআধুনিক শৈলীর কৌশলÑ যেমন আন্তঃপাঠ্যতা, মেটাফিকশনÑ প্রয়োগ করেছেন। সালমান রুশদীর ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ এভাবেই উপনিবেশ-উত্তর সঙ্কট, পরিচয়ের দ্বন্দ্ব ও ইতিহাসের পুনর্লিখন উপস্থাপন করেছেন। তবে উত্তর-উপনিবেশিক সাহিত্য সব সময়ই একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ধারণ করে, যা পরিচয় পুনরুদ্ধার, ভাষাগত ঔপনিবেশিকতার সমালোচনা ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনে সহায়ক।
উপমহাদেশের সাহিত্য এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ঊনবিংশ শতকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস হিন্দু পুরাণনির্ভর জাতীয়তাবাদ ও মুসলিম-বিদ্বেষের প্রতীকায়নের মাধ্যমে এক ধরনের উপনিবেশিক অনুধ্যান ফুটিয়ে তুলেছে। উপন্যাসটি উপনিবেশবিরোধী আত্মপরিচয়ের সন্ধান করলেও, তাতে ঔপনিবেশিক শক্তিকে উদ্ধারকর্তা হিসেবে চিত্রায়ন এবং মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দু জাতির মুক্তির প্রত্যাশা সমস্যাজনক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপনিবেশ, আধুনিকতা ও আত্মপরিচয়ের বিষয়ে গভীর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি দিলেও, সমালোচকেরা প্রশ্ন তোলেন : তিনি কি সমাজের সব শ্রেণিকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন?
তাঁর সাহিত্য প্রধানত হিন্দু মধ্যবিত্ত অভিজ্ঞতার ভাষ্য, যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, দলিত, মুসলিম বা আদিবাসী কণ্ঠ উপেক্ষিত। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে উপনিবেশিক স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব জটিল রূপ পেয়েছে সমরেশ বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, বুদ্ধদেব গুহ প্রমুখের রচনায়। বিশেষত বুদ্ধদেব গুহ তাঁর প্রকৃতি ও স্থানকেন্দ্রিক লেখায় দেশজ সৌন্দর্যবোধের এক স্বতন্ত্র বাস্তবতা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন, যা ঔপনিবেশিক ভূগোলের বাইরের।
উপনিবেশ-উত্তর তত্ত্বের আলোকে এই সাহিত্য পাঠ করলে বোঝা যায়, উপনিবেশ কোনো একরৈখিক অভিজ্ঞতা নয়; বরং এটি ভাষা, জাতীয়তা, ধর্ম ও শ্রেণিকে অতিক্রম করে বিস্তৃত এক জটিল বাস্তবতা, যা এখনো সাহিত্য-সংস্কৃতির গভীরে সক্রিয়।
ফাননের দৃষ্টিতে উপনিবেশ ও মানসিক পরাধীনতা
ফ্রানৎস ফানন তাঁর ‘ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্ক’ ও ‘দ্য রেচড অব দি আর্থ’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, উপনিবেশিক শাসনের সবচেয়ে গভীর ক্ষতি হয় মানুষের মানসিকতায়। উপনিবেশিত ব্যক্তি নিজ সংস্কৃতি ও গৌরব হারিয়ে শ্বেতাঙ্গের মানসিকতা আত্মস্থ করে। নিজ জাতিগোষ্ঠী তার চোখে নিকৃষ্ট, শাসকশ্রেণি শ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠে। এই মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বই প্রকৃত গোলামি। ফাননের মতে, ঔপনিবেশিক শাসনে বাস করা ব্যক্তি সর্বদা ‘অন্যের দৃষ্টি’র ভেতর বন্দি থাকে, যা আত্মপরিচয়ের বিপর্যয় ঘটায়। আর এই আত্মবিরোধী চেতনা থেকেই অনেক সময় সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্ম হয়। ফাননের বিশ্লেষণ উত্তর-উপনিবেশিক সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যখন লেখকরা দেখান কিভাবে একটি জাতির মানুষ নিজের ভাষা, চেহারা বা ইতিহাস ঘৃণা করতে শেখে।
উপনিবেশিক মানসিকতা ও সাহিত্য
উপনিবেশবাদ মানুষের ভূমি দখল করে, কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর হলো মানুষের মন, ভাষা ও কল্পনাশক্তিকে বন্দি করা। সাহিত্য-সংস্কৃতির ভেতর দিয়েই এই মানসিক বন্দিত্ব সবচেয়ে গভীরভাবে কাজ করে। পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তি কেবল প্রশাসন ও সেনাশক্তির জোরে টিকে থাকেনি; তারা টিকে থেকেছে কবিতা, উপন্যাস, গবেষণা, ইতিহাস ও ভাষার ভেতর বীজ বপন করে। এডওয়ার্ড সাঈদ দেখিয়েছেন, পশ্চিমা সাহিত্য প্রাচ্যকে সবসময় ‘অন্য’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। গ্রামশি, ফানন ও সাঈদÑ এই তিন চিন্তকের আলোকে বোঝা যায়, সাহিত্য কখনো নিরপেক্ষ নয়। সে হয় আধিপত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, নয়তো প্রতিরোধের পক্ষে। ঔপনিবেশিক মানসিকতা আমাদের ভেতর গভীর দাগ কেটে গেছে, কিন্তু সাহিত্যই সেই দাগ মুছতে পারে, যদি সে জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। সাঈদ পশ্চিমা সাহিত্যের অন্তর্নিহিত সাম্রাজ্যবাদী বয়ান চিহ্নিত করেছেন, চমস্কি আধুনিক গণমাধ্যমের সাংস্কৃতিক উপনিবেশীকরণ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, আর ফানন শিখিয়েছেন যে আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম ছাড়া সাহিত্য পূর্ণতা পায় না।
শেষটায় এই তিনজন চিন্তকের কথা মিলিয়ে আমরা বুঝতে পারি সাহিত্য কখনো নিরপেক্ষ নয়। সে হয় আধিপত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, নয় তো প্রতিরোধের পক্ষে। ঔপনিবেশিক মানসিকতা আমাদের ভেতর গভীর দাগ কেটে গেছে কিন্তু সেই দাগ মুছতেও পারে সাহিত্য, যদি সে জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। সাঈদ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখান পশ্চিমা সাহিত্যের ভেতরে লুকানো সাম্রাজ্যবাদী বয়ান, চমস্কি আমাদের সতর্ক করেন আধুনিক গণমাধ্যমের সাংস্কৃতিক উপনিবেশ সম্পর্কে, আর ফানন শেখান আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম ছাড়া সাহিত্য পূর্ণতা পায় না। [উকিপেডিয়া ]
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক
প্যানেল হু








