ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৭ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২

জাকাত ব্যবস্থা

দারিদ্র্য বিমোচনের বিকল্প মডেল

মো. সহিদুল ইসলাম সুমন

প্রকাশিত: ১৯:৪৪, ১৭ মার্চ ২০২৬

দারিদ্র্য বিমোচনের বিকল্প মডেল

পবিত্র ঈদুল ফিতর আমাদের দ্বারে যখন কড়া নাড়ে, তখন মুমিনের হৃদয়ে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সামাজিক সাম্যের এক সুগভীর বার্তা অনুরণিত হয়। এই উৎসব কেবল ব্যক্তিগত ভোগের নয়, বরং ত্যাগের মাধ্যমে সামষ্টিক কল্যাণের এক মহান সোপান। ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম জাকাত ব্যবস্থাকে যদি নিছক ব্যক্তিগত পর্যায়ের দান-খয়রাত হিসেবে বিবেচনা না করে একটি শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখা হতো, তবে আমাদের দারিদ্র্য বিমোচনের পথচিত্রটি হয়তো অন্যরকম হতে পারত। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার করে এসে আমরা যখন প্রবৃদ্ধির বড় বড় মাইলফলক স্পর্শ করছি, তখন কেন এখনও কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে এবং কেন সম্পদের পাহাড় কেবল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে জমা হচ্ছে, সেই নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ করা আজ সময়ের দাবি। বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে জাকাত ব্যবস্থার যে বিপুল সম্ভাবনা সুপ্ত রয়েছে, তার সঠিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান করা গেলে তা কেবল রাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি মেটাতেই সাহায্য করত না, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতে পারত। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে আয়ের চরম বৈষম্য এবং মুদ্রাস্ফীতির কশাঘাতে প্রান্তিক মানুষের জীবন আজ ওষ্ঠাগত, সেখানে জাকাতভিত্তিক একটি বিকল্প উন্নয়ন মডেল আমাদের মুক্তিদাতা হয়ে উঠতে পারে।
তাত্ত্বিক অর্থনীতি এবং গাণিতিক পরিসংখ্যানের নিরিখে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে জাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণ বিশাল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে ব্যক্তিগত আমানতের পরিমাণ এবং পুঁজিবাজারের মূলধন মিলিয়ে যে বিপুল তারল্য প্রবাহ বিদ্যমান, তার একটি ক্ষুদ্র অংশও যদি জাকাতের আওতায় সুসংগঠিতভাবে সংগ্রহ করা যেত, তবে তার পরিমাণ দাঁড়াত বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বার্ষিক জাকাত সংগ্রহের সম্ভাবনা প্রায় ৩০-৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তুলনা করলে দেখা যায়, সরকারের প্রতি বছর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতে যে বিশাল বরাদ্দ থাকে, জাকাতের এই সম্ভাব্য অর্থ তার একটি বড় অংশকে অনায়াসেই প্রতিস্থাপন করতে পারে। বর্তমানের বাজেট ব্যবস্থাপনায় আমরা দেখি যে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর একটি বড় অংশ ব্যয় হয় সরকারি কর্মকর্তাদের পেনশন এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে, যার ফলে প্রকৃত গরিব ও দুস্থ মানুষের কাছে পৌঁছানো অর্থের পরিমাণ থাকে অত্যন্ত নগণ্য। যদি একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ জাতীয় জাকাত বোর্ড বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ ও বণ্টন করা হতো, তবে প্রশাসনিক ব্যয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে রেখে সরাসরি প্রান্তিক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব ছিল। এই বাড়তি অর্থ যখন সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছায়, তখন তা বাজারে পণ্যের চাহিদা তৈরি করে এবং পরোক্ষভাবে শিল্প উৎপাদন ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া বা অন্যান্য মুসলিম প্রধান দেশগুলোর জাকাত ব্যবস্থাপনার দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা একে একটি অত্যন্ত আধুনিক ও ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় নিয়ে এসেছে। সেখানে জাকাত কেবল অভাবীদের এক বেলা খাওয়ানোর মাধ্যম নয়, বরং এটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি এবং দারিদ্র্যের স্থায়ী অবসানের একটি পদ্ধতি। বাংলাদেশে জাকাত ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর বিক্ষিপ্ত ও অসংগঠিত চরিত্র। আমরা প্রতি বছর দেখি বিত্তবানরা নিজ উদ্যোগে শাড়ি বা লুঙ্গি বিতরণ করছেন, যা অনেক সময় পদদলিত হয়ে প্রাণহানির মতো করুণ ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। এই সনাতনী পদ্ধতি দারিদ্র্য বিমোচন করে না, বরং দারিদ্র্যকে লালন করে এবং মানুষের আত্মমর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। অথচ জাকাতের অর্থ দিয়ে যদি এলাকাভিত্তিক কর্মসংস্থান কেন্দ্র গড়ে তোলা হতো, গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তির ব্যবস্থা করা হতো কিংবা বিনা সুদে ক্ষুদ্র ঋণের বিকল্প হিসেবে বিনিয়োগ করা হতো, তবে সেই মানুষগুলো একসময় নিজেরাই জাকাতদাতার কাতারে শামিল হতে পারতেন। সম্পদের এই যে বৃত্তাকার প্রবাহ, এটিই হলো জাকাত অর্থনীতির আসল মাহাত্ম্য। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় যেখানে সুদ সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঘটায়, জাকাত সেখানে সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করে বাজারকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে।
বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট। মুদ্রাস্ফীতির ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ, যাদের প্রকৃত আয় কমছে এবং ভোগের পরিমাণ সংকুচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জাকাত ভিত্তিক একটি শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। যখন রাষ্ট্র তার সীমিত সম্পদ দিয়ে বিশাল জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন জাকাত হতে পারে একটি বেসরকারি এবং ধর্মীয় দায়বদ্ধতা থেকে আসা বিকল্প অর্থায়ন। ২০২৬ সালের দিকে আমরা যখন এলডিসি থেকে চূড়ান্তভাবে উত্তরণ লাভ করব, তখন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর অনুদান বা সহজ শর্তের ঋণ অনেক কমে যাবে। সেই কঠিন সময়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের জন্য জাকাত ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ছাড়া আমাদের হাতে খুব বেশি বিকল্প থাকবে না। যদি আমরা এখনই একটি সঠিক আইনি কাঠামো এবং মানুষের আস্থার জায়গা তৈরি করতে না পারি, তবে সম্পদের এই বিশাল সম্ভাবনাটি চিরকালই অব্যবহৃত থেকে যাবে। সাধারণ মানুষের মনে একটি বড় সংশয় থাকে যে, জাকাতের টাকা সঠিক খাতে ব্যয় হচ্ছে কিনা বা এর মধ্যে কোনো দুর্নীতি প্রবেশ করছে কিনা। এই আস্থাহীনতা দূর করার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্লকচেইন ভিত্তিক ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে, যাতে দাতা দেখতে পারেন তার দেওয়া অর্থ ঠিক কার কাছে পৌঁছাচ্ছে।
জাতীয় বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরকার প্রতি বছর দেশি ও বিদেশি ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করে, যার সুদের বোঝা বইতে হয় সাধারণ জনগণকে। যদি একটি প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অর্থায়ন করা যেত, তবে রাষ্ট্রের ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা অনেক কমে আসত। জাকাত কেবল একটি ধর্মীয় বিধান নয়, এটি একটি সামাজিক কর ব্যবস্থা যা সরাসরি সম্পদশালীদের কাছ থেকে নিয়ে বিত্তহীনদের দেওয়া হয়। বর্তমান কর ব্যবস্থায় আমরা দেখি যে, সাধারণ মানুষের ওপর ভ্যাট বা পরোক্ষ করের বোঝা বেশি থাকে, যা প্রকারান্তরে বৈষম্য বাড়ায়। জাকাত ব্যবস্থা এ অসামঞ্জস্যতা দূর করার জন্য একটি আদর্শ মডেল। এটি সম্পদকে অলস ফেলে রাখতে নিরুৎসাহিত করে এবং অর্থনীতিতে অর্থের গতিশীলতা বজায় রাখে। সামষ্টিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে অর্থের বেগ বা ‘ভেলোসিটি অফ মানি’ যত বেশি হয়, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তত বেশি সম্প্রসারিত হয়। জাকাত যেহেতু সম্পদের আড়াই শতাংশ প্রতি বছর বাধ্যতামূলকভাবে খরচ করার নির্দেশ দেয়, সেহেতু এটি পুঁজিবাদীদের বাধ্য করে তাদের সম্পদকে বিনিয়োগে খাটাতে। এর ফলে নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে এবং বেকার সমস্যার সমাধান হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাকাত ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চিন্তার সমন্বয়হীনতা। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ সরকারের জাকাত তহবিলের চেয়ে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত কোনো প্রতিষ্ঠানে অর্থ দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এই প্রবণতা পরিবর্তনের জন্য সরকারকে উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে থাকা জাকাত বোর্ডকে আরও স্বায়ত্তশাসিত ও শক্তিশালী করতে হবে যেখানে অর্থনীতিবিদ, আলেম এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকবে। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে একটি আঞ্চলিক মডেলও চিন্তা করা যেতে পারে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে যেখানে এখনো দারিদ্র্যের হার শহরের তুলনায় অনেক বেশি, সেখানে জাকাত ভিত্তিক সমবায় ব্যবস্থা চালু করা গেলে কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা যারা মহাজনী ঋণের জালে পিষ্ট হন, জাকাতের অর্থ দিয়ে তাদের কৃষি উপকরণ সরবরাহ করলে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
পবিত্র রমজান এবং ঈদুল ফিতরের এই সময়ে আমরা যদি হৃদয়ের প্রসারতা দিয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্যের দিকে তাকাই, তবে দেখব যে জাকাত ব্যবস্থা কেবল পরকালীন মুক্তির উপায় নয়, বরং এটি ইহকালীন মুক্তিরও এক অনন্য চাবিকাঠি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। যে প্রবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের পেটে ক্ষুধা রেখে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখে, সেই প্রবৃদ্ধি টেকসই হতে পারে না। জাকাত ভিত্তিক একটি শক্তিশালী সামাজিক কাঠামো তৈরি করা গেলে তা হবে দারিদ্র্য বিমোচনের সবচেয়ে কার্যকর ও সস্তা মডেল। এটি কোনো দয়া নয়, বরং বিত্তহীনদের প্রাপ্য অধিকার। এই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রকে যেমন নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ নিতে হবে, তেমনি সম্পদশালীদের মাঝেও চেতনার উন্মেষ ঘটতে হবে। 
আমরা যদি একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর জাকাত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে অভাবের গ্লানি চিরতরে মুছে যাবে। সাম্যের সেই সুদিন দেখার প্রত্যাশায় আমাদের অর্থনৈতিক নীতিমালায় জাকাতকে একটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার নয়, বরং নৈতিক অপরিহার্যতায় পরিণত হয়েছে। আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কতটা সাহসের সাথে এ ধরনের মৌলিক সংস্কার গ্রহণ করতে পারছি তার ওপর। জাকাত হোক আমাদের দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের অন্যতম কারিগর।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক
[email protected]

প্যানেল/মো.

×