ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৮ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২

...বসন্তে বরিয়া তুমি লবে নাকি তব বন্দনায়?

শূন্য ক্যাম্পাসে বসন্তের আগমন ইবিতে গড়ে উঠেছে ফুলের সাম্রাজ্য

তালুকদার হাম্মাদ

প্রকাশিত: ২৩:৪৬, ১৭ মার্চ ২০২৬

শূন্য ক্যাম্পাসে বসন্তের আগমন ইবিতে গড়ে উঠেছে ফুলের সাম্রাজ্য

ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে ইবি ক্যাম্পাস

‘হে কবি, নীরব কেন ফাগুন যে এসেছে ধরায়, বসন্তে বরিয়া তুমি লবে নাকি তব বন্দনায়?’ লাইনটি কবি সুফিয়া কামালের ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতা থেকে নেওয়া। কবিতায় দেখা যায় যে, প্রকৃতিতে বসন্ত আসলেও তা নিয়ে কবির মধ্যে নেই কোনো ব্যাকুলতা। তিনি লিখছেন না কবিতা, কাব্যের ভাষায় ফুটিয়ে তুলছেন না বসন্তের অতুলনীয় সৌন্দর্য। মূলত, তিনি ব্যক্তিগত দুঃখে ভুলে গিয়েছেন বসন্তের কথা। আবার বসন্ত তাকে না জানিয়ে চলে আসাতে অভিমানও করছেন তিনি। আসলে প্রকৃতি এমনই।

এটি বয়ে চলে তার চিরাচরিত নিজস্ব নিয়মে। যে কারণেই গ্রীষ্মের পরে ডাক পড়ে বর্ষার। আর বর্ষার পরে ডাক পড়ে শরতের। আবার শীতের পরে আগমন ঘটে বহুল কাক্সিক্ষত বসন্তের। প্রকৃতি কারও জন্য কখনো অপেক্ষা করে না, না অপেক্ষা করে কোনো ঋতু। ঠিক এমনটিই ঘটেছে এবার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ক্যাম্পাসেও। রমজানের ছুটিতে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই ক্যাম্পাস ছেড়ে বাড়িতে অবস্থান করছেন। পুরো ক্যাম্পাস শিক্ষার্থী শূন্যতাই খা খা করলেও বসন্ত থেমে থাকেনি। নিজস্ব নিয়মে চিরাচরিত সময়েই আগমন ঘটেছে বসন্তের, আর প্রাণ ফিরে পেয়েছে ক্যাম্পাস। ফুলে ফুলে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে সমগ্র ক্যাম্পাস।
সরেজমিনে দেখা যায়, শীতের নরম রোদ পেরিয়ে যখন ফাল্গুনের হালকা উষ্ণতা নেমেছে, ঠিক তখনই পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে রঙের এক অপূর্ব উৎসব শুরু হয়েছে। ফুলের সমারোহে ছেয়ে গেছে সমগ্র ক্যাম্পাস। বিশেষ করে শহীদ আনাস হলের সামনের রাস্তা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে দুটি জারুল গাছ। ক্যাম্পাসে এ গাছগুলো থেকে ফোটা ফুলগুলো যেন সৌন্দর্যের কুহরন সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নিউজফিডে ভাসছে এ ফুলগুলোর ছবি আর ভিডিওগ্রাফী।

এদিকে ক্যাম্পাসের প্রশাসন ভবনের সামনের দক্ষিণ-পশ্চিম মোড়, রবীন্দ্র নজরুল কলা ভবনের দক্ষিণ গেইট, থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের দক্ষিণ গেইটসহ বিভিন্ন স্থান দখল করে নিয়েছে পলাশ ফুল। মনে হচ্ছে যেন, ফেব্রুয়ারির ভাষা শহীদ আর মার্চের কালরাতের শহীদদের লাল রক্তকে সম্মান জানাতেই এই লাল টকটকে পলাশ ফুলের আগমন ঘটেছে। এদিকে সাদ্দাম হোসেন হলের গেট হয়ে উঠেছে পয়েনসেটিয়া আর লাল-সাদা গোলাপের অভয়ারণ্য। ক্যাম্পাসে অবস্থানরত যুগলদের আগমন দেখা যাচ্ছে সেখানে। এখান থেকে প্রিয়তমাকে কেউবা উপহার দিচ্ছেন পয়েনসেটিয়া কেউবা প্রিয়তমার চুলে গুঁজে দিচ্ছেন সাদা গোলাপ।
এদিকে ক্যাম্পাসে অবস্থিত দেশের অন্যতম বিখ্যাত মসজিদের সামনের স্থান এক প্রাকৃতিক নৈসর্গে রূপ নিয়েছে। মসজিদের সিঁড়ির এক পাশে আভা ছড়াচ্ছে হলুদ ল্যান্টানা। সিঁড়ির ঠিক নিচের এক পাশে ছেয়ে আছে গাঁদা ফুলে, যেন দেখলেই মনে হয় ফুলেল সাজে বসে আছে কোনো এক ষোড়শী নববধূ। সিঁড়ির সামনের আরেকপাশ মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে বিভিন্ন রকমের ভৃঙ্গরাজ ফুলে। ভৃঙ্গরাজ সাধারণত অবহেলায় বেড়ে ওঠা ফুল হলেও এখানকার ফুলগুলো যে খুব যতেœই বেড়ে উঠেছে তা এর সৌন্দর্যেই নিরবে ব্যক্ত করে যাচ্ছে। প্রেমিককে সহসাই এই ফুল তুলে প্রেমিকার নখে গুঁজে দিতে দেখা যায়।

প্রতি ওয়াক্তের নামাজ শেষে মুসল্লিরা ভিড় করে এর শোভা বাড়াচ্ছে দ্বিগুণ। এছাড়া প্রেমিক যুগল ও পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় স্থান শহীদ মিনারের সামনেও ফুটেছে গাঁদাসহ বিভিন্ন ধরনের ফুল, যা স্থানটির প্রতি বাড়িয়ে তুলেছে আকর্ষণ। তাছাড়া কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর সামনে ভৃঙ্গরাজসহ বিভিন্ন ফুলে মুখরিত হচ্ছে। এছাড়া সমগ্র বছর জুড়েই প্রতিটি হলের চারপাশে সৌন্দর্যের সুধা ছড়াচ্ছে বিভিন্ন ধরনের গোলাপ ও গাঁদাসহ নাম না জানা হরেক ফুল।
লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী ফারিহা আক্তার মিষ্টি বলেন, বসন্ত এলে ইবি ক্যাম্পাস যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। কৃষ্ণচূড়া, শিমুল, জারুল, ভৃঙ্গরাজ, পলাশের লাল, হলুদ, কমলা আভা সবুজ ঘাসের ওপর ছড়িয়ে দেয় এক মায়াবী আবেশ। একাডেমিক দিক দিয়ে অনেক সীমাবদ্ধতা থাকলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর আমাদের ক্যাম্পাস। এই বসন্তের সময় চারদিকের এতো ফুলের সমারোহ দেখলে মন অনেক বেশি ভালো হয়ে যায়। ইবির এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বড্ড ক্যাম্পাস অভিমুখী করে তোলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সরওয়ার মুর্শেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বই পড়ার জন্য নয়। প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা এবং প্রকৃতির প্রতি ভালাবাসা জন্মানোও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অন্যতম কাজ হওয়া উচিত। ক্যাম্পাসে আমার লাগানো কিছু পলাশ ফুলসহ বিভিন্ন ফুলের সৌরভ তৈরি হয়েছে, এটা ভালো লাগছে। তবে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধিতে প্রতিটি রাস্তার পাশে বিভিন্ন ধরনের ফুলের গাছ রোপণ করা উচিত। আমাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের যৌথ চেষ্টায় এই ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা রাখি।

প্যানেল হু

×