ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ১৬ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩২

নতুন বাংলাদেশের ২৮ দিন

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

প্রকাশিত: ২১:৫০, ১৬ মার্চ ২০২৬

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

নতুন বাংলাদেশের ২৮ দিন

বাংলাদেশ এখন এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জনম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের প্রথম ২৫ দিনে বেশ কিছু সাহসী ও ‘স্মার্ট মুভ’ গ্রহণ করেছে। এই যাত্রার মূলে রয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উৎপাদনমুখী রাজনীতি এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপোসহীন সংগ্রামের আদর্শিক সেতুবন্ধন। বর্তমান রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান এই উত্তরাধিকারকে ধারণ করে আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তা জনগণের মধ্যে যেমন আশার সঞ্চার করেছে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ ও বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষের কাছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরিচয় ছিল একজন ‘মাঠের মানুষ’ হিসেবে। সাধারণ পোশাকে কৃষকের সঙ্গে খাল কাটা বা অজপাড়া গাঁয়ে হেঁটে বেড়ানো জিয়ার সেই ছবিগুলো আজও গ্রামীণ জনপদে জনপ্রিয়। তারেক রহমান যখন প্রটোকল ভেঙে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশছেন, তখন অবচেতনেই মানুষ তাঁর মধ্যে জিয়ার সেই ছায়া খুঁজে পাচ্ছে। গত দেড় দশকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তারেক রহমানের ব্যাপারে যে নেতিবাচক বয়ান তৈরির চেষ্টা করেছিল, তাঁর বর্তমান আড়ম্বরহীন চলাফেরা সেই প্রচারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে। বিদেশের বিলাসিতা ছেড়ে দেশে ফিরে এসে তৃণমূল মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা শোনা এবং সাধারণ জীবনযাপন তাঁর সম্পর্কে জনমনে একটি ‘নতুন ইতিবাচক উপলব্ধি’ তৈরি করেছে। মানুষ তাকে এখন একজন পরিণত ও সংবেদনশীল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেখছে।
সাধারণত বাংলাদেশের রাজনীতিতে শীর্ষ নেতাদের কাছে পৌঁছাতে হলে দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক বা দলীয় স্তরের বাধা পার হতে হয়। তারেক রহমান সরাসরি জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে এই ‘দেয়াল’ ভেঙে দিয়েছেন। এর ফলে তৃণমূলের প্রকৃত সমস্যাগুলো কোনো ফিল্টার ছাড়াই তাঁর কাছে পৌঁছাচ্ছে। দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে জবাবদিহি ভয় তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে, সরকার তাদের কথা শুনছে, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বড় একটি প্রাপ্তি।
বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ‘প্রটোকল-নির্ভর’ বা ‘রাজকীয়’ নেতৃত্বের চেয়ে ‘অ্যাক্সেসিবল’ বা সহজলভ্য নেতৃত্ব পছন্দ করে। তারেক রহমান যেভাবে সাধারণ পোশাকে, সরাসরি মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন, তা তরুণদের কাছে তাকে একজন আধুনিক ও প্রগতিশীল নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। এটি কেবল আবেগ নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত কৌশলগত নেতৃত্ব (Strategic Leadership)। আড়ম্বরহীন জীবন যাপনের মাধ্যমে তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা দিচ্ছেনÑ ক্ষমতা মানে ভোগবিলাস নয়, বরং ত্যাগ। যখন শীর্ষ নেতা নিজে মিতব্যয়ী হন, তখন নিচের স্তরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার করার প্রবণতা কমে আসে। এটি বর্তমান সরকারের ‘দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন’ গড়ার লক্ষ্যের সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
গণভোটের মাধ্যমে প্রাপ্ত বিশাল জনম্যান্ডেটকে ভিত্তি করে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে সরকার দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই সনদ কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং ছাত্র-জনতার বিপ্লবের রক্তাত আকাক্সক্ষার এক আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা। গত ২৪ দিনের কার্যক্রমে দেখা গেছে, জুলাই সনদের আলোকে প্রশাসনকে আমূল সংস্কার, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং জুলাই হত্যাকা-ের প্রতিটি ঘটনার স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেও জুলাই সনদের মূল দফাগুলোকে রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করার যে তাগিদ পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা প্রমাণ করে যে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার গণভোটের রায়কে সম্মান জানিয়ে একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়তে সম্পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ। অবশ্য গণভোটের প্রাপ্ত ম্যান্ডেটের সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে কিছু বিষয়ে ভিন্নতা রয়েছে। সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।
অবশ্য নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের প্রান্তিক ও দুস্থ নারীদের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রী ১০ মার্চ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত হয়ে এই স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। তিনি ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্পটে উপস্থিত উপকারভোগীদের সঙ্গে সরাসরি ভিডিও কলে কথা বলেন এবং তাদের হাতে কার্ড তুলে দেওয়ার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এবং পতেঙ্গা-বন্দর আসনের সংসদ সদস্য, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রমের  উদ্বোধন করেন।

মন্ত্রীর হাত থেকে কার্ড গ্রহণ করে পতেঙ্গার দুস্থ ও নি¤œআয়ের নারীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। বিতরণকালে তিনি উল্লেখ করেন যে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং প্রকৃত অভাবীদের কাছে সরাসরি সরকারি সুবিধা পৌঁছে দিতে এই এনএফসি (ঘঋঈ) চিপযুক্ত স্মার্ট কার্ড একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
জনপ্রশাসনে পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সরকার ক্ষমতায় আসার পর জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিলেও মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুনর্প্রতিষ্ঠায় কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে, যা বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হচ্ছে। মব জাস্টিস বা গণপিটুনি এবং অস্থিরতার যে সংস্কৃতি  তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ন্ত্রণে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী  বারবার সতর্ক করেছেন, যে কোনো মূল্যে শান্তি বজায় রাখতে হবে এবং কোনো ধরনের প্রতিহিংসামূলক কর্মকা- বরদাস্ত করা হবে না।  
সরকারের ২৫ দিনের কার্যক্রমে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও সমালোচিত বিষয়টি হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিয়োগ দেওয়া অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে ব্যবসায়ী নেতা মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়ায় টিআইবি (ঞওই) সহ বিভিন্ন সুশীল সমাজ এই নিয়োগের তীব্র বিরোধিতা করেছে। তাদের অভিযোগ, একজন ব্যবসায়ীর হাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়া ‘স্বার্থের সংঘাত’ (Conflict of Interest) তৈরি করতে পারে।

এ বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন গভর্নর বন্ধ কল-কারখানা চালু এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট নিরসনে ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কাজ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে সরকার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশের শীর্ষ আলেমদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে জাকাত ভিত্তিক দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে। এটি কেবল ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একটি সফল অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে দারিদ্র্য নিরসনে বড় ভূমিকা রাখবে। ইসলামী অর্থনীতির এই মৌলিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের নি¤œবিত্ত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ‘স্মার্ট মুভ’।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, তা মোকাবিলায় সরকার অত্যন্ত সতর্ক। জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে জোর দেওয়া এবং সাশ্রয় নীতি গ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ কমানো হচ্ছে। একইসঙ্গে, দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এক ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের দিকে ঝুঁকে না পড়ে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখার এই নীতি বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবে
রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা নগরে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ-এর প্রথম অধিবেশন। সংসদ ভবনের সেই চিরচেনা করিডোর আবার মুখরিত হচ্ছে জনগণের প্রতিনিধিদের পদচারণায়, যা দীর্ঘ দেড় দশক পর এক অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে যেসব ‘স্মার্ট মুভ’থ তা সে জ্বালানি সাশ্রয় নীতি হোক, জাকাতভিত্তিক দারিদ্র্য বিমোচনের সাহসী উদ্যোগ হোক, কিংবা জুলাই সনদের বাস্তবায়নথ সবই আজ এই মহান সংসদে আইনি ও কাঠামোগত ভিত্তি পেতে যাচ্ছে। শহীদ জিয়ার সেই ঐতিহাসিক ১৯-দফা আর বেগম জিয়ার গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই আজ যেন এই সংসদীয় কক্ষেই পূর্ণতা পাচ্ছে।

সংসদ অধিবেশন শুরুর এই মাহেন্দ্রক্ষণে জাতির প্রত্যাশা, তারেক রহমানের আড়ম্বরহীন জীবনবোধ এবং সরাসরি জনসম্পৃক্ততার যে সংস্কৃতি গত তিন সপ্তাহে আমরা দেখেছি, তা যেন কেবল রাজপথের রাজনীতিতে নয়, বরং সংসদের প্রতিটি বিতর্কেও প্রতিফলিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা আর অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংসদই হোক জাতীয় ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু। সরকারের  এই সফল অভিযাত্রা যেন আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি সমৃদ্ধ, সুশাসিত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের সোপান হয়ে থাকে।
লেখক  : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

[email protected]

প্যানেল হু

×