চিত্তরঙ্গিনী
যানজটের শহরে সন্ধ্যা নেমেছে। ব্যস্ত সড়কে থেমে থেমে চলছে লক্কড়-ঝক্কড় জীর্ণ বসগুলো, তাতে আটকা কত মানুষজন! হঠাৎ অনিবার্য কারণে রাকিবের মনটা ভালো নেই। বিদেশ থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরেছে সে, মাসখানেক হলো। ক’দিন ধরেই রাতে তার ভালো ঘুম হয় না, কেমন নিদ্রাহীন কেটেছে গতকাল রাতও! এদিন সন্ধ্যায় রুম থেকে বেরিয়ে কোথাও ঘুরে আসা যায় কিনা, ভাবছিল সে। আশপাশে তেমন কোনো পছন্দ মতো জায়গাও ভেবে পায় না, যেখানে গিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ সময় কাটাবে।
এমন মন খারাপ করে রুমে একা বসে থাকারও কোনো মানে নেই। সন্ধ্যার পর রাজধানীর অভিজাত এলাকায় হাঁটতে হাঁটতে কৌতূহলবশত একটি মদের দোকানে উঁকি দেয় রাকিব। উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েদের ভিড় করতে দেখা যাচ্ছে। কয়েকটা ব্যক্তিগত গাড়ি দোকানের সামনে থেমে আছে এলোমেলো ভাবে। বিদেশে থাকাকালীন সহপাঠীদের সঙ্গে রাকিব মদ খেয়েছে কালেভদ্রে। দেশের মদে যে ভেজাল থাকে, সেটা তার অজানা নয়। আগে কখনো এসব মদের দোকানে আসার ইচ্ছেও তার হয়নি। কেন যেন আজ ভেতরে ঢুকতে তার ইচ্ছে করছে। দোকানের এক পাশের দেওয়াল ঘেঁষে ফাঁকা একটা টেবিলে গিয়ে বসে রাকিব। বেয়ারা এলে এক পেগ হুইস্কির অর্ডার করে সে।
দোকানের ভেতরে নিভু-নিভু অবস্থায় আলো নাচছে যেন। এদিক ওদিক তরুণ-তরুণী গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে হুইস্কি খাচ্ছে। দোকানের কাউন্টারের পাশে রাখা সোপায় বসে আছে শর্ট স্কার্ট পড়া অল্প বয়সী তিনটি মেয়ে। আবছা আলোয় তাদের মুখ তেমন ভালো দেখা যাচ্ছে না। মেয়েগুলোর দিকে তাকায় রাকিব। একটি মেয়ের চোখাচোখি হতেই কামুক হাসি ফুটে মেয়েটির মুখে। চোখ ফিরিয়ে রাকিব হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দেয়। মেয়েটি তার কাছে এসে দাঁড়ায়। মোটামুটি সুন্দরী বলা যায় মেয়েটাকে। ফর্সা লম্বাটে মুখ। খুব চালাক-চতুরও মনে হয়। বয়স বাইশ-তেইশ হবে। টানা-টানা চোখ আর শরীর সম্পূর্ণ ভরা নদীর মতো- যৌন আবেদনময়ী। এত কিছুর পরও মেয়েটির চোখেমুখে গ্রাম্যতার একটা ছাপ স্পষ্ট।
কোমল গলায় মেয়েটি বলল, এক্সকিউজ-মি! আপনার পাশে বসতে পারি? মেয়েটির দিকে চেয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল রাকিব। মেয়েটির জন্যও এক পেগ হুইস্কির অর্ডার দেয় সে। দু’চার কথা হয় মেয়েটির সঙ্গে। মেয়েটির বাসা কোথায়, অকারণে জানতে চায় রাকিব। কেমন ভনিতার সুরে মেয়েটি বলে, কেন? আমার রুমে যাবেন? অপরিচিত ছেলেদের সঙ্গে এত সহজে কথা বলতে পারে মেয়েটি। রাকিব নিশ্চুপ চেয়ে ভাবে। মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে তার খুব একটা ইচ্ছেও করছে না। রাকিব ভাবছে, নারী সঙ্গিনী তো চাই তেমন একজনকে- যে কিনা চুপচাপ পাশে বসে থাকবে, মুখে কোনো কথা বলা ছাড়াই তার আনন্দ-বেদনা বুঝতে পারবে...। হুইস্কির গ্লাসে ফের চুমুক দেয় রাকিব।
তারপর মেয়েটির দিকে চেয়ে বলে, আমার মনটা ভালো নেই, প্রেমিকার...। - প্রেমিকার বিয়ে হয়ে গেছে নিশ্চয়ই! মেয়েটি মুখ চেপে বিদ্রুপ হাসে সামান্য, তারপর বলে, ইদানীং কত ছেলের মুখে যে এসব কথা শুনতে হয়! আপনার প্রেমিকাও তাহলে খুব নটি ছিল! কজনের সঙ্গে প্রেম করত ? এমন কথায় রাকিব আহত চোখে চেয়ে থাকে মেয়েটির দিকে। - প্রেমিকা ছেড়ে গেল কেন? জানতে চায় মেয়েটি। - কারণ আছে একটা, গল্পের মতো কারণটা, বলতে গেলে রাতটা পেরিয়ে যাবে! - তাহলে বেশ! আমার রুমে চলুন। রাতভর সেই গল্পটাই শুনব। অবশ্য আপনার প্রেমিকার গল্পটা শুনতে শুনতে আমাকে যে রাতভর...। কী ভেবে রাকিব বলল, তোমার রুমে কী সারারাত থাকা যায়? - ওমা! সারারাত কাটাবেন!
রাকিব হুইস্কির গ্লাসে ফের চুমুক দেয়। তারপর বলল, হুম! রাতভর তোমাকে গল্পটা শোনাব। অদ্ভুত সুন্দর করে হাঁসল মেয়েটি। হুইস্কির গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে বলল, সেটা সমস্যা হবে না। টাকাটা একটু বাড়িয়ে দিলেই চলবে! আমি তো টাকার জন্যই...। -তা ঠিক আছে, দেব। বেয়ারাকে ডেকে হুইস্কির বিলটা দেয় রাকিব। তারপরও যথেষ্টা টাকা আছে তার পকেটে। মেয়েটিকে বলল, রুমে কখন যাবে? মেয়েটি হাতঘড়ি দেখে বলল, আপনি বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করুন। আমি আসছি। কথা শেষে রাকিব বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। কয়েক মিনিট পর শালীন পোশাকে মেয়েটি বেরিয়ে আসে।
একটা সিএনজি ডেকে রাকিবকে হাত ধরে টেনে নিয়ে সিটে বসে মেয়েটি। গুলিস্তানের ফুটপাতে বিক্রি হওয়া সস্তা পারফিউমের অস্বস্তিকর গন্ধ মেয়েটির শরীরে! রাস্তায় গাড়ি কম। চলন্ত সিএনজিতে হালকা বাতাস পেয়ে গতরাতের নিদ্রাহীনতায় একটু ঘুমের ভাবে ঝিমিয়ে পড়ে রাকিব। কিছু দূর যেতেই মেয়েটির কাঁধে মাথা রাখে সে। ইতোমধ্যে সিএনজি চালক মেয়েটির কথায় একটা গলিপথে ঢুকে যায়। রাকিব গায়ে হেলে পড়ছে দেখে মেয়েটি তাকে ধাক্কা দিয়ে বলে, এই যে ভদ্রলোক, একটু সোজা হয়ে বসুন! গায়ে শুয়ে পড়বেন না! ধাক্কা খেয়ে সোজা হয়ে বসে রাকিব।
মেয়েটি মিনমিন করে বলে, ছেলেরা যে কেমন! মেয়েদের কাছে পেলে সামান্য লজ্জ্বাবোধও রাখে না! মেয়েটির তিক্ত কথায় বিব্রত বোধ করে রাকিব। এরইমধ্যে একটা পুরোনো আমলের ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে সিএনজি এসে থামল। এলাকাটা একেবারে অপরিচিত রাকিবের। মেয়েটি তাকে হাত ধরে নিয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল। বাড়ির দেওয়ালে প্লাস্টার, চুন-বালি খসে খসে পড়ছে, দু-এক জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙাও সিঁড়ির রেলিংয়ে। বাড়ির মালিকের বোধহয় এসব বিষয় নিয়ে মাথাব্যথা নেই সামান্যও। সিঁড়িপথে অচেনা লোকজনের পাশ ঘেঁষেই রাকিবকে নিয়ে ওপরের দিকে উঠে গেল মেয়েটি।
পাঁচতলার একটা রুমের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল মেয়েটি। রুমের তালা খুলে রাকিবকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দেয় সে। এক রুমের ঘরের ভেতরটা খারাপ না। বেশ পরিপাটি বলা যায়। বিছানায় আরাম করে বসতেও তেমন অরুচি হলো না। রাকিবের চোখে পড়ল, বিছানার পাশে কয়েকটা কনডম রাখা আছে। রাকিব বিছানায় বসতেই মেয়েটিকে বিবস্ত্র হতে দেখে তার ভীষণ অস্বস্তি বোধ হলো। মেয়েটিকে পোশাক খুলতে বাধা দেয় সে। মেয়েটি অবাক চোখে চেয়ে বলল, দেরি করে কী হবে! আমার কাজ এটাই তো...। -তা ঠিক আছে। এত তাড়াহুড়োর কিছু নেই। এক রাতে কি তোমার একাধিক খদ্দের থাকে? সামান্য হাঁসল মেয়েটি। তারপর বলল, প্রস্তুত তো থাকতেই হয়।
কখন কার প্রয়োজনে, কার ফোন আসে- সেটার কী ঠিক আছে! কথা শেষে রাকিবের পাশ ঘেঁষে বসল মেয়েটি। রাকিবের কাঁধে একটা হাত রাখে সে। একটু দূরে সরে বসে রাকিব বলল, আমার কিন্তু মোটেও ইচ্ছে করছে না, বেশ্যার সঙ্গে...। রাকিবের কথায় অত্যল্প অপমানবোধ নিয়ে মেয়েটি বলল, দেখুন, এই মুহূর্তে কিন্তু আপনার আর আমার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তাছাড়া, বেশ্যাও মানুষই! পুরুষের যৌন চাহিদা মিটাতেই নারী হয় বেশ্যা!... মেয়েটি কথা বলতেই থাকে। রাকিব কেমন যেন অপরাধবোধ নিয়ে একেবারে নিশ্চুপ। মেয়েটির দিকে নির্লোভ চোখে চেয়ে থাকে সে। এই মুহূর্তে রাকিবের মাথার ভেতর কত রকম চিন্তা যে ভিড় করছে। মনে পড়ছে তার প্রেমিকা রিমার কথাও। রিমা কোথায় আছে? কী করছে সে? কারও সঙ্গে সেও কী...? নাহ! রিমাকে নিয়ে এসব ভাবতে তার ভালো লাগছে না।
মাথা নিচু করে অন্যমনস্ক হয়ে বসে থাকে রাকিব। অগত্যা, বুকের ওপর থেকে পুরো পোশাক সরিয়ে কেমন তেজি গলায় মেয়েটি বলল, আরে, এদিকে তাকান না! আমাকে কী অসুন্দর লাগছে?... মেয়েটির উন্মুক্ত বুকের উঁচু স্থান দুটির দিকে তাকায় রাকিব। যৌন সুরসুরি জাগে তার মনে। নিষ্পলক চেয়ে থাকে সে। অনুচ্চ স্বরে রাকিব বলে, খুব সুন্দর, খুব সেক্সি...! কিছুক্ষণ মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে বসে থাকে সে। রাকিবের বুকে স্থান পেয়ে মেয়েটি ভণিতার সুরে বলে, আমি হয়ত আপনার প্রেমিকার মতো ভালো মেয়ে না। আমার তেমন পড়াশোনাও নেই। গ্রামের একটা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছি। তারপর পড়ালেখা করার সুযোগও হয়নি।
কারও সঙ্গে সুন্দর করে কথাও বলতে পারি না..., কথায় কথায় মেয়েটির গলা শুকিয়ে আসে! চোখে পানিও এসে যায় সামান্য। হঠাৎ করেই মেয়েটিকে বোধহয় কিছুটা ভালো লাগে রাকিবের! মেয়েটির খোলা পিঠে ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ স্পর্শ করে, ঠোঁটে চুমুও খায় কয়েকবার! তবে মেয়েটিকে হঠাৎ এমন ভালো লাগাটা তার প্রেমিকা রিমার মতো তেমন ভালো লাগাটা নয় মোটেও! কারণ রিমার জন্য যে ভালো লাগাটা, সেটা তো শুধু তার শরীরের জন্য নয়, সেটা তার অন্য কিছুর জন্যই বোধ হয়। একপর্যায় মেয়েটার সঙ্গে কিছু অশ্লীল কথাবার্তাও হয় রাকিবের। এমন অশ্লীল কথাবার্তা আগে কোনোদিন কোনো মেয়ের সঙ্গে বলেনি রাকিব। তার চিন্তায়ও কখনো আসেনি ওসব বিষয়।
নির্জনে নারী সঙ্গ পেলে হয়ত পুরুষের চিন্তা-চেতনায় হঠাৎ পরিবর্তন আসে! রাকিব কথার প্যাঁচে মেয়েটিকে বলল, এই পথে আসলে কেন? এমন প্রশ্নে মেয়েটি কেমন যেন বিরক্তবোধ নিয়ে বলে, কেউ ইচ্ছা করে এই পথে আসে না। আমার বিয়ে হয়েছিল অল্প বয়সেই। বিয়ের মাসখানেক পর স্বামী ছেড়ে চলে গেল। স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ নাই দীর্ঘদিন। ছিলাম বাবার সংসারে। সেখানে কত রকম অভাব। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। ঘরে মা অসুস্থ। ঠিকঠাক খাবার জুটে না। মায়ের ওষুধ কেনার টাকা কোথায়! সংসার চলবে কিভাবে! আমরাই কিভাবে বাঁচব । ছোট বোন অভাব-অনটন সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে। ছোট ভাইটাও অভাবের তাড়নায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে বাড়ি ছাড়ে। কোলের শিশুকে বুকে চেপে ধরে শ্বাসরোধে হত্যা করেন আমার মা!
এমন নির্দয় ঘটনার পরদিন বাড়ির পাশে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিলেন তিনি। নিরুপায় হয়ে আমি বাড়ি ছেড়ে ট্রেনে চড়ে এই শহরে আসি। ট্রেন থেকে নেমে এক লোকের পাল্লায় পড়ি। আমাকে একটা মহিলার কাছে রেখে যায় লোকটি। বিনিময়ে লোকটি বোধহয় কিছু টাকাও নেয়! ঘর ছাড়ার আগে কাউকে কিছু বলেও আসতে পারিনি। এই শহরে আসার পর, পুষ্টির অভাবে শুকিয়ে যাওয়া আমাকে যৌন আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য খেতে হয়েছে শরীর মোটাতাজা করার ওষুধ। ওই মহিলার নিয়মিত খদ্দরের লালসার খোরাক বানানো হলো আমাকে। অল্পদিনে আমি হলাম নারী লোভী পুরুষের চিত্তরঙ্গিনী! বিশেষ উৎসবের দিনে আমাকে ভাড়া করে নিয়ে রাতভর ফূর্তি করত কতজন! অল্পবয়সী বলে আমার চাহিদাও ছিল বেশি। রাতের পর রাত কত মাতালের অত্যাচার, কত যৌন নির্যাতন! এক সময় অতিষ্ঠ হয়ে পড়ি। পালিয়ে আসি সেখান থেকে। তারপর নিজের পথ নিজেই বেচে নিয়েছি।
অবশ্য, আমার কাছে এখনো হরেক রকম লোক আসে, কেউ আমাকে পশুর মতো ভোগ করে, কেউ আবার জড়িয়ে ধরে রঙ করে, কত রকম গল্প করে...। একেক জনের যেমন একেক রকম কষ্ট, তেমন একেক রকম চাহিদাও। আমার সঙ্গ পেয়ে ক্ষণিকের জন্য হয়ত কারও কারও চিত্তে শান্তি মিলে। মনে ফূর্তি অনুভব করে। কোনো কারণে মন খারাপ হলে রাত-দুপুরে আমার কাছে ছুটে আসে কেউ কেউ। আমাকে হয়ত তাদের চিত্তরঙিনী বোধ করে! কথায় কথায় মেয়েটির চোখের ভেতর জ্বলছে কেমন অদৃশ্য ঘৃণার আগুনও। যে আগুনে পুড়ছে তার ভেতরটাও। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে মেয়েটি। কে জানে! হয়ত চরম কোনো কষ্টে তার বুকের ভেতরে কঠিনভাবে মুচড়ে মুচড়ে রক্তপাত হচ্ছে অবিরত, সেটা হুট করে কী ভাবে বুঝবে অন্য কেউ! মেয়েটির চোখ থেকে টপ টপ করে পানি পড়ে।
চোখের পানি লুকানোর তার তেমন চেষ্টা নেই। নরম গলায় ফিসফিসিয়ে মেয়েটি বলে, আমার গল্প তো অনেক হলো। আপনার প্রেমিকার গল্পটা বলুন। মেয়েটি তার উন্মুক্ত বুকটা পোশাকে ঢেকে নেয়। মেয়েটির মুখের দিকে তাকায় রাকিব। এমন অসহায় মুখখানার প্রতি কেমন মায়া জাগে রাকিবের। সহানুভূতির গলায় রাকিব বলে, তুমি কী সুখে আছো? চোখের পানি মুছে মেয়েটি বলল, হ্যাঁ, সুখেই আছি বোধ হয়! দিন তো কেটে যাচ্ছে ভালোই। এখন আর কেউ আমাকে অসুখী করতেও পারবে না। আমাকে অসুখী করাটা অনেক কঠিনই, প্রায় অসম্ভবও! এত কিছুর পরও আমি কিন্তু সম্পূর্ণ হতাশ হইনি এখনো।
সম্পূর্ণ হতাশ হলে তো বেঁচেও থাকা যায় না। মাঝে মধ্যে যেন মনে হয়, একদিন বিশেষ কোনো একজনের সঙ্গে দেখা হবেই! অকল্পনীয় কিছু একটা ঘটে পাল্টে যাবে আমার এমন জীবনটাও...! হঠাৎ খুব আনমনা হয়ে যায় রাকিব। মেয়েটির আর একটি কথাও শোনতে তার ইচ্ছে করছে না। মুখের ওপর হাতটা চেপে হাই তুলে বলল, ক্লান্ত লাগছে খুব। ঘুম পাচ্ছে। প্যান্টের হিপ-পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে রাকিব। সিএনজি ভাড়ার জন্য পাঁচশ’ টাকা রেখে বাকি সবগুলো টাকা মেয়েটির সামনে রেখে কেমন বিরক্তবোধ নিয়ে রাকিব বলল, এখন আমি যাই। মেয়েটি বলল, কিন্তু আপনার প্রেমিকার গল্পটা তো শোনা হলো না! - আজ সেই গল্প করতে ইচ্ছে করছে না। রাকিব উঠে দাঁড়াতেই মেয়েটি বলল, মোবাইল নাম্বারটা...। কথা না বাড়িয়ে মেয়েটির রুম থেকে অস্থিরতা বোধ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রাকিব।
দ্রুত বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে সে। কত খারাপ লোকের, মাতালের হাঁটাচলা এ-মহল্লার গলি রাস্তায়। রাকিবকে এত রাতে গলি পথে একা যেতে দিতে একটু দ্বিধা হলো মেয়েটির। রাকিবের অপরিচিত এলাকা, অচেনা গলির পথ ধরেই সে হাঁটছে। রাকিবকে এগিয়ে দিতে পেছনে পেছনে রাস্তায় নেমে আসে মেয়েটিও। রাকিব গলির মোড়ের রাস্তায় আসতেই, মহল্লার মাদকাসক্ত একটা যুবক ছেলে তাকে চাকু দেখিয়ে টাকা-পয়সা যা আছে সব দিতে হুমকি দেয়। মেয়েটি তা দেখেই এগিয়ে এসে মাদকাসক্ত ছেলেটিকে জোরে ধাক্কা দিয়ে চেঁচিয়ে উঠে, ‘খানকির ছেলে ভাগ, নইলে পুলিশ ডাকব, আমার লোকরে...!’ আকস্মিকভাবে মেয়েটির সামান্য ধাক্কাতেই মাদকাসক্ত হ্যাংলা পাতলা ছেলেটি রাস্তায় পড়ে যাচ্ছিল যেন! নিজেকে সামলে দূরে সরে দাঁড়ায় সে।
রাকিব বড় রাস্তার দিকে এগোয়, রুমে ফিরছিল মেয়েটিও। হঠাৎ মাদকাসক্ত ছেলেটি পিছন থেকে এসে চাকু দিয়ে আঘাত করে মেয়েটির তলপেটে। চিৎকারের শব্দে রাকিব পেছনে ফিরে দেখে, গলির ভেতরের দিকে দৌঁড়ে পালিয়ে যাচ্ছে মাদকাসক্ত ছেলেটি আর তলপেটে হাত চেপে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ছে মেয়েটি। রাকিব বিপদের আশঙ্কায় নির্দয় মনোভাব নিয়ে গলির সামনে একটা খালি সিএনজি পেতেই দ্রুত উঠে যায়। বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি নিয়ে তখনো এদিক-ওদিক তাকায় মেয়েটি।
প্যানেল হু








