টানা চার মাস ধরে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন দেশের প্রান্তিক পোলট্রি খামারিরা। দেশের সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দৈনিক পণ্যমূল্যের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সম্প্রতি রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি হালি ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ৩৬-৪০ টাকা। আর মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা হলো, প্রতিটি ডিম উৎপাদনে যেখানে খরচ পড়ছে প্রায় সাড়ে ৯ টাকা, সেখানে খামারিদের বিক্রি করতে হচ্ছে সাড়ে ছয় টাকার মতো দামে। ফলে প্রতিটি ডিমেই প্রায় তিন টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। অথচ সেই ডিম আড়ত হয়ে খুচরা বাজারে সাধারণ ভোক্তাকে ১১ টাকায় কিনে খেতে হচ্ছে। এছাড়া প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে ১৮০-১৯০ এবং এক মাস আগে ১৭০-১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পোল্ট্রি খাতে দিনের পর দিন এই লোকসান টেনে নেওয়া, ঋণের চাপ, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া, কর্মচারীর বেতন– সব মিলিয়ে প্রান্তিক খামারিদের জীবন এখন অনিশ্চয়তার দোলাচলে। অনেকে খামার গুটিয়ে ফেলেছেন, কেউ অন্য পেশায় চলে গেছেন। আবার কেউ ঋণের চাপে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে থাকছেন।
ছোট খামারিদের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তারা দ্রুত লোকসানে পড়েন। বড় বাণিজ্যিক খামার সহজে ঋণ ও সরকারি সুবিধা পায়। কিন্তু প্রান্তিক খামারিরা তা পান না। ফলে তারা একবার ক্ষতির মুখে পড়লে আবার উৎপাদনে ফিরতে পারেন না। বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য রোধ করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারগুলো টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্যে একদিকে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে বাড়তি মূল্যে ডিম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রেতা। যদি ছোট খামারগুলো বন্ধ হয়ে যায় তাহলে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ডিম ও মুরগির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। এতে ভবিষ্যতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে সরাসরি ভোক্তার ওপর।
পোলট্রি খাত গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। দুই দশকের বেশি সময় প্রান্তিক খামারিদের পরিশ্রমের কারণেই দেশের মানুষ তুলনামূলক কম দামে ডিম ও মুরগি খেতে পেরেছেন। অথচ আজ তারাই সবচেয়ে বেশি সংকটে। বাজারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য নির্ধারণ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো না গেলে ছোট খামারিরা দ্রুত ঝরে পড়বে এমনটাই স্বাভাবিক। খামারিদের অভিযোগ, পোলট্রি খাত নিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর নীতিমালা নেই। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রেও জানা যায়, আগের তুলনায় দেশে পোলট্রি খামারের সংখ্যা কমেছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে খাতটি সুরক্ষা পাবে। তাছাড়া প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিমের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ, স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমানো, পোলট্রি খামারিদের জন্য কৃষক কার্ড ও ভর্তুকি এবং ছোট খামারিদের জন্য আলাদা নীতিগত সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
প্যানেল/মো.








